
রাজধানী ও আশপাশের এলাকার পানি নিরাপত্তা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ নামে প্রায় ৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে।
তবে বাস্তবায়নে পরামর্শকদের পেছনে ৮০৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাকে অস্বাভাবিক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অত্যধিক ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশনও। অভিযোগ উঠেছে, নানা ত্রুটিবিচ্যুতি থাকার পরও প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনে চাপ দিচ্ছেন এক উপদেষ্টার।
অতিরিক্ত পরামর্শক ব্যয় নিয়ে বিতর্ক
ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পে ১৬ ক্যাটাগরির পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৮০৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি।
পরিকল্পনা কমিশন এটিকে ‘অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক’ মন্তব্য করে বলছে—ঋণের বড় অংশ পরামর্শকদের পেছনে গেলে জনগণের উপকারের তুলনায় বিশেষজ্ঞদের আয়ই বেশি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, খাল পুনর্বাসন বা স্যানিটেশন উন্নয়নের মতো কাজ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে; এত বিপুল পরামর্শক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নেই।
ব্যয় বরাদ্দে আরও অসংগতি
পরামর্শক ব্যয়ের পাশাপাশি বেতন-ভাতা, অফিস খরচ, সেমিনার ও প্রশাসনিক ব্যয়েই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এ ছাড়া খাল পুনর্বাসনে ব্যয় হিসাবেও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ঢাকায় কিলোমিটারপ্রতি পুনর্বাসন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি টাকার বেশি, যেখানে নারায়ণগঞ্জে একই কাজের ব্যয় ২৫ কোটি টাকার মতো।
যানবাহন ও যন্ত্রপাতি কেনায় ব্যয় প্রস্তাব ৫৫৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে ১৬০টি ভ্যাকিউম ট্রাক ও অন্যান্য ছোট যানবাহন কিনতেই বরাদ্দ ৩০৬ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এই প্রকল্পে যে পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছে, সেটা অনেক বেশি। প্রকল্পে যদি খুব উচ্চ প্রযুক্তির নকশা, জটিল কারিগরি ডিজাইন বা ‘সোফিস্টিকেটেড’ কাজ থাকত, তাহলে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নেওয়ার যৌক্তিকতা থাকত, কিন্তু এমন কাজে ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে—এটা অতিরঞ্জিত, কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ ধরনের প্রস্তাব যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প প্রস্তাব, অনুমোদনে চাপ
অসঙ্গতি সত্ত্বেও প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনের চাপ রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র। প্রকল্পটি এখনও এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত নয়, তবুও বিশেষ অনুমতিতে পিইসি সভায় তোলা হয়েছে—যা নিয়মবহির্ভূত বলে কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন।
পিইসি সভায় পরামর্শক খাতে অস্বাভাবিক বরাদ্দ, ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষার অনুপস্থিতি এবং ক্রয় পরিকল্পনায় পিপিআর বিধির ব্যত্যয়সহ একাধিক আপত্তি তোলা হয়। সংশোধন করে নতুনভাবে ডিপিপি পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছে কমিশন।
ঋণ করে পরামর্শক খাতে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাবকে অস্বাভাবিক ও অত্যাধিক বলছেন পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ঋণের বড় অংশ যদি পরামর্শকদের পেছনে খরচ হয়ে যায়, তাহলে এ প্রকল্পে জনগণের উপকারের তুলনায় বাইরের বিশেষজ্ঞদের আয়ই দাঁড়াবে বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলোচ্য প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গ্রুপ। যাদের সরকারি ডিপিপি প্রণয়নের অভিজ্ঞতা নেই এবং সরকারি পরিকল্পনা প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা কম। তারাই অনেকগুলো পরামর্শক খাত যুক্ত করেছে, যেগুলো আসলে এখানে আসার কথা নয়।
কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা
স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনা শাখার যুগ্ম সচিব ড. আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, পরামর্শক ব্যয়ের প্রাক্কলনে ভুল হয়েছিল। পিইসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী প্রকল্পটি সংশোধনের কাজ চলছে; সংশোধন হলে মোট ব্যয় কমে যাবে বলে তিনি আশা করেন।
আরটিভি/একে




