ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

নস্টালজিয়া

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:১৫ এএম

পুরো বাংলাদেশ গত কয়েক সপ্তাহ থেকে এক ধরনের বিষণ্নতায় ভুগছে। খবরের কাগজ খুললেই প্রথম পৃষ্ঠায় রোহিঙ্গাদের কোনো একটি মন খারাপ করা ছবি দেখতে হয়। খবরের কাগজের একটা বড় অংশজুড়ে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের কোনো না কোনো খবর থাকে। যারা টেলিভিশন দেখেন, তারা স্বচক্ষে রোহিঙ্গাদের কষ্টটুকু আরো তীব্রভাবে দেখতে পান। ইন্টারনেটের সামাজিক নেটওয়ার্কে যেহেতু অনেক কিছু সরাসরি দেখানো সম্ভব হয়, অনুমান করছি সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ছবি কিংবা ভিডিও আরো অনেক বেশি নির্মম। এই অমানুষিক নির্যাতনের শিকার মানুষগুলোকে যখন বাংলাদেশের কোনো একটি ক্যাম্পে দেখি, তখন একটি মাত্র সান্ত্বনা যে, এখন তাদের আর কেউ মেরে ফেলবে না। কষ্ট হোক, যন্ত্রণা হোক— মানুষগুলো প্রাণে বেঁচে গেছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও ছোট শিশুদের মুখের হাসিটুকু দেখে মনে হয়, পৃথিবীটা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

আমি প্রতি দুই সপ্তাহে একবার করে এই দেশের অনেক পত্রপত্রিকায় লিখি। কেন লিখি, নিজেও জানি না। আমি কোনো বিষয়েরই বিশেষজ্ঞ নই; তাই দেশ, সমাজ কিংবা পৃথিবীর কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমার নেই। তাই নিজের দুঃখ-কষ্ট বা আনন্দটুকু পাঠকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিই। রোহিঙ্গাদের এই কষ্টটুকু শুরু হওয়ার পর মনে হচ্ছিল, এখন থেকে বুঝি শুধু তাদের নিয়েই লিখতে হবে, অন্য কিছু লেখার মতো মানসিক অবস্থা হয়তো কখনোই আসবে না। কিন্তু আজ সকালে খবরের কাগজে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের খবরটি পড়ে মনে হলো— একবার হলেও সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয় নিয়ে একটুখানি লিখি।

২০১৫ সালে যখন প্রথমবার গ্র্যাভিটি ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গ বিজ্ঞানীরা তাদের ল্যাবরেটরিতে দেখতে পেয়েছিলেন, সেটি বিজ্ঞানের জগতে অনেক বড় একটি খবর ছিল। সাধারণ মানুষ হয়তো খবরটি পড়েছেন; কিন্তু খবরটার গুরুত্বটুকু নিশ্চয়ই ধরতে পারেননি। এই মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্যালাক্সির একটি গ্যালাক্সি আমাদের ছায়াপথ; সেই ছায়াপথের কোটি কোটি নক্ষত্রের একটি নক্ষত্র সূর্য; সেই সূর্যের আটটি গ্রহের একটি গ্রহ পৃথিবী এবং সেই পৃথিবীর অসংখ্য প্রাণীর একটি প্রাণী হচ্ছে মানুষ! এই অতি ক্ষুদ্র মানুষ এই পৃথিবী নামের নীল গ্রহটিতে থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির গোপন রহস্য বের করতে পেরেছেন, সেটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য একটি ব্যাপার মনে হয়। সেটি করার জন্য বিজ্ঞানীরা গ্রহ-নক্ষত্র গ্যালাক্সির দিকে তাকিয়েছেন। সেখান থেকে যে আলো এসেছে, সেটি দেখেছেন। টেলিস্কোপে শুধু আলো দেখে সন্তুষ্ট থাকেননি, রেডিও তরঙ্গ দেখেছেন, এক্স-রে দেখেছেন, গামা-রে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, নিউট্রিনো নামে রহস্যময় কণাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছেন। একটি পরমাণুর ভেতরে কী আছে বা নিউক্লিয়াসের ভেতরে কী আছে, সেটি দেখার জন্য বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে বড় বড় অ্যাকসেলারেটর তৈরি করেছেন এবং সেগুলো ব্যবহার করে তার ভেতরের রহস্য ভেদ করেছেন। কিন্তু এই মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি কিভাবে তৈরি হয় কিংবা নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু কিভাবে হয় কিংবা ব্ল্যাকহোল কিভাবে স্থান-কালকে পাল্টে দেয়, সেগুলো বোঝার জন্য তারা ল্যাবরেটরিতে সেগুলো নিয়ে আসতে পারেন না। সেটি করার জন্য তাদের মহাকাশের দিকে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। পর্যবেক্ষণ করেন আলো কিংবা বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ, কখনো কখনো নিউট্রিনো।

বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করার জন্য নতুন একটি পদ্ধতি বের করেছেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী চেষ্টা করে তারা গ্র্যাভিটি ওয়েভ বা মহাকর্ষ তরঙ্গ নামে সম্পূর্ণ নতুন এই তরঙ্গ দেখতে সক্ষম হয়েছেন, যেটি পদার্থবিজ্ঞান জগতের জন্য একেবারে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ২০১৫ সালে প্রথমবার যখন তারা মহাকর্ষ তরঙ্গ দেখেছেন, সেটি ছিল দুটি ব্ল্যাকহোলের সংঘর্ষ। দুটি ব্ল্যাকহোল কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে একটি আরেকটিকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাদের ঘুরপাকের কারণে মহাকর্ষ তরঙ্গ তৈরি হয়েছে এবং সেই তরঙ্গ তাদের শক্তি সরিয়ে নিচ্ছিল বলে একে অন্যের কাছাকাছি চলে এসে একসময় দুটি মিলিত হয়ে নতুন একটা বড় ব্ল্যাকহোল তৈরি করেছে। ১৯১৪ সালে আইনস্টাইন তার জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি প্রকাশ করেন এবং সেটি বিশ্লেষণ করে প্রথম মহাকর্ষ তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। তখন তিনি নিজেও হয়তো বিশ্বাস করেননি যে ঠিক একশ বছর পর পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এটি নিজের চোখে দেখতে পাবেন। বিষয়টি কত কঠিন ছিল সেটি অনুমান করাও কঠিন। কারণ এটি দেখতে হলে বিশাল পৃথিবীর আকার যদি একটি পরমাণুর আকারে সঙ্কুচিত হয়, সেটি দেখার ক্ষমতা থাকতে হবে। একটি পরমাণু কত ছোট সেটি যারা না জানে, তাদের অনুভব করানো প্রায় দুঃসাধ্য!

বিজ্ঞানীরা সেই অসাধ্য সাধন করেছেন এবং এ পর্যন্ত চারবার তারা সুনিশ্চিতভাবে মহাকর্ষ তরঙ্গ দেখতে পেয়েছেন এবং চারবারই কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে দুটি ব্ল্যাকহোল একটি আরেকটির সঙ্গে পাক খেতে খেতে একসময় একত্র হয়ে একটি বড় ব্ল্যাকহোলে রূপান্তরিত হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, ২০১৬ সালেই তাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু নিশ্চয়ই নোবেল পুরস্কার দেওয়ার আগে একটুখানি যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হয়। তাই ২০১৬ সালে না দিয়ে এ বছর দেওয়া হলো।

নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন— একজন এমআইটির প্রফেসর, অন্য দুজন ক্যালটেকের। নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাটি দেখে আমি ভিন্ন এক ধরনের আনন্দ পেয়েছি। কারণ ক্যালটেকে আমি পোস্ট ডক হিসেবে কাজ করেছি এবং যে দুজন প্রফেসর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তাদের আমি চিনি! সত্যি কথা বলতে কী, এই দুই অধ্যাপকের একজন কিপ থর্নের অফিসটি ছিল আমার অফিসের খুব কাছে। প্রায় প্রতিদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হতো। তার অফিসটি অন্য যেকোনো প্রফেসরের অফিস থেকে ভিন্ন। তিনি বাজি ধরতে খুব পছন্দ করতেন এবং পৃথিবীর অন্যান্য বিজ্ঞানীর সঙ্গে তিনি নানা বিষয়ে বাজি ধরতেন। সেই বাজির বিষয়বস্তু ছিল খুবই চমকপ্রদ। স্টিফেন হকিংসের সঙ্গে তিনি বাজি ধরেছিলেন, সিগনাস এক্স ওয়ান নামের একটি নক্ষত্র আসলে একটি ব্ল্যাকহোল। দুজনের স্বাক্ষরসহ ১৯৭৫ সালের বাজির কাগজটি ছোট একটা ফ্রেমে কিপ থর্নের অফিসের সামনে টানানো ছিল। সেখানে লেখা ছিল, বাজিতে যে হেরে যাবে, তাকে অন্যজনকে এক বছরের জন্য পেন্টহাউস নামের ম্যাগাজিনটি কিনে দিতে হবে (যারা জানে না তাদের বলে দেওয়া যায়, পেন্টহাউস, প্লেবয় এগুলো হচ্ছে নগ্ন নারীদের ছবিতে পূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজিন)। ১৯৯০ সালে স্টিফেন হকিংস এই বাজিতে হেরে গিয়েছিলেন। তিনি সত্যি সত্যি কিপ থর্নকে এক বছরের জন্য পেন্টহাউস কিনে দিয়েছিলেন কিনা কিংবা কিনে দিয়ে থাকলে তার স্ত্রী ব্যাপারটা কিভাবে নিয়েছিলেন সেটা আমি জানি না।

কিপ থর্ন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। মহাকর্ষ তরঙ্গ দেখা এবং মাপার বিষয়টি যতটুকু না তাত্ত্বিক সমস্যা তার থেকে অনেক বেশি এক্সপেরিমেন্টাল সমস্যা। কাজেই নোবেল পুরস্কার যে তিনজনকে দেওয়া হয়েছে, তার ভেতর দুজন হচ্ছেন এক্সপেরিমেন্টাল পদার্থবিজ্ঞানী। এর ভেতর একজন এমআইটির প্রফেসর, অন্যজন ক্যালটেকের। ক্যালটেকের প্রফেসর ব্যারি ব্যারিসের নামটি দেখে আমার এক ধরনের দুঃখবোধ হয়েছে। কারণ এখানে ব্যারি ব্যারিসের নামের পাশে আরো একটি নাম থাকার কথা ছিল— সেই নামটি হচ্ছে রোনাল্ড ড্রেভার। মহাকর্ষ তরঙ্গের নোবেল পুরস্কারটি যদি এ বছর ঘোষণা না করে গত বছর ঘোষণা করা হতো, তাহলেই হয়তো আমরা তার নামটিও দেখতে পেতাম। কারণ এ বছর পুরস্কার ঘোষণা করার মাত্র কয়েক মাস আগে তিনি মারা গেছেন। নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, কেউ মারা গেলে তাকে আর পুরস্কারটি দেওয়া যায় না। নিয়মটি ভালো না। পদার্থ বিজ্ঞানের ইতিহাসে একজন মানুষের নাম থাকতে পারল না; কারণ ঘটনাক্রমে তিনি মারা গেছেন— এটি মেনে নেওয়া যায় না। (আমাদের বাংলা একাডেমির পুরস্কারেও মনে হয় এই ঝামেলাটি আছে। অনেক হেজিপেজি চেষ্টাচরিত্র করে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছে; কিন্তু আহমদ ছফাকে কখনো বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়নি, এটা মেনে নেওয়া কঠিন)। রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছে, তাদের নিয়মের ভেতর পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার নিয়মটিও থাকা উচিত ছিল। তাহলে এখন মিয়ানমারের ফটোজেনিক নেত্রী আউং সান সু চির অন্যান্য পুরস্কার এবং সম্মাননা কেড়ে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নোবেল পুরস্কারটিও কেড়ে নেওয়া যেত।

আমি যখন ক্যালটেকে ছিলাম, তখন আমি সদ্য পিএইচডি শেষ করা তরুণ একজন পোস্ট ডক। ক্যালটেকে পৃথিবীর সেরা সেরা বিজ্ঞানীরা রয়েছেন, ক্যাফেটেরিয়ায় লাঞ্চ করার সময় পাশের টেবিলে ফাইনম্যানের মতো বড় বিজ্ঞানীদের দেখি এবং মোটামুটি হতবুদ্ধি হয়ে যাই। প্রায় নিয়মিতভাবে বড় বড় বিজ্ঞানীরা সেমিনার দেন, আমরা খুব আগ্রহ নিয়ে সেগুলো শুনি। আমি পৃথিবীর অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীর বক্তৃতা শুনেছি কিন্তু আমার স্মৃতিতে যে বক্তৃতাটি সবচেয়ে দাগ কেটে আছে, সেটি হচ্ছে মৃত্যুর কারণে নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হওয়া রোনাল্ড ড্রেভারের বক্তৃতা। আজ থেকে প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা, মহাকর্ষ তরঙ্গ দেখার জন্য বিশাল দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়েছে এবং তার নেতৃত্বে রয়েছেন এই রোনাল্ড ড্রেভার। উচ্চতা খুব বেশি নয়, ঢিলেঢালা শরীরের গঠন, মুখে সবসময় এক ধরনের হাসি, দেখলেই মনে হতো, তিনি বুঝি এই মাত্র খুব মজার কিছু শুনেছেন। এই বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্টটি কিভাবে দাঁড় করানো হচ্ছে সেটি নিয়ে তার বক্তৃতা শুনতে আমরা সবাই গেছি। আজকাল সব বক্তৃতাই দেওয়া হয় ভিডিও প্রজেক্টর দিয়ে, তখন দেওয়া হতো ওভারহেড প্রজেক্টর দিয়ে। স্বচ্ছ ট্রান্সপারেন্সির ওপর কলম দিয়ে লিখতে হতো এবং সেগুলো ওভারহেড প্রজেক্টরে রাখা হলে পেছনের স্ক্রিনে দেখা যেত।

প্রফেসর ড্রেভার আমাদের তার এক্সপেরিমেন্টের কথা শোনাতে শোনাতে স্বচ্ছ ট্রান্সপারেন্সিগুলো ওভারহেড প্রজেক্টরে রাখছেন। কথা বলতে বলতে একসময় উত্তেজিত হয়ে উঠলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে তার ট্রান্সপারেন্সিগুলো ওলট-পালট হয়ে গেল এবং দেখলাম সারাটেবিলে তার ট্রান্সপারেন্সিগুলো ছড়ানো-ছিটানো এবং তিনি যেটা দেখাতে চাইছেন, সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রায় পাগলের মতো বিশাল টেবিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ছুটে যাচ্ছেন, তার মুখে বিব্রত হাসি, অপ্রস্তুত ভঙ্গি। গল্প-উপন্যাসে বিজ্ঞানীদের যে বর্ণনা থাকে হুবহু সেই দৃশ্য! একসময় হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি এমনিতেই তার বক্তৃতা দিলেন। যখন বলার অনেক কিছু থাকে, তখন স্লাইড কিংবা ট্রান্সপারেন্সি খুঁজে না পেলেও চমৎকার বক্তৃতা দেওয়া যায়।

পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাটি দেখে আমি একটুখানি নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো শুধু ছাত্র পড়ানো হয়। পড়ানোর পাশাপাশি যখন সত্যিকার গবেষণাও করা শুরু হবে, শুধু তখনই সত্যিকারার্থে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারবে।

সারাপৃথিবী জ্ঞান সৃষ্টি করবে, আমরা শুধু সেই জ্ঞান ব্যবহার করব, নিজেরা কিছু সৃষ্টি করব না, সেটা তো হতে পারে না।

* ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
বছরটা কেমন গেল?
দেখতে দেখতে বছরটি শেষ হয়ে গেল। প্রতিবারই যখন বছর শেষ হয় তখন আমি চাই কিংবা নাই চাই, বছরটি কেমন কেটেছে সেটা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এ বছর যখন বিষয়টা চিন্তা করছি তখন সবার আগে মনে পড়ল এ বছর ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। অন্যরা বিষয়টাকে কীভাবে নিয়েছে আমি জানি না কিন্তু আমার মনে হয়, বাকি জীবনে এটা ভুলতে পারব না যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে ক্লাস ওয়ানের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। এ দেশে এখন যে শিক্ষা নীতিটি রয়েছে আমি তার প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্য ছিলাম। আমার যতদূর মনে পড়ে সেখানে আমরা বলেছিলাম স্কুলের বাচ্চাদের প্রথম তিন বছর কোনো পরীক্ষাই থাকবে না। কিন্তু আমরা বেশ অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছি শুধু ক্লাস ওয়ান নয় প্রি-স্কুলে পর্যন্ত বাচ্চাদের পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং সেই পরীক্ষা নিয়ে বাবা মা’দের ঘুম নষ্ট হয়ে যায়। ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অর্থ এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ধারণা হয়েছে ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাদেরও পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হবে এবং সেটা করার জন্য প্রশ্নটা ফাঁস করিয়ে বাচ্চাদের সেই ফাঁস করা প্রশ্ন মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার হলে পাঠাতে হবে। আমি যখন খবরটি দেখেছি তখন আমি কী হাসব না কাঁদব নাকি দেয়ালে মাথা কুটতে থাকব কিছুই বুঝতে পারিনি। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন নিয়ে অভিভাবকরা তাদের ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাকে কী বুঝিয়েছিলেন আমার জানার খুব ইচ্ছে করে! অবশ্যই এ বছরের সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঘটনা। এতদিনে আমরা সবাই জেনে গেছি মিয়ানমারের মিলিটারি জেনারেলরা তাদের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ফটোজেনিক নেত্রী, সেই দেশের সাধারণ মানুষ সবাই মিলে ঠিক করেছে রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে রাখা যাবে না। কাজেই রোহিঙ্গাদের অমানুষিক নিষ্ঠুরতায় খুন করা হতে লাগল, কোনো একটি হিসাবে এক মাসেই নয় হাজার নিরীহ মানুষ এবং সাত থেকে আটশ’ শিশুকে হত্যা করা হয়েছিল। মেয়েদের ধর্ষণ করা হতে থাকল। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হতে থাকল। এই অব্যর্থ প্রেসক্রিপশন নির্ভুলভাবে কাজ করেছে, সেই দেশের সব রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশে হাজির হয়েছে। প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও আমরা শেষে সবাইকে আশ্রয় দিয়েছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে আমরা লাখ দশেক রোহিঙ্গাকে খাওয়াতে পারব। সারা পৃথিবীর মানুষ দেখছে আমরা লাখ দশেক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, খেতে দিচ্ছি, প্রাণ বাঁচিয়ে থাকতে দিচ্ছি। আমরা সাধারণ মানুষ সাধারণভাবে চিন্তা করি তাই কোনোভাবেই বুঝতে পারি না বার্মা নামের দেশটি একেবারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে এত বড় একটি বর্বরতা করে যাচ্ছে কিন্তু কেন সারা পৃথিবীর সবাইকে সেটা দেখতে হচ্ছে এবং শুনতে হচ্ছে। কেউ কিছু করতে পারছে না কেউ কিছু বলতে পারছে না। সিকিউরিটি কাউন্সিলে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয় তখন মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে চীন সেখানে ভেটো দেয়। যার অর্থ চীন নামের এক বিলিয়ন মানুষের দেশটি সারা পৃথিবীর সামনে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে, ‘বার্মার জেনারেলদের, বার্মার মিলিটারিদের এবং বার্মার পাবলিকদের শান্তি মতো রোহিঙ্গাদের খুন করতে দাও, গ্রাম জ্বালাতে দাও, মেয়েদের ধর্ষণ করতে দাও। খবরদার কেউ তাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করতে পারবে না!’ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় চীন নামের দেশটি আমাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। প্রায় অর্ধ-শতাব্দী বছর পরেও দেশটির মানবিক মূল্যবোধে কোনো পরিবর্তন হয়নি! জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা এ বিষয়গুলো অর্থনীতি, রাজনীতি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এসব বড় বড় বিষয় দিয়ে বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারেন। আমি ক্ষুদ্র মানুষ, এতকিছু বিশ্লেষণ করতে পারি না। শুধু মনে হয়, আহা রে! এতো মানুষকে এতো নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলল, দেশ ছাড়া করে ফেলল অথচ পৃথিবীর মানুষ ঘটনাটার নিন্দা পর্যন্ত জানাতে পারবে না? আমরা কোন পৃথিবীতে আছি? রোহিঙ্গাদের ঘটনাটি এখন সারা পৃথিবীর মানুষ জেনে গেছে। দেশের যেই ঘটনাটি নিয়ে শুধু আমাদের দেশের মানুষই মাথা ঘামাচ্ছে সেটি হচ্ছে ‘গুম’। মাঝে মাঝেই আমরা পত্রপত্রিকায় দেখি একজন ‘গুম’ হয়ে গেছে। কী ভয়ানক একটি ব্যাপার। মাঝখানে ফরহাদ মজহার গুম ব্যাপারটাকে একটা হাস্যকর কৌতুকের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কিন্তু সেটি বিবেচনা করা না হলে প্রতিটি ‘গুম’ আসলে বড় ধরনের নিষ্ঠুরতা। গুম হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ভেতর কেউ কেউ কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস পর ফিরে আসছে কিন্তু ফিরে আসার পর মুখ খুলছে না। বোঝাই যাচ্ছে যারা গুম করে নিয়ে যাচ্ছে ছেড়ে দেওয়ার আগে তারা এমনভাবে ভয় দেখাচ্ছে যে মানুষগুলো আর মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস পায় না। তারপরেও বলতে হবে তারা খুবই সৌভাগ্যবান মানুষ, ভয়ভীতি যাই দেখানো হোক অন্তত আপনজনের কাছে ফিরে আসতে পারছে। কিন্তু যারা ফিরে আসছে না তাদের আপনজনদের কথা চিন্তা করলে আমি কেমন জানি বিপন্ন অনুভব করি। কিছুদিন আগে খবরের কাগজে গুম হয়ে যাওয়া অনেক মানুষের পরিবারের একটা ছবি দেখেছিলাম। ছোট ছোট বাচ্চা তাদের বাবার ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, মা সন্তানের ছবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে বুকটা ভেঙে যায়। বহুদিন আগে আর্জেন্টিনার সরকার তাদের দেশের মানুষদের এভাবে ধরে নিয়ে যেত। কেউ তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারত না। তখন সেই মানুষগুলোর মায়েরা তাদের সন্তানদের ছবি নিয়ে চুপচাপ বসে থাকত। একদিন নয় দুইদিন নয় প্রতিদিন। নিঃশব্দ সেই প্রতিবাদ সারা পৃথিবীর সব মানুষের বিবেককে স্পর্শ করেছিল। এতদিন পরে আমাদের দেশেও ঠিক একই ব্যাপার ঘটছে সেটি মেনে নেওয়া কঠিন। যে দেশে একজন মানুষ গুম হয়ে যায় এবং দেশটি সেই গুম হয়ে যাওয়া মানুষটির কোনো খোঁজ দিতে পারে না, সেই দেশটির জন্য এর চাইতে বড় অবমাননা আর কী হতে পারে? তবে কি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে দেশের ভেতর আরও একটি দেশ আছে যে দেশটির ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? কী ভয়ানক কথা! এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা ‘ভালোভাবে’ শেষ হয়েছে, আমার কাছে এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এখানে অবশ্য ‘ভালোভাবে’ শব্দটি এ দেশের ছেলেমেয়েদের জন্য নয়। শব্দটি এ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখানোর জন্য। যারা এই ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে ‘টু পাইস’ কামাই করে সেই টাকা দিয়ে নতুন ফ্রিজ টেলিভিশন কিনেছেন! অন্য সব বছরের মতো এ বছরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসা ছেলেমেয়েগুলো একটি অবিশ্বাস্য কষ্টের ভেতর দিয়ে গিয়েছে এবং সেটি নিয়ে এ দেশের কোনো মানুষের কোনো উচ্চবাচ্য নেই। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি গত বছরেই একবার ভাইস চ্যান্সেলরদের একটি সভায় সবাইকে অনুরোধ করেছিলেন যেন ছেলেমেয়েদের কষ্ট কমানোর জন্য সবাই মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়। আমার ধারণা ছিল রাষ্ট্রপতি কিছু চাইলে সেটি করে ফেলতে হয়। কিন্তু দেখাই যাচ্ছে আমাদের দেশের ভাইস চ্যান্সেলররা মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধকেও উপেক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন। ভাসা ভাসা শুনেছিলাম এ মাসের ৬ তারিখ সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ সভা হবে, আমি খুবই আগ্রহ নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। পত্রপত্রিকায় কোথাও সেই গুরুত্বপূর্ণ সভার কোনো খোঁজ-খবর পাইনি। সম্ভবত আমাদের ছেলেমেয়েদের কষ্ট দেওয়ার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সামনের বছরে নতুন টেলিভিশন, ফ্রিজ কিংবা ওয়াশিং মেশিন কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন! প্রতি বছরের মতো এ বছরেও হিন্দু পরিবারের ওপর আক্রমণ হয়েছে। প্রক্রিয়াটি হুবহু অন্য বছরের মতো। কোনো একজন হিন্দু মানুষের নাম ব্যবহার করে বলা হবে, ‘অমুক মানুষটি ধর্মের অবমাননা করেছে’ তারপর হাজার দশেক লোক জড়ো করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের ওপর আক্রমণ করা হবে। তাদের ঘরবাড়ি লুট করা হবে, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। যে মানুষটি কিছুই করেনি তাকে অ্যারেস্ট করে রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হবে। গত বছর ছিল নাসিরনগর, নিরীহ মানুষটির নাম ছিল রসরাজ। এ বছর রংপুরের ঠাকুরপাড়া, নিরীহ মানুষটির নাম টিটু রায়! আমি প্রতি বছরই আশা করে থাকি এ বছরটি আমরা এ রকম কিছু না ঘটিয়ে কাটাতে পারি কিনা! নিশ্চয়ই কোনো একটি সময় আমরা সাম্প্রদায়িকতার এ বিষাক্ত শিকড় মাটি থেকে উৎপাটন করতে পারব। এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ‘চরিত্রের’ নাম হচ্ছে চিকুনগুনিয়া! প্রথমবার যখন এ বিচিত্র অসুখটির নাম শুনেছি আমি নিজের মনে হা হা করে হেসে বলেছি, কী অদ্ভুত একটি নাম! তারপর যখন রোজার ঈদের দিন ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম পায়ের তালুতে ব্যথা এবং দেখতে দেখতে সারা শরীরের গিঁটে গিঁটে সেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। তখন আমি চিকুনগুনিয়ার নামের মাহাত্ম্য আবিষ্কার করলাম। অসুখ-বিসুখের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট উদার। মানুষ হিসেবে আমার যদি পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার থাকে তাহলে পশু-পাখি, বৃক্ষ-লতা, পোকা-মাকড় ব্যাকটেরিয়া ভাইরাসের কেন বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে না! কাজেই ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ারা যখন বেঁচে থাকার জন্য কিছুদিন আমাদের শরীরে বসবাস করতে চায় আমি আনন্দের সঙ্গে তাদের থাকতে দিই। চিকুনগুনিয়ার বেলাতেও সেটাই ধরে নিয়েছিলাম, কিছুদিন ভুগে আমি ঠিক হয়ে যাব। কিন্তু প্রথমে বিস্ময় এবং পরে আতঙ্ক নিয়ে আবিষ্কার করেছি এ ভয়াবহ অসুখটির কোনো মাত্রাজ্ঞান নেই। প্রথম কয়েক সপ্তাহ জ্বর, শরীর ব্যথা বমি ইত্যাদি। তারপর অসুস্থতার উপসর্গ চলে গেল কিন্তু আমি আবিষ্কার করলাম, সোফায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না! কয়েক বছর থেকে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি কলাম লিখে যাচ্ছি, এ প্রথমবার আমি লিখতে পারলাম না! শুধু আমার অসুস্থতা নিয়ে নাকিকান্না কেঁদে যাচ্ছি কিন্তু সেটি আমার উদ্দেশ্য না। আমার এ অসুস্থটা হয়েছিল বলে জানি এটি কী ভয়াবহ! এ গ্রীষ্মে ঢাকা শহরের লাখ লাখ মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। মানুষের সময়কে যদি অর্থমূল্য দিয়ে বিবেচনা করা যেত তাহলে আমরা দেখতাম কত অল্প সময়ে কত হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে! প্রথমে শুনেছিলাম এ রোগে মানুষ মারা যায় না কিন্তু পরে জেনেছি এটি সত্যি নয়, অনেকে মারাও গেছে, বিশেষ করে যারা বয়স্ক। মারা যেতে যেতে বেঁচে এসেছে তার সংখ্যাও কম নয়। আশা করি সামনের বছরগুলোতে আমাদের যেন চিকুনগুনিয়া বৃত্তান্ত আর লিখতে না হয়! গত বছরের ইতিবৃত্ত লিখতে লিখতে আবিষ্কার করলাম যা কিছু লিখেছি সবই নেতিবাচক। ভালো কিছু ঘটেনি এটা তো হতে পারে না। এবারে ভালো কিছু লিখি। এখন প্রায় মোটামুটি নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে আমাদের ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে যাচ্ছি। এর মাঝে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অলিম্পিয়াড হচ্ছে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও ইনফরমেটিক্স (প্রোগ্রামিং) অলিম্পিয়াড। এবারে এ তিনটি অলিম্পিয়াডে আমাদের ছেলেমেয়েরা এক ডজন মেডেল এনেছে। পদার্থবিজ্ঞানে একটি সিলভার তিনটি ব্রোঞ্জ, গণিতে দুইটি সিলভার, দুইটি ব্রোঞ্জ এবং ইনফরমেটিক্সে চারজনের চারজনই একটি করে ব্রোঞ্জ! আমাদের ছেলেমেয়েরা কেমন করছে বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ভারতবর্ষের প্রতিযোগীদের সঙ্গে তুলনা করা। তাদের জনসংখ্যা আমাদের ছয়গুণ, সুযোগ-সুবিধার কোনো তুলনা নেই, লেখাপড়ার মান ভালো (প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না) তারপরেও আমরা নিয়মিত বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে আসছি। কী আনন্দ! আরেকটি আনন্দের সংবাদ হতে পারে আমাদের রূপপুর নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্রের কর্মযজ্ঞের উদ্বোধন। খাঁটি বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাশিয়ার চেরনোবিল, জাপানের ফুকুসিমার উদাহরণ দেয়। আমার অবশ্য সে রকম দুর্ভাবনা নেই, বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, দেশের বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাতে পারলেই দেশটি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র থেকেই শুধু বড় মাপের বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব। পৃথিবীর সব দেশে এ প্রযুক্তি থাকবে আমাদের থাকবে না, এটি কেমন কথা? রূপপুর নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নিয়ে সরকারিভাবে প্রচার প্রচারণা করা হয়েছে, সেখানে এটাকে ‘পারমাণবিক’ শক্তিকেন্দ্র বলা হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এটি সঠিক নয়, এ শক্তি পরমাণু থেকে আসে না, এটি আসে পরমাণুর কেন্দ্রে থাকা নিউক্লিয়াস থেকে। কাজেই এর নাম আসলে নিউক্লিয়ার শক্তি কেন্দ্র! তবে যে নামেই এটাকে ডাকা হোক, সেই শৈশব থেকে যে রূপপুর শক্তি কেন্দ্রের কথা শুনে এসেছি শেষপর্যন্ত তার কাজ শুরু হয়েছে দেখে ভালো লাগছে।   নতুন বছরে সবার জন্য রইল অনেক শুভেচ্ছা! লেখক: অধ্যাপক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
বছরটা কেমন গেল?
নিস্তব্ধতা ভেঙে আওয়াজ উঠল জয় বাংলা
আমাদের বয়সী যেকোনো মানুষকে যদি জিজ্ঞাস করা হয় তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন কোনটি সে অবধারিতভাবে বলবে সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। আমি মনে করি আমরা যারা সেই দিনটিতে বাংলাদেশের জন্ম হতে দেখেছি, সেই সময়ের তীব্র আনন্দটুকু পৃথিবীর খুব কম মানুষ অনুভব করেছে। আমরা খুবই সৌভাগ্যবান একটি প্রজন্ম যারা সেই অবিশ্বাস্য আনন্দটুকু অনুভব করার সুযোগ পেয়েছিলাম। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে সেই দিনটিতে যখন একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হয়েছে তখন প্রথম অনুভূতিটি হচ্ছে এক ধরনের বিষাদ, কারণ সারাদেশে একজন মানুষও ছিল না যার কোনো না কোনো আপনজন বা প্রিয়জন সেই যুদ্ধে মারা যায়নি। নতুন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য একটি দেশের মানুষ কত বড় আত্মত্যাগ করেছে। বাংলাদেশের পতাকার মাঝখানে যে লালবৃত্ত, সেটি সাধারণ মানুষের কাছে শুধু এক টুকরো লাল কাপড়, কিন্তু আমরা জানি সেই লাল রংটুকু কোথা থেকে এসেছে, আমরা জানি সেই লাল রং এ  আমাদের সব আপনজনের বুকের রক্ত একটুখানি হলেও আছে। ১৯৭১ সালে বিজয়ের আগের দিনগুলোর স্মৃতি আমাদের এখনো এত স্পষ্টভাবে মনে আছে যে, মনে হয় এটি মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমাদের পুরো পরিবার তখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, কে কোথায় আছে কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা আমরা কিছুই জানি না। আমি যাত্রাবাড়ীতে একটা পরিবারের সঙ্গে অনেক শিশুদের নিয়ে আছি। ১৯৭১-এর যাত্রাবাড়ী আজকের যাত্রাবাড়ীর মতো নয়, মোটামুটি ফাঁকা। রাস্তার দুই পাশে বাড়িঘর নেই। আমি যেখানে আছি তার চারপাশে ছোট একটা জনবসতি। তখন শেষ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। দিনরাত গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। শেলিং হচ্ছে, একটা দুটো শেল আশপাশে পড়ছে সে রকম খবরও ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে এত কাছে থেকে এত তীব্র গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই যে মনে হয় এই বুঝি সেগুলো আমাদের গায়ে এসে লাগবে। এরকম সময়ে কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকা যায় না তাই কিছু একটা করার উদ্দেশ্যে একটা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ঘরের উঠানে একটা ট্রেঞ্চ খুঁড়ে ফেলা হলো। ট্রেঞ্চের ওপরে একটা ঢেউ টিনের আস্তরণ। যখন গোলাগুলির শব্দ খুব বেড়ে যায় তখন বাচ্চাগুলোকে নিয়ে ট্রেঞ্চের ভেতর বসে থাকি। বাড়িটার পাশেই রাস্তা, সেই রাস্তা দিয়ে মিলিটারির বহর যাচ্ছে এবং আসছে। একদিন মিলিটারিরা সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটা স্কুটারের সব যাত্রীকে মেরে ফেলল। আমরা দেখতে পাই, স্কুটারের ভেতর থেকে মৃত মানুষগুলোর হাত-পা বের হয়ে আছে। মৃত মানুষগুলো প্রকাশ্য রাস্তায় স্কুটারের ভেতর দিনের পর দিন পড়ে আছে কেউ সেটা নিয়ে বিচলিত হচ্ছে না। এক সময় লক্ষ্য করলাম রাস্তা দিয়ে বড় বড় ট্যাংক ঘর ঘর শব্দ করে ঢাকার দিকে ফিরে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পাকিস্তানি মিলিটারি! ‘পশ্চাদপসরণ’ বলে একটা শব্দ আছে, এই মিলিটারি বাহিনীকে দেখলেই বোঝা যায় তারা সেই পশ্চাদপসরণ করছে। প্রাণের ভয়ে? আমরা দূর থেকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকি। ঠিক তখন একদিন যখন সূর্যের আলো নিভু নিভু অন্ধকার নেমে আসছে, গোলাগুলির শব্দ কমে আসছে তখন নৈঃশব্দ বিদীর্ণ করে একজন চিৎকার করে উঠলো, ‘জয় বাংলা’। মুহূর্তের মাঝে আমরা বুঝে গেলাম দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হয়েছে, যে স্বাধীনতার জন্য বুভুক্ষের মতো আমরা অপেক্ষা করছিলাম সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে। সেটি জানার জন্য আমাদের প্রয়োজন ছিল শুধু একটি স্লোগান। জয় বাংলা। কী আশ্চর্য, মুক্তিযুদ্ধের সেই স্লোগানটি এই দেশে নির্বাসিত হয়েছিল। শুধু স্লোগানটি নয় যে মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই স্লোগান সেই মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল, দেশের শাসক হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত স্বাধীনতার শত্রুরা! ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ধুঁকে ধুঁকে বেঁচেছিল শুধু আওয়ামী লীগের কর্মীদের মাঝে। কেউ সেই স্লোগানটি উচ্চারণ করলেই মানুষ ধরে নিত সেই মানুষটি নিশ্চিতভাবে আওয়ামী লীগের কর্মী! দেশের মানুষ মনে হয় ভুলেই গেলো যেকোনো রাজনৈতিক দলের স্লোগান ছিল না এটি। এই স্লোগানটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গর্জে ওঠার আগে তাদের কণ্ঠ থেকে প্রকম্পিত হতো এই স্লোগান। গণজাগরণ মঞ্চের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই যে তারা মুক্তিযুদ্ধের সেই স্লোগানটি আবার আমাদের উপহার দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও এখন একজন শুধু মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর ভালোবাসায় জয় বাংলা স্লোগানটি দিতে পারে! দুই. বাংলাদেশটি আমরা এমনি এমনি পাইনি। এই দেশটি পাওয়ার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। এক সময় আমরা পাকিস্তানের অংশ ছিলাম। সেই পাকিস্তান দেশটির জন্য যে লাহোর প্রস্তাব ছিল সেখানে বহুবচনে দুটি দেশের কথা বলা হয়েছিল। ‘মুদ্রণ প্রমাদ’ বলে দুটি দেশের ধারণাটিকে সরিয়ে একটি পাকিস্তান তৈরি করা হয়েছিল। আমরা জন্ম থেকে দেখে এসেছিলাম বলে মেনে নিয়েছিলাম, এখন নিশ্চয়ই সবাই চোখ কপালে তুলে বলে, এটি কিভাবে সম্ভব? একটি দেশের দুই টুকরো দুই জায়গায় মাঝখানে হাজার কিলোমিটার দূরত্ব? সেটিই ছিল আজব স্থান পাকিস্তান! জনসংখ্যায় আমরাই ছিলাম বেশি অথচ সম্পদের বড় অংশ ভোগ করত পশ্চিম পাকিস্তান। পুরো দেশটিই যে ছিল ষড়যন্ত্রের জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা একটি দেশ সেটি বুঝতে বাঙালিদের মাত্র বছরখানেক সময় লেগেছিল- যখন পাকিস্তানের স্থপতি মোহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ঘোষণা দিয়ে গেলেন উর্দু এবং শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা! বাহান্ন সালে ভাষা আন্দোলন হলো, রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হলো। চুয়ান্ন সালে বঙ্গবন্ধু আর সহনেতারা প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করলেন কিন্তু বছর ঘোরার আগেই সেই সরকারকে বাতিল করে দেয়া হলো। বঙ্গবন্ধু তখন একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতা কিন্তু তার বুঝতে বাকি রইল না যে পাকিস্তানের এই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তিলাভের একটি মাত্র উপায় সেটা হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন। তিনি ছয় দফার আন্দোলন শুরু করেন। এই দেশের নতুন প্রজন্মের যারা দেশকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করে তাদের সবার এই ছয়টি দফা একবার হলেও পড়ে দেখা উচিত, তাহলে তারা অবাক হয়ে আবিষ্কার করবে যে, ছয় দফা আসলে একটি মাত্র দফা, যার আসল অর্থ হচ্ছে স্বাধীনতা! পাকিস্তানে তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, বঙ্গবন্ধু আর তার সহকর্মীরা বেশির ভাগ সময়ই জেলখানায় থাকেন। রাজনৈতিক নেতাদের বলতে গেলে কেউই বাইরে নেই, ছাত্ররা আন্দোলন করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনল। (আজকাল কেউ কল্পনা করতে পারবে, এখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রলীগ আছে ক্যাফেটারিয়া ক্যান্টিনে ফাউ খাওয়া থেকে যারা বড় কিছু চিন্তা করতে পারে না তাদের পূর্বসুরিরা এক সময় এত বড় বড় কাজ করেছে?) ঊনসত্তরের বিশাল গণ আন্দোলনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হলো, ক্ষমতা দেয়া হলো সর্বকালের নৃশংস দানব ইয়াহিয়া খানের কাছে– তখনও আমরা তার সেই পরিচয়টির কথা জানি না। সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতি স্বীকৃতি জানিয়ে বাঙালিরা তাকে একটা অভূতপূর্ব বিজয় উপহার দেয়। বাঙালিরা প্রথমবার এই দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে, পাকিস্তানি মিলিটারির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো! তাদের বিশাল ষড়যন্ত্রের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তারা নির্বাচনের রায় অস্বীকার করা মাত্রই সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, তার অঙুলিহেলনে এই দেশ চলতে শুরু করল। মার্চ মাসের ৭ তারিখ রেসকোর্সে তিনি তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দিলেন, যেটি শুনলে এখনো আমার শরীরে শিহরণ হয়! ২৫ মার্চ পাকিস্তান মিলিটারি এই দেশে গণহত্যা শুরু করল, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ! নয় মাসের সেই যুদ্ধের ইতিহাস হচ্ছে আত্মত্যাগের ইতিহাস, বীরত্বের ইতিহাস আর অর্জনের ইতিহাস। পৃথিবীর কয়টি দেশ এ রকম একটি গৌরবের ইতিহাস দাবি করতে পারবে? তিন. বাংলাদেশের একটি কালো অধ্যায়ের সময় ছিল যখন সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করা হতো কিংবা খাটো করে দেখানো হতো। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বোঝানো হতো বঙ্গবন্ধু বলে কেউ নেই, কেউ ছিল না, জিয়াউর রহমান নামের একজন মেজরের ঘোষণায় এই দেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। রাজাকার শব্দটি উচ্চারণ করা যেত না। পাকিস্তান বলা যেত না বলতে হতো হানাদার যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতেন তাদের শাসন করা হতো, শাস্তি হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করে দেয়া হতো। যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা উচ্চারণ করলে দেশদ্রোহী হিসেবে মামলা করে দেয়া হতো। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আমাকে জিজ্ঞেস করত ‘স্বাধীনতার ঘোষক কে?’ (স্বাধীনতা যেন একটি ছেলের হাতের মোয়া কোনো একজন তার কথা ঘোষণা করলেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়!) তারা জিজ্ঞেস করত রাজাকাররা কেমন করে মন্ত্রী হয়? যারা এই দেশ চায়নি, এই দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে তারা কেমন করে এই দেশের শাসন করে? তারা কেমন করে তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়? আমাদের অনেক বড় সৌভাগ্য সেই দুঃসময়কে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। কেউ আমাদের কাছে জানতে চায় না স্বাধীনতার ঘোষক কে? নতুন প্রজন্ম এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছে, নিজের কানে শুনতে পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এই দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে দেখেছে, দেশকে গ্লানিমুক্ত হতে দেখেছে। এই দেশকে নিয়ে অনেকের অনেক কিছু চাওয়ার আছে, আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। এই দেশ থেকে আমি যা চেয়েছিলাম তার থেকে বেশি পেয়েছি। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে নতুন প্রজন্মের কাছে আমার শুধু একটি মাত্র প্রত্যাশা– যেটুকু পেয়েছি সেটি যেন কোনোভাবে আবার হারিয়ে না ফেলি। লেখক: অধ্যাপক, শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। এমকে 
নিস্তব্ধতা ভেঙে আওয়াজ উঠল জয় বাংলা
সাম্প্রতিক ভাবনা
এক. খবরের কাগজে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ছবি দেখে দেখে এতদিনে আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা এখনো অভ্যস্ত হতে পারিনি। সম্ভবত তার প্রধান কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা শিশু। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার জীবনের সবকিছু পেছনে ফেলে হেঁটে হেঁটে অনিশ্চিত একটা জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই দৃশ্যটি যথেষ্ট হৃদয়বিদারক। তার চেয়ে শতগুণ বেশি হৃদয়বিদারক দৃশ্য একটি অবোধ শিশু যখন তার চারপাশে কী ঘটছে তার কিছুই বুঝতে না পেরে তার বাবা বা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে যায়। তাদের চোখে এক ধরনের বিস্ময়, এক ধরনের অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক। সেই চোখের দৃষ্টি দেখে বিচলিত না হয়ে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে চোখ ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। শিশুগুলো যখন খুব ছোট তখন তারা থাকে তাদের মায়ের কোলে, একটুখানি বড় হয়ে গেলে বাবার কোলে বা কাঁধে। তারা যদি হাঁটতে শেখে তাহলে নিজেরাই বাবা কিংবা মায়ের পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে আসে। আরেকটু বড় হয়ে গেলে অবধারিতভাবে তাদের মাথায় একটা বোঝা থাকে। এই কিশোর কিংবা কিশোরীর চোখের দৃষ্টি দেখে কেন জানি নিজের ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধ বোধের জন্ম হয়। এই পৃথিবীতে কত সম্পদ, কত ঐশ্বর্য অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য কিছু নেই। শুধু প্রাণটুকু বাঁচিয়ে রাখতেই তাদের পুরো জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে প্রথমেই আমার মনে হয় এখন তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা কিন্তু সেই কথাটি উচ্চারণ করাই মনে হয় একটা উৎকট রসিকতার মতো মনে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে, পরীক্ষা শেষে অনেকেই বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে যাবে, আগ্রহ নিয়ে পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করবে। নতুন বছর শুরু হলে তাদের সবার হাতে নতুন বই উঠবে, সেই বই হাতে নিয়ে তাদের মুখে হাসি ফুটে উঠবে। অথচ এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কিছু নেই। শুধু শরণার্থী শিবিরে একটি দিনের পর আরেকটি দিন বেঁচে থাকা। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা যখন তার মিলিটারি জেনারেলদের নিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যা-ধর্ষণ করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে দেশছাড়া করেছিল তখন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষদের নিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। সারা পৃথিবীর মানুষের সামনে ঘোষণা করেছেন আমরা ১৬ কোটি মানুষ যদি খেতে পারি তাহলে এই দশ লাখ লোকও খেতে পারবে। নতুন এবং পুরনো মিলে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন এই দেশের মাটিতে স্থান পেয়েছে, মাথার ওপর একটুখানি আচ্ছাদন পেয়েছে, দুই বেলা খেতে পারছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছে, সবচেয়ে বড় কথা প্রাণের ভয়ে তাদের বনের পশুর মতো বনে জঙ্গলে ছুটে বেড়াতে হচ্ছে না। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কত জায়গায় কত রকম যুদ্ধবিগ্রহ কত রকম নিষ্ঠুরতা তার ভেতরে হতদরিদ্র দুঃখি রোহিঙ্গাদের কথা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি, পৃথিবীর সব মানুষ এই রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের কথা জানে। (শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর একজন নিষ্ঠুরতম মহিলার সম্মাননা একটি একটি করে প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে, এর চেয়ে বড় লজ্জা আর অপমান কী হতে পারে?) খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি আলোচনা চলছে, চুক্তি হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা হচ্ছে। দিনে তিনশত করে শরণার্থী প্রক্রিয়া করা সম্ভব হবে বলে দেখেছি, সেটি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে দশ লাখ রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দশ বছর সময় লাগবে! সোজা বাংলায় যার অর্থ এই রোহিঙ্গা মানুষগুলোকে আমাদের বছরের পর বছর আশ্রয় দিতে হবে। যদি তাই সত্যি হয় তাহলে এই রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ কি আমাদের একটু আলাদাভাবে দেখার প্রয়োজন নেই? আমরা আমাদের শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দেব কিন্তু একই ভূখণ্ডে আশ্রয় নেয়া অন্য শিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করব না? তাদের ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্ন থাকবে না? আমরা যখন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছি তখন চীন দেশের কমিউনিস্ট নেতা মাও সে তুংয়ের কথা খুব শুনতে পাওয়া যেত। তার একটা বিখ্যাত উক্তি ছিল এরকম- একজন মানুষ খাওয়ার জন্য একটি মুখ কিন্তু কাজ করার জন্য দুটি হাত নিয়ে জন্মায়। আমরা কি এখন রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য সেই কথাটিই ব্যবহার করতে পারি না? তাদের মুখ একটি, হাত দুটি এবং মস্তিষ্কে নিউরন একশ বিলিয়ন?    দুই. একজন মানুষকে ঘর ছাড়া কিংবা দেশ ছাড়া করার সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর পদ্ধতি হচ্ছে তার বাড়িতে আগুন দিয়ে দেয়া। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মহিলা এবং তার জেনারেলরা সেই তথ্যটি খুব ভালো করে জানেন তাই তারা একটি একটি করে রোহিঙ্গা গ্রামের প্রতিটি বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে তাদের ঘর ছাড়া করেছে, দেশ ছাড়া করেছে। কেউ কি লক্ষ করেছে, আমার নিজের দেশের রংপুরে হিন্দুদের বেলায় হুবহু একই ব্যাপার ঘটেছে। অনেক মানুষ মিলে পুলিশের সামনে হিন্দুদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও একই প্রক্রিয়ায় একই ব্যাপার ঘটেছিল। তখন রসরাজ নামে একজন অসহায় নিরীহ মানুষকে ব্যবহার করে কাজটি করা হয়েছিল, এবার টিটু রায় নামে অন্য একজনকে বেছে নেয়া হয়েছে। পুরো ব্যাপারটির মাঝে এক ধরনের অচিন্তনীয় নিষ্ঠুরতা রয়েছে অথচ অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে- এই টিটু রায়কে দিনের পর দিন রিমান্ডের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে। আমরা রোহিঙ্গাদের বুক পেতে গ্রহণ করেছি অথচ হিন্দুদের বুক আগলে রক্ষা করব না? এ কেমন কথা?   তিন. সবেমাত্র জেএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, খবরের কাগজ থেকে জানতে পেরেছি সব পরীক্ষার সব প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সারাদেশে যেরকম তুলকালাম কাণ্ড হওয়ার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষাটি বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা- একটি পরীক্ষাও বাতিল হয়নি কাজেই ধরে নিচ্ছি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি মেনে নিয়েছে। যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাওয়াটি মেনে নেয় তাহলে ছাত্রছাত্রী শিক্ষক শিক্ষিকা অভিভাবকরা সেটি কেন মেনে নেবে না? সবাই মেনে নিয়েছে এবং বিষয়টি একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে এর চেয়ে কালো কোনো অধ্যায় কি হওয়া সম্ভব? জেএসসি পরীক্ষা শেষ পিইসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। জেএসসি পরীক্ষার ‘ঐতিহ্য’ধরে রেখে এর প্রশ্ন ফাঁস হতে শুরু হয়েছে। প্রাইমারির ছেলেমেয়েরা একেবারেই শিশু তাদের প্রশ্ন ফাঁসে অভ্যস্ত করে দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে? জেএসসি এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যে লাগাম ছাড়া সমস্যার জন্ম হয়েছে, প্রাইমারি পরীক্ষার বেলায় সেটি একেবারেই হওয়ার কথা ছিল না কারণ এই পরীক্ষাটিই হওয়ার কথা ছিল না। এই দেশের লেখাপড়া নিয়ে কথা বলা হলে যে শিক্ষানীতির কথা বলা হয় সেই শিক্ষানীতিতে প্রাইমারি পরীক্ষাটির কথা বলা নেই। শিক্ষানীতিকে সম্মান দেখিয়ে যদি এই পরীক্ষাটিকে পাবলিক পরীক্ষার মতো একটি বিশাল দক্ষযজ্ঞতে রূপান্তর করে ফেলা না হতো তাহলেই এর প্রশ্নফাঁসের ব্যাপারটাই থাকত না! যদি পরীক্ষাই না থাকে তাহলে কোন পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হবে? এবারের পিইসি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে সঙ্গে আমরা নতুন আরো একটা বিষয় দেখতে পেয়েছি, সেটি হচ্ছে প্রশ্নপত্রের ভুল। যারা পত্রপত্রিকা পড়েন তাদের একজনও নেই যারা প্রশ্নের ইংরেজিটি দেখে আতঙ্কে শিউরে ওঠেনি। প্রশ্নপত্রের এই ভুলটি যেরকম অবিশ্বাস্য এর প্রতিকার হিসেবে যে কাজটি করা হয়েছে সেটি আরো অবিশ্বাস্য। খুঁজে খুঁজে সেই মানুষটিকে বের করা হয়েছে যে প্রশ্নপত্রটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে তারপর তাকে বরখাস্ত করে দেয়া হয়েছে। যে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছে তার ইংরেজির জ্ঞান খুব কম, তার পক্ষে এর চেয়ে ভালো ইংরেজি লেখা সম্ভব নয়, তাই সে এরকম একটি অনুবাদ করেছে। এটি অন্যায় হতে পারে না, এটি হচ্ছে ব্যর্থতা। ব্যর্থতার জন্য কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না। যদি শাস্তি দিতেই হয় তাহলে শাস্তি দিতে হবে এই প্রশ্ন প্রণয়নকারী দায়িত্বে থাকা কমিটিকে, তার সভাপতিকে, তার সদস্যদের। তারা অনেক বড় অন্যায় করেছেন, তারা এমন একজন মানুষকে প্রশ্ন অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছেন যিনি ইংরেজি জানেন না। শুধু তাই না, ইংরেজিতে অনুবাদ করার পর সেই কমিটি প্রশ্নপত্রটিতে চোখ বুলানো প্রয়োজন মনে করেননি কিংবা চোখ বুলিয়ে ভুল ইংরেজি দেখার পরও সেটি সংশোধন করা দরকার মনে করেননি। একটি বিশাল বিপর্যয় ঘটবে, যারা সেই বিপর্যয়টি ঘটাবে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে, খুঁজে পেতে সবচেয়ে নিরীহ এবং ক্ষুদ্র মানুষটিকে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে সবাই আনন্দে বগল বাজাতে থাকবে এটি কেমন কথা? একজন মানুষ ইংরেজি না জানলে তাকে শাস্তি দেয়া যায় না, যে তাকে দিয়ে ইংরেজি অনুবাদ করেছে তাকে খুঁজে বের করে প্রয়োজন হলে তাকে শাস্তি দিতে হবে! সবচেয়ে বড় কথা, একটা বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর কাউকে খুঁজে বের করে তাকে শাস্তি দিয়ে কোনো লাভ নেই, বিপর্যয় না ঘটলে অনেক বড় লাভ হয় এই সহজ কথাটি কেউ কেন বুঝতে পারছে না?   চার. সাম্প্রতিক ঘটনার মাঝে আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে যে ঘটনাটি সেটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি ঘোষণা, সেটি হচ্ছে তারা এখন স্কুলে স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করবে। নিজের কানে শুনেও আমি কথাটি বিশ্বাস করতে পারছি না। বর্তমান ছাত্রলীগ কি আমাকে সারাদেশে একটি ঘটনার কথা বলতে পারবে যেটি দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যে আমার স্কুলে পড়ুয়া সন্তানকে ছাত্রলীগের সদস্য করে দিতে হবে? যদি না পারে তাহলে তাদের এই সর্বনাশা প্রজেক্টে হাত দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। লেখক: কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
সাম্প্রতিক ভাবনা
স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন
শপিং মলের খোলা জায়গায় একটি সুন্দর বসার জায়গা। সেখানে তের চৌদ্দ বছরের এক কিশোরকে নিয়ে তার মা বসে আছেন। মায়ের বয়স খুব বেশি নয়, চেহারার মাঝে মার্জিত রুচিশীলতার ছাপ রয়েছে। কিশোরটিরও বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। মা হাসি হাসি মুখে তার ছেলেটিকে বললেন, ‘বাবা, ঐ যে কাপড়ের দোকানটা দেখছিস?’ ছেলে বলল, ‘হ্যাঁ মা, দেখছি।’ ‘ওখানে একজন মহিলা কেনাকাটা করছে দেখেছিস? ছেলে মাথা নাড়ল। বলল, ‘হ্যাঁ মা, দেখছি।’ মা বললেন, ‘মহিলাটা তার ব্যাগ পাশে চেয়ারটার ওপরে রেখেছে’। ছেলে মাথা নাড়ল। মা তখন বললেন, ‘তুই গিয়ে ঐ ব্যাগটা নিয়ে ছুটে চলে আয়’। ছেলেটি একটু অবাক হয়ে বলল, ‘মানে ব্যাগটা চুরি করব?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ চুরি করবি।’ ‘তুমি আমার মা, তুমি আমাকে চুরি করতে বলছ?’ মা হাসি হাসি মুখে বলল, ‘তুই এত অবাক হচ্ছিস কেন? সবাই চুরি করে।’ ‘যদি ধরা পড়ে যাই?’ সিসি ক্যামেরাতে ছবি উঠে যায়?’ ‘ধরা পড়বি কেন? আর সিসি ক্যামেরাতে ছবি উঠলেও কোনো সমস্যা নেই। তোর বয়স কম। তোকে কেউ কিছু বলবে না। পত্রপত্রিকায় ছবি উঠলেও তোর মুখটা ঝাপসা করে রাখবে। কম বয়সী চোরদের চেহারা পত্রিকায় ছাপানোর নিয়ম নেই।’ মায়ের উৎসাহ পেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার কিশোরটি কাপড়ের দোকান থেকে মহিলাটির ব্যাগটি চুরি করে নিয়ে এলো। ছেলেটি যখন মায়ের কাছে ফিরে এলো, মা ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘বাবা, আজকে তোর চুরিতে হাতেখড়ি হলো।’ ছেলেটি হাসি মুখে বলল, ‘তুমি উৎসাহ দিয়েছ বলে পেরেছি।’ মা বললেন, ‘পরের বার বাসা থেকে বড় চ্যালা কাঠ নিয়ে আসব। তুই পেছন থেকে একজনের মাথায় মারবি। মানুষটা পড়ে গেলে তার হ্যান্ডব্যাগ, মানি ব্যাগ সব তুলে নিয়ে আসবি। পারবি না?’ ছেলেটি উজ্জ্বল চোখে বলল, ‘কেন পারব না মা? তুমি দোয়া করো আমার জন্য।’ মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘সব সময় দোয়া করি। একজন মা যদি সন্তানের জন্য দোয়া না করে তাহলে কে করবে?’ আমি জানি, পাঠকদের যারা এ পর্যন্ত পড়েছেন তারা নিশ্চয়ই খুব বিরক্ত হচ্ছেন। মা-সন্তানকে নিয়ে এরকম জঘন্য একটা কাহিনী তৈরি করেছি বলে অনেকে হয়তো আমাকে শাপ শাপান্ত করছেন। আমি এবারে পাঠকদের আবার গল্পটা পড়তে বলব, এবারে যেখানে যেখানে ‘ব্যাগ চুরি’র কথা বলা হয়েছে সেখানে ‘প্রশ্ন ফাঁস’কথাটা ঢুকিয়ে দিতে হবে। (চুরি করা অন্যায়, প্রশ্ন ফাঁসও অন্যায়। এ দুইয়ের মাঝে বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই)। হঠাৎ করে পাঠকরা আবিষ্কার করবেন আমার গল্পে বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জন নেই। আমাদের দেশের মা-বাবা কিংবা শিক্ষকরা নিজ হাতে তাদের সন্তানদের অন্যায় করার হাতেখড়ি দিচ্ছেন। বড় হয়ে যেন আরো বড় অন্যায় করতে কুণ্ঠিত না হয় তার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পাবার পর যখন এসব বাবা-মায়ের ছেলেমেয়ে গোল্ডেন ফাইভ পাবে তারা বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে মিষ্টি পাঠাবেন। চুরি করার মতো অন্যায় করা এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে। জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন প্রত্যেক দিন ফাঁস হয়েছে। পত্রপত্রিকায় তার খবর বের হয়েছে। ছবি ছাপা হয়েছে। কিন্তু কোনো পুলিশ র‌্যাব মিলিটারি বিজিবি কাউকে ধরতে যায়নি। কোনো মোবাইল কোর্ট কাউকে বিচার করে শাস্তি দেয়নি। তের চৌদ্দ বছরের ছেলেমেয়েরা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখে নিয়মিত পরীক্ষা দিচ্ছে অথচ একটি রাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা নেই, সবাই নিরাসক্তভাবে দেখছে এটি কেমন করে হতে পারে? বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। নিয়মিত প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এবং সেটি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। পরীক্ষার আগে ছেলেমেয়েরা আমার কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন পাঠায়। পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর তারা আমার কাছে আসল প্রশ্নটি পাঠায়, আমি অবাক বিস্ময়ে দেখি হুবহু মিলে যাচ্ছে। আমি এ অকাট্য প্রমাণ দেখিয়ে লেখালেখি করেছি কিন্তু কারো ভেতরে কোনো চিত্তচাঞ্চল্য নেই। শেষে কোনো উপায় না দেখে আমি ঠিক করলাম। ‘প্রশ্ন ফাঁস মানি না মানব না’লিখে একটা প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ হিসেবে শহীদ মিনারে বসে থাকব। আমার প্রতি মায়া দেখিয়ে আমার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব পরিচিত মানুষ এবং বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অল্প কিছু ছেলেমেয়ে আমার সঙ্গে ছিল। (মজার কথা, আমি যে প্ল্যাকার্ডটি নিয়ে বসেছিলাম তার বক্তব্য একটু পরিবর্তন করে আমার একটা ছবি নেটওয়ার্কে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল) পরে শুনেছি আরো কিছু ছেলেমেয়ে শহীদ মিনারে আসতে চেয়েছিল কিন্তু তাদের ভয় দেখানো হয়েছিল বলে তারা সাহস করে আসেনি! টেলিভিশনের অনেক চ্যানেল এসেছিল তারা নিশ্চয়ই অল্পবিস্তর প্রচারও করেছিল। তার ফলে কিছুদিনের ভেতরে তদন্ত কমিটি হলো, তারা তদন্ত করলেন, বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা আমার বাসাতেও এসে আমার বক্তব্য শুনে গেলেন। সমস্যাটা সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য দেশের বড় শিক্ষাবিদদের নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সচিবালয়ে একটা মিটিং ডাকলেন। মিটিংয়ের এজেন্ডাতে ‘প্রশ্ন ফাঁস’কথাটি নেই, সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যার কথা বলা হয়েছে। তাই খুবই স্বাভাবিকভাবে দেশের বড় বড় বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদরা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। দেশের বড় শিক্ষাবিদরা রিটায়ার করার পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে যান তাই কিছুক্ষণের মাঝেই আলোচনা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যার দিকে মোড় নিলো। আমি ততক্ষণে বুঝে গিয়েছি প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটা চাপা পড়ে গিয়েছে। বড় বড় শিক্ষাবিদ যারা এসেছেন তাদের কাছে প্রশ্ন ফাঁস গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইস্যু নয়। আমি ততক্ষণে ঠিক করে নিয়েছি কোনো কথা না বলে বিদায় নেব। মিটিংয়ের শেষের দিকে শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় নিজে আমাকে কিছু বলতে অনুরোধ করলেন। আমি কিছু বললাম, অন্যরাও কিছু বললেন, আলোচনা শেষ। তখন কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এতদিন পর আমার আর সেটি মনে নেই, কিন্তু এটুকু সবাই জানে যে সমস্যাটির সমাধান হয়নি। এখনো নিয়মিতভাবে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখে পরীক্ষা দেওয়া অন্যায়। সারা পৃথিবীতে অন্যায় কাজ করা হয় গোপনে, শুধু আমাদের দেশে এটি করা হয় প্রকাশ্যে। কী লজ্জা! কী লজ্জা! প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটি আমাকে যেটুকু আহত করে তার থেকে বেশি আহত করে এ পুরো ব্যাপারটি নিয়ে দেশের বড় বড় মানুষের নির্লিপ্ততা। এ দেশে কত শিক্ষক, শিক্ষক সংগঠন, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, ভাইস চ্যান্সেলর, কোর্ট, হাইকোর্টের বিচারপতি, সাংবাদিক, সম্পাদক, কত পুলিশ, র‌্যাব, মিলিটারি, কত সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, কত বুদ্ধিজীবী, কত রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু কেউই জোর গলায় এর প্রতিবাদ করছে না। একটা জাতির জন্য এটা যে কত বড় একটা বিপর্যয় সেটা কি কেউ ভেবে দেখেছে? এ দেশের একটা শিশু বড় হচ্ছে অন্যায় করতে শেখে! পুলিশ কাউকে ধরতে পারে না, অথচ আমার কাছে স্কুলের শিশুরা নিয়মিত চিঠি লিখে জানায় কে কোন সেন্টারে পরীক্ষা দিচ্ছে সেই সেন্টারের কোন শিক্ষক কীভাবে কোন স্কুলের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছেন, তার উত্তর বলে দিচ্ছেন। একটা স্কুলের বাচ্চারা যে অপরাধীদের চেনে এ দেশের পুলিশ মিলিটারি র‌্যাব মিলে সেই অপরাধীদের ধরতে পারে না এটা আমি কেমন করে বিশ্বাস করি? তাই আমাকে মেনে নিতেই হচ্ছে যারা প্রশ্ন ফাঁস করছে তাদের ধরার ব্যাপারে কারো কোনো আগ্রহ নেই। একেবারে প্রথম দিন থেকে আমি যে কথাটা বলে আসছি এখনো আমি সেই একই কথা বলছি! একটা সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রথমে সমস্যাটা বুঝতে হয়। সমস্যাটা বুঝতে পারলেই সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু সেই সমস্যাটা যদি কেউ বুঝতেই না পারে তাহলে তার সমাধানটা হবে কেমন করে? প্রশ্ন ফাঁসের সমস্যা সমাধানটা হচ্ছে না ঠিক এ কারণে। সেটা এখন পর্যন্ত কেউ সমস্যাটা বোঝার পর্যায়েই যায়নি। কেমন করে যাবে? তাহলে স্বীকার করতে হবে প্রশ্নটা ফাঁস হয়েছে। কেমন করে স্বীকার করবে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে? তাহলে পরীক্ষাটি বাতিল করতে হবে। কাজেই কখনই ঘোষণা দিয়ে স্বীকার করা হয়নি প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। যেহেতু প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলা হয়নি তাই যারা প্রশ্ন ফাঁস করেছে তাদের অপরাধী বলার সুযোগ নেই। বরং আমি উল্টোটা হতে দেখেছি, যখন কেউ প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে চিৎকার করেছে তখন তাকেই গুজব ছড়ানোর অভিযোগে শাস্তি দেয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। অথচ খুব সহজে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা সম্ভব। শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা দিতে হবে, ‘যা হওয়ার হয়েছে, এ দেশের মাটিতে ভবিষ্যতে আর কখনও প্রশ্ন ফাঁস হবে না।’কিন্তু আমি অনেকবার অনুরোধ করেও তাদের মুখ থেকে ঘোষণাটি বের করতে পারিনি। অথচ আমি নিশ্চিতভাবে জানি এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আগ্রহ আছে, ভালোবাসা আছে এ রকম অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, প্রযুক্তিবিদ রয়েছেন, অসংখ্য তরুণ তরুণী আছে যারা সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত। শুধু তাদের সাহায্য নিতে হবে। যখন দেশে বন্যা হয়, ঘূর্ণিঝড় হয় তখন দেশের সব মানুষ সাহায্য করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমস্যাটি বন্যা ঘূর্ণিঝড় থেকেও বড় বিপর্যয়। এর সমাধানে দেশের মানুষ এগিয়ে আসবে না আমি বিশ্বাস করি না। আমি এ লেখাটি আশার কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। আমি আশাবাদী মানুষ, দেখেছি জীবনে আমার কোনো আশাই বিফলে যায়নি। কয়েক বছর আগের কথা। একটি মেয়ে আমাকে ই-মেইল পাঠিয়েছে। খুবই মন খারাপ করা ই-মেইল। সে লিখেছে তার আশপাশে যত ছেলেমেয়ে আছে তারা সবাই ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখে দেখে পরীক্ষা দিয়েছে। এ মেয়েটি কখনও কোনো প্রশ্ন দেখেনি কারণ সে পণ করেছে অন্যায় করবে না, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দেখবে না। কাজেই সবার পরীক্ষা খুব ভালো হচ্ছে, যে প্রশ্নে পরীক্ষা দেবে সেই প্রশ্ন আগে থেকে জানা থাকলে পরীক্ষা ভালো না হয়ে উপায় কী? মেয়েটি তার ই-মেইলে লিখেছে সবার পরীক্ষা খুবই ভালো হচ্ছে তার পরীক্ষা সেরকম ভালো হয়নি। বিশেষ করে পদার্থ বিজ্ঞানের পরীক্ষাটি বেশি খারাপ হয়েছে কারণ প্রশ্নটি বাড়াবাড়ি কঠিন হয়েছে। পরীক্ষার খবর দেওয়ার পর মেয়েটি লিখেছে- যেহেতু তার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল যথেষ্ট ভালো হবে না তাই সম্ভবত সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগই পাবে না। যেহেতু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না তাই তাকে হয়তো কোনো কলেজে যেনতেনভাবে লেখাপড়া শেষ করে একটি প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। তার স্বপ্ন দেখা শেষ। মেয়েটির ই-মেইলের উত্তরে তাকে আমি সান্ত্বনা দিয়ে কী লিখব বুঝতে পারছিলাম না, কারণ সে যে কথাগুলো লিখেছে সেটি সত্যি। ‘কোনোভাবে অন্যায় করব না’পণ করার কারণে এ দেশে একটি ছেলে বা মেয়ের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতেই পারে! অনেক চিন্তা করে আমি মেয়েটিকে লিখলাম, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া নিয়ে তুমি মন খারাপ করো না। আমিও ঠিক করেছি রিটায়ার করার পর প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুল খুঁজে বের করে সেখানে মাস্টারি করে জীবন কাটিয়ে দেব। তুমি আর আমি মিলে একই স্কুলে মাস্টারি করব, সমস্যা কী? আমার এ উত্তরে কাজ হলো, বুঝতে পারলাম সে মহাখুশি! প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করার জন্য তখন আমরা দু’জনেই মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। হঠাৎ একদিন সেই মেয়েটির আরেকটি ই-মেইল এসেছে। সেখানে সে লিখেছে, ‘স্যার, আমি শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। মজার কথা কী জানেন, আমি যত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি সবটাতে চান্স পেয়েছি।   আর আমার পরিচিত বন্ধুবান্ধব যারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছিল তাদের কেউ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি! আমার সঙ্গে সেই মেয়েটির প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করার পরিকল্পনাটা সম্ভবত আপাতত স্থগিত হয়ে আছে। কিন্তু আমি খুব খুশি হয়েছি দুই কারণে। প্রথমত ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে পরীক্ষার ফলাফল হয়তো ভালো করা যায় কিন্তু তাতে জীবনের কোনো লাভ হয় না সেটি খুব ভালোভাবে প্রমাণিত হলো। দ্বিতীয়ত অন্যায় না করে মাথা উঁচু করে থাকার মাঝে বিশাল একটা মর্যাদার ব্যাপার আছে সেটিও সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সম্ভব হলো। আমি আশা করে আছি, আমাদের দেশের সব ছেলেমেয়ে এরকমভাবে মাথা উঁচু করে থাকবে এবং এই ছেলেমেয়েদের উঁচু করে থাকা মাথাকে ভূলুণ্ঠিত করার জন্য যেন কোনো কোচিং সেন্টার, কোনো শিক্ষক কিংবা কোনো দায়িত্বহীন অভিভাবক তাদের ধারে-কাছে আসতে না পারে। যদি এইটুকু আমরা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখব যেমন করে? আমরা তো দুঃস্বপ্ন দেখতে চাই না, স্বপ্ন দেখতে চাই। লেখক: কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, শাবিপ্রবি।
স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন
বাজাই আমার ভাঙা রেকর্ড
আবার ভাঙা রেকর্ডটা বাজাই। এই ভাঙা রেকর্ড বাজানো ছাড়া আর কীই বা করতে পারি? (ভাঙা রেকর্ড বাজানোর অর্থ এক কথা বার বার বলা। কথাটা কোথা থেকে এসেছে, এই যুগের ছেলেমেয়েদের জানার কথা নয়। গ্রামোফোনের যুগে যে রেকর্ড বাজিয়ে গান শোনা হতো, সেখানে খুব সূক্ষ্ণ খাঁজ কাটা থাকত। ঘুরতে থাকা রেকর্ডের বাইরের প্রান্তে গ্রামোফোনের পিন লাগানো মাথাটা বসিয়ে দিলে সূক্ষ্ণ খাঁজটা অনুসরণ করে গান বাজাতে বাজাতে সেটি রেকর্ডের ভেতরের প্রান্তে এসে শেষ হতো। রেকর্ড ভাঙা হলে বা সেখানে ফাটল থাকলে পিনটা একটা খাঁজে আটকে গিয়ে সেই খাঁজের অংশটুকুই বার বার বাজিয়ে যেত। তাই এক কথা বার বার বলা হলে আমরা বলি ভাঙা রেকর্ড বাজিয়ে যাওয়া!) আমি কোন ভাঙা রেকর্ড বাজানোর কথা বলছি, সেটা অনুমান করা নিশ্চয়ই খুব কঠিন নয়, সেটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা। দেশে এখন ৪২টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। সব বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভর্তি পরীক্ষার জন্য একটি করে উইকেন্ড নিতে চায়, তাহলে ৪২টি উইকেন্ড দরকার। এইচএসসি পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শুরু হওয়ার মাঝখানে ৪২টি উইকেন্ড নেই! তারচেয়ে বড় কথা দেশের প্রতাপশালী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক উইকেন্ডে পরীক্ষা শেষ করে না, তাদের বেশ কয়েকটি উইকেন্ড দরকার হয়। তারা তাদের পছন্দের উইকেন্ডগুলো বেছে নেওয়ার পর উচ্ছ্বিষ্ট উইকেন্ডগুলো অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাগাভাগি করে নেয়। শুধু তাই নয়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে প্রত্যেকটা বিভাগ আলাদা করে নিজের বিভাগের পরীক্ষা নেয়! সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হলে ছেলেমেয়েদের গাট্টি-বোচকা নিয়ে দিনের পর দিন থাকতে হয়। তারা কোথায় থাকবে, কীভাবে থাকবে, তা নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এই সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিষ্ঠুরতা দেখার সময়। এই সময়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাওয়া ছেলেমেয়েদের কষ্ট পাওয়ার সময়। আর এই সময়টা আমার সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হওয়ার সময়। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার এই সময়টাতে প্রতিবছরই নানা ধরনের অঘটন ঘটে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেগুলো লুকিয়ে ছাপিয়ে রাখার চেষ্টা করে। একটা দুটি খবর বের হয়ে যায়। সেটা নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ হয়। তারপর সবাই সবকিছু ভুলে যায়। এবারে সর্বশেষ ঘটনাটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের দুটি প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রয়োজন নেই, একেবারে খুবই সাধারণ মানুষের চোখে পড়লেও তারা বলে দিতে পারত যে, এরকম প্রশ্ন ঠিক নয়। এটা হচ্ছে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন, এক ধর্মকে বড় করে দেখিয়ে অন্য ধর্মকে খাটো করে দেখানোর প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্ন দুটো কারো চোখে পড়েনি। যেকোনো পরীক্ষার প্রশ্ন কখনো একজনে করেন না, বেশ কয়েকজনের একটা কমিটি প্রশ্নগুলো প্রস্তুত করেন। কাজেই সেই কমিটির সব উগ্র সাম্প্রদায়িক হবে তার সম্ভাবনা কম। কমিটির কারো না কারো চোখে পড়ার কথা। কমিটির সদস্যদের কারোই চোখে পড়েনি দেখে অনুমান করা যায় সদস্যদের কেউই সম্ভবত প্রশ্নগুলো পড়ে দেখেননি। তাই কেউই হয়তো জানতেন না সদস্যদের কোনো একজন এ রকম একটা প্রশ্ন ঢুকিয়ে রেখেছেন। ভর্তিপরীক্ষা মানেই হেলাফেলা, যেনতেনভাবে কিছু গাইড বই থেকে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়ে একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করে ফেলা। সেইসব প্রশ্ন এত নিম্নমানের হয় যে, মাঝে মাঝে মনে হয় পরীক্ষা না নিয়ে লটারি করে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করার জন্য বেছে নিলেও হয়তো তাদের প্রতি বেশি সুবিচার করা হয়। হাইকোর্ট থেকে একবার আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রক্রিয়া করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমি তখন সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছিলাম সেই পরীক্ষার প্রত্যেকটা প্রশ্ন গাইড বই থেকে নেওয়া। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই এ রকম ঘটনা ঘটে তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একই ব্যাপার কেন ঘটবে না? কাজেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ভর্তি পরীক্ষায় আমরা চরমভাবে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন দেখতে পেয়েছি। অনেকেই হয়তো অবাক হয়েছেন, আমি মোটেও অবাক হইনি। ভর্তি পরীক্ষায় এই ধরনের ব্যাপার সব সময়েই ঘটে যাচ্ছে, আগে সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি, এইবারে যে কোনো কারণেই হোক এটা নিয়ে অনেকে মাথা ঘামাচ্ছে। এবারে শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে তা নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। আমি ডেইলি স্টারে পড়েছি তারা ভোর রাতে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছে। পরের দিন সেই প্রশ্নগুলো ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেছে সব মিলে গেছে। এটা সংবাদপত্রের খবরের মাঝে ভুল বা মিথ্যা হওয়ার কিছু নেই। প্রশ্ন ফাঁসের এর থেকে অকাট্য প্রমাণ আর কী হতে পারে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যি পুরোটা অস্বীকার করে রেকর্ড সময়ের ভেতর পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে ফেলেছে। এ রকম অবস্থায় এটি হচ্ছে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। একবার ফল প্রকাশ করে ফেললে আর কেউ কিছু করতে পারবে না। ফলে যাদের নাম চলে আসবে এখন তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে অন্য সবার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও আমরা সবাই জানি, আসলে সত্যিই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁস করার সঙ্গে জতিড় থাকার ব্যাপারে ছাত্রলীগের নেতাদের নাম উঠে এসেছে, কাউকে কাউকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একটা চরম ঘোলাটে অবস্থা! ভর্তি পরীক্ষার ফলে ভালো ছেলেদের সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্ন যারা পেয়ে গেছে তারাও চলে এসেছে। আমি যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কাজকর্মগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তখন দেখেছি কেউ যদি এক নম্বর বেশি পেত সে ৩০ জনকে ডিঙ্গিয়ে সামনে চলে আসত। কাজেই যারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন পেয়ে পরীক্ষা দিয়েছে তারা অন্য সব ছেলেমেয়েকে ডিঙ্গিয়ে অনেক সামনে এসে গেছে। তারাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হবে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের প্রশ্নগুলো দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ভর্তি পরীক্ষায় একটি অনেক বড় অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। জেনেও তারা দুর্বৃত্তদের হাত থেকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের রক্ষা করেনি, তারা দুর্বৃত্তদের অন্যায় করতে দিয়েছে। এর চাইতে হতাশার ব্যাপার আর কী হতে পারে? মাত্র অল্প কিছুদিন আগে আমি ভর্তি পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক এরকম একটি মেয়ের কাল্পনিক একটা গল্প লিখেছিলাম। সেখানে লিখেছিলাম এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যাওয়ার সময় রাতের বাস পথে দেরি করার জন্য মেয়েটি সময়মতো পৌঁছতে পারেনি বলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারেনি। আমরা সবাই দেখেছি এরকম ঘটনা এখন মোটেও কাল্পনিক ঘটনা নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক এই ঘটনাটি ঘটেছে। শত শত ছেলেমেয়ে পথে ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে সময়মতো পরীক্ষার হলে হাজির হতে পারেনি বলে ভর্তিপরীক্ষা দিতে পারেনি। একজন ছাত্র বা ছাত্রী সমস্ত জীবন দিয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে যখন পরীক্ষাটি দিতে পারে না তখন তাদের কাছে কী পুরো জীবনটিই একটা অর্থহীন বিষয় মনে হয় না? যদি সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নিতো, তাহলে এর কোনোটিই কিন্তু ঘটত না। বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যদি একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করতো, তাহলে সেটি হতো একটি অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নপত্র, মোটেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রশ্ন নয়। সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যদি সেই প্রশ্নপত্র ছাপাতো, সংরক্ষণ করতো, বিতরণ করতো তাহলে সেটি কখনই ফাঁস হয়ে যেতো না। যদি সবাই মিলে একসঙ্গে ভর্তিপরীক্ষা নিতো তাহলে সবাই নিজের এলাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতো, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হতো না। ট্র্যাফিক জ্যামে আটকা পড়ে দেরি করে পরীক্ষা কেন্দ্রে হাজির হয়ে পরীক্ষা দিতে না পারার ভয়ঙ্কর দুর্ভাগ্যটি মেনে নিতে হতো না। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার এত বড় গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রক্রিয়া নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই কেন আমি বুঝতে পারি না। আমি সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে যিনি সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন করেছেন তাকে কেন শাস্তি দেওয়া হবে না সেটি হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন। চারুকলা বিভাগের এই সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি পরীক্ষা নেওয়া। আমি বহুদিন থেকে অপেক্ষা করে আছি কখন হাইকোর্ট সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জানতে চাইবেন, কেন সবাই মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এই দেশের ছেলেমেয়েদের ওপর চরম অমানবিক নির্যাতন বন্ধ করছে না? ছয় সাত বছর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একবার একটা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তখন আমাকে অনুরোধ করেছিল- দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের সামনে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া যায়, তার ওপর একটা বক্তব্য দিতে। আমি গাধা টাইপের মানুষ, তাই সরল বিশ্বাসে ভাইস চ্যান্সেলরদের সামনে বক্তব্য রেখেছিলাম। সব ভাইস চ্যান্সেলরের সেই সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াটির কথা আমি কোনো দিন ভুলব না এবং সোজা ভাষায় বলে দেওয়া যায়, আমি সেদিনই বুঝেছিলাম, এই দেশের অসহায় ছেলেমেয়েদের জন্য কারো মনে বিন্দুমাত্র মায়া নেই। তাদের পীড়ন করে কোনোভাবে কিছু বাড়তি টাকা আয় করা ছাড়া আর কারো মনে অন্য কোনো ইচ্ছা নেই! সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি অবশ্যি এর থেকেও জটিল। যেহেতু কেউই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় রাজি হতে চাইছে না, তাই তখন যশোর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের আগ্রহে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং যশোর বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি কমিউনিস্ট পার্টি, ওয়ার্কার্স পাটি ও গণতন্ত্রী পার্টি এরকম বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো মিলে সেই পরীক্ষাটি বন্ধ করার আয়োজন করেছিল। রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক শ’ বছরপূর্তি উপলক্ষে যখন বামপন্থী দলগুলো সারাদেশে সভা-সমিতি করছে তখন তাদের আমার খুবই জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় একেবারে নিজের ঘরে ছেলেমেয়েদের সাহায্য করার এই বিপ্লবটিকে তারা কেন গলাটিপে হত্যা করেছিলেন? একবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের ডাকা হয়েছিল সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করার জন্য। সেই আলোচনায় সবাই এক বাক্যে স্বীকার করেছিলেন যে, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া উপায় নেই। সেই বক্তব্য শুনে আমি খুবই আশাবাদী হয়েছিলাম কিন্তু দেখা গেল যে তারপর আর কিছুই হয়নি! আমি একেবারে সত্যিকারভাবে আশাবাদী হয়েছিলাম যখন আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং চ্যান্সেলর সব ভাইস চ্যান্সেলরকে একটি সভায় সম্মিলিতভাবে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে দেশের ছেলেমেয়েদের কষ্ট লাঘব করার অনুরোধ করেছিলেন। আমি যেটুকু জানি মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধ দেশের আইনের মতো, সবাইকে এটি মানতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিশ্চয়ই দেশের আইনের ঊর্ধ্বে! তারা রাষ্ট্রপতির অনুরোধ রক্ষা করেননি! আমার খুবই আশাভঙ্গ হয়েছে যখন এই বছর দেখতে পেয়েছি আবার প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় আগের মতো আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা নিতে শুরু করেছে! কয়েকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই সভায় বক্তব্য রাখার সময় আমি ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে এসেছি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে অনুরোধ করে এসেছি যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুরোধটি রক্ষা করে তারা যেন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার একটি উদ্যোগ নেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান তার বক্তব্য দেওয়ার সময় আমাদের জানালেন প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে এবং খবরের কাগজে সে সম্পর্কে খবর ছাপা হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি যে এটি ক্রমান্বয়ে কার্যকর করা হবে। আমি ন্যাড়া এবং আমি বহুবার বেলতলা গিয়েছি, কাজেই আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ‘ক্রমান্বয়ে’কার্যকর করার বিষয় নয়, এটি ‘একেবারে’সবাইকে নিয়ে কার্যকর করতে হবে। যদি সেটি না করা হয় এবং কিছু প্রতাপশালী বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রক্রিয়া থেকে বাইরে থেকে যায় তাহলে তাদের উদাহরণ দেখিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাবে। আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষার উদ্দেশ্য শুধু বাড়তি কিছু টাকা উপার্জন, কাজেই হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক নির্লোভ সাধুসন্ত হয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বেন, সেটা মনে করার কোনো কারণ নেই। কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজি করাতে হবে জোর করে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই! আরো একটি বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝে আলোচনা হয়, যেটি দেখে আমি বুঝতে পারি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি অনেকেই এখনো বুঝে উঠতে পারেননি। সেই কথাটি হচ্ছে, ‘গুচ্ছ পদ্ধতি’! অর্থাৎ এক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি গুচ্ছ তৈরি করা হবে এবং তারা মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নেবে। যে বিষয়টি অনেকেই বুঝতে পারেন না, সেটি হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পরীক্ষা নেয় না কিংবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ছাত্রছাত্রীদের কৃষি বিষয়ে পরীক্ষা নেয় না! ছাত্রছাত্রীরা এখনো ইঞ্জিনিয়ার বা কৃষিবিদ হয়নি, তারা মাত্র এইচএসসি পাস করা ছাত্র—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এসব বিষয় পড়ে আসা ছাত্র। কাজেই তাদের যাচাই করার জন্য আসলে তারা যেসব বিষয় পড়ে এসেছে—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান—এসব বিষয়েই পরীক্ষা নিতে হবে! কাজেই গুচ্ছ তৈরি করে সেই গুচ্ছের জন্য আলাদা পরীক্ষা নিতে হবে সেটা কে বলেছে? সবাই মিলে একই পরীক্ষায় একই বিষয়ে পরীক্ষা দেবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি বিশেষ কোনো বিষয়ে বেশি জোর দিতে চায় সেটি তারা করতেই পারে, তার জন্য আলাদাভাবে পরীক্ষা নিতে হবে না। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার একটা অনেক বড় ইতিবাচক দিক আছে, যেটা অনেকেই জানে না। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটা সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে নেয়, তাহলে ছাত্রছাত্রীদের ওপর ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং’ নামে যে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধরনের নির্যাতন হয় সেটিও চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, ছাত্রছাত্রীরাও প্রথমবার খানিকটা সময় পাবে নিজের জীবনকে উপভোগ করার জন্য, মা-বাবার অনেক টাকা বেঁচে যাবে তাদের ছেলেমেয়েদের আর ভর্তি কোচিং করাতে হবে না বলে। আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি দেখার জন্য কী হয়। ভর্তি পরীক্ষার চলমান এই নির্যাতন শেষ হওয়ার পর সত্যিই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ যদি নেওয়া হয়, আমি তাহলে আশায় বুক বাঁধার জন্য প্রস্তুত হব। যদি কিছুই না হয়, তাহলে আবার শুরু করব ভাঙা রেকর্ডটি বাজিয়ে যাওয়ার জন্য।   লেখক : শিক্ষাবিদ ও লেখক
বাজাই আমার ভাঙা রেকর্ড
আরও পড়ুন
সাম্প্রতিক ভাবনা
স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন
কয়েকটি মন খারাপ করা ঘটনা
শাহানার জীবনের একদিন