অতিরিক্ত পরিমাণে চুল উঠতে দেখলে দুশ্চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। আর সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে অনেকে চুল পড়ার সমস্যায় ভুক্তভোগী। তাই চুল পরার সমস্যা কমাতে কেউ কেউ দামি শ্যাম্পু ব্যবহার করেন, আবার কেউ ভরসা রাখেন প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেকেরই কম বেশি পরিমাণে চুল ঝরে যায়। প্রতিদিন আপনার ৫০-১০০টা পর্যন্ত চুল পড়তে পারে। এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আপনার যদি প্রতিদিন এর থেকেও বেশি পরিমাণে চুল ঝরে এবং মাথায় হাত দিলেই মুঠো ভর্তি চুল উঠে আসে, তাহলে তো আপনাকে সতর্ক হতেই হবে। দূষণ, আবহাওয়া পরিবর্তন, অযত্ন এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে এই সমস্যা বাড়তে পারে। এ ছাড়াও, শীতকালে বাতাসে দূষণের মাত্রা অনেকটাই বাড়ে। তখন কম বেশি সবারই অতিরিক্ত মাত্রায় চুল পড়ার সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই এ বিষয়টিও ভুলে গেলে চলবে না।
হেয়ার ফলের কারণ বুঝুন-
চুল পড়া কমাতে এবং ঘন চুল পেতে আপনি ঘরোয়া রূপটানের ওপরে ভরসা রাখতেই পারেন। কিন্তু তাতে কাজ নাও হতে পারে! প্রত্যেকের হেয়ার ফলের আলাদা আলাদা কারণ রয়েছে, আর এই সমস্যা কমানোর জন্যে কারণটি বোঝা খুবই জরুরি। তাই কেন আপনার অতিরিক্ত পরিমাণে চুল ঝরছে, তা বুঝে সঠিক উপায়ে যত্ন নেওয়া শুরু করুন।
চুল পড়া রোধ করতে এই কথা অনেকেই মনে করেন যে, পেঁয়াজের রস নিয়মিত স্ক্যাল্পে লাগালে চুল পড়া তো কমেই, সেই সঙ্গে নতুন করে চুলও গজায়! তাই হেয়ার রিগ্রোথের আশায় নিয়মিত পেঁয়াজের রস লাগানো শুরু করেন। এই ধারণা কি সত্যি? তা খতিয়ে দেখেন না অধিকাংশই। চলুন জেনে নেই চুল পড়া রোধে আদৌ পেঁয়াজের রস কাজ করে কি না।
পেঁয়াজের রসে কাজ হবে? কী জানালেন গবেষণায়-
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পেঁয়াজের রস নিয়মিত স্ক্যাল্পে মালিশ করলে কি চুল পড়া কমে কিংবা নতুন করে চুল গজায়? এই বিষয়ে গবেষণায় কী তথ্য পাওয়া গিয়েছে, এবার তা জানা যাক। দ্য জার্নাল অফ ডার্মাটোলজিতে প্রকাশিত ২০০২ সালে একটি গবেষণাপত্রে এই বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়।
৩৮ জন পুরুষ ও মহিলার ওপরে চালানো হয় সেই পরীক্ষা। তারা প্রত্যেকেই 'অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা'-তে আক্রান্ত ছিলেন। ফলে অতিরিক্ত চুলও পড়ছিল। পরীক্ষা চলাকালীন ৩৮ জনকে দুটি দলে ভাগ করে নেওয়া হয়। তাদের ২ মাস ধরে দিনে ২ বার করে পেঁয়াজের রস লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তারা সেই পরামর্শ মেনে চলেন। কয়েক সপ্তাহ পর থেকে পরিবর্তন চোখে পড়তে শুরু করে। প্রথমে ১৭ জন এবং পরে ২০ জনেরই নতুন করে চুল গজিয়েছিল বলে দাবি করা হয় ওই গবেষণায়।
অ্যালোপেসিয়া এরিয়া-
অযত্ন-দূষণের কারণে চুল ওঠার সঙ্গে কিন্তু অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটার কোনও সম্পর্ক নেই। তাই এই অসুখের বিষয়ে আপনার জেনে রাখা প্রয়োজন। অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা এক ধরনের অটোইমিউন ডিসঅর্ডার।
AADA-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই অসুখে ইমিউনিটি সিস্টেম হেয়ার ফলিকলকে আক্রমণ করে। ফলে সেই স্থানে চুল উঠে যায়। এই অসুখে আক্রান্ত হলে খুব অল্প বয়সেও টাক পড়ে যেতে পারে।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণায় এই অসুখের লক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই অসুখে আক্রান্ত হলে শুধুই স্ক্যাল্প থেকে চুল ওঠে, এমন কিন্তু নয়। বরং শরীরের যে কোনও অংশ থেকেই হেয়ার প্যাচ উঠে আসতে পারে! পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে যে কেউ এই অসুখে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই প্রথম থেকে উপসর্গগুলো নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি-
নিয়মিত পেঁয়াজের রস লাগালে অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে কিংবা টাকে নতুন করে চুল গজাতে পারে বলে দাবি করা হয় ওই গবেষণায়। তবে আপনার যদি অন্য কোনও কারণে চুল ঝরতে থাকে, তাহলে পেঁয়াজের রস মালিশে যে তা নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। একাধিক প্রাচীন পুঁথিতে এমন উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে শুধু।
প্রসঙ্গত, অ্যালোপেসিয়া এরিয়াটা এক ধরনের অটো ইমিউন ডিজিজ। তাই এই রোগের লক্ষণ দেখলে কোনও ঘরোয়া টোটকা কাজে না লাগিয়ে সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
যেভাবে ব্যবহার করবেন পেঁয়াজের রস-
আপনি চুলের ঘনত্ব বাড়াতে পেঁয়াজের রস ব্যবহার করতে পারেন। একটি আস্ত পেঁয়াজ মিহি করে বেটে নিন। তারপর সাদা কাপড়ে পেঁয়াজের রস ছেঁকে নিন। এই পেঁয়াজের রস আপনার স্ক্যাল্পে ও চুলের গোড়ায় ভালো করে মালিশ করুন। তারপর ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শ্যাম্পু করে নিন। সপ্তাহে ৩ দিন এই নিয়ম মেনে চললেই উপকার মিলবে। কিন্তু আপনার স্ক্যাল্পে কোনও সংক্রমণ থাকলে পেঁয়াজের রস লাগানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।