কম্পিউটার ভাইরাস এতদিন ছিল এক ধরনের ডিজিটাল চোর। কিন্তু এবার সেই চোরের হাতে যেন উঠে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্ক। সে শুধু চুরি করে না, আগে ঘর মাপে, তালা দেখে, দুর্বল জানালা খুঁজে বের করে, তারপর আক্রমণের পথ বানায়। কানাডার গবেষকদের নতুন এআই-ওয়ার্ম সেই কারণেই সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। কারণ এটি শুধু ভাইরাস নয়। এটি এমন এক ডিজিটাল কীট, যা শুধু ছড়ায় না এটি শেখে, বাধা পেলে থেমে যায় না, বরং ফিরে আসে নতুন কৌশলে ।
গবেষকেরা যে নতুন ধরনের ম্যালওয়্যার পরীক্ষা করেছেন, তার নাম এআই-ওয়ার্ম। সাধারণ ভাষায় বললে, এটি এমন এক ক্ষতিকর সফটওয়্যার, যা মানুষের নির্দেশ ছাড়াই ছড়িয়ে পড়তে পারে একটি কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে । তবে ভয়টা এখানেই শেষ নয়। এটি প্রতিটি নতুন যন্ত্রে ঢোকার পর আগে সেটিকে বিশ্লেষণ করে। কোন পোর্ট খোলা, কোন সেবা চলছে, অপারেটিং সিস্টেম কী সব তথ্য জোগাড় করে। এরপর সেই যন্ত্রের দুর্বলতা বুঝে তৈরি করে আক্রমণের আলাদা পরিকল্পনা ।
এই গবেষণার তত্ত্বাবধানে ছিলেন কানাডার ভেক্টর ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। গবেষকেরা লিনাক্স, উইন্ডোজ ও আইওটি মিলিয়ে ৩৩টি যন্ত্রের একটি পরীক্ষামূলক নেটওয়ার্ক বানান। সেখানে এআই-ওয়ার্মটি সাত দিনের পরীক্ষায় ৬২ শতাংশ যন্ত্রে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে এটি নেটওয়ার্কের ৭৪ শতাংশ দুর্বলতা শনাক্ত করে। ১৫টি আলাদা পরীক্ষায় দেখা যায়, ওয়ার্মটি দৈনিক গড়ে ৩১টি দুর্বলতা সঠিকভাবে খুঁজে পায়, ২৩টি যন্ত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, ও ২০টি যন্ত্রে নিজের কপি বসাতে পারে।
কম্পিউটার ওয়ার্ম অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১৭ সালে ওয়ান্নাক্রাই কয়েক লাখ কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করেছিল। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবাও তখন বড় ধাক্কা খেয়েছিল। একই বছর নটপেটিয়া নামের আরেকটি ওয়ার্ম বিশ্বজুড়ে এক হাজার কোটি ডলারের বেশি ক্ষতির কারণ হয়। তবে সেসব ওয়ার্ম সাধারণত নির্দিষ্ট দুর্বলতা কাজে লাগাত। দুর্বলতা বন্ধ করে দিলে তাদের থামানো যেত। কিন্তু এআই-ওয়ার্ম বাধা পেলে থেমে যায় না। বরং ব্যর্থতার কারণ বুঝে নতুন পথ খুঁজে নেয়।
আরও ভয়ংকর বিষয় হলো, কোনো শক্তিশালী জিপিইউ-সমৃদ্ধ যন্ত্রে ঢুকলে এটি সেই যন্ত্রের প্রসেসিং শক্তি ব্যবহার করতে পারে। অর্থাৎ আক্রান্ত কম্পিউটারই তখন হামলার অস্ত্র হয়ে যায়। এতে হামলাকারীর খরচ কমে, কিন্তু আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানকে প্রতিরক্ষার জন্য বারবার বেশি টাকা খরচ করতে হয়।
আপস
গবেষণায় দেখা গেছে, ওয়ার্মটি ২০২৬ সালে প্রকাশিত নতুন কিছু নিরাপত্তা দুর্বলতাও কাজে লাগাতে পেরেছে। অথচ ব্যবহৃত এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ২০২৬ সালের আগেই শেষ হয়েছিল। গবেষকদের ধারণা, ইন্টারনেটে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করেই এটি নতুন দুর্বলতাগুলো বুঝে নেয়।
গবেষকেরা অবশ্য কিছু কারিগরি তথ্য গোপন রেখেছেন। কারণ এই গবেষণা সাইবার নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, আবার ভুল হাতে পড়লে ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার তৈরির পথও দেখাতে পারে। গবেষণাপত্রটি এখনো পিয়ার রিভিউর অধীনে আছে। তাই চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি এখনো বাকি।
আরটিভি/এআর



