ভারতে বেকারত্ব, ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে তরুণদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথ, সব জায়গায় বাড়ছে প্রতিবাদ। এই পরিস্থিতিতে তরুণদের ক্ষোভকে সংগঠিত আন্দোলনে রূপ দিতে সামনে এসেছেন এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে নিজ দেশে ফিরলেন ৩০ বছর বয়সী উদ্যোক্তা অভিজিৎ দীপকে।
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা সিএনএন জানায়, আজ শনিবার (৬ জুন) ককরোচ জনতা পার্টি নামে একটি ব্যঙ্গধর্মী রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লিতে পৌঁছেছেন।
তিনি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন। তার দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থা, চাকরির সুযোগ এবং সরকারি ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
দিল্লিতে পৌঁছানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় তিনি জানান, তার পরিবার ও বন্ধুরা গ্রেপ্তারের আশঙ্কা করলেও তিনি আর ভয় পেতে চান না। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং এ বিষয়ে কথা বলার সময় এসেছে।
শনিবার (৬ জুন) সকালে দিল্লি বিমানবন্দরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখা যায়। পরে পুলিশ তার কর্মসূচির অনুমতি দেয়। রাজধানীর জন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ভারতের উচ্চশিক্ষায় ভর্তিযুদ্ধে পরীক্ষাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, কারিগরি ত্রুটি এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে লাখো শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি দেশের সবচেয়ে বড় মেডিকেল শিক্ষা ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর ফলাফল বাতিল করা হয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে। এতে নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তির জন্য দুইবার পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থী ভেরোনিকা মাদান সিএনএনকে বলেন, পরীক্ষার চাপ শুধু পরীক্ষার দিন নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের বহন করতে হয়। তিনি জানান, দুই বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরও তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। তবে সেই ব্যর্থতা তাঁকে নতুন পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছে এবং বর্তমানে তিনি ফরেনসিক বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
ভারতের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩৬ কোটির বেশি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫ বছরের কম বয়সী স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। অন্যদিকে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় ২০ শতাংশের কোনো চাকরি নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা শেষ করে কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে না পারা বর্তমানে ভারতের তরুণদের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ককরোচ জনতা পার্টি। মাত্র এক সপ্তাহে এর অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি ছাড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে তৈরি তেলাপোকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য। অনেকেই মনে করেছিলেন তিনি বেকার তরুণদের ‘ককরোচ বা তেলাপোকা’ বলে উল্লেখ করেছেন। যদিও পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, ভুয়া সনদ ব্যবহার করে পেশায় প্রবেশকারীদের উদ্দেশ্যেই ওই মন্তব্য করেছিলেন। তবে এর আগেই তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এই আন্দোলনের সমর্থক অমৃতা সিং বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই তাদের সমস্যাগুলো সামনে আনা এবং সমাধানের দাবি তোলা প্রয়োজন।
আন্দোলনের মুখপাত্র ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক সৌরভ দাস বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যা জমতে জমতে এখন বড় আকার ধারণ করেছে এবং জনগণ এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে শুরু করেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার গত এক দশকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও নির্বাচনী সাফল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে অভিজিৎ দীপকের দাবি, কয়েক বছর আগেও সরকারবিরোধী অবস্থান প্রকাশ্যে নেওয়া কঠিন ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে এবং তরুণরা আরও বেশি সরব হচ্ছে।
অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছেন, তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক হবে। তিনি বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরাই তাদের লক্ষ্য। পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ



