বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ মানেই লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, ছেলেদের পাঞ্জাবি আর মেলার রঙিন আনন্দ। তবে সকালটা সত্যিই জমে ওঠে, যখন টেবিলে থাকে পান্তা ভাত আর সঙ্গে ভাজা ইলিশ। যেন পান্তা-ইলিশ ছাড়া পহেলা বৈশাখের কথা ভাবাই যায় না। মজার বিষয় হলো, এই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি কোনো হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নয়। এটি মূলত শহরের একটি নতুন উদ্ভাবন, যা ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
গ্রামীণ বাংলার পান্তার ইতিহাস
গ্রামে যদিও পান্তা ভাত খাওয়া হয়ে থাকে, তবে ইলিশের সঙ্গে নববর্ষের খাবার হিসেবে আগে কখনো এটি প্রচলিত ছিল না। মূলত গ্রামীণ মানুষের পান্তা ভাত খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। এটি ছিল কৃষক ও সাধারণ মানুষের গরিবের খাবার। রাতে বেঁচে যাওয়া ভাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রেখে, পরের দিন সকালে নুন, পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে খাওয়া এই প্রথাটিই ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন। যেখানে ভাত জুটতেই কষ্ট, সেখানে ইলিশ মাছ খাওয়া তো ছিল কল্পনারও বাইরে। মূলত ক্ষুধা এবং সঙ্গে তীব্র গরম ও কায়িক পরিশ্রমের ক্লান্তি দূর করতেই তারা পান্তা ভাত খেত।
শহরের উদ্ভাবন, আইকনিক খাবার
একসময় শুধু গ্রামীণ বা গরিবদের খাবার হলেও, এখন তা প্রাত্যহিক খাদ্য থেকে পান্তা-ইলিশ হয়ে উঠেছে ঢাকা শহরের পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আইকনিক খাবার। ধারণা করা হয়, এরপর থেকেই এক ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসেবে প্রচলিত করা হয়েছে। যা আজকাল এটি সহজেই প্রথার অংশে পরিণত হয়েছে। এর বিরোধিতা করাও এখন অনেকের কাছে বিতর্কের বিষয়।
প্রথম পান্তা-ইলিশের আয়োজন
বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের সম্পর্ক খুব বেশিদিনের না। ১৯৮০-এর দশকে ঢাকার রমনা পার্ককে কেন্দ্র করে শুরু হয় শহুরে বৈশাখ উৎসব। সাংস্কৃতিক কর্মীরা ও দর্শকরা সেখানে অংশ নিতেন। ১৯৮৩ সালে কয়েকজন সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী আড্ডা দিতে দিতে সিদ্ধান্ত নেন, বৈশাখের সকালে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা পরিবেশন করা হোক। তারা মিলে ৫ টাকা করে চাঁদা তুলে খাবার প্রস্তুত করেন। পান্তা রান্না, ইলিশ ভাজা ও মাটির সানকি আয়োজনের অংশ ছিল। পরের সকালেই সবাই রমনার বটমূলের সামনে হাজির হয়ে প্রথমবারের মতো পান্তা-ইলিশ উপভোগ করেন। মুহূর্তের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়।
বিতর্কও আছে
তবে এই রীতি এখনও বিতর্কের মুখে। সমালোচকরা মনে করেন, শহরের মানুষ যখন পান্তা-ইলিশ ঘটা করে খায়, তখন তা প্রকৃত গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে মিলছে না। তাদের মতে, এটি মূলত নগরী কেন্দ্রিক, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ও প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রচলিত হয়ে উঠেছে।
গ্রামীণ রীতি না হলেও, ঢাকা শহর থেকে মফস্বল শহর পর্যন্ত বাঙালিরা এখন নববর্ষের সকালের আনন্দ নিতে পান্তা-ইলিশ খায়। তাই এটি বৈশাখের টেবিলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যদিও ইতিহাস নতুন, তবুও শহুরে সংস্কৃতিতে পান্তা-ইলিশ এক আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
আরটিভি/জেএমএ




