একজন সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারী হলেও চিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কম্পিউটার চালুর সঙ্গে সঙ্গে ওয়ালপেপারে নীল আকাশের নিচে সবুজ পাহাড়ের সঙ্গে দিগন্ত মেশা ছবিটি। ২০০০-এর দশকের শুরুতে যাদের কম্পিউটারে হাতেখড়ি তাদের তো এ ছবির সঙ্গে মিশে আছে এক গভীর আবেগ। এডিটেড মনে হলেও এটি আসলে একজন ফটোগ্রাফারের ক্যামেরায় তোলা ছবি।
মাইক্রোসফটের রাখা এই ওয়ালপেপারের কাব্যিক নাম ‘ব্লিস’ (Bliss)। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ছবির দিকে তাকিয়ে থাকত। আর এই কারণেই এটিকে বলা হয় পৃথিবীর ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বেশি দেখা’ ছবি। আজ জানবো এই ছবির পেছনে থাকা এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
কীভাবে ইতিহাসে জায়গা নিল ‘ব্লিস’
ঘটনাটি ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসের। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাবেক ফটোগ্রাফার চার্লস ও’রিয়ার সোনোমা হাইওয়ে ধরে সান ফ্রান্সিসকোর উত্তরে নাপা ভ্যালি অঞ্চলে তার বান্ধবীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তার আগেই ওই অঞ্চলে একটি তীব্র ঝড় শেষ হয়েছিল এবং শীতের বৃষ্টিতে চারপাশের ঘাসগুলো গাঢ় সবুজ রঙ ধারণ করেছিল।
আঙুরের ক্ষেতগুলো ছাঁটা থাকায় পাহাড়ের ঢেউ খেলানো রূপটি ও’রিয়ারের চোখ এড়ায়নি। তিনি গাড়ি থামালেন, নামলেন এবং তার এনালগ ফিল্ম ক্যামেরা দিয়ে মাত্র ৪টি ছবি তুললেন। ব্যস, এভাবেই জন্ম নিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক মাস্টারপিস।
কুরিয়ার কোম্পানির অস্বীকৃতি ও কোটি টাকার রহস্য
ও’রিয়ার ছবিটি বিক্রির জন্য ফটো এজেন্সি ‘করবিস’ কে দেন। সেখান থেকেই এটি চোখে পড়ে টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটের। তারা উইন্ডোজ এক্সপির মূল ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহারের জন্য ছবিটির ফুল কপিরাইট বা মালিকানা কিনে নিতে চায়।
মাইক্রোসফট ও’রিয়ারকে ছবিটির আসল নেগেটিভ বা ফিল্মটি কুরিয়ারে পাঠাতে বলে। কিন্তু তৎকালীন সময়ে কোনো কুরিয়ার সার্ভিস এই ফিল্মটি বহন করতে রাজি হয়নি! কারণ, মাইক্রোসফট এই ছবির জন্য ও’রিয়ারকে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্য প্রস্তাব করেছিল (যার সঠিক অংক আজও গোপন রাখা হয়েছে)। কুরিয়ার কোম্পানিগুলোর ভয় ছিল, পথে যদি কোনোভাবে এই কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের নেগেটিভ হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই বিপুল পরিমাণ বিমার টাকা তারা পরিশোধ করতে পারবে না। শেষমেশ উপায় না পেয়ে মাইক্রোসফট ও’রিয়ারকে বিমানের টিকিট পাঠায়, যেন তিনি নিজে এসে সরাসরি তাদের অফিসে নেগেটিভটি পৌঁছে দেন!
ক্যামেরার জাদু!
অনেকেই মনে করেন এই ছবির রঙ বা স্যাচুরেশন ফটোশপে বাড়িয়ে কৃত্রিম করা হয়েছে। তবে, ফটোগ্রাফার ও’রিয়ার বারবার নিশ্চিত করেছেন যে, এটি কোনো ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন বা এডিট ছাড়াই সরাসরি ফিল্ম থেকে পাওয়া ছবি।
ছবিটি তোলা হয়েছিল Mamiya RZ67 মডেলের একটি মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরায় এবং এতে ব্যবহার করা হয়েছিল ফুজিফিল্মের বিখ্যাত ‘ভেলভিয়া’ (Velvia) ফিল্ম। ফুজিফিল্মের এই ভেলভিয়া সিরিজটি রঙের উজ্জ্বলতা ও প্রাণবন্ত স্যাচুরেশনের জন্য ফটোগ্রাফারদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। আর মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরা হওয়ায় এর নেগেটিভ ছিল সাধারণ ৩৫ মিমি ক্যামেরার চেয়ে অনেক বড়, যা ছবিটিকে দিয়েছিল অবিশ্বাস্য শার্পনেস। এই কারণেই ছবিটি বিশাল আকারের বিলবোর্ডে বড় করলেও কখনও ফাটত না।
ছবির নামকরণ
ফটোগ্রাফার প্রথমে এই ছবিটির নাম রেখেছিলেন ‘বিউকোলিক গ্রিন হিলস’ (Bucolic Green Hills)। তবে মাইক্রোসফট যখন এর স্বত্ব কিনে নেয়, তখন এর নাম বদলে রাখা হয় ‘ব্লিস’।
আজকের এআই আর নিখুঁত ফটো এডিটিংয়ের যুগে বসে ভাবা কঠিন যে, পৃথিবীর সবথেকে পরিচিত এবং কোটি কোটি মানুষের নস্টালজিয়া জাগানো এই ছবিটি স্রেফ একটি এনালগ ফিল্ম ক্যামেরার মাধ্যমে কোনো কারসাজি ছাড়াই তোলা হয়েছিল।
আরটিভি/এমএম


