ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

টেলিভিশন : সীমাহীন সম্ভাবনার হাতছানি

সৈয়দ আশিক রহমান

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪৪ পিএম
সৈয়দ আশিক রহমান

আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবস। ১৯২৬ সালের এই দিনে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি (লজি) বেয়ার্ড (John Logie Baird) টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। যদিও উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর গবেষণা এবং মৌলিক উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে টেলিভিশন আবিষ্কারের পথ তৈরি হতে থাকে এবং ১৯২৬ সালের ২১ নভেম্বর সফলতা পায়। দিনটিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত এক ফোরামে ২১ নভেম্বরকে বিশ্ব টেলিভিশন দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয় ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া ‘এই যে আকাশ নীল হলো আজ / এ শুধু তোমার প্রেম’ গানটি সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে। সে সময় অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো ডিআইটি ভবন, বর্তমানের রাজউক ভবন থেকে। নাম ছিল পাকিস্তান টেলিভিশন কর্পোরেশন। দেশ স্বাধীন হবার পর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন। যদি কিছু মনে না করেন, চতুরঙ্গ, আপনার ডাক্তার, হারজিত, সপ্তবর্ণা, আনন্দ মেলা, নতুন কুঁড়ি, ভরা নদীর বাঁকে, ইত্যাদি, মাটি ও মানুষ, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, বহুব্রীহি, নক্ষত্রের রাতসহ বহু জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও নাটক দর্শক-শ্রোতাদের উপহার দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই টেলিভিশন চ্যানেলটি। চলতি শতকের শূন্য দশকের প্রায় মধ্যভাগ পর্যন্ত টেলিভিশন নির্ভর বিনোদনের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতো বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি। তবে, নব্বই দশকের শেষের দিকে সেসময়ের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দিলে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। সত্তরের দশকে সারা দেশে যেখানে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি টিভি সেট ছিল, বর্তমানে সেখানে ক্যাবল নেটওয়ার্কে যুক্ত টিভি সেটের সংখ্যাই প্রায় ৪ কোটি।

টেলিভিশন আবিষ্কার ও বাণিজ্যিক যাত্রার পর থেকে বিনোদন আর তথ্যের এই মাধ্যমটি ধীরে ধীরে প্রায় প্রতিটি পরিবারে অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউবের এই যুগেও টেলিভিশন কেবল তার অবস্থান ধরেই রাখেনি বরং ক্রমেই সম্প্রসারিত হয়েছে এর আবেদন। বাংলাদেশে আগে শুধু একটি টেলিভিশন চ্যানেল থাকলেও গত দুই দশকে বেড়ে চ্যানেলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪টিতে। লাইসেন্স পেয়ে সম্প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি চ্যানেল। এই মাধ্যমকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে সৃজনশীল, শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। লগ্নি করা হয়েছে হাজার কোটি টাকার পুঁজি। সরকারও এই খাত থেকে আয় করছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিকাশ সহায়ক নীতিমালার অভাবে এই খাতে দেখা দিয়েছে বহুমুখী শঙ্কা, মুখোমুখি হচ্ছে অসম প্রতিযোগিতার। বিশেষ করে দেশীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা বেশ কিছু ভিনদেশি টিভি চ্যানেলের অবাধ প্রবেশাধিকার এবং নিষেধাজ্ঞা থাকবার পরও বাংলাদেশের গ্রাহকদের টার্গেট করে বিদেশি চ্যানেলে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার এবং সংকুচিত বিজ্ঞাপনের বাজারে ডিজিটাল প্লাটফর্মের ভাগ বসানোয় এই সংকট ঘনিভূত হয়েছে।

বাংলাদেশে টেলিভিশনের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা:

একটি দেশের টিভি চ্যানেল সেদেশের সংস্কৃতি ও চরিত্রের ধারক, পরিচায়ক ও মুখপাত্র। টিভি স্ক্রিনেই সেদেশের শিল্পের রূপ, মানুষের রুচিবোধ, চিন্তা, সৃষ্টিশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশেও শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বিনির্মাণ এবং বিশ্বের বুকে দেশের ও দেশীয় পণ্যের ব্রান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে টিভি চ্যানেলগুলো। সরকার প্রতিবছর চ্যানেলগুলো থেকে অর্ধ-হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি রাজস্ব আদায় করছে। এ খাতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে লক্ষাধিক মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের।

সাড়ে ষোল কোটি মানুষের ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশে টেলিভিশন খাতের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একদিকে বিনোদনের সীমিত সুযোগ, অন্যদিকে যানজটসহ নানান ভোগান্তি এড়াতে মানুষ তার বিনোদনের জন্য টেলিভিশনের উপর নির্ভরশীল। নাটক, সিনেমা, ডক্যু-ড্রামা, টক’শো, গানের অনুষ্ঠান, খেলা, চিকিৎসা ও কৃষি পরামর্শ, রান্নার অনুষ্ঠান, শিশুতোষসহ বিভিন্ন দিবস ভিত্তিক অনুষ্ঠান যেমন মানুষের বিনোদনের খোরাক যোগাচ্ছে, শিক্ষা ও সচেতনতার বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে; তেমনি দেশ-বিদেশের খবরা-খবরও ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিচ্ছে টেলিভিশন। ‘রিয়েল টাইম’-এ কোথায় কী ঘটছে তা ঘরে বসেই দেখতে ও জানতে পারছে মানুষ। প্রায় সব ক’টি টিভি চ্যানেলই তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দর্শকের সরাসরি মতামত ও প্রশ্ন করার সুযোগ রাখছে। ফলে অনুষ্ঠানগুলো আরো বেশি প্রাণবন্ত এবং অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠছে। এর মধ্য দিয়ে সচেতনতা ও জনমত যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি জনমতের প্রতিফলনও ঘটছে। উদীয়মান অর্থনীতি ও শিল্পায়নের এ সময়ে পণ্যের পরিচিতি ও ব্র্যান্ড তৈরিতে টেলিভিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, পণ্যের প্রচারে টেলিভিশনের ওপর উৎপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরতাও বাড়ছে।

বর্তমান বাজার চিত্র:

বাংলাদেশে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন বাজার বছরে প্রায় এক হাজার কোটি থেকে ১২’শ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই বাজারকেই ভাগ করে নেয় বিটিবিসহ দেশের বর্তমান ৩৪টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল। নতুন আরও বেশ কয়েকটি চ্যানেল অনুমতি পেয়েছে, যারা এই বিজ্ঞাপন বাজারে ভাগ বসাবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিজ্ঞাপনের একটি বড় অংশ আবার চলে যাচ্ছে ফেসবুক-ইউটিউবের মতো ডিজিটাল প্লাটফর্মে। যতদূর জানি, বর্তমানে চালু টিভি চ্যানেলের অর্ধেকই লোকসান গুনছে। বিজ্ঞাপনের অভাবে দুই-তৃতীয়াংশ চ্যানেল অনেকটা যুদ্ধ করেই টিকে আছে।

টিভি চ্যানেলগুলোর চ্যালেঞ্জ:

* আয়: টিভি চ্যানেলের আয়ের উৎস দুটি। ১. সাবস্ক্রিপশন বাবদ আয়। এবং ২. বিজ্ঞাপন বাবদ আয়। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো সাবস্ক্রিপশন বাবদ কোনো টাকা পায় না। ফলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় চ্যানেলের আয় শতভাগ বিজ্ঞাপন নির্ভর। কিন্তু নানান কারণে বিজ্ঞাপনের বাজার ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। দেশের ভোক্তাবাজার বড় হলেও নিয়ন্ত্রণ করছে গুটি কয়েক বড় বড় শিল্প গ্রুপ। এই শিল্প গ্রুপগুলোর অধিকাংশের আবার টিভি চ্যানেলের মালিকানা রয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের প্রচার বাবদ নির্ধারিত বাজেটের একটি বড় অংশই নিজের চ্যানেলে দিচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে অন্যান্য চ্যানেল। আবার চ্যানেলের মালিকানা নেই এমন অন্যান্য বড় কোম্পানি তাদের পণ্যের প্রচারে বিনিয়োগ বাড়ালেও যে হারে চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে তার তুলনায় পণ্যের প্রচারে বিনিয়োগ বা বাজেট বেড়েছে খুবই নগণ্য। আগে যে টাকা ৫টি চ্যানেল পেতো, সেই টাকা এখন ভাগ হয়ে যাচ্ছে ৩৪টি চ্যানেলে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশের ভোক্তাদের টার্গেট করে বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। অথচ ‘ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন ২০০৬’ ১৯ ধারার ১৩ উপধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, দেশের মানুষকে লক্ষ্য করে ভিনদেশি কোনো চ্যানেলে পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয়া দ-নীয় অপরাধ। কিন্তু এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলেও আইনের আওতায় আনার নজির দেখছি না। এরকম নানান কারণে দেশের চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনের বাজার দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, চ্যানেলগুলোর আয় কমছে। যার অনিবার্য অভিঘাত হিসেবে চ্যানেলগুলো ব্যয় সংকোচনের পথে হাঁটছে, কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

* অসম প্রতিযোগিতা: সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেলগুলোর সুবিধা হচ্ছে তাদের শুধু দেশীয় চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। কিন্তু বিনোদন নির্ভর বা মিশ্র চ্যানেলগুলোকে অভ্যন্তরীণ চ্যানেলগুলোর পাশাপাশি স্টার জলসা, স্টার প্লাস, এইচবিও, স্টার মুভিজের মতো বিদেশি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। বিদেশি এই চ্যানেলগুলো সাবস্ক্রিপশন ফি বাবদ ভোক্তা বা দর্শকদের কাছ থেকে বিপুল আয় করছে এবং অনুষ্ঠান নির্মাণে ব্যয়ও করছে অনেক বেশি। বিদেশি কিছু চ্যানেল তাদের একটি অনুষ্ঠান নির্মাণে যে ব্যয় করে তা দেশীয় কিছু চ্যানেলের সারা মাসের আয়ের সমান। সীমিত আয়ের কারণে ব্যয় সক্ষমতার অভাবে দেশের চ্যানেলগুলো শুধু মেধা আর আন্তরিকতার জোরেই বিদেশি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিয়ে দর্শকদের মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান উপহার দেবার চেষ্টা করছে।

* ডিজিটাল প্লাটফর্মের প্রভাব: বর্তমানে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম। স্মার্টফোনের সঙ্গে ইন্টারনেট সুলভ ও সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ বিনোদনের জন্য গুগল-ইউটিউবে ঝুঁকছে। ইউটিউবে নাটক, সিনেমাসহ বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠান দেখছে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে শুধু ডিজিটাল প্লাটফর্মের জন্য নাটক, সিনেমাসহ বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় যে যার মতো ইউটিউব চ্যানেল খুলে বসছেন। বিজ্ঞাপন বাজারের একটি বড় অংশ এখন চলে যাচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্মে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি অনলাইনে বিজ্ঞাপন বাবদ গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দিয়েছে ৮ হাজার ৭’শ কোটি টাকারও বেশি। আবার এই মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো কোনো ধরনের অনুমোদন বা অনুমতি ছাড়াই ডিজিটাল মিডিয়া প্লাটফর্ম খুলে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করছে, যা পুরোটাই আইন বহির্ভূত। তবে এটি একটি খণ্ডিত চিত্র। দেশের শত শত কোম্পানি বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে কত টাকা বিজ্ঞাপন বাবদ দিচ্ছে তা হিসেব করাও মুশকিল। ডিজিটাল প্লাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচারে আপত্তি নেই। আপত্তির জায়গাটা হলো গুগল, ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে কোনো অফিস নেই। বাংলাদেশে উবার, আলী-বাবার মতো অনলাইন ভিত্তিক অনেক সেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা দেশে ব্যবসা করলেও বিদেশে বসেই বিজ্ঞাপনের পুরো টাকা দিয়ে দেয় গুগল, ফেসবুক বা অন্য প্লাটফর্মে। অথচ তাদের প্রচারণার পুরোটাই চলছে বাংলাদেশের মধ্যে, বাংলাদেশের গ্রাহকদের টার্গেট করে। দেশ থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার কোটি টাকা আয় করলেও এ খাত থেকে সরকারের আয় অত্যন্ত নগণ্য। অন্যদিকে দেশে টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার বাবদ সরকার ১৫ শতাংশ ভ্যাট পায়। এর মধ্যে অগ্রিম আয়কর হিসেবে নেয় ৪ শতাংশ। প্রতিবেশী ভারতে ডিজিটাল সেবা বা বিজ্ঞাপনের ওপর ১৮ শতাংশ ট্যা* আরোপ করেছে। শুধু দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোর সুরক্ষার জন্যই নয়, বরং সরকারের রাজস্ব আয় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ঠেকানোর পাশাপাশি ডিজিটাল প্লাটফর্মকে সুশৃঙ্খল করার জন্যও সুপরিকল্পিত শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে।

* দুষ্টচক্র: নানা কারণে দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর আয় কমলেও ব্যয় বাড়ছে। ফলে বিজ্ঞাপন নির্ভরতা বাড়ছে, অনুষ্ঠানের মান উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে না, দর্শক হারাতে হচ্ছে, আয় কমছে। ফলে এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে যাচ্ছে দেশের টেলিভিশন চ্যানেল।

* দক্ষ কর্মী ও অনুষ্ঠানের মান: দ্রুততম সময়ে চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু সে অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি হয়নি। ফলে পেশাদারিত্বের অভাব দেখা দেয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে এ খাতে। এ কথা সংবাদ কর্মীদের ক্ষেত্রে যেমনটা প্রযোজ্য তেমনি প্রযোজ্য অনুষ্ঠান কর্মী কিংবা টেকনিশিয়ানদের ক্ষেত্রেও।

বিদেশি চ্যানেলের প্রভাব:

* সম্প্রচার বৈষম্য: সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়া একটি চলমান এবং দ্বি-পাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেল বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী দেশ ভারতে ডাউন-লিংক করতে বছরে লাগে ৫ থেকে ৭ কোটি রুপি আর সেদেশের চ্যানেল বাংলাদেশে ডাউন-লিংক করতে লাগে মাত্র দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। অভিযোগ আছে, কিছু চ্যানেল এই টাকাটাও দেয় না। সুতরাং সংস্কৃতির আদান-প্রদান এবং মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির নামে যা ঘটছে, তা পুরোপুরি অনৈতিক, অযৌক্তিক এবং বিপুল বৈষম্যমূলক।

* নিজস্ব সংস্কৃতির স্বকীয়তার জন্য হুমকি: বাংলাদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা বিদেশি বহু চ্যানেল বাংলাদেশে বাছ-বিচারহীনভাবে সম্প্রচার হচ্ছে। এতে দেশের সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিশুরা বাংলা ঠিক-ঠাক শেখার আগেই হিন্দিতে কথা বলতে শিখছে। নতুন ভাষা শেখা নিশ্চয়ই ভালো, তবে নিজের ভাষা-সংস্কৃতির আগে নয়। আর আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ও এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, অনেক অভিভাবক খুব গর্ব করেই বলেন, তার সন্তান বাংলা বলতে পারে না, হিন্দি বলে।

* বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপন হারাচ্ছে: বিজ্ঞাপনসহ বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচারের সুযোগ থাকায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ভোক্তাদের উদ্দেশ্য করে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। এর মধ্য দিয়ে কোম্পানিগুলো একই বাজেটে সেদেশ এবং এদেশ, উভয় দেশের ভোক্তাদের কাছে পণ্যের প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছে এবং নিচ্ছে। আগে যেখানে কোম্পানিগুলোর শত কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বাজেট থাকতো বাংলাদেশের জন্য, এখন তা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এক ঢিলে দুই পাখি মারলেও মরছে আসলে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো।

* বিদেশি পণ্য গ্রাস করছে স্থানীয় বাজার: বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি তাদের পণ্যের প্রচারের জন্য সে দেশের টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তারা যেমন নিজের দেশে বাজার তৈরি করছে, বিজ্ঞাপনসহ সেই চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে প্রচার হওয়ায় এদেশেও সেই পণ্যের প্রচার ঘটছে এবং বাজার তৈরি হচ্ছে। ফলে ক্ষতি ও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো।

সমাধান:

বহুমুখী সংকটের ঘেরাটোপে আটকে পড়া দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে বাঁচাতে হলে এর বিজ্ঞাপনের বাজারকে যেমন সুরক্ষা দিতে হবে, তেমনি চ্যানেলগুলোর আয় কেবল বিজ্ঞাপন নির্ভর না রেখে আয়ে বৈচিত্র্য আনতে হবে। এর জন্য যে উদ্যোগগুলো নেয়া দরকার:

১. পে-চ্যানেল: ফ্রি চ্যানেলের ধারণা থেকে বেরুতে হবে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পে-চ্যানেল ফর্মুলা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দেশে টেলিভিশন খাত ছাড়া আর একটি খাতও কেউ দেখাতে পারবেন না যেখানে উৎপাদক উৎপাদন করছে, ভোক্তা টাকার বিনিময়ে ভোগ করছেন কিন্তু উৎপাদক কানাকড়িও পাচ্ছে না। ২ কোটি গ্রাহক হিসেবে মাসে প্রায় ৬’শ থেকে ৮’শ কোটি টাকা ক্যাবল অপারেটররা গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করছেন। এর একটি টাকাও দেশের কোনো টিভি চ্যানেল পায় না। চ্যানেলগুলোকে এভাবে অপেশাদারিত্ব, অযৌক্তিক এবং অনৈতিকভাবে দিনের পর দিন বঞ্চিত করা থামাতে হবে।

২. বিতরণ ডিজিটাইজ করণ: এগার বছর আগে নবম সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপান্তরের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজও করছে। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশে টিভি চ্যানেলের ডিস্ট্রিবিউশন হচ্ছে ‘এনালগ’ পদ্ধতিতে। দর্শকদের উন্নত মানের ও উচ্চ রেজ্যুলেশনের ঝকঝকে স্ক্রিন উপহার দেবার জন্য কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দেশের অধিকাংশ চ্যানেল নিজেদের ‘হাই ডেফিনেশন’ অর্থাৎ এইচ.ডি-তে রূপান্তর করেছে। কিন্তু এনালগ পদ্ধতিতে চ্যানেল ডিস্ট্রিবিউশনের ফলে দর্শকরা এইচ.ডি’র পুরো সুবিধা পাচ্ছে না। অন্যদিকে এনালগ পদ্ধতিতে ডিস্ট্রিবিউশনের ফলে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। ডিজিটাইজ করা হলে দেশের সব ক্যাবল নেটওয়ার্ক সংযোগ গণনায় আনা সম্ভব হবে, নিশ্চিত হবে রাজস্ব, বন্ধ হবে খেয়ালখুশি মতো বিদেশি চ্যানেল ডাউন-লিংকের প্রবণতা। ডিস্ট্রিবিউশন ডিজিটাইজ করার ব্যাপারে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে। সেই নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে। প্রতিবেশী ভারতের মতো এতো বড় একটি দেশ শতভাগ ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন নিশ্চিত করতে পেরেছে নীতিমালা ও আইনগত বাধ্যবাধকতা কার্যকর করার মধ্য দিয়ে। সেখানে নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে নির্ধারিত সংখ্যক চ্যানেলের বান্ডেল বা প্যাকেজ কিনতে হয়। পরিসংখ্যান বলছে, পে-চ্যানেল ও ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের পর ভারতে টেলিভিশনের দর্শক বেড়েছে।

৩. বিজ্ঞাপন নীতিমালা: অনুষ্ঠানের মাঝখানে কতক্ষণ বিজ্ঞাপন চলবে, বিজ্ঞাপনের রেট কী হবে ইত্যাদি বিষয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হবে। এ ব্যাপারে টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো’কে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

৪. সাবস্ক্রিপশন ফি: বিদেশি চ্যানেলকে সাবস্ক্রিপশন ফি বাবদ একটি মোটা অংকের টাকা দেয়া হচ্ছে, শুধু বঞ্চিত করা হচ্ছে দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোকে। একটি নীতিমালার আওতায় এই বৈষম্য দূর করতে হবে।

* বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ: বিদেশি চ্যানেল সম্প্রচার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা করতে হবে দেশের অর্থনীতি এবং নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধকে রক্ষা করার জন্য। নেপাল, সিঙ্গাপুরের মতো বহু দেশ আছে, যারা নিজেদের সংস্কৃতিকে সুরক্ষা দেবার জন্য ভিনদেশি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। অথচ আমরা আমাদের সংস্কৃতির ব্যাপারে এতোটাই উদাসীন যে, আকাশকে অযৌক্তিকভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছি, নিজেদের সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছি। ভারতের গুজরাটে অন্য কোনো প্রদেশের সিনেমা চালাতে হলে ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হয়। এটা তারা করছে আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে সুরক্ষা দেবার জন্য। আর আমরা ভিন্ন দেশ হয়েও অবারিত সুযোগ করে দিচ্ছি।

৫. দেশীয় চ্যানেলে বিদেশি কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ: সীমাবদ্ধতার একটি বাস্তবতায় বিটিভিতে বিদেশি সিরিয়াল এবং সিনেমা দেখানো শুরু হয়েছিল। সেই রেফারেন্স টেনে এখন বেসরকারি বিভিন্ন চ্যানেল তাদের সম্প্রচার সময়ের একটি বড় অংশই বিদেশি কনটেন্ট দেখাচ্ছে। এতে দেশীয় টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরা কাজ হারাচ্ছেন, বন্ধ হচ্ছে প্রোডাকশন হাউজ। দেশের টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীদের সুরক্ষায় দেশীয় টিভি চ্যানেলে বিদেশি কনটেন্ট সম্প্রচারে একটি দূরদর্শী এবং স্থানীয় শিল্পীবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

৬. অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য ও মান বৃদ্ধি: অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে হবে, চ্যানেলগুলোকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে হবে তাদের উপস্থাপনা রীতিতে। গৎবাঁধা প্রেমের গল্প থেকে বেরিয়ে নাটকের নির্মাণ শৈলীতে ভিন্নতা আনতে হবে। সময়কে ধারণ করে সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, মানবিক, মনস্তাত্ত্বিক ইস্যুগুলোকে গল্পে তুলে আনতে হবে। পরিবর্তিত বাস্তবতায় দর্শকদের চাহিদা, আগ্রহ ও রুচিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দর্শকের রুচি তৈরিতেও টিভি চ্যানেলগুলোর ভূমিকা রয়েছে।

৭. আইনের প্রয়োগ: দেশে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনের তোয়াক্কা না করে যারা বিজ্ঞাপন কিংবা বিজ্ঞাপনের নামে বিদেশে টাকা পাচার করছে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

৮. প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা: দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপক বন্দোবস্ত করতে হবে। সাংবাদিক, উপস্থাপক, চিত্রনাট্যকার, গল্পকার, প্রযোজক, পরিচালক, ভিডিও এডিটর, ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যানসহ দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি করতে হবে। তা না হলে এই খাতে মেধাশূন্যতা দেখা দেবে। ইতোমধ্যে সে আলামতও স্পষ্ট।

৯. কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে: তথ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং এনবিআরকে জরুরি ভিত্তিতে দেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে রক্ষায় একটি সম্মিলিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে বিদেশি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচার এবং এসব চ্যানেলের কনটেন্টের ব্যাপারে একটি শক্ত অবস্থান নিতে হবে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে বিজ্ঞাপন প্রচার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও আইনের আওতায় আনতে হবে।

১০. গবেষণা: সর্বোপরি, দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর বর্তমান প্রকৃত অবস্থা, প্রকৃত সংকট সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাবার জন্য এবং চ্যানেলগুলোর মানোন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, সে সম্পর্কে গভীর গবেষণা করতে হবে। এজন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনতিবিলম্বে একটি গবেষণা সেল গঠন করতে হবে। সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে, গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করে পদক্ষেপ নিতে হবে।

শেষ কথা:

দেশে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের যে ব্যাপক অবক্ষয় ঘটেছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অস্বীকার করলে বরং সংকট আরো গভীর হবে। সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষকরা মনে করছেন এই অবক্ষয়ের পেছনে বিদেশি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হবে। এখন সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে, আমরা আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোকে ভিনদেশি টিভি চ্যানেল আর ডিজিটাল প্লাটফর্মের আগ্রাসনের মুখে ছেড়ে দিয়ে তামাশা দেখবো নাকি নিজেদের সভ্যতা, সমাজ, শিল্প-সংস্কৃতি ও অর্থনীতির স্বতন্ত্র বিকাশের স্বার্থে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে সুরক্ষা দেয়ার পদক্ষেপ নেবো। আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে, সঠিক পথে বিকাশের সুযোগ করে দিতে না পারলে, দর্শকদের দেশীয় টিভি চ্যানেলের প্রতি আকৃষ্ট করতে না পারলে; দেশের শিল্প-সংস্কৃতি-কৃষ্টি যেমন পথ হারাবে, তেমনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে এ খাতের উপর প্রত্যক্ষ নির্ভরশীল ১৪-১৫ হাজার কর্মী, জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল কয়েক লাখ মানুষ।

লেখক: আরটিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

সি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সড়কের আনন্দ, বেদনা ও আতঙ্ক
আমি নিজেকে যে কয়েকটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করতে পারি তার একটি হচ্ছে- ‘বাংলাদেশের সড়ক পথের নিরলস যাত্রী’। শুধু যে মুখের কথায় দাবি করছি তা নয় আমি তার প্রমাণও দিতে পারব। যে দুমড়ানো মোচড়ানো মাইক্রোবাসটিতে আমি সারা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছি (এবং আলাদাভাবে ঢাকা সিলেট কিংবা সিলেট ঢাকা করেছি)- তার কারণে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়েছে সেটি যদি শুধু একদিকে করা হতো তাহলে এর মাঝে পুরো পৃথিবীটাকে কমপক্ষে ছয়বার পাক খেয়ে আসতাম! কাজেই সড়ক পথে চলাচলের যে সব আনন্দ, বেদনা কিংবা আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হওয়া সম্ভব আমার সব হয়েছে। যখন মেঘনা ব্রিজ তৈরি হয়নি তখন ফেরি পার হওয়ার জন্য অনেক রাত রাস্তায় কাটিয়েছি। জামায়াত-শিবিরের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ঘরের বাতি না জ্বালিয়ে অন্ধকারে প্রস্তুতি নিয়ে গভীর রাতে ঢাকা রওনা দিয়েছি। ছাত্রলীগের ছেলেদের মাস্তানি করার অপরাধে শাস্তি দেওয়ার কারণে, তারা আমাদের রাস্তায় খুঁজে বেড়াচ্ছে তার অভিজ্ঞতাও আছে। দিন-দুপুরে পেছন থেকে বাস ধাক্কা দিয়েছে, কুয়াশায় সামনে থেকে কিংবা পাশ দিয়ে চলতে থাকা ট্রাকের টায়ার ফেটে তার শক্তিশালী ঝাপটায় পাশ থেকে গাড়ির দরজা জানালা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। গণিত অলিম্পিয়াডে যাওয়ার সময় গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে সবাই কমবেশি আহত, একজন সহকর্মী গুরুতর, তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চলন্ত গাড়িগুলো থামানোর চেষ্টা করছি কেউ থামতে রাজি নয়! শেষ পর্যন্ত একটা ট্রাক আমাদের হাসপাতালে নিয়েছে। হঠাৎ করে বাস ধর্মঘট, