ইফতারের পর চা-কফি: যে প্রভাব পড়ে শরীরে

আরটিভি নিউজ

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৫:৩২ পিএম


ইফতারের পর চা-কফি: যে প্রভাব পড়ে শরীরে
প্রতীকী ছবি

রমজান মাসে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের সময় শরীর এক বিশেষ অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, পানি থেকে বিরত থাকা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার ফলে শরীর ক্লান্ত, পানিশূন্য এবং শক্তিহীন হয়ে পড়ে। এই সময় ইফতারের টেবিলে পানি ও খেজুরের পাশাপাশি অনেকের হাতেই দেখা যায় এক কাপ চা বা কফি। ইফতারের পর চা–কফি পান করা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অভ্যাস শরীরের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা অনেকেই গভীরভাবে ভেবে দেখেন না। ইফতারের পর চা–কফি পান করার উপকারিতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে কিছু নেতিবাচক দিকও, যা জানা অত্যন্ত জরুরি।

বিজ্ঞাপন

রোজার সময় শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীরগতিতে চলে। সারাদিন খাবার না পেয়ে শরীর জমা শক্তি ব্যবহার করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কিছুটা কমে যায়। একই সঙ্গে পানিশূন্যতার কারণে শরীরের ভেতরের ভারসাম্যও বদলে যায়। পাকস্থলী দীর্ঘ সময় খালি থাকায় তা হয়ে পড়ে সংবেদনশীল। ঠিক এই অবস্থায় ইফতারের পর আমরা যে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করি, তার প্রভাব শরীরে দ্রুত ও সরাসরি পড়ে। চা ও কফির প্রধান উপাদান ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে। ফলে ইফতারের পরপরই চা–কফি পান করলে শরীর হঠাৎ এক ধরনের উত্তেজক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে পড়ে।

ইফতারের পর চা–কফি পান করার একটি বড় সুবিধা হলো এটি সাময়িকভাবে ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। সারাদিনের অবসাদ, মাথা ঝিমুনি বা শরীর ভারী লাগার অনুভূতি অনেকটাই কমে যায়। বিশেষ করে যারা রাতে অফিসের কাজ করেন, পড়াশোনা করেন বা দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে হয়, তাদের কাছে এক কাপ চা বা কফি যেন নতুন শক্তির উৎস। মানসিকভাবে এটি চাঙ্গা ভাব এনে দেয়, মনোযোগ বাড়ায় এবং ইফতারের পরের সময়টাকে কিছুটা কর্মক্ষম করে তোলে। অনেকের ক্ষেত্রে হালকা চা খাবার হজমেও সহায়তা করে, বিশেষ করে যদি ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া বা ভারী খাবার খাওয়া হয়ে থাকে।

বিজ্ঞাপন

তবে এই উপকারিতার আড়ালে কিছু ক্ষতিকর দিকও লুকিয়ে আছে। ক্যাফেইন একটি মৃদু ডাইইউরেটিক উপাদান, যা প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়াতে পারে। রোজার পর শরীর যখন আগে থেকেই পানিশূন্য থাকে, তখন ইফতারের পর বেশি চা–কফি পান করলে পানিশূন্যতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যারা ইফতারের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করেন না, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি।

ইফতারের পরপরই চা–কফি পান করার আরেকটি বড় সমস্যা হলো গ্যাস্ট্রিক ও অ্যাসিডিটি। দীর্ঘ সময় খালি থাকার পর পাকস্থলী অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এই সময় চা বা কফি পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি করতে পারে, যার ফলে বুকজ্বালা, পেটব্যথা, বমি ভাব বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক, আলসার বা অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে, তাদের জন্য ইফতারের পর চা–কফি বিশেষভাবে ক্ষতিকর হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চায়ের মধ্যে থাকা ট্যানিন শরীরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, বিশেষ করে আয়রন শোষণে বাধা দেয়। ইফতারে আমরা সাধারণত খেজুর, ডাল, শাকসবজি বা অন্যান্য আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে থাকি। ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে বা খাবারের পরপরই চা পান করলে শরীর সেই আয়রন পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে না। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চলতে থাকলে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা দুর্বলতা বা রক্তস্বল্পতার কারণ হতে পারে।

কফি অতিরিক্ত পান করলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে এবং অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ইফতারের পর কফি পান করলে অস্বস্তি বা ঝুঁকি বাড়তে পারে। একইভাবে রাতে চা–কফি পান করার ফলে ঘুমের সমস্যাও দেখা দেয়। রমজানে অনেকেই তারাবির নামাজ শেষে বিশ্রাম নিতে চান, কিন্তু ক্যাফেইনের প্রভাবে ঘুম আসতে দেরি হয়, ঘুম হালকা হয়ে যায় বা অনিদ্রার সমস্যা দেখা দেয়।

বিজ্ঞাপন

ইফতারের পর চা–কফি পান করতে চাইলে সময় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে চা–কফি পান না করে প্রথমে পানি, খেজুর ও হালকা খাবার গ্রহণ করা উচিত। এতে শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। খাবার খাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পর চা বা কফি পান করলে পাকস্থলীর ওপর চাপ কম পড়ে এবং ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলক কম হয়। একই সঙ্গে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। দিনে এক কাপ চা বা কফি অনেকের জন্য যথেষ্ট।

কিছু মানুষকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়। গ্যাস্ট্রিক, আলসার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাদের ঘুমের সমস্যা আছে- এই শ্রেণির মানুষের জন্য ইফতারের পর চা–কফি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনমুক্ত পানীয় বা হারবাল চা ভালো বিকল্প হতে পারে। আদা, দারুচিনি বা লেবু দিয়ে তৈরি হালকা হারবাল চা শরীরকে আরাম দেয় এবং হজমে সহায়তা করে।

আরও পড়ুন

রমজানে চা–কফির পরিবর্তে কিছু স্বাস্থ্যকর বিকল্প পানীয় বেছে নেওয়া যেতে পারে। ডাবের পানি পানিশূন্যতা দূর করতে দারুণ কার্যকর। লেবু-পানি শরীরকে সতেজ রাখে এবং হজমে সহায়তা করে। অল্প পরিমাণ গরম দুধও অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে। এসব পানীয় শরীরের ওপর কম চাপ ফেলে এবং রোজার পর শরীরকে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইফতারের পর চা–কফি পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। সময়, পরিমাণ এবং নিজের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে চা–কফি পান করলে বড় কোনো সমস্যা হয় না। রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু উপবাস নয়, বরং শরীর ও আত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখা। তাই ইফতারের পর এমন কিছু বেছে নেওয়াই উত্তম, যা শরীরের জন্য আরামদায়ক ও উপকারী। সচেতন অভ্যাসই পারে রমজানকে সুস্থ ও সুন্দর করে তুলতে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission