বিশ্বের সবচেয়ে দামী মাংস: কোবে বিফের আদ্যোপান্ত

লাইফস্টাইল ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

রোববার, ২৪ মে ২০২৬ , ০২:৪৭ পিএম


বিশ্বের সবচেয়ে দামী মাংস: কোবে বিফের আদ্যোপান্ত
ছবি: সংগৃহীত

আসছে ঈদুল আজহা। বাংলাদেশে এই উৎসব বেশি পরিচিত কোরবানির ঈদ নামে। আর ঈদ এলেই ঘরে ঘরে শুরু হয় গরুর মাংসের নানা আয়োজন। শুধু ঝাল-ঝোল নয়, ভুনা, কাবাব, কালাভুনা, রেজালা থেকে শুরু করে নানা রকম পদে মাংস খাওয়ার উৎসবে মেতে ওঠেন সবাই। আবার যারা একটু ভিন্ন স্বাদ পছন্দ করেন, তারা ঘরেই তৈরি করেন স্টেকের মতো বিশেষ খাবার।

এ তো গেল দেশের মানুষের মাংসপ্রেমের গল্প। তবে বিশ্বের অনেক দেশেই গরুর মাংস খাওয়াকে বিলাসিতার পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। আর সেই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি জাপানের কোবে বিফ।

খাবারের জগতে আভিজাত্যের এক অনন্য উদাহরণ এই কোবে বিফ। বিশ্বজুড়ে ভোজনরসিকদের কাছে এটি যেন স্বপ্নের খাবার। জাপানে উৎপাদিত এই বিশেষ গরুর মাংসের প্রতি কেজির দাম বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৪ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে শুধু দাম নয়, এর উৎপাদন পদ্ধতি এবং কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণও মানুষকে বিস্মিত করে।

শুধু জাপানেই কেন আসল কোবে বিফ পাওয়া যায়?

কোবে বিফ বলতে যে কোনো গরুর মাংসকে বোঝায় না। এর মান ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে জাপানে রয়েছে অত্যন্ত কঠোর আইন। এই বিশেষ মাংস শুধু জাপানের হিয়োগো (Hyogo) অঞ্চলে উৎপাদিত গরু থেকেই সংগ্রহ করা যায়। জাপানের বাইরে অন্য কোথাও এই মাংস উৎপাদন আইনত অনুমোদিত নয়। এমনকি কোবে নামটির স্বত্বও জাপানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

তবে আমেরিকাতেও কোবে বিফের আদলে এক ধরনের মাংস পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় আমেরিকান ওয়াগ্যু। ১৯৭৬ সালে জাপান থেকে তাজিমা জাতের চারটি গরু আমেরিকায় নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই গরুগুলোর বংশধর থেকেই সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে এই মাংস উৎপাদন শুরু হয়। জাপানের আসল কোবে বিফের তুলনায় এর দাম কিছুটা কম। সাধারণত প্রতি কেজির দাম প্রায় ২০০ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি।

কোবে বিফ কেন এতো দামী?

সাধারণ গরুর মাংসের তুলনায় কোবে বিফের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পেছনে রয়েছে এর অনন্য স্বাদ, সুগন্ধ এবং চর্বির ধরণ। মজার বিষয় হলো, এই দামী মাংসে কোনো ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে না।

আরও পড়ুন

এর বিশেষত্বগুলো হলো:

  • উপকারী ফ্যাট: এতে প্রচুর পরিমাণে মোনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, ওমেগা-৩ এবং ওমেগা-৬ থাকে, যা শরীরের জন্য ভালো।
  • নরম টেক্সচার: মাংস এতোটাই নরম ও তুলতুলে হয় যে মুখে দিলেই গলে যায়। সাধারণত ‘স্টেক’ হিসেবে এটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

কোবে বীফের স্বাদের আসল রহস্য

কোবে বিফের দিকে তাকালে দেখা যায় লাল মাংসের ভেতরে সাদা চর্বির সূক্ষ্ম জালের মতো রেখা। একে বলা হয় মার্বেলিং। সাধারণ গরুর মাংসে চর্বি থাকে আলাদা স্তরে, কিন্তু কোবে বিফে চর্বি মাংসের কোষের ভেতরেই মিশে থাকে।

এই চর্বির গলনাঙ্ক মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়েও কম। ফলে মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাংসটি মাখনের মতো গলে যেতে শুরু করে। এটিই কোবে বিফের প্রধান বিশেষত্ব, যার কারণে একে বলা হয় মেল্টিং ইন মাউথ বা মুখে গলে যাওয়া অভিজ্ঞতা। 

কেন এর দাম এতো বেশি?

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী, ১ কেজি ভালো মানের কোবে বিফের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ ডলারের আশেপাশে থাকে। বাংলাদেশে ট্যাক্স এবং ইমপোর্ট খরচ মিলিয়ে এর দাম আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। 

এর চড়া দামের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে:

১. সীমিত উৎপাদন: বছরে মাত্র কয়েক হাজার গরু কোবে বিফ হিসেবে  সার্টিফাইড হয়। চাহিদার তুলনায় জোগান খুবই কম।

২. কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি গরুর ১০ সংখ্যার একটি আইডি নম্বর থাকে। এটি দিয়ে ওই গরুর বংশলতিকা এবং খাবারদাবারের সব তথ্য ট্র্যাক করা যায়।

৩. যত্ন ও লালন-পালন: এই গরুগুলোকে অত্যন্ত আরামদায়ক পরিবেশে বড় করা হয়। তারা যেন মানসিকভাবে শান্ত থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

প্রচলিত কিছু ধারণা বনাম বাস্তবতা

কোবে বিফ নিয়ে অনেক মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে। যেমন- গরুকে বিয়ার খাওয়ানো হয় বা ক্লাসিক্যাল মিউজিক শোনানো হয়। আধুনিক খামারিরা বলছেন, বিষয়টি সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। তবে গরুর ক্ষুধা বাড়ানোর জন্য বা হজমে সহায়তার জন্য কখনও কখনও বিয়ার দেওয়া হয়। আর শীতকালে রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখতে বিশেষ ব্রাশ দিয়ে ম্যাসাজ করা হয়, যাতে মাংসের মার্বলিং ঠিকভাবে তৈরি হয়।

বর্তমানে কোবে বিফের পাশাপাশি ভোজনরসিকদের নজর কেড়েছে অলিভ ওয়াগ্যু। জাপানের শোদোশিমা দ্বীপে এই গরুগুলোকে জলপাইয়ের শুকনো অবশিষ্টাংশ খাওয়ানো হয়। এর ফলে মাংসে স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পরিমাণ বাড়ে এবং স্বাদ আরও হালকা মিষ্টি হয়। এটি কোবে বিফের চেয়েও বেশি দুর্লভ।

বর্তমানে অনেক রেস্তোরাঁ কোবে বিফের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করছে। আপনি যদি ঢাকার কোনো রেস্তোরাঁয় কোবে বা ওয়াগ্যু বিফ ট্রাই করতে চান, তবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ান বনাম জাপানিজ

বাজারে অস্ট্রেলিয়ান বা আমেরিকান ওয়াগ্যু পাওয়া যায়, যা দামে কিছুটা কম। তবে খাঁটি স্বাদের জন্য খুঁজতে হবে সার্টিফায়েড জাপানিজ এ ফাইভ ওয়াগ্যু।

রান্নার ধরন

কোবে বিফ কখনোই খুব বেশি মশলা দিয়ে বা ওয়েল ডান করে খাওয়া উচিত নয়। এটি মিডিয়াম রেয়ার বা হালকা সেঁকা অবস্থায় খেলে আসল স্বাদ পাওয়া যায়।

সার্টিফিকেট

আসল কোবে বিফ পরিবেশনকারী রেস্তোরাঁর কাছে জাপানিজ অথরিটির দেওয়া কিউআর কোডযুক্ত সার্টিফিকেট থাকে। অর্ডার করার আগে সেটি দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

পরিশিষ্ট

কোবে বিফ কেবল একটি খাবার নয়, এটি জাপানিজদের শত বছরের কৃষি ঐতিহ্যের ফসল। এটি সবার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকার মতো বিষয় নয়, বরং বিশেষ কোনো দিন বা বিশেষ কোনো মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে এই খাবারের স্বাদ নেওয়া হয়। দামী শৌখিনতার জগতে কোবে বিফ তাই সবসময়ই শীর্ষে অবস্থান করে।


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission