আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬ , ০৮:৫৫ এএম


আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব
ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দুই সপ্তাহের জন্য হামলা ও বোমাবর্ষণ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (৮ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে তিনি সম্মত হয়েছেন। তার ভাষায়, এটি হবে একটি “দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি”।

এই অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী ও বিস্তৃত রূপ দিতে আগামী শুক্রবার (১১ এপ্রিল) ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য এই বৈঠকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মিত্রদের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারেন। 

এদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার টেবিলে উপস্থাপিত ১০ দফা প্রস্তাবের বিস্তারিত সামনে এসেছে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের প্রস্তাবগুলো মূলত সামরিক উপস্থিতি, আঞ্চলিক প্রভাব, নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনি গ্যারান্টিকে কেন্দ্র করে গঠিত।

ইরানের অন্যতম প্রধান প্রস্তাব হলো হরমুজ প্রণালি “নিয়ন্ত্রিত যাতায়াত” ব্যবস্থা চালু করা। তেহরান বলছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এই রুটে একটি নতুন নিরাপদ ট্রানজিট কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে ইরানের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ইরান একটি “নিরাপদ ট্রানজিট প্রোটোকল” গঠনের কথাও বলেছে, যা ওই প্রণালিতে তাদের কার্যত প্রাধান্য নিশ্চিত করতে পারে।

তেহরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধকালীন মোতায়েন কেন্দ্রগুলো থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।

ইরানের মতে, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে। ফলে স্থায়ী সমঝোতা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার সামরিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ইরান তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধের দাবিও তুলেছে। এই তালিকায় রয়েছে হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি।

তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা চলতে থাকলে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা কার্যকর হবে না। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রশ্নে এই বিষয়টি আলোচনার অন্যতম স্পর্শকাতর অংশ হয়ে উঠতে পারে।

ইরান তাদের ওপর আরোপিত সব ধরনের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদে গৃহীত নেতিবাচক প্রস্তাবনাগুলোও বাতিল করতে হবে বলে শর্ত দিয়েছে তেহরান।

এ ছাড়া বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি দ্রুত এবং নিঃশর্তভাবে ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য, অর্থনৈতিক চাপ কমানো ছাড়া কোনো বাস্তব রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।

ইরান দাবি করেছে, বিগত বছরগুলোতে সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ ও বহুমুখী নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। সে কারণে তারা “পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ” দাবি করছে।

এই দাবির মধ্যে অবকাঠামোগত ক্ষতি, অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি, বাণিজ্য বাধা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে প্রতিবন্ধকতার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের আরেকটি কৌশলগত শর্ত হলো, ইসলামাবাদে আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমঝোতা হলে সেটিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি বাধ্যতামূলক রেজুলেশন হিসেবে পাস করতে হবে।

তেহরানের মতে, এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ সহজে চুক্তি থেকে সরে যেতে পারবে না। বিশেষ করে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় তারা আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা মূলত তিনটি বড় বার্তা দিচ্ছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় নিজেদের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে প্রতিষ্ঠা করা, পশ্চিমা চাপ ও নিষেধাজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসা, ভবিষ্যৎ সমঝোতার জন্য শক্ত আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি নিশ্চিত করা।

তবে এসব শর্তের অনেকগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ইসলামাবাদের সম্ভাব্য আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর এখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের নজর ইসলামাবাদের সম্ভাব্য বৈঠকের দিকে। এই বৈঠকে যদি কোনো ন্যূনতম সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission