মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে দীর্ঘ ১১ বছর সফলভাবে কাটানোর পর অবশেষে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অনুসন্ধানযান ‘মাভেন’-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। গেল বছরের ডিসেম্বরে যানটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সব রকম চেষ্টা করেও সেটিকে আর পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়নি। মহাকাশযানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ছয় মাস পর নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেট।
‘মার্স অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড ভোলাটাইল ইভোলিউশন’ বা মাভেন ছিল নাসার প্রথম এমন একটি মিশন, যা বিশেষভাবে মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল ও এর বিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ২০১৩ সালে কেপ ক্যানাভেরাল থেকে মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয় এবং প্রায় এক বছর পর ২০১৪ সালে এটি মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে। মহাকাশযানটির মূল বৈজ্ঞানিক গবেষণার মেয়াদ কেবল এক বছর নির্ধারণ করা হলেও সব পরিকল্পনা ছাড়িয়ে এটি মঙ্গলের কক্ষপথে ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে নিয়মিত তথ্য পাঠিয়েছে। নাসা তাদের ‘মার্স ২০২০’ মিশনের অ্যান্টেনা হিসেবেও এই মহাকাশযানটিকে ব্যবহার করেছিল, যার মাধ্যমে ‘পার্সিভ্যারেন্স’ রোভারটিকে মঙ্গল গ্রহে নামানো সম্ভব হয়।
২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর নাসা শেষবারের মতো ‘মাভেন’-এর সংকেত পায়। এর পরপরই মহাকাশযানটি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। তবে তখনো প্রোবটি নিয়ে আশা ছেড়ে দেয়নি নাসা। প্রথমে প্রোবটি উদ্ধারের সম্ভাব্য সব উপায় খতিয়ে দেখেছে সংস্থাটি। মাভেনের অবস্থা মূল্যায়ন করতে ও এটিকে জাগিয়ে তোলার কোনো কার্যকর পথ আছে কিনা তা খুঁজে বের করতে গত ফেব্রুয়ারিতে ‘অ্যানোমালি রিভিউ বোর্ড’ গঠন করা হয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে শেষ পর্যন্ত বোর্ড সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে মহাকাশযানটি আর কোনো বৈজ্ঞানিক মিশন পরিচালনা বা পৃথিবীতে তথ্য পাঠাতে সক্ষম নয়।
নাসা জানিয়েছে, লাল গ্রহের গভীরে যাওয়ার আগপর্যন্ত প্রোবটি একেবারে ঠিকঠাক কাজ করছিল। তবে গ্রহটির আড়াল থেকে ফিরে আসার পর নাসার আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড অ্যান্টেনার বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ‘ডিপ স্পেস নেটওয়ার্ক’ প্রোবটির কোনো সংকেত শনাক্ত করতে পারেনি। এই নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসার পর মাভেন ‘সেইফ মোড’-এ চলে যায় এবং অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ঘুরতে শুরু করে। ফলে এর ব্যাটারির সব চার্জ শেষ হয়ে যায় ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এই ত্রুটির মূল কারণ কী ছিল তা জানতে নাসা এখনো তথ্য বিশ্লেষণ করছে এবং এ বছরের শেষদিকে এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
মাভেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে যে সৌর বায়ু ও সৌর ঝড় প্রতিনিয়ত মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলকে ক্ষয় করে চলেছে। এই কারণে এক সময় বসবাসের উপযোগী থাকা গ্রহটির জলবায়ু এখন এমন ঠান্ডা ও শুষ্ক মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
এই মিশনটি থেকে আরও জানা গেছে, প্রোটন কণার কারণে মঙ্গল গ্রহে এক নতুন ধরনের মেরুজ্যোতি বা অরোরা তৈরি হতে পারে এবং পৃথিবীর মতো কেবল মেরু অঞ্চলে নয়, বরং মঙ্গলের যেকোনো স্থানেই এমনটা ঘটতে পারে। এছাড়া পুরো মঙ্গল গ্রহ জুড়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক ধূলিঝড় কীভাবে গ্রহটির পানির বিভিন্ন অণুকে মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল, বিজ্ঞানীদের তা গভীরভাবে বুঝতে দারুণভাবে সাহায্য করেছে মাভেন।
আরটিভি/এআর



