যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাজ্যে কয়েক কোটি মশা ছাড়তে চায় গুগল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ , ০৭:০৮ পিএম


যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাজ্যে কয়েক কোটি মশা ছাড়তে চায় গুগল
এআই ছবি

‘ভালো পোকা দিয়ে খারাপ পোকা দমন’ এমন এক অভিনব ফর্মুলায় এবার মাঠে নামছে মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগল। ডেঙ্গু, জিকা ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের প্রকোপ কমাতে ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডায় ৩ কোটি ২০ লাখ পর্যন্ত পুরুষ মশা ছাড়ার জন্য মার্কিন সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছে কোম্পানিটি।

তবে এমনটা কোনো কম্পিউটার কোডিং বা সফটওয়্যার ডিবাগিং নয়, বরং রোগবাহী মশা দমনে প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে কোটি কোটি বন্ধ্যা মশার এক বড় বাহিনী। গুগলের এ বিশেষ ‘ডিবাগ’ প্রজেক্টটি এরই মধ্যে সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ৭০ শতাংশের বেশি কমিয়ে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। 

মশা পৃথিবীর অন্যতম মারাত্মক রোগবাহী প্রাণী হিসেবে বিবেচিত, যা ডেঙ্গু, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, জিকা, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়িয়ে প্রতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো প্রাণীর চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটায়। 

মার্কিন সরকারের ফেডারেল রেজিস্টারের এক বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা গুগলের এ আবেদনটি পর্যালোচনা করছে, যেখানে আগামী দুই বছর ধরে ফ্লোরিডা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় দুই বছরে এক কোটি ৬০ লাখ করে মশা ছাড়ার অনুমতি চেয়েছে কোম্পানিটি। গুগলের এ পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা আগামীকাল ৫ জুন জনমত যাচাইয়ের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত করবে সংস্থাটি।

সাধারণত পুরুষ মশা কামড়ায় না আবার রোগও ছড়ায় না। গুগল বিশেষ এক পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখছে, যেখানে পুরুষ মশার দেহে ‘উলবাকিয়া’ নামের প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এক ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে এদের বড় করা হয়। এ ব্যাকটেরিয়া পুরুষ মশাগুলোকে বুনো স্ত্রী মশার সঙ্গে প্রজননের অযোগ্য করে তোলে। ফলে ব্যাকটেরিয়াওয়ালা পুরুষ মশা কোনো বুনো স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হলে সেই স্ত্রী মশার ডিম থেকে আর বাচ্চা ফোটে না। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এক ব্লগ পোস্টে গুগল বলেছে, এর ফলে প্রতি প্রজন্মে মশার সংখ্যা কমতে থাকে।

আরও পড়ুন

বড় কোনো প্রযুক্তি কোম্পানির ল্যাবে ব্যাকটেরিয়া-আক্রান্ত মশা তৈরির বিষয়টি শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বিজ্ঞানের জগতে একেবারেই নতুন নয় গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট। ‘ভ্যারিলি হেলথ’ নামের স্বাস্থ্য ও এআই বিষয়ক কোম্পানিটি একসময় ‘গুগল এক্স’-এর উচ্চাভিলাষী ‘মুনশট’ প্রজেক্ট হিসেবে শুরু হয়েছিল, যারা বহু বছর ধরে এ ‘ডিবাগ’ প্রজেক্টের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। অ্যালফাবেটের সহযোগী কোম্পানি হিসেবে ‘ভ্যারিলি’ প্রযুক্তি ও ডেটা সায়েন্স ব্যবহার করে রোগব্যাধি ও বিশ্বের অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। তবে ভ্যারিলি বলেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গুগল ডিবাগ প্রজেক্টটিকে পুরোপুরি নিজেদের অধীনে নিয়ে নেয়।

গুগলের এ উদ্যোগটি একেবারে নতুন কিছু নয়। কোম্পানিটি ‘স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক’ বা বন্ধ্যা পোকা পদ্ধতি নামের এক বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির সাহায্য নিচ্ছে, যা বিশেষজ্ঞরা গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা দমনে ব্যবহার করে আসছেন। ‘ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডা’র সহকারী অধ্যাপক এরিক ক্যারাগাটা মশা ও অণুজীবের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেছেন, মশা বন্ধ্যা করার জন্য এ ‘উলবাকিয়া’ ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার প্রায় ১৫ বছর ধরে চলে আসছে।

আপাতত গুগল তাদের প্রাথমিক নজর রাখছে কেবল ‘এডিস ইজিপ্টি’ প্রজাতির মশার ওপর। এ মশাটিই ডেঙ্গু, জিকা, ইয়োলো ফিভার ও চিকুনগুনিয়ার মতো অধিকাংশ রোগের বিস্তারের জন্য দায়ী। কোম্পানিটি বলেছে, গুগলের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা এসব নাজুক প্রাণীর জন্য ‘স্বয়ংক্রিয় প্রজনন ব্যবস্থা’ তৈরি করতে ডেটা অ্যানালিটিক্স ও সেন্সর ব্যবহার করছেন। এ চ্যালেঞ্জের বড় অংশ হলো, এআই চালিত কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে পুরুষ মশাকে স্ত্রী মশা থেকে আলাদা করা এবং পুরুষ মশাগুলোকে ঠিক সঠিক জায়গায় ও সঠিক সংখ্যায় প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া।

আরও পড়ুন

গুগলের এই ডিবাগ প্রজেক্টটি তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র সিঙ্গাপুরে বেশ ভালো অগ্রগতি পেয়েছে। কোম্পানিটি ১১ মে প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে বলেছে, সেখানে লাখ লাখ পুরুষ ‘উলবাকিয়া’ মশা ছাড়ার পর দেশটি এডিস ইজিপ্টি মশার সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছে। এছাড়া মশা ছাড়ার ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। মে মাসেই গুগল ঘোষণা করেছিল, তারা সিঙ্গাপুরের এ প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়াতে যাচ্ছে। 

ডিবাগ প্রজেক্টের প্রধান লাইনাস আপসন বলেছেন, সিঙ্গাপুরে প্রথম ডিবাগ চালুর সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তির মাধ্যমে মশার উৎপাদন ও তা প্রকৃতিতে ছাড়ার প্রক্রিয়াটিকে আরও উন্নত করা। একই সঙ্গে ডিবাগ’কে এশিয়ার আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যেখানে বিশ্বের মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের ৭০ শতাংশেরই বসবাস। সিঙ্গাপুরের এ সাফল্যই আমাদের প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়ানোর আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।

আরটিভি/এআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission