ট্রান্সজেন্ডার নামের এক ভয়ংকর ফেতনা ঝড়ের মতো ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে। এর প্রবর্তকেরা পৃথিবীবাসীকে এমন এক পথের দিকে আহ্বান করছে যেখানে শরীর নয়, মনই ব্যক্তির আসল লিঙ্গ-পরিচয়। অর্থাৎ একজন পুরুষের মন যদি বলে সে নারী, তবে সে নারী। আবার একজন নারীর মন যদি বলে সে পুরুষ, তবে সে পুরুষ।
এই ফেতনা প্রতিষ্ঠিত হলে হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর লিঙ্গভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ওলটপালট হয়ে যাবে। এর ফলে যে চরম সামাজিক অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে তার কিছু নমুনা দেখা যাচ্ছে।
সম্পদ বণ্টন, বিবাহ ও মোহরানা, শিক্ষাঙ্গনে ভর্তি, হোস্টেল যাপন, পাবলিক টয়লেট ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তৈরি হবে ভয়ঙ্কর গোলযোগ। বাবার সম্পত্তি বেশি পাওয়ার জন্য কন্যা নিজেকে পুত্র দাবি করবে। ছাত্রীদের হোস্টেলে রাত্রিযাপনের জন্য কোনো পুরুষ নিজেকে নারী দাবি করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ভিড়ের বাসে নারীকে বাজে স্পর্শ করার পর পুরুষ লোকটি বলবে, আমি নারী। ভুল দেহে আটকে পড়ে আছি। আমার এ স্পর্শ নারীর সাথে নারীর স্পর্শের মতো।
ইতোমধ্যে স্কটল্যান্ডের জেলখানার নারী সেলে তথাকথিত ‘ভুল দেহে আটকা পড়া’ এমন এক রূপান্তরিত নারী (আসলে পুরুষ) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক নারী কয়েদি। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের সরকারি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে নিজেকে নারী দাবি করা এক পুরুষের জন্য সিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এখানেও যে স্কটল্যান্ডের মতো ঘটনা ঘটবে না তার কী গ্যারান্টি আছে!
এই সময়ে ট্রান্সজেন্ডার গোটা পৃথিবী জুড়েই আলোচিত ইস্যু। রাশিয়া, চীনসহ পশ্চিমের অনেক দেশ এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কয়েদি ধর্ষণের ঘটনায় জনতার ক্ষোভের মুখে স্কটল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। অথচ আমাদের দেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এটাকে সহজ ও সামাজিকীকরণের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে বহুদিন ধরে।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ) আর ট্রান্সজেন্ডার এক নয়। হিজড়ারা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু ট্রান্সজেন্ডারদের শারীরিক কোনো ত্রুটি নেই। হিজড়াদের ব্যাপারে ইসলামি ফিকহের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ও নীতিমালা রয়েছে। তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতা রাখতে হবে। কিন্তু কুচক্রী মহল দুটো এক হিসেবে উপস্থাপন করে শব্দের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমকামিতার এজেন্ডা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে।
ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়ে আমাদের উদ্বেগের প্রধান কারণ দুটি। এক. লিঙ্গভিত্তিক শৃঙ্খলা ধ্বংস। দুই. সমকামিতার ব্যাপক প্রসার।
ট্রান্সজেন্ডারকে বৈধ ও সামাজিকীকরণের মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী সমকামিতার প্রচার-প্রসারের পাঁয়তারা করা হচ্ছে। একজন পুরুষ যখন নিজেকে নারী দাবি করেন, আর সেই দাবি যখন সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তাকে বিয়ে করতে হবে পুরুষকে। অথচ জন্মগত ভাবে তিনি নিজেই পুরুষ।
একই কথা নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জন্মসূত্রে কোনো নারী যখন নিজেকে পুরুষ দাবি করেন, তখন তাকে নারীকে বিয়ে করতে হবে। অথচ তিনি নিজেই নারী। আর এভাবেই ট্রান্সজেন্ডারের নাম ব্যবহার করে পৃথিবীব্যাপী সমকামিতার নীলনকশা বাস্তবায়ন করার চক্রান্ত চলছে।
সমকামিতা এমন এক কুরুচিপূর্ণ কাজ, যা ইসলাম ধর্ম তো বটেই, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, সকল ধর্মেই জঘন্য অন্যায় এবং আমাদের দেশে আইনত অপরাধ। অথচ ট্রান্সজেন্ডার আইন প্রতিষ্ঠিত হলে এই ঘৃণ্য অপরাধ রোধে আইনত কোনো বাধা থাকবে না, যা এদেশের জন্য অভিশাপ বয়ে আনবে। আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে নর-নারী সৃষ্টি করেছেন, যেন তারা পৃথিবীর বুকে তাদের উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন। সৃষ্টির এই নিগুঢ় শৃঙ্খলা মেনে আজও মানবসভ্যতা পৃথিবীর বুকে টিকে আছে।
এই শৃঙ্খলা ধসে গেলে পৃথিবী থেকে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এই অসুস্থ অনাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব ও আলোচক।