ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

ইফতার পার্টির টাকায় বাঁচুক গরিবের প্রাণ

সৈয়দ আশিক রহমান

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২১, ১০:৪৭ এএম
সৈয়দ আশিক রহমান

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে কঠোর লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরু হয়েছে। গেলো বছরের ধাক্কা সামলে ওঠার চলমান লড়াইয়ে যখন সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা, তখন দ্বিতীয় দফার লকডাউনে নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে খাবারের পাত্রগুলো প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। একমুঠো খাবারের সন্ধানে অনেকেই ভিড় করছেন শহরের সড়কগুলোতে। দিন আনে দিন খায় এমন মানুষের হাত পাততে ইতস্ততাবোধ থাকলেও পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করছে। এসব নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে লাজ-লজ্জা, করোনা আতঙ্ক শুধুই বিলাসিতা, তুচ্ছ ব্যাপার মাত্র। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের সামর্থ অনুযায়ী খাদ্যসামগ্রী নিয়ে দুস্তদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা খুবই সামান্য।

অভাবী ও নিম্ন আয়ের মানুষগুলো তাদের বেঁচে থাকার জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। সরকারও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। লকডাউনের প্রথম থেকেই সরকার অনুদান ও প্রণোদনা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। ২১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র, দুঃস্থ, ভাসমান এবং অসচ্ছল মানুষকে সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে নতুন করে আরও ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। কিন্তু, বিপুল সংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যের যোগান দেয়া একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।

দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক যেমন রিকশওয়ালা, হকার, দিনমজুরের সংখ্যা ৫ কোটি ১৭ লাখের বেশি। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে কোভিড-১৯ এর অভিঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। মোট জনসংখ্যার হারে তা ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ আগে থেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। সংখ্যার বিচারে তা প্রায় চার কোটি। মৌলিক চাহিদার অনেক কিছু থেকেই তারা বঞ্চিত। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দিন আনে দিন খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকে তারা। করোনা সংকট তাদের রোজগারের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার যে পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে, তাতে চাহিদার ২৫ শতাংশও মিটবে না। বাকি যে ৭৫ শতাংশ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে তাদের জন্য করপোরেট প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অনেক কিছুই করার আছে।

অতীতে প্রতি রমজানেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও জমকালো ইফতার পার্টির আয়োজনের রেওয়াজ আমরা দেখেছি। রোজায় এসব ইফতার পার্টিতে সর্বমোট কতটাকা খরচ হয় তার সঠিক কোন হিসাব না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা অনুমান করেন সেটি শত কোটি টাকার ওপরে। লকডাউনের কারণে ইফতার পার্টি আয়োজনের সুযোগ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। যদি প্রতিষ্ঠানগুলো সাশ্রয় হওয়া এই টাকা শ্রমিক, গরিব, অনাহারীদের জন্য ব্যয় করে তাহলে সংকটে পড়া দরিদ্র মানুষগুলোর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে।

করোনার মতো এমন মহাসংকট অতীতে আমাদের কখনো মোকাবেলা করতে হয়নি। কোটি কোটি মানুষ আজ বিপদগ্রস্ত, দিশাহারা, ক্ষুধার্ত। রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ধনী ব্যক্তিরা প্রতি রোজায় ইফতার পার্টিতে যে টাকা খরচ করতো সেই টাকা যদি এখন গরিবের জন্য ব্যয় করে, তবে তা হবে ত্যাগ ও মহিমান্বিত রমজান মাসে সর্বোৎকৃষ্ট এবং মহৎ কাজ। মনে রাখতে হবে, মানুষ হিসেবে নিজের সামর্থ নিয়ে এই অতিমারি দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলেই জয়ী হবে মানবতা, রক্ষা পাবে আমাদের প্রিয় দেশ ও দেশের মানুষ।

লেখক: সৈয়দ আশিক রহমান

প্রধান সম্পাদক আরটিভি অনলাইন ও সিইও আরটিভি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
আমরা এখন একা 
পুরো করোনার সময় একটা বাসার চার দেয়ালের ভেতরে আটকে থেকে সময় কাটিয়েছি। তখন বসে বসে নানা কিছু চিন্তা করেছি, তার মাঝে একটা ছিল করোনার উপদ্রব শেষ হওয়ার পর কী করব তার নানারকম পরিকল্পনা। সবচেয়ে বড় কল্পনাটা ছিল, রাজশাহী গিয়ে হাসান আজিজুল হক স্যারের সঙ্গে দেখা করে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে আসা। স্যারের সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে, অনেকবার কথা হয়েছে, কিন্তু আর কেউ নেই শুধু আমি আর স্যার, তার সঙ্গে বসে সাহিত্য, দেশ, ইতিহাস, রাজনীতি এইসব সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলার একটা ছেলেমানুষী সখ ছিল। যত সময় গিয়েছে সেটা নিয়ে আমার সেই সখটা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। খবর পেয়েছিলাম স্যারের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, তার ছেলের বক্তব্য থেকে জানতে পেরেছিলাম তার স্মৃতিশক্তিও কমে আসছে, অনেক সময় পরিচিত মানুষজনকে চিনতে পারেন না। তারপর দেখলাম স্যারকে চিকিৎসার জন্যে ঢাকা নিয়ে আসা হয়েছে, খুব ভয় পেয়েছিলাম তখন। তার ছেলের কাছে স্যারের খোঁজ নিয়েছি। করোনার সময়টিতে আমরা আইসিইউ নামে একটা ভয়ঙ্কর শব্দ শিখেছি, দেখে আসছি একবার কেউ তার ভেতরে গেলে প্রায় কখনোই বেঁচে ফিরে আসছেন না। স্যার কিন্তু সুস্থ হয়ে বের হয়ে এসেছেন, আবার রাজশাহী ফিরে গিয়েছেন দেখে অনেক শান্তি পেয়েছিলাম। শুধু তাই না, কয়েক সপ্তাহ আগে দেখলাম স্যার পত্রিকায় একটি লেখা দিয়েছেন, লেখার বিষয়বস্তুটুকু আমাকে যতটুকু আনন্দ দিয়েছে তার থেকে বেশি আনন্দ দিয়েছে স্যার আবার লিখছেন সেই তথ্যটুকু। আমি যখন রাজশাহী যাওয়ার কথা চিন্তা করছি তখন একেবারে হঠাৎ করে জানতে পারলাম স্যার আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। হঠাৎ করে মনে হলো একেবারে একা হয়ে গেছি। আমাদের বুঝি দেখেশুনে রাখার আর কেউ নেই। বহুকাল আগে একবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি। তখন সময়টা ভালো না, দেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বঙ্গবন্ধুর অবদান এসব কিছুকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। সেই দুঃসময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছেলেমেয়েরা মিলে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভালোবাসাটুকু ধরে রাখার জন্য একটা সংগঠন করেছে। সেই বাচ্চা ছেলেমেয়েরা আমাকে ডেকেছে, আমি তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছি। হঠাৎ করে দেখি সেই বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মাঝে একজন বড় মানুষ—খবর পেয়ে হাসান আজিজুল হক স্যার চলে এসেছেন। দেশের বাইরে ছিলাম বলে দেশের এই বড় বড় কবি, সাহিত্যিক শিল্পীদের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, তার ওপর সবাই ঢাকাকেন্দ্রিক। শুধু স্যার রাজশাহী থাকেন! স্যারের সঙ্গে পরিচয় হলো, কথা হলো। তারপর থেকে যতবার রাজশাহী গিয়েছি, স্যারের সঙ্গে একটিবার হলেও দেখা করে এসেছি, স্যার হাসিমুখে আমার যন্ত্রণা সহ্য করেছেন। আমি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে, অভ্যাস অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথাবার্তা বলে জামায়াত-শিবিরের চক্ষুশুল হয়ে আছি। দুইদিন পরে পরেই আমাকে নিয়ে ঝামেলা হয়, কখনও বাসায় বোমা পড়ে, কখনও ফাঁসির দাবি, কখনও আমার বিরুদ্ধে আন্দোলন—স্যার প্রতিবার রাজশাহী থেকে আমাকে ফোন করেন, সাহস দেন। আমার পাশে আছেন বলে আমিও ভরসা পাই, বাড়াবাড়ি করছি কি না জানি না, কিন্তু ভুল করছি না সেই বিষয়টা বুঝতে পারি। এই দেশে যারা থেকেছে, মুক্তিযুদ্ধের জন্য ভালোবাসাটুকু ধরে রাখার জন্য তাদের সবাইকেই কাজ করতে হয়েছে, সেজন্য ঝামেলাও কম হয়নি। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার পরও স্যারের পরিচয় শুধু অধ্যাপক নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল চেতনার একজন অভিভাবকও। এতকিছুর পরেও স্যারের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে লেখক। আমি নিজে আমার ছেলেমানুষী লেখার চেষ্টা করি বলে আমি বুঝতে পারি আমরা কেন দায়সারা লেখক আর স্যার কেন সত্যিকারের লেখক—শুধু লেখক নয়, বড় লেখক! খুব বেশি লিখেননি কিন্তু যেটুকু লিখেছেন একেবারে খাটি সোনা। দেখে ভালো লাগে যে স্যারের লেখার জন্য দেশে এবং দেশের বাইরে তাকে ঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।   বহুদিন আগে এলিস ওয়াকারের লেখা ‘দি কালার পারপল’ নামে একটা উপন্যাস পড়েছিলাম (আমার ধারণা এই নামে তৈরি চলচ্চিত্রটি মূল বই থেকে বেশি পরিচিত)। যারা মূল বইটি পড়েছেন তারা জানেন এই বইয়ের ভাষা কিন্তু আমাদের পরিচিত ইংরেজি নয়, আমেরিকান কালো মানুষদের নিজস্ব এক ধরনের ভাষা। প্রথম এক দুই পৃষ্ঠা পড়লেই এই ভাষাটিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া যায়, তখন এই নূতন ভাষাটিকে রীতিমতো মিষ্টি একটি ভাষা বলে মনে হতে থাকে। আমাদের বাংলা ভাষায় লেখা বইয়েও কেউ এক-দুটি সংলাপ নয়, পুরো বইটি এভাবে লিখেছেন কি না, আমার সেটি নিয়ে কৌতূহল ছিল। হাসান আজিজুল হক স্যারের ‘আগুনপাখী’ বইটি পড়ে আমার সেই অতৃপ্তিটুকু প্রথমবার পূরণ হয়েছে। প্রমিত ভাষায় বই পড়ে পড়ে হঠাৎ করে একটা স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় একটা মেয়ের জবানীতে পুরো বইটুকু পড়ে মনে হয় সামনে বুঝি একটা নূতন দিগন্ত খুলে গিয়েছে। বইয়ের ভাষা হচ্ছে মাত্র একটি দিক, বইটিতে সেই সময়ের এত নিখুঁত এবং এত মানবিক একটি ইতিহাস উঠে এসেছে যে তার তুলনা নেই। ব্রিটিশ উপনিবেশ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, আমাদের দেশে যে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করেছিল তার একটা অসাধারণ বাস্তব ছবি এই বইয়ে পরম মমতায় তুলে ধরা হয়েছে, সেটি না পড়া পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারবে না। স্যারের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে প্রত্যেকবার সাধারণ কথাবার্তা হয়েছে কিন্তু আমার মনের গহীনে একজন সত্যিকার সাহিত্যিকের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে কথা বলার একটা গোপন বাসনা ছিল। সেই বাসনাটুকু বাসনা হিসেবেই থেকে গেল। হাসান আজিজুল হক স্যারের মেধাবী ছেলেটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য ইন্টারভিউ দিতে এসেছিল। সে যোগ্য প্রার্থী ছিল, এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিন্তু—সেই সময়টিতে হাসান আজিজুল হকের পুত্র হওয়ার অপরাধে এখানে নিয়োগ পায়নি, যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মতো একজনের খুবই প্রয়োজন ছিল। তখন তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এবং তার কাছে স্যারের অনেক গল্প শুনেছি। তার কাছে জেনেছি স্যারের হাতের লেখা নাকি খুবই দুর্বোধ্য, যারা তার হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের কাছে মনে হবে স্যার বুঝি কলম দিয়ে কাগজে দাগ দিয়ে গিয়েছেন মাঝে মাঝে শুধু কলমটি একটু ওপরে নিচে করেছেন! শুধু সে তার হাতের লেখা মর্মোদ্ধার করতে পারে! আমি স্যারের হাতের লেখা দেখিনি, তাই কথাটুকু কতটুকু বাবাকে নিয়ে কৌতুক কতটুকু সত্যি কখনও যাচাই করে দেখতে পারিনি! হাতের লেখা যেরকমই হয়ে থাকুক সেই লেখা দিয়ে তিনি যে অসাধারণ লেখাগুলো লিখে গিয়েছেন, তার জন্য আমরা সবসময়েই স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। আমি জানি স্যার পরিণত বয়সে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন শেষে অসাধারণ কালজয়ী কিছু লেখা আমাদের উপহার দিয়ে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে থেকে দেশের অসংখ্য মানুষের অভিভাবক হয়ে আত্মীয় পরিজন  গুণগ্রাহীদের মাঝে থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমাদের হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে এটা মেনেই নিতে হবে। কিন্তু যখন মনে হয় তিনি আর নেই তখনই মনে হয় এখন আমরা একা। একেবারেই একা।   লেখক : অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল  
আমরা এখন একা 
সংজ্ঞায়িত আওয়ামী লীগ, সত্যায়িত সৈয়দ আশরাফ
মিথ্যাকে আমি প্রশ্রয় দেই নাই, মিথ্যাকে অলংকার দিয়ে সাজিয়ে আমি কোনো  রূপান্তর করতে পারি নাই বরং সত্যটাকেই সত্য বলে জেনেছি আর তা প্রকাশ করেছি, আমার সেই সত্য কোনো সত্যের অলাতচক্র তৈরি করতে পারে নাই, সত্যের জোয়ার তৈরি করতে পারে নাই যা দিয়ে ভাটায় আটকে থাকা তরীগুলোকে অবমুক্ত করে সত্যের কূলে ফেরাবে। আর সত্য বলাতে আমি যে ঘৃণা পেয়েছি তার জন্য আমার কষ্ট নাই। কারণ আমার জন্য সত্যবতী নাই। আর এই প্রেক্ষাপটের জন্য সত্যবান নাই কারণ সত্যবানের সত্য সত্যহীন হয়ে গেছে আর সত্যবতী সত্যহারা সত্যহীন অসত্যে সত্যবান। (রূপক অর্থে আমি হলো সমাজ, সত্যবতী হলো রাজনীতি, আর সত্যবান হলো সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম) বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ কাউকে বলা হলে তা শেখ হাসিনা নিঃসন্দেহে বলতে হবে আর সৈয়দ আশরাফ শেখ হাসিনার রাজনীতিতে শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে সজ্জন ব্যক্তিটাই সৈয়দ আশরাফ। এই দুনিয়াতে কিছু কিছু জিনিস বার বার আসে না, তা কেবল একবারের জন্যই জন্মায় আর কিছু কিছু মানুষ যুগের অন্তরে নতুন যুগের সূচনার জন্য আসে এবং নতুন সংস্কৃতির অস্তিত্ব ধারণ করে, এক নব্য দিগন্তের কারণে নব্য সূচনায় তার গাম্ভীর্য প্রতিষ্ঠা করে যায়। এই ধরণের বাক্যের বিশেষরা অসাধারণ হয়, আর এই অসাধারণ কোনো সাধারণের কাতারে নয়, বরং এই অসাধারণদের সাধারণ জীবন যাপন এবং সত্যকে সত্যে দেখানোর প্রবল ক্ষমতায় চরম বিশ্বাসের পাত্র হয়ে উঠে, মানুষ বিশ্বাস করে অন্ধের মত। দেশ-জাতি এদেরকে ধরে বাঁচতে চায় বারবার এদেরকে চায়, এদের বিয়োগান্ত জাতিকে কাঁদায়, শক দেয় এক অস্থিরতায় ফেলে দেয়। সৈয়দ আশরাফ ঠিক তাদেরই এক জন, সংকটে এক অজানা কালো ভয়কে আলোতে ফেরাতে সৈয়দ আশরাফকেই চায়, যে আশরাফকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, “আওয়ামী লীগের অনেকের গ্রুপ আছে, আপনি কোনো গ্রুপের তখন সৈয়দ আশরাফের উত্তর আসে, আমার কোনো গ্রুপ নাই, আমি শুধু শেখ হাসিনার রাজনীতি করি। নেত্রীর প্রতি এত প্রচণ্ড বিশ্বাস, আস্থা একনিষ্ঠতা শুধু নির্লোভ সৈয়দ আশরাফের পক্ষেই সম্ভব কারণ নেত্রীর অভিভাবকতার সৈয়দ আশরাফ তিনি। সৈয়দ আশরাফ ১৯৬৯ সাল থেকেই সক্রিয় ছাত্র-রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ১৯৭১ সালে শেখ কামালের সাথে ভারতের উত্তরখণ্ডের দেরাদুনে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধাদলের অন্যতম এক মুক্তিযোদ্ধা তিনি। ১৯৭৫ সালের জাতি এক প্রচণ্ড অমানুষিক বর্বরতার (১৫ই আগস্ট জাতির পিতার সপরিবারে হত্যা, তারপর ৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা) শিকার হয়। ১৯৭৫ সালের পরবর্তীতে ইংল্যান্ডের জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য যারা আন্দোলন করে সেই সংঘটকদের মধ্যে সৈয়দ আশরাফ অন্যতম। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহান যখন ইংল্যান্ডে সৈয়দ আশরাফ ও তখন এক সাথে ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে থাকে। ১৯৮৩ সালে ইংল্যান্ডের টিবি-চ্যানেল ফোর এ "Fighting Back" নামে একটি Drama Play হয় যেটা লেখক ছিলেন সৈয়দ আশরাফ, যে নাটকটির বিষয়বস্তু ছিলো, স্বৈরাচার বিরোধী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত সৈয়দ আশরাফ ব্রিটিশ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন এবং লেবার পার্টির সক্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন। ১৯৯৫ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সৈয়দ আশরাফকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন এবং ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে বিজয়ী হয়। (উল্লেখ্য: সৈয়দ নজরুল সাহেবের পর তিনিই আওয়ামী লীগকে এই আসনে আবার জয়ী করেন) এবং শেখ হাসিনা তার মন্ত্রী ক্যাবিনেটে সৈয়দ আশরাফকে বেসরকারি বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী করেন। ১/১১ এর সময় সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগসহ গণতন্ত্রের জন্য এক ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভাব ঘটান। কেয়ারটেকার গভারমেন্টকে দেশী-বিদেশী চাপে এক ভঙ্গুর অবস্থায় নিয়ে যান। সৈয়দ আশরাফ, দুই নেত্রীকেই জেলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সমমর্যাদা দিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবহিত করেন। মাইনাস ২ এর রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অনেক সিনিয়র রাজনীতিবিদদের রোষানলে পড়েন কিন্তু শেখ হাসিনাকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাবে না তা ঘোষণা দেন। ঠিক তাই হলো শেখ হাসিনাকে নিয়েই নির্বাচনে গেলেন, কোনো কিছুতেই আপোষ করেননি এবং আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এক অনন্য বিজয় নিয়ে সংসদে গেলেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আস্থার সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। সময়ের ক্ষত তখনো শুকাইনি সরকার গঠনের পরেই পিলখানা ঘটনায় যখন তাল মাতাল, খুব কঠিন হস্তে তা মোকাবেলা করেন আওয়ামী লীগের এই তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক।  বঙ্গবন্ধুর আদর্শের শ্রেষ্ঠ ধারক বাহক সৈয়দ আশরাফকে আপনি চোখ বন্ধ করে বলতে পারেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সর্বদায় ধারণ করতেন এবং তার কাজে তা প্রতিফলন ঘটাতেন। ২০১২ সালের দিকে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদে, সংস্কারের হবে আইন তখন সৈয়দ আশরাফ প্রকাশ্যে বিএনপিকে আহ্বান জানান, "আপনারা সংসদে আসুন, বসুন এটাকে নিয়ে আলোচনা করে যুগের অন্যতম এক সিদ্ধান্ত আমরা নিবো, আমরা সংসদে সংখ্যাগুরু আপনারা না আসলেও তা পাশ হবে কিন্তু আমরা আপনাদের নিয়েই তা করতে চাই" ঠিক যেমন বঙ্গবন্ধুর ভাষণেরই প্রতিফলন, "আমরা সংখ্যায় বেশী হলেও, আপনারা ন্যায্য কথা বললে সেই ন্যায্য কথাই গ্রহণ করা হবে"। ২০১৩ সালে হেফাজতকে মোকাবেলা করা এক কঠিন বিষয় ছিল কিন্তু তিনি যে ক্রাইসিস ম্যান ঠিকই হাজির এবং এক অনন্যতায় কঠিন ভাবে বিদ্রোহের হাত থেকে বেঁচে গেলো আওয়ামী লীগ। হিলারি ক্লিনটন আসলেন বাংলাদেশে, বাংলাদেশের যুবকদের সাথে দেখা করলেন প্রশ্ন শুনলেন উত্তর দিলেন। সৈয়দ আশরাফ বললেন, "আমাদের দেশের যুবকেরা আমাদের গণ্ডি থেকে বের হতে পারলো না, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা পৃথিবী নাকাল বৈশ্বিক মন্দার জন্য কে দায়ী তা জিজ্ঞেস করে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব বিলীন করে দেশের রাজনীতিতে কি হবে কি করবে তা জানতে চাইল। দূরদর্শন-হীন যুবকদের দূরদর্শী হতে বললেন। আজ এই সমাজের মানুষ ভাবে কখন কে এসে আমাদের কি করে দিয়ে যাবে অনেকেই সেই অপেক্ষায় কিন্তু সৈয়দ আশরাফ শক্তভাবেই বলে গিয়েছেন, বাংলাদেশকে নিয়ে বিদেশের খেলার দিন দেশ। এখন আর সেই দিন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় দূতকেও ছাড়লেন না, ড্যান মজিনা কে কাজের মেয়ে মর্জিনা বলে সম্বোধন করলেন আর বললেন কাজের মেয়ে মর্জিনা আর দুই আনার মন্ত্রী নেশাদেশাই ক্ষমতা এনে দিতে পারবে না। এত স্পর্ধা তৃতীয় বিশ্বের দেশের এক নেতার তা ভাবা যায় অন্য দিকে শেখ হাসিনা স্পর্ধা যেন তাক করে দিয়েছিল, ড্যাং মদিনাকে বিদায়ের আগ পর্যন্ত কোন সাক্ষাৎকারই দেয় নাই।  শেখ হাসিনা-সৈয়দ আশরাফ এক অদ্ভুত ভাই-বোনের রসায়ন যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর ফিরবে না হয়ত তাই সংসদে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেছিল, "আশরাফ আমাকে বড় বোনের মত আবদার করতো, আমি সব সময় ছোট ভাইয়ের মত দেখতাম"। ২০১৪ সালের নির্বাচনে যখন বিএনপি আসে নাই তখন সৈয়দ আশরাফ বলেছিল, "বিএনপি ট্রেন মিস করেছে, এটা তাদের রাজনীতির অংকে ভুল করেছে"। ঠিক তাই হলো, বিএনপি আর উঠে দাড়াতে পারে নাই, ৯৩ দিনের টানা হরতালে বিএনপি তার ইমেজকে নষ্ট করে দিল। সৈয়দ আশরাফ দপ্তর-বিহীন মন্ত্রী হলেন, প্রত্যক এমপিকে ২০ কোটি টাকা ব্যক্তিগত ফান্ডে দিতে হবে, এমন বিল পাসে তিনি নারাজ, দুর্নীতিকে সম্পূর্ণ বঞ্চন করেছেন তার সমস্ত জীবনে। তিনি একনেকের বৈঠকে যান নাই, ঘুণে খাওয়া রাজনীতির বলীর শিকার হলেন। বিল পাস হলো কিন্তু দপ্তর-বিহীন মন্ত্রী হলেন। ক্ষমতার লোভ বলে তার কাছে কিছু ছিল না। ক্ষমতা, অর্থ এই গুলা তিনি ছুড়ে ফেলেছিলেন এক অনন্য অসাধারণ সজ্জন বাংলার সত্যবান সৈয়দ আশরাফ। দপ্তর-বিহীন হওয়ার পরের দিনই শ্রমিক লীগের সভায় উপস্থিত হন, কিন্তু তার চোখে মুখে কষ্টের কোন ছাপ বা মন্ত্রিত্ব হারানোর ব্যথায় ব্যথিত নয় বরং আরো উৎফুল্ল। তিনি বললেন, "আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর সাথে বেঈমানি করে নাই, সেই রক্তই আমার শরীরে বহমান"। তিনি বুজিয়ে দিলেন, কোন চেয়ার, অবস্থা তার থেকে আওয়ামী লীগকে বিচ্ছুরিত করতে পারবে না। তার রক্ত বিশুদ্ধ এই রক্ত বিসর্জন দিবে কিন্তু বেঈমানি নয়। আর সৈয়দ আশরাফ চিহ্নিত করে গেছেন যে, ত্যাগীরা কখনও আওয়ামী লীগ ছাড়ে না, অভিমান করে কিন্তু আওয়ামী লীগ ছাড়ে না। সৈয়দ আশরাফ বলে গেছেন, "সত্য গোপন ইতিহাস বিকৃতি থেকে কোন অংশে কম নয়"। অপপ্রচার ও বিভ্রান্ত একটা জাতিকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে তা তিনি ভালো করেই জানতেন আর সেই জন্য তিনি সব সময় সত্য বলাকেই নিজের জীবনের মূলমন্ত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন। রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সব সময় সম্মান আর রাজনীতি থেকে আলাদা করেই দেখতেন। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মিটিং এ রাজশাহীর এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেছিল, "খালেদা জিয়া রেশমের শাড়ী পড়ে, এত সোনাদানা পড়ে..." সৈয়দ আশরাফ যখন আসলেন সর্বপ্রথম বললেন,"খালেদা জিয়া রেশমের শাড়ী পড়ে কি না তা রাজনীতির বিষয় নয় বরং এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার "। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকেও সম্মান দেখানোর জায়গা এটাতেই অন্যরা পিছিয়ে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফ অন্যতম এক ব্যাকটি। সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ হিসাবে চীনে সব চেয়ে দীর্ঘতম সফর করেন। তিনি ২৮ দিনের রাষ্ট্রীয়  চীন সফর করে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং কে বাংলাদেশে সফরের এবং বাংলাদেশ-চীন এক নতুন সম্পর্কে উন্নীত করেন। সৈয়দ আশরাফ চীন সম্পর্কে বলেছিলেন, "সময় এখন আর পশ্চিমাদের নেই, নতুন জাগরণ হয়েছে এশিয়ানদের। চীন পৃথিবীর নতুন পরাশক্তি। আমরা সকলের সাথে বন্ধুত্ব করবো কারো সাথে বৈরিতা নয়"। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে এটা বড় একটা ধমকা ছিল। আওয়ামী লীগ এর কাউন্সিলের অধিবেশনে শেখ হাসিনা - আশরাফ যা দেখালেন তা আওয়ামী লীগের বাংলাদেশ সৃষ্টির পর এমন কাউন্সিল মনে হয় প্রত্যক্ষ করে নাই। শেখ হাসিনা পাশাপাশি বসে তার হাত টা প্রসারিত করলেন সৈয়দ আশরাফের দিকে, ভাতৃত্বের ভালবাসায় সিক্ত এমন কাউন্সিল বাংলাদেশ মনে হয় আর প্রত্যক্ষ করবে না। ওই দিন সৈয়দ আশরাফ বললেন, আওয়ামী লীগকে কোন দিন আমি একটা দল মনে করি নাই, আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতি। বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগে, হাজার হাজার নেতা কর্মীদের ত্যাগে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে, সেই অনুভূতিই হলো আওয়ামী লীগ। আরো বলেন, আওয়ামী লীগ কোন দিন মরবে না, স্তব্ধ হবে না। আর নিজেই ওবায়দুল কাদেরের নাম প্রস্তাবে চমক দেন। এমন কেও আছে হাসি মুখে বিসর্জন দিয়েছে নিজের সাধারণ সম্পাদক পদ কিন্তু বনে গেছেন অসাধারণ তার বিজয়া যে বিসর্জনের মধ্যেই। সৈয়দ আশরাফের জন্য কিশোরগঞ্জের মানুষের আর্তনাদে এক স্তব্ধ-নীরবতায় থমকে গিয়েছিল। তিনি যখন অসুস্থ হয়ে থাইল্যান্ড এ চিকিৎসাধীন এই মানুষদের মর্মমূলের আবেগাস্নাত অনুভূতিতে যে সৈয়দ আশরাফ অধিষ্ঠিত তা বার বার প্রমাণ পেয়েছে। রাজনীতিতে চরম বিরোধীদেরও যদি জিজ্ঞেস করা হয়েছে, একজন সৎ রাজনীতিবিদের নাম বলেন, যার ভিতর দুর্নীতি,অর্থ লোভ, ক্ষমতায় মোহের ছিটা ফোটাও নাই? চোখ বন্ধ করে সৈয়দ আশরাফের নামই এসেছে। ২০১৮ সালে ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে, প্রাথমিকভাবে আওয়ামী লীগের আসন প্রাপ্তিদের তালিকায় কিশোরগঞ্জ-১ আসনে সৈয়দ আশরাফের নাম আসেন যখন তিনি অসুস্থ অবস্থায় থাইল্যান্ড এ চিকিৎসাধীন, সমস্ত মানুষ তাকে ফিরে পাবার আশায় শপথ গ্রহণ পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু তা আর হয় নি, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সহকর্মীদের কাঁধে চড়ে বিমান থেকে নামেন এই প্রচণ্ড মেধাবী সজ্জন রাজনীতিবিদ। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় তিল ধারণের জায়গা ছিল না তার জানাযায়। কিশোরগঞ্জ এর ইতিহাসে কোন রাজনীতিবিদের জানাযায় এত সিক্তকরণ অবস্থা হয় নাই। তিনি ফিরবে না, আর ফিরানোর পথ ও নাই কিন্তু তার মত এমন প্রজ্ঞাবান, যশ, মেধাবী ও প্রচণ্ড আস্থাশীল এমন রাজনীতিবিদ খুবই দুষ্কর কারণ তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এমন অকাট্য সেনাপতি যার মননে-মনসায় অস্থি-মজ্জায় অগাধ ভালবাসায়, অন্তহীনতার অবিরতায় গণতন্ত্র,আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা চরমোৎকর্ষে বিদ্যমান ছিলও যা অন্যদের পক্ষে অসম্ভব প্রায়। সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের অন্য সাধারণ সম্পাদকদের মত নয় যে, নিজের বিসর্জনেও বিজয়া পায়, নেত্রীর মমত্ববোধের প্রসারিত হাত সবাইতো পায় না কারণ সৈয়দ আশরাফ এমন ভাবে সত্যায়িত যার সত্যয়ন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা করেছে। প্রচণ্ড ভালবাসায় অনুকরণীয়, বরণীয় সৈয়দ আশরাফ যেখানে সংজ্ঞায়িত আওয়ামী লীগ, সত্যায়িত সৈয়দ আশরাফ। লেখক: আব্দুল্লাহ আল জাবের, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক সাইবার ৭১। ও মোঃ মঞ্জুরুল হক ফাহিম, কান্ট্রি এম্বাসেডর, ইউনিভার্সাল ইয়ুথ মুভমেন্ট।
সংজ্ঞায়িত আওয়ামী লীগ, সত্যায়িত সৈয়দ আশরাফ
‘নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাইসি ও নতুন যুগের হাতছানি’
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসির বিজয় ইরানিদের মধ্যে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা জাগিয়ে তুলেছে। নানা কারণে এমন আশা জেগেছে। এর মধ্যে একটি হলো- বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাইসি যেসব কাজ করেছেন সেগুলো ছিল বৈপ্লবিক ও আশা জাগানিয়া।  দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান : ইব্রাহিম রাইসি ইতোমধ্যে নিজেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অগ্রপথিক হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরানেও কোনো কোনো অঙ্গনে কিছুটা দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে যা বিপ্লবী চেতনা ও আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ইব্রাহিম রাইসি বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দুর্নীতি দমনে মনোনিবেশ করেন। সর্বত্র ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো উপড়ে ফেলার কাজ শুরু করেন এবং অনেক দূর এগোতে সক্ষম হন। এই পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। এ কারণে তাকে অনেক প্রভাবশালীর রোষানলে পড়তে হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানই তাকে সারাদেশে আপামর জনগণের কাছে প্রিয়পাত্র করে তুলেছে। নিজ বিভাগে শুদ্ধি অভিযান : বিচার বিভাগের ভেতরেও শুদ্ধি অভিযান চালান রাইসি। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে বিচার বিভাগের সাবেক উপপ্রধান আকবার তাবারিকে গ্রেপ্তার করেন এবং বেশ কয়েকজন বিচারককে বরখাস্ত করেন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আকবার তাবারির ৩১ বছরের জেল হয়েছে। ইব্রাহিম রাইসি এমন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান যারা নানা কৌশলে আইন ও বিচারের বাইরে থাকার চেষ্টা চালিয়েছেন। রাইসির নির্দেশে সারা দেশে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে বড় ধরণের অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ পর্যন্ত হাজার হাজার একর সরকারি জমি উদ্ধার হয়েছে। তার হস্তক্ষেপে পুনরায় চালু হয়েছে কয়েক হাজার কারখানা। ফলে বহু মানুষ চাকরি ফিরে পেয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার পর যখন মানুষকে দুর্নীতি দমন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তখন সবাই তার ওপর সহজে আস্থা রাখতে পেরেছে। কারণ তারা রাইসির সাম্প্রতিক অতীত থেকেই তার এমন কাজের নজির খুঁজে পেয়েছেন।   বঞ্চিতদের পক্ষে সরব কণ্ঠ : ইব্রাহিম রাইসি ইতোমধ্যে মজলুমদের সাইয়্যেদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)'র বংশে যাদের জন্ম তাদের নামের আগে সাইয়্যেদ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ইরানের মানুষ সাইয়্যেদদেরকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে। কথা ও কাজে বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষ নেয়ায় তাকে মজলুমদের সাইয়্যেদ হিসেবে অভিহিত করেন অনেকে। বিচার বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাইসি দেশের প্রায় সব প্রদেশ সফর করেছেন। স্থানীয় আদালতগুলোর খোঁজ-খবর নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অভিযোগ-অনুযোগের কথা শুনেছেন। অনেক দরিদ্র বিচারপ্রার্থীর সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করেছেন। এমন অনেকেই তার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছেন যারা কোথাও গিয়ে কোনো সমাধান পাননি। প্রান্তিক শ্রেণির যেসব মানুষের কথা কেউ কোনো দিন শোনেনি, তাদের কথাও শুনেছেন তিনি। বর্ণিল কর্মময় জীবন : সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসি বর্ণিল কর্মময় জীবনের অধিকারী। যে পদেই আসীন হয়েছেন সততা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। এ কারণে রাইসির অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো কিছুই খুঁজে পায়নি তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা। ১৯৬০ সালে ইরানের পবিত্রতম শহর মাশহাদের এক আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাইসি। তার বাবার নাম হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ হাজি রায়িসুস সাদাতি। তবে রাইসি বাবার সান্নিধ্য খুব বেশি দিন পাননি, কারণ পাঁচ বছর বয়সেই তার বাবা ইন্তেকাল করেন। মাশহাদ শহরেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করেন রাইসি। এরপর ১৫ বছর বয়সে ইরানের ধর্মীয় শিক্ষার নগরী হিসেবে খ্যাত পবিত্র কোম শহরে আসেন এবং সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি হন। তিনি কোমের বিজ্ঞ শিক্ষকদের উচ্চশিক্ষার ক্লাসে অংশ নেন। ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার উচ্চতর ধর্মীয় জ্ঞানের ক্লাসে অংশগ্রহণেরও সুযোগ হয়েছে সাইয়্যেদ রাইসির। তিনি ধর্মীয় লাইনে সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আইন শাস্ত্রে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ইব্রাহিম রাইসি নানা অঙ্গনে সক্রিয় উপস্থিতির পাশাপাশি কিছু দিন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ইরানের বিখ্যাত ইমাম সাদেক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী ওপেন ইউনিভার্সিটিতে আইন পড়াতেন।  ইব্রাহিম রাইসি ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হয়েছেন মাত্র দুই বছর আগে। এর আগে ইরানের প্রসিকিউটর জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন। টানা ১০ বছর বিচার বিভাগের উপপ্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। জাতীয় নিরীক্ষণ দপ্তরের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ বা অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টেরও সদস্য। দুই মেয়াদে এই পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পরিষদের ভাইস-প্রেসিডেন্টও তিনি। রাইসি সরাসরি বিচারকাজও পরিচালনা করেছেন।  স্ত্রী-সন্তান : সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসি ২৩ বছর বয়সে ইরানের বিখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আহমাদ আলামুল হুদার বড় মেয়ে জামিলা আলামুল হুদাকে বিয়ে করেন। রাইসি সহধর্মিণী ড. জামিলা আলামুল হুদা বর্তমানে ইরানের শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের সহযোগী অধ্যাপক। তাদের রয়েছে দুই সন্তান। দুই মেয়েই বিয়ে করেছেন। বড় মেয়ে সমাজ বিজ্ঞান এবং  কুরআন ও হাদিস বিজ্ঞান-এই দুই বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। ছোট মেয়ে পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্স করছেন। সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ : ইব্রাহিম রাইসির ব্যক্তি ইমেজ ও জনপ্রিয়তা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকেও কাছে টেনে এনেছে ইতোমধ্যে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার সব প্রতিদ্বন্দ্বীই ভোটের প্রাথমিক ফলাফল হাতে পেয়েই আন্তরিক অভিনন্দন জানান রাইসিকে। তিনি রক্ষণশীল রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সংস্কারবাদীরাও তাকে জোরালো সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন। বিদায়ী সংস্কারবাদী প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পরপরই রাইসির সঙ্গে দেখা করে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া প্রথম থেকেই রক্ষণশীল রাজনৈতিক জোটগুলোরও একচেটিয়া সমর্থন-তো তার পেছনে রয়েছেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। রক্ষণশীলদের একচেটিয়া সমর্থন আগামীতে রাইসির পথ চলাকে অনেক সহজ করে তুলবে। কারণ ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন রক্ষণশীলদের জয়জয়কার। সাম্প্রতিক সিটি কাউন্সিল নির্বাচনেও বড় জয় পেয়েছে রক্ষণশীলরা। রাজধানী তেহরানে সিটি কাউন্সিলের ২১ আসনের সবকটিতে জিতেছে তারা। এর মধ্যে ইরানিদের চোখের মনি শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মেয়ে নার্জেসও রয়েছেন। তেহরানের পরবর্তী মেয়রকে বেছে নেবেন এই কাউন্সিলররা। ফলে নিশ্চিতভাবেই একজন রক্ষণশীল প্রার্থী পরবর্তী মেয়র হতে যাচ্ছেন। বছর খানেক আগে ইরানের সংসদ নির্বাচনেও রক্ষণশীলরা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতেছে। গত কয়েক দশকের রীতি অনুযায়ী এমনিতেই এবার রক্ষণশীল প্রার্থীদের জেতার সম্ভাবনা বেশি ছিল। ইরানের সাম্প্রতিক কয়েক দশকের প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আট বছর পরপর সংস্কারবাদী ও রক্ষণশীলদের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। টানা দুই নির্বাচনে সংস্কারপন্থীরা জয় পেলে পরের দুই নির্বাচনে রক্ষণশীলরা জেতে। রক্ষণশীলদের বিজয়ের সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে সংস্কারবাদী বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির সরকারের আমলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও সাধারণ মানুষের আর্থিক অনটন। এবারের নির্বাচনী প্রচারেও এই দুই ইস্যুই প্রাধান্য পেয়েছে।  