ফটোগ্রাফিতে লেন্সের ব্যবহার

হিমেল খান

শনিবার, ১০ নভেম্বর ২০১৮ , ০৫:০২ পিএম


ফটোগ্রাফিতে লেন্সের ব্যবহার
ফাইল ছবি

একুশ শতকের এই যুগে ফটোগ্রাফার নন কে? এই সময়ে প্রায় সবার হাতেই কিছু না হোক কমপক্ষে একটি স্মার্টফোন তো থাকেই। আর এই স্মার্টফোনের কল্যাণেই সবাই এখন আলোকচিত্রী বা ফটোগ্রাফার।

বিজ্ঞাপন

তবে এই আঙ্গিক থেকে বের হয়ে একটু বৃহদাকারে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই স্মার্টফোনের যুগেও পেশাদার আলোকচিত্রের চাহিদা বিন্দুমাত্র কমে যায়নি বরং বেড়েছে। ফটোগ্রাফিতে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা। আর পেশাদার ফটোগ্রাফির জন্য কিছু বিষয় আলাদা করে ভাবতেই হয়। পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে শুরু করতে চাইলে যে কয়েকটি বিষয় ভালোভাবে মাথায় রাখা উচিত.

১. অন্তত মধ্যম মানের একটি পেশাদার ক্যামেরা যেমন- ডিএসএলআর (Digital Single Lens Reflex) বা সেমি এসএলআর (Single Lens Reflex).

বিজ্ঞাপন

২. ফটোগ্রাফি সম্পর্কিত পড়াশোনা ও সাধারণ জ্ঞান।

৩. নিয়মিত বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ধরনের ছবি দেখা এবং সেগুলোর সাথে নিজের ছবি তুলনা করা।

বিজ্ঞাপন

৪. আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যে ব্যাপার তা হলো ছবি তোলার জন্য প্রচণ্ড আগ্রহ, নেশা আর প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার মানসিকতা।

 

বিজ্ঞাপন

 বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের ফটোগ্রাফির সাথে যুক্ত থাকার ফলে অনেকেই জানতে চান, ক্যামেরার সাথে কোন লেন্স কিনবেন। এক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্নটিই হচ্ছে- ক্যামেরা কেন কিনবেন? মানে কী ধরনের ছবি তোলার উদ্দেশ্যে, যদিও অনেকেই মনে করে থাকেন ব্যক্তিগত ঘুরাফেরা, পারিবারিক অনুষ্ঠানে আর বন্ধুদের ছবি তোলার জন্যই। তবে অনেকেই আবার ভিন্নভাবে শুরু করতে চান। ওয়াইল্ড লাইফ, ন্যাচার, স্ট্রিট, ফ্যাশন, স্টিল লাইফ বা লাইফস্টাইল বিষয়ক ছবি তোলার আগ্রহও থাকে অনেকের। তাই এখানে স্বল্প পরিসরে কোন ধরনের কাজের জন্য কোন লেন্স পছন্দ করা উচিত তা নিয়ে কিছু কথা বলার প্রচেষ্টা থাকছে।

১. পোর্ট্রেইট: পোর্ট্রেইট বা মানুষের ছবি তোলার ক্ষেত্রে অনেক আলোকচিত্রীর প্রথম পছন্দ বিভিন্ন ফোকাল লেন্থের প্রাইম লেন্স, যেমন ৩৫মিমি, ৫০ মিমি, ৮৫মিমি বা ১০০ মিমি। বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত আলোকচিত্র শিক্ষক নাসির মাহমুদ মনে করেন- পোর্ট্রেইট ফটোগ্রাফির জন্য ৫০ মিমি লেন্সই আদর্শ। ৩৫ মিমি-এ কিছুটা ডিসটর্শন তৈরি হয় যা প্রকৃত আকার থেকে ছবিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে। আবার ৮৫ বা ১০০ মিমি এ ছবি তুলতে হলে বেশ দূর থেকে তুলতে হয় যা মডেল আর ফটোগ্রাফারের মাঝে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। আবার ৫০মিমি এর বেশি লেন্থে ছবি তুললে সেখানেও প্রকৃত আকার ফুটিয়ে তোলা কঠিন। তাই আমরা চোখে যেমন দেখি তেমন ছবি পেতে ৫০মিমি লেন্সই আদর্শ। আর এখানে যোগাযোগ বলতে কেবল কথা বলা আর শোনাই নয়, চোখের ইশারা বুঝাসহ মডেল আর ফটোগ্রাফারের মাঝে দারুণ একটি বোঝাপড়া থাকা দরকার বলেও মনে করেন তিনি। তবে বর্তমান সময়ে অনেক ফটোগ্রাফার পোর্ট্রেইটের জন্য বিভিন্ন ফোকাল লেন্থের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সও ব্যবহার করেন যা তাদের বিভিন্ন ধরনের পারস্পেকটিভ ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। তবে কোন লেন্সে পোর্ট্রেইট তুলবেন তা মূলত নির্ভর করে কী ধরনের ছবি তুলতে চাচ্ছেন তার ওপর। যদি অনেক বড় ফ্রেম নিয়ে তুলতে চান বা লোকেশনকে প্রাধান্য দিতে চান তবে ভালো মানের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ১৬ থেকে ৩৫ মিমি বা ২৪ থেকে ৭০ মিমি ফোকাল লেন্থের লেন্স পছন্দ করা যেতে পারে।

 ছবি. হিমেল খান ও অভিজিৎ নন্দী

২. ওয়াইল্ড লাইফ: বনে-জঙ্গলে ঘুরে ওয়াইল্ড লাইফ তুলে আনার যে প্রশান্তি, তা প্রত্যেক ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার মাত্রই মনেপ্রাণে অনুভব করেন। তবে এ ধরনের ফটোগ্রাফি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং কষ্টসাপেক্ষ কাজ। তাই তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার সংখ্যা খুব কম। তবে এই অঙ্গনে অনেকেই এখন বেশ দারুণ কাজ করছেন। ওয়াইল্ড লাইফের ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার টেলিফটো লেন্স লাগবে। অর্থাৎ অনেক দূর থেকে যেন ছবি তোলা যায় সেজন্য কমপক্ষে ১৩৫ মিমি এরপর ১৫০ মিমি, ২০০ মিমি, ৪০০ মিমি বা ৬০০মিমি ফোকাল লেন্থের লেন্স প্রয়োজন। যারা আরও বড় মাপের ফটোগ্রাফার, তারা ৬৫০ থেকে ১৩০০ মিমি লেন্সও ব্যবহার করেন। এ ধরনের লেন্স গাছের উপরের কাঠবিড়ালি, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও বন্যপ্রাণী বা আকাশে উড়ন্ত পাখির ছবি স্পষ্ট, কাছে ও ঝকঝকে করে আমাদের কাছে উপস্থাপন করতে পারে। আবার অনেকে ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির জন্যও এ ধরনের লেন্স ব্যবহার করেন। তবে ভালো মানের ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির জন্য ডেডিকেটেড ম্যাক্রো লেন্স পাওয়া যায়।

ছবি. হিমেল খান

৩. ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি: ডেডিকেটেড ম্যাক্রো লেন্স ছাড়াও আরেকটি সুন্দর উপায়ে ভালো মানের ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি করা যায়। রিভার্স লেন্স ম্যাক্রো। ১৮ থেকে ৫৫ মিমি বা ৫০ মিমি প্রাইম লেন্সকে রিভার্স রিং এর সাহায্যে উল্টো করে ক্যামেরায় সেট করে অতিরিক্ত আলোকপ্রক্ষেপণের ব্যবস্থা করে ম্যাক্রো ফটোগ্রাফি করা যায়। এখানে উদাহরণ হিসেবে রিভার্স রিং ব্যবহার করে তোলা দুটি ম্যাক্রো ছবি উপস্থাপন করা হলো।

ছবি. রাশিদুল ইসলাম রাব্বি                                                                ছবি. হিমেল খান

৪. ন্যাচার ও ল্যান্ডস্ক্যাপ: ন্যাচার ও ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে মূলত প্রয়োজন ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স। ফিশ আই থেকে শুরু করে ৫০মিমি এর কম ফোকাল লেন্থের সব লেন্সকে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স বলা হয়। তবে ল্যান্ডস্কেপ এর ক্ষেত্রে ৩৫ মিমি এর নিচে থাকাই ভালো। আর ন্যাচারের ক্ষেত্রে লেন্স বাছাই নির্ভর করে সাবজেক্টের উপর। সাবজেক্ট যদি ফুল বা ফল বা স্থির কিছু হয় সেক্ষেত্রে শার্পনেস আর ব্লার ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য প্রাইম লেন্স ব্যবহার করতে পারেন। তবে অ্যাপার্চার ৪ থেকে ৬ এর মধ্যে থাকলে ভালো। তাতে শার্পনেস আর ব্লার ব্যাকগ্রাউন্ড উভয়কূলই রক্ষা হয়।

 ছবি. হিমেল খান

৫. স্টিল লাইফ: স্টিল লাইফ ফটোগ্রাফি অত্যন্ত মজার একটি বিষয়। চাইলে ঘরে বসেই এ ধরনের ফটোগ্রাফি করতে পারেন। বিভিন্ন জিনিস সাজিয়ে অর্থমূলক বা দেখতে সুন্দর কোনও কিছুকে সাজিয়ে ছবি তোলা যায়। আবার এ ধরনের ফটোগ্রাফিতে লাইট নিয়েও দারুণ কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এ ফটোগ্রাফিতে নিজের মতো করে সাজিয়ে কাজ করা যায় বলে লেন্স নিয়েও এক্সপেরিমেন্টের সুযোগ থাকে। অনেকে অবশ্য এ ধরনের ছবির জন্য ২৪মিমি থেকে ১০৫মিমি ফোকাল লেন্থের লেন্স ব্যবহার করেন। তবে শার্পনেস ভালো পেতে আর আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য প্রাইম লেন্সও পছন্দ করেন অনেকেই।

ছবি. অভিশেক মোহাম্মদ

৬. ফ্যাশন ফটোগ্রাফি: ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতে অনেকেই সাধারণ পোর্ট্রেইটের মতোই লেন্স ব্যবহারের কথা বলে থাকেন। তবে এখানে সাধারণত বিনিয়োগ জড়িত থাকে এবং জমকালোভাবে উপস্থাপনের একটি ব্যাপার থাকে। তাই একটু দামি লেন্স ব্যবহার করতে পারলে ভালো হয়। সেক্ষেত্রে ৭০ থেকে ২০০মিমি আইএস ২.৮ অ্যাপার্চার এর লেন্স, ৮৫মিমি ১.৮ বা ৫০মিমি ১.৪ অ্যাপার্চার এর লেন্স ব্যবহার করতে পারলে ভালো। সেই সাথে লাইটের ব্যবহারেও গুরুত্ব দিতে হবে।

 ছবি. আরিফ আহমেদ

 

৭. স্ট্রিট ফটোগ্রাফি: স্ট্রিট ফটোগ্রাফি অনেকেরই খুব পছন্দের বিষয়। অনেকেই রাস্তাঘাটে হাঁটতে হাঁটতে দারুণ সব বিষয়ের ছবি তুলে আনেন। বিভিন্ন এক্সিভিশন বা প্রতিযোগিতায়ও স্ট্রিট ফটোগ্রাফি বেশ প্রাধান্য পায়। এ ধরনের ছবি তোলার ক্ষেত্রে সাধারণত ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের ব্যবহার সর্বাধিক দেখা যায়। ১১ থেকে ১৬মিমি, ১৮ থেকে ৫৫মিমি বা ১৬ থেকে ৩৫মিমি বিভিন্ন মানের, বিভিন্ন দামের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স পাওয়া যায় বাজারে। এর যেকোনওটি ব্যবহার করা যেতে পারে চাহিদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী। তবে ক্ষেত্র বিশেষে অনেকেই টেলিফটো লেন্স ব্যবহার করেন এ ধরনের ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রেও।

ছবি. জিএমবি আকাশ

তবে যে ধরনের ফটোগ্রাফিই করেন না কেন যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো, ছবির ক্ষুধা আর নিত্যনতুন বিষয়াবলী জানার চেষ্টা করা। ছবি তোলার আগ্রহটাই আসলে মূলকথা। সেক্ষেত্রে হাতে পারফেক্ট লেন্সটি না থাকলেও যা আছে তা দিয়েই চালিয়ে যেতে পারেন শখ কিংবা পেশাদার ফটোগ্রাফির কাজটি। মনে রাখতে হবে- ফটোগ্রাফি শেখার হাজারো নিয়ম আছে, আর ফটোগ্রাফি চর্চা করতে হয় এসব নিয়মকে ভেঙে নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য। তাই আমার কাছে প্রয়োজনীয় লেন্সটি নেই বলে যখনই থেমে গেলেন তখনই ফটোগ্রাফি নামক এই সুন্দর ভুবন থেকে হারিয়ে গেলেন। তাই কোনও অজুহাতকে পাত্তা না দিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন শখের ক্যামেরা হাতে।

সি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps
বিজ্ঞাপন

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission