সামুদ্রিক জলসীমায় মাছের সুষ্ঠু প্রজনন নিশ্চিত করতে সারা দেশের ন্যায় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় গভীর সমুদ্রে মৎস্য নিধনের ওপর ৫৮দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। সরকারি নির্দেশনা মেনে দ্বীপের প্রায় এক লাখ জেলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে বেকার সময় পার করছেন। সরকারি সুবিধা না পাওয়া ও উপার্জন বন্ধ থাকায় অনেকটা অনাহারে অর্ধাহারে কাটছে তাদের জীবন।
সামুদ্রিক মাছের সুষ্ঠু প্রজনন ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ৬৫দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। তবে, গভীর সমুদ্রের নিষিদ্ধ এলাকা নির্ধারণ নিয়েও আছে প্রশ্ন জেলেদের।
গত বছর মাছ শিকারে ৫৮ দিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে ১৫এপ্রিল থেকে ১১জুন পর্যন্ত ৫৮দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ সময় সমুদ্রে মাছ ধরা, ক্রয়-বিক্রি ও পরিবহন সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। আর এ সময় সরকারি নির্দেশনার প্রতি সম্মান রেখে সমুদ্রে মাছ ধরা থেকে বিরত আছে দ্বীপের জেলেরা।
উপজেলা মৎস্য অফিস ও স্থানীয় জেলেরা জানায়, দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ছোট-বড় ২০টি ঘাটে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় লক্ষাধিক জেলে। এর মধ্যে সরকারি সহযোগিতা পেতে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৪ হাজার।
ইতিমধ্যে সরকারি বরাদ্ধের চিঠি চলে এসেছে। এতে চার হাজার ৮৭৩ জন জেলেকে নিষেধাজ্ঞার সময় ৭৭ কেজি করে চাল দেওয়র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চলতি মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা ১৫এপ্রিল থেকে শুরু হলেও এখনও সরকারি সহযোগিতা পায়নি জেলেরা। এতে নিজেদের পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। অভাব আর অনটনে, খেয়ে না খেয়ে কাটছে তাদের জীবন। বেকার সময়ে সংসার চালাতে গিয়ে ধার দেনা আর ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন অনেকে।
বুড়িরচর ইউনিয়নের বড়দেইল গ্রামের বাসিন্ধা রবিয়ল মাঝি দীর্ঘদিন থেকে মাছধরা ট্রলারের মাঝি হিসাবে কাজ করছেন।
রবিয়ল জানান, নিজের মালিকানা ট্রলারের মাঝি তিনি। এই বছর মাছ না ধরায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে আছেন। জ্বালানি তেলের সংকটে নিষেধাজ্ঞায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন রবিয়ল। রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে নিজের একমাত্র সহায়সম্বল ট্রলারটি আগুনে পুড়িয়ে পালিয়ে যেতে চান দেশ থেকে। এই জীবন তার কাছে এখন আর ভালো লাগেনা বলে জানান রবিয়ল।
তিনি আরও জানান, সরকারের কাছে সহায়তা হিসাবে ১০ লিটার পেট্রল চান রবিয়ল। যাতে তার মাছধরার ট্রলারটি সহজে পুড়িয়ে পেলতে পারেন।
বুড়িরচর নতুন সুইজ ঘাটে প্রায় ২ শতাধিক বড় বড় মাছধরা ট্রলার ঘাটে নঙর করা অবস্থায় আছে। এসব ট্রলারের এক একটিতে ২০-২২ জন করে মাঝি মাল্লা। প্রতিদিন সবাই ঘাটে এসে চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
ওই ঘাটের প্রবিন মাঝি আফছার উদ্দিন জানান, প্রতিবছর সরকার দুইভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাতে প্রথম ধাপে ২২ দিন ও পরে ৫৮ দিন। প্রায় তিন মাস। বছরে সমুদ্রে মাছধরার সময় হলো চার মাস। এর মধ্যে তিনমাস থাকে নিষেধাজ্ঞা। বাকি সময় মাছ ধরে খরচ মিটানো কোন ভাবে সম্ভব হয় না। এতে এই পেশায় অনেকে দেউলিয়া হয়ে দেশ ত্যাগ করেছে। সহায় সম্বল হারিয়ে অসুস্থ্য হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ও আছে।
আফছার উদ্দিন আরও জানান, জেলেদের জন্য সরকারিভাবে যে চাল দেওয়া হয় তা অতি নগন্য। হাতিয়াতে জেলে আছে একলাখ। কিন্তু চাল দেওয়া হয় ৫ হাজার পরিবারকে। অন্যরা কিছুই পায় না।
তিনি আরও জানান, এসব চাল না দিয়ে তাদেরকে সহজ লাভে ঋণ দেওয়া হলে অনেক ভালো হতো।
বাবুল পাটি নামে এক জেলে জানান, গভীর সমুদ্রে না গিয়ে উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে মাছ শিকার করলে প্রশাসনের হয়রানির শিকার হতে হয়। গত বছর তাদের ঘাটের তিনটি ট্রলার উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে মাছ শিকার করে ঘাটে ফিরে আসার সময় কোষ্টগার্ড তাদেরকে আটক করে। এ সময় তাদের ট্রলারে থাকা বিপুল পরিমান মাছ প্রশাসন এতিম খানায় বিতরণ করে দেয়।
বাবুল পাটি আরও জানান, এসব মাছ গভীর সমুদ্র থেকে ধরা হয়নি বলা হলেও প্রশাসন তা শুনেন নি। নিষেধাজ্ঞার সময় সমুদ্রের কোন পর্যন্ত গিয়ে মাছ শিকার করা যাবে তার সুনির্দিষ্ট মাপকাটি প্রশাসন ঠিক করে দেয়নি। এতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হয়।
জেলেদের ন্যায় নিষেধাজ্ঞায় একই অবস্থা ট্রলার মালিক ও এই পেশার সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের। কোটি টাকা ব্যায় করে তৈরি করা এসব ট্রলার এখন আর কাঙ্ক্ষিত মাছ পায় না। প্রতিনিয়ত দেনা আর ঋণের টাকা বাড়তে বাড়তে তারা এখন সর্বশান্ত। ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি তাদেরকে সরকারি চাল না দিয়ে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হোক।
হাতিয়া ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি রাশেদ উদ্দিন জানান, নিষেধাজ্ঞার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সরকারি সহযোগিতা এখনো আসে নি। প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞার প্রথমে ও শেষে দুই ধাপে জেলেদের মাঝে এই চাল বিতরণ করা হয়। নিবন্ধীত জেলেদের মধ্য থেকে নিষেধাজ্ঞা সময়ের জন্য প্রনোধনা হিসাবে চাল বিতরণ করা হয়। কিন্তু বিগত বছর গুলোর বরাদ্ধের চিঠি পর্যালোচনা করে দেখা যায় এই সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এক লাখ জেলের মধ্যে গত বছর ৪ হাজার ৮ শত জেলেকে এই চাল দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান প্রায় এক লাখ জেলের মধ্যে মাত্র ২৪ হাজার নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। বাকি জেলেরা কেন সহযোগিতার বাইরে থাকবে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এই বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: ফয়জুর রহমান বলেন, জেলেদের মাঝে চাল বিতরণের একটি চিঠি পেয়েছেন। তাতে ৪ হাজার ৮ শত পরিবারকে চাল সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেহেতু চিঠি এসেছে বরাদ্দও কয়েকদিনের মধ্যে পাওয়া যাবে। তবে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু মাত্র গভীর সমুদ্রে যাওয়া জেলেদের জন্য। উপকূলের কাছাকাছি জেলেরা মাছ ধরতে পারবেন।
আরটিভি/এমএম




