মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের মুখে পড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আটকে থাকা আর ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে পার হচ্ছে আরেকটি বছর।
বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা ঢলের ৫ বছর পূর্ণ হলো। গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করে। মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে।
বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে তাদের বসবাস। এর বাহিরে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য রোহিঙ্গা। কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পাঠানো হলেও অনেকেই পালিয়ে এসেছে। তবে রোহিঙ্গা ঢলের কারণে ৫ বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজারের স্থানীয় লোকজন ও সামাজিক পরিবেশ।
এদিকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন দাবি নিয়ে আজ ২৫ আগস্ট সকালে কক্সবাজারে কয়েকটি সংগঠনের ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচি রয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের প্রধান মিশেল ব্যাচেলেট ও জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত মিস নোয়েলিন হেজার। তাদের কাছে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছে। ক্যাম্প পরিদর্শনে তারা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের জন্য ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কখন কীভাবে হবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কেউ।
প্রতিনিধি দলটির বিষয়ে রোহিঙ্গা যুবক ইউসুফ জানান, তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। ক্যাম্প কেন্দ্রিক সংঘবদ্ধ অপরাধির তৎপরতা, হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসাসহ সার্বিক পরিস্থিতির কথা প্রতিনিধিদের জানানো হয়। কিছু চিহ্নিত অপরাধি চক্র এমন অপকর্মে জড়িত থাকার বিষয় অবগত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানানো হয়।
কক্সবাজার পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম জানান, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ৯৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। খুনাখুনি, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, অগ্নিসংযোগসহ ১৪ ধরনের অপরাধের সঙ্গে রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়েছে। এসব কারণে ১ হাজার ৯০৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অবশ্যই বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় তথ্যমতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত বলেন, প্রত্যাবাসন বিষয়টি দেখছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আমরা শুধু রোহিঙ্গাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করাসহ নানা বিষয়ে কাজ করছি। যেকোনো সময় প্রত্যবাসনের প্রক্রিয়া শুরু করতে শতভাগ প্রস্তুত রয়েছি।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসন শুরু না হলেও আপাতত ক্যাম্পে চাপ কমানোর জন্য ১ লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ হাজারের অধিক রোহিঙ্গাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গেল এক বছরে রোহিঙ্গা ইস্যূতে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের শিরোনামজুড়ে ছিল কক্সবাজার ও ভাসানচর থেকে এই শরণার্থীদের পালানোর চেষ্টা, কক্সবাজারের ক্যাম্পে আগুন এবং ক্যাম্পকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড। প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে ভাসানচরে নিয়ে যাওয়ার যে কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে, অবশেষে তাতে যুক্ত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘ। সেখান থেকে চলতি মাসে পালানোর চেষ্টাকালে মার গেছে অনেক রোহিঙ্গা। এ ছাড়া সেখান থেকে গেল ১ বছরে পালানোর চেষ্টা করে আটক হয়েছে কয়েক শ।
কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির নেতা অ্যাডভোকেট তাপস রক্ষিত জানান, সীমান্তবর্তী উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা রোহিঙ্গাদের কারণে এখন রীতিমতো ঝুঁকির মুখে বসবাস করছে। তিনি আরও জানান, শিবিরগুলো এখন স্থানীয় লোকজনের জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
ক্যাম্পে কর্মরত কর্মকর্তারা জানিয়েছে, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে বছরে ৩০ হাজার ৪০০ শিশু জন্মগ্রহণ করছে। সে হিসেবে গেল ৫ বছরে প্রায় ২ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। তারা আরও জানিয়েছে, এ নিয়ে বিপদে রয়েছে কক্সবাজারবাসী।
যদি রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন করা না গেলে বাংলাদেশ তথা পর্যটন নগরী কক্সবাজার মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী কক্সবাজার।