রাইসির সরকারের জন্যও আর্থিক সমস্যার সমাধানই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিদায়ী রুহানি সরকার আর্থিক সমস্যার জন্য মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে থাকেন। তবে ইব্রাহিম রাইসি প্রথম থেকেই এই সমস্যা সমাধানে দেশীয় সুযোগ ও সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন। এ কারণে তিনি সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের শিল্প কারখানা বন্ধ ঠেকাতে চেষ্টা করেছেন। রাইসির মতে, দেশে ন্যায়বিচার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলে এবং রাষ্ট্রের নানা অঙ্গনকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা গেলে বাইরের নিষেধাজ্ঞা উন্নয়নের পথে খুব বড় কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। একইসঙ্গে তিনি সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের বাধ্য করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভিয়েনায় পরমাণু সমঝোতা পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে যে আলোচনা চলছে তা চালিয়ে যাবেন ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাইসি। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা প্রক্রিয়া চলছে। ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে সৌদি আরবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান।  ইরানের সব প্রেসিডেন্টকেই সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে থাকেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রেসিডেন্টের প্রতিও তার পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। ইব্রাহিম রাইসিকে একজন সৎ ও সাহসী বিচারক হিসেবে জানেন সর্বোচ্চ নেতা। এ কারণে তিনি সংবিধান অনুযায়ী ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে রাইসিকে নিয়োগ দেন। সর্বোচ্চ নেতার এ আস্থাও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে ইরানিরা সাইয়্যেদ ইব্রাহিম রাইসির নেতৃত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা করতেই পারে।   ড. সোহেল আহম্মেদ লেখক ও সাংবাদিক ই-মেইল : [email protected] এসআর/
‘নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রাইসি ও নতুন যুগের হাতছানি’
বিচার চাওয়ার যোগ্যতা অথবা অপরাধেরও উঁচুতে উচ্চ বংশীয়রা
আপনি নির্যাতিত, প্রতারিত, নিগৃহীত কিংবা লাঞ্চিত হলেন, তাই বলে সাথে সাথে বেহায়ার মতো আপনাকে বিচার চাইতে হবে? থামুন, আগে ভাবুন আপনার কি বিচার চাওয়ার যোগ্যতা আছে? কোন ঘটনার স্বীকার হলে বিচার চাওয়ার আগে মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে হবে, অপরাধ সংগঠনে আপনি কিভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এরপর ভাবুন আপনি ৩০, ৪০ কিংবা ৫০ বছরের জীবনে কখনো কি কোন ভুল করেননি? আইন লঙ্ঘন করেননি? লাল লাইটে রাস্তা পার হননি? আপনার খুড়তুতো ভাই কি যৌবন কালে একবারও শুড়িখানায় উঁকি দেয়নি? আপনার ১৪ পুরুষের কেউ কি ভুল করেও কারো সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেনি? দেখেন এর কোনটা ঘটলেও আপনার বিরুদ্ধে এতো দিন কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। নিজেকে ভাগ্যবান ভেবে খুশি থাকেন। আপনি নারী হলে তো কথাই নেই। আপনার কথা বলার ঢং কি শালীন? আপনার চাহনি ঠিক আছে তো? আপনি বোরকা পরলেও তা কোনভাবে কোনো পুরুষের চোখকে পিড়া দিচ্ছে না তো? এসব ভাবুন, দশ বার ভাবুন। মনে রাখতে হবে অপরাধীর অপরাধের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নারীর দুর্বলতা অনুসন্ধান। সে হোক ভুক্তভোগী। এরপর আপনার বংশ পরিচয় বিচার করুন। আপনি কে? উঁচু বংশীয় কেও হলে বিচার আপনি চাইতেই পারেন। এটি তো আপনারই অধিকার। পদ, বিত্ত বিবেচনা করে নিন। তারপর ভাবুন কার বিরুদ্ধে বিচার চাইছেন? মনে রাখবেন যারা উঁচু বংশের তাদের অপরাধও স্পর্শ করতে পারে না। তারা পাহাড়ের খুব উঁচুতে বাস করে, অতো উপরে আগাছাও জন্মায় না আর ছোটখাটো অপরাধ তো পৌঁছাতেই পারে না। বিত্তশালী, প্রভাবশালী, উচ্চপদস্থরা দু-চারটা ঘটনা ঘটাতেই পারে, তাকে কি দোষ বলা যায়? এসব নিয়ে আবার আলোচনা কিসের? এই যে বিভিন্ন ঘটনায় আমরা কি সফলতার সাথে ভুক্তভোগীদের দোষ খুঁজে বের করতে পেরেছি। আর অপরাধী প্রভাবশালী হওয়ায় অপরাধ তো তাকে স্পর্শই করতে পারেনি। না হলে নিশ্চয় তাদের অপরাধ নিয়ে আমরা বিচলিত হতাম। যা হোক আজেবাজে কিছু নারী-পুরুষ সব সময় অশুভ উদ্দেশ্য নিয়ে উঁচু বংশে কালিমা লেপনের হীন উদ্দেশ্যে কুটিল ষড়যন্ত্র করেই থাকে। যুগে যুগে এমন ষড়যন্ত্রই হয়ে এসেছে। আর রাষ্ট্রও যে কি, কঠোর আইন করে ঐসব দুষ্কৃতিকারীদের অপকর্ম চিরতরে বন্ধে কোন ব্যবস্থাই নেয়নি। যা হোক ঐসব অপচেষ্টায় দোর্দন্ড প্রতাপশালী সমাজের হর্তাকর্তা, অর্থনীতির চালিকাশক্তিদের উদ্দাম কি থামানো যায়! কখনও না। এসব চিন্তা করাও বালখিল্যতা। তাই বলি এমন কোথাও যাবেন না, এমন কিছু করবেন না, এমন কিছু পরবেন না যেন আপনাকে নিয়ে খারাপ কিছু করার চিন্তা উঁচু বংশীয়দের মনে উঁকি দেয়। এর দায় তো আসলে আপনারই। তারপরও নিজেকে নির্যাতিত, নিগৃহীত, লাঞ্চিত বা প্রতারিত মনে করার অপচিন্তা মনে উকিঁ দিলে আগে হিসাব করে নিন, বিচার চাওয়ার যোগ্যতা আপনার আছে কি? এটি নিছক একটি আষাঢ়ে লেখা। এরসাথে বাস্তবতার মিল খুঁজতে চাওয়া হবে আপনার বালক মনের অপরিপক্কতার বহি:প্রকাশ। তার ওপর আমার হাতের লেখা খারাপ, বানানও ভুল। মাফ করবেন। লেখক: মামুনুর রহমান খান সাংবাদিক
বিচার চাওয়ার যোগ্যতা অথবা অপরাধেরও উঁচুতে উচ্চ বংশীয়রা
আল আকসা মসজিদে হামলা নেতানিয়াহুর জন্য কেন জরুরি ছিল?
ইসরাইলিরা ভালো করেই জানতো যে মাসজিদুল আকসার অবমাননা তাও আবার রমজান মাসে ফিলিস্তিনিদের সহ্যের সীমাকে অতিক্রম করবে এবং এর ফলে ব্যাপক সংঘাতের সূচনা হবে। প্রশ্ন হলো, তারপরও তারা কেন তা করতে গেল ? ইসরাইলের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কট এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়।  অনেক দিন ধরেই এই ইহুদিবাদী দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে শূণ্যতা বিরাজ করছে। সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বের অভাব  ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। ব্যাপক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখন টালমাটাল। নিজের পিঠ বাঁচাতেই তিনি এখন বেশি ব্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ের জামাই জারেড কুশনার ছিলেন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ ও অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক।  গত নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের পর তিনি তার এই ঘনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষককে হারিয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া সমর্থন থেকে ব্যক্তি নেতানিয়াহু এখন প্রায় বঞ্চিত। ইসরাইলের গত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এরপর বহুমুখী প্রচেষ্টা চালিয়েও মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত কোয়ালিশন সরকার গঠনে সফল হতে না পেরে তিনি বুঝতে পারলেন যে ভাগ্যের চাকা আগের মত আর ঘুরছে না। তিনি এটাও বুঝতে পারলেন ক্ষমতায় আকড়ে থাকা হয়তো আর বেশি দিন সম্ভব হবে না। আর এ অবস্থায় ক্ষমতা ছাড়লে মাথার উপর চেপে থাকা দুর্নীতির অভিযোগ তাকে তাড়া করবে, এমন কি কারাগারেও যেতে হতে পারে। আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিক দিয়েও ইসরাইল খুবই খারাপ অবস্থানে রয়েছে। সম্প্রতি তাদের একটি বড় অস্ত্র কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বলয় ভেদ করে ফিলিস্তিনি মুক্তিকামী যোদ্ধাদের রকেট প্রায়ই হামলে পড়ছে ইসরাইলের ইহুদী উপশহরগুলোর উপর। এ রকম অবস্থায় ইসরাইলের নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বোধ দেখা দিয়েছে। এর ফলে অভিবাসী ইহুদীরা যেসব দেশ থেকে ইসরাইলে বসতি গড়েছিলেন তারা আবার সেখানেই ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছেন, ইতিমধ্যে অনেকেই ইসরাইল ছেড়েছেন। ইসরাইলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। গত কয়েকমাস যাবত প্রায় প্রতিদিনই অর্থনৈতিক সঙ্কট ও নানা বৈষম্যের প্রতিবাদে ইসরাইলের নাগরিকরা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি জোরদার হয়েছে আফ্রিকা ও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসী ইহুদীদের পক্ষ থেকে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ । গত ২৯ এপ্রিল সংঘটিত হয় মেরুন পর্বত ট্র্যাজেডি।  সেখানে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পদদলিত হয়ে মারা যায় ৬০ জন ইসরাইলি নাগরিক। এছাড়া শতাধিক লোক ওই ঘটনায় আহত হয় । ‘লাগ বার্মার’ হিসেবে পরিচিত ওই ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে হাজার হাজার মানুষ দেশটির মাউন্ট মেরনের পাদদেশে জড়ো হয়েছিলেন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশংকায় ইসরাইলের নীতি নির্ধারকদের অনেকেই ওই অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কট্টরপন্থী ইহুদিদের সমর্থন লাভের আশায় সেই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেন। অতএব, ওই দুর্ঘটনার দায় বর্তায় নেতানিয়াহুর উপর। রাজনৈতিক এই দৈন্যতার মধ্যে নেতানিয়াহু নির্বচনকে ঘিরে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করেন, কিন্তু তার সে চেষ্টাও সফল হয়নি। রমজানের শেষ শুক্রবার বিশ্ব কুদস দিবসে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তার সতীর্থরা বুঝতে পারেন যে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বিভেদ ও বিবাদ সৃষ্টির প্রচেষ্টা বিফলে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জেহাদে ইসলামি ও হামাস বিরোধী ফিলিস্তিনি দল এবং গোষ্ঠিগুলোও ইসরাইলের সাথে আলোচনার নীতি থেকে সরে আসছে। ইসরাইলের সাথে সমঝোতার পক্ষের ফিলিস্তিনি নেতারা এখন বুঝতে পারছেন যে ইহুদিবাদীদের সাথে আলোচনা করে আসলে কোন লাভ নেই। হামাস ও জেহাদে ইসলামি প্রতিরোধ নীতিই ফিলিস্তিন মুক্তির একমাত্র পথ। প্রধানমন্ত্রীর নেতানিয়াহুর বিপর্যয়ের পেছনে আরেকটি কারণ হলো  ইসরাইলের 'ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি' কোনো ফলাফল বয়ে আনতে না পারা। নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন যে গত এক বছরে যেসব দেশ ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে অন্তত এই দেশগুলো আর ফিলিস্তিনিদেরকে সমর্থন করবে না। ফলে তিনি এ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে পারবেন। তিনি ভেবেছিলেন এটাকে দেশের জনগণের সামনে নিজের কূটনৈতিক সফলতা হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। কিন্তু তার এই আশা পুরোপুরি বিফলে গেল। কারণ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বা প্রলোভনে ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে নিজ দেশের জনমত বা অন্য যে কোন কারণেই হোক ফিলিস্তিনিদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। এই ঘটনা কট্টর ইহুদিবাদী এই প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতাকে আরও অনেক বেশি সুস্পষ্ট করেছে। মূলত এসব ব্যর্থতা ঢাকা দিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর জন্য দরকার হয়ে পড়েছিল একটি বড় ধরনের সংঘাতের । আর এজন্য তিনি ও তার সতীর্থরা বেশ কিছু দিন ধরেই নানা ভাবে উগ্র ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উস্কানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন ঠিকই কিন্তু এর পরিণতি যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তার সঠিক হিসাব হয়ত তিনি করতে সক্ষম হননি। গাজা বা ফিলিস্তিনের অন্য অঞ্চলে ইসরাইলের তাণ্ডব, ব্যাপক ধ্বংসাত্মক বহুমুখী অভিযান, নারী ও শিশুসহ ব্যাপক গণহত্যা নতুন কোন বিষয় নয়। মজলুম ফিলিস্তিনিরা এখন এসবে অভ্যস্ত, এসবের কোনো পরোয়া নেই তাদের। কিন্তু ইসরাইলের ইহুদি উপশহরে হামাস ও ইসলামি জেহাদের উপর্যুপরি রকেট বৃষ্টির মুখে জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য ইসরাইলের নাগরিকদের জন্য নতুন বিষয়। এতে তারা অভ্যস্ত হতে পারবে কি না তাই এখন দেখার বিষয়। লেখক : আইআরআইবি, বাংলা বিভাগের সাবেক পরিচালক [email protected] 
আল আকসা মসজিদে হামলা নেতানিয়াহুর জন্য কেন জরুরি ছিল?
আরও পড়ুন
ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন প্রধানমন্ত্রী 
দেশে ওমিক্রনে আক্রান্ত আরও ৩ জন
বিশ্বে আরও প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মৃত্যু
ওমিক্রনে আক্রান্ত হওয়ার ৮ লক্ষণ