সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সরকারি কর্মচারী

আফ্রিদি আহাম্মেদ (মানিকগঞ্জ), আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ , ০৮:০৪ পিএম


সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সরকারি কর্মচারী
ছবি: কোলাজ আরটিভি

তিনি ১৯তম গ্রেডের ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট। তবে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে তার জীবনচিত্র। সরকারি চাকরির আড়ালেই গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল সেলুন ব্যবসা, নির্মাণ করেছেন একাধিক ভবন।

সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে রয়েছে ঘুষ গ্রহণ, প্রভাব খাটানো এবং নারী কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগ। তিনি পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মচারী সেলিম মাহমুদ, যিনি এলাকায় ‘সানি’ নামেই অধিক পরিচিত।

জানা যায়, ১৫-১৬ বছর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট পদে চাকরিতে যোগ দেন মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়ার বালিয়াটি ইউনিয়নের কুষ্টিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেলিম মাহমুদ। স্থানীয়দের ভাষ্য, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই বদলে যেতে থাকে তার জীবনযাত্রা। অল্প সময়েই গড়ে তোলেন বিপুল সম্পদের পাহাড়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মানিকগঞ্জ শহরের কাজল কমপ্লেক্সে দ্য জেন্টলম্যান নামে একটি বিলাসবহুল সেলুন ও একটি কসমেটিকস ব্যবসা যা একই ভবনে পরিচালনা করছেন তিনি। ব্যবসাগুলো কাগজে-কলমে স্ত্রীর নামে থাকলেও নিয়ন্ত্রণ করছেন নিজেই। শুরুতে একাধিক অংশীদার থাকলেও ধীরে ধীরে পুরো ব্যবসার মালিকানা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। মাত্র কয়েক বছরই সেলিম মাহমুদ প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছে। 

হাতে আসা প্রমাণাদি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সর্বশেষ প্রায় ১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে আরেক অংশীদারের শেয়ার কিনে নেন তিনি। বর্তমানে প্রায় ৪৬ লাখ টাকার বিনিয়োগে পরিচালিত হচ্ছে ওই সেলুন।

ক্রেতা টানতে সেলুনে চালু করা হয়েছে লোভনীয় অফার। ডেস্কে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ব্র্যান্ড নিউ আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স। বিভিন্ন সেবার সঙ্গে স্মার্টফোন জয়ের অফার দিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অথচ একজন ১৯তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর এমন বিলাসী ব্যবসা ও বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেলিম মাহমুদ গ্রামের বাড়িতেও গড়ে তুলেছেন একাধিক স্থাপনা। সাটুরিয়ার বালিয়াটি ইউনিয়নের কুষ্টিয়া গ্রামে মেইন রাস্তার পাশে ১০ ডিসিমেল জমির ওপর নির্মাণ করেছেন তিনতলা বাড়ি। এছাড়া খলিলাবাদ চরপাড়া এলাকায় রয়েছে আরও একটি আরসিসি ভবন, যা এখনও নির্মাণাধীন। এছাড়াও মানিকগঞ্জ শহরে তার বিলাসবহুল দুইটি ব্যবসার সকল প্রমাণাদি হাতে এসেছে আরটিভির কাছে।

বালিয়াটি ইউনিয়নের কুষ্টিয়া গ্রামের এক দোকানদার বলেন, তার বাবার বাড়ির পাশেই জায়গা কিনে বিল্ডিং করছে। জমিসহ তিনতলা বাড়িটার দাম প্রায় কোটি টাকার মতো হবে। আর খলিলাবাদ চড়পাড়া মসজিদের দক্ষিণ পাশে যে ভবন করছে, সেটার পেছনেও অনেক টাকা খরচ হয়েছে।

সেলিম মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে তার সাবেক কর্মস্থল কুষ্টিয়ায়। অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের নামে বিভিন্ন ইটভাটা থেকে নিয়মিত উৎকোচ আদায় করতেন তিনি। এ নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে কুষ্টিয়া কয়লা-ভাটা মালিক সমিতি পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেয়। পরে তাকে সেখান থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুষ্টিয়া জেলা কয়লা-ভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ ইটভাটা মালিক সমিতির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হাবলু মোল্লা বলেন, সে বিভিন্ন ভাটা থেকে ৪-৫ লাখ টাকা করে নিয়েছে। খুব ডিস্টার্ব করতো। একজন পিয়ন কীভাবে প্রাইভেটকারে ঘোরে, এত সম্পদ করে, সেটা তদন্ত হওয়া দরকার। তার যন্ত্রণায় ভাটা মালিকরা অতিষ্ঠ ছিল।

সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী ব্যবসায় জড়িত হতে পারেন না। অথচ সেলিম মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠলেও এ বিষয়ে কোনো অনুমতির তথ্য পাওয়া যায়নি।

সেলিম মাহমুদের সাথে এসকল বক্তব্য চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি প্রফেসর ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, ১৫-১৬ বছর আগে ১৯ তম গ্ৰেডে চাকরি করে ১০-২০ হাজার টাকা বেতনে এত সম্পদ বৈধভাবে করা সম্ভব না। এই বেতনে সচ্ছল ভাবে চলাইতো কষ্ট। সেই সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরের ৪র্থ শ্রেনীর কর্মচারী সে।

তিনি আরও বলেন, সে একা এই কাজ করতে পারেনি। তার বস তাকে দিয়ে এই কাজ করিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে সে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে আর সেখান থেকে তার বসদের কিছু দিয়ে বড় অংশ নিজে রেখে দিয়েছে। তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হোক এবং উপযুক্ত বিচারের দাবি জানাই। 

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাসান আহম্মদ বলেন, তিনি কয়েক মাস আগে এখানে যোগদান করেছেন। তার আগের বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। সরকারি চাকরিজীবী হয়ে ব্যবসা করতে হলে তো অনুমতি লাগে, তবে এমন কোনো অনুমতির তথ্য আমার জানা নেই।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, ১৯তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর পক্ষে কয়েক বছরে কোটি টাকার সম্পদ, বিলাসবহুল ব্যবসা ও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক হওয়া কীভাবে সম্ভব? সেলিম মাহমুদের সম্পদের উৎস, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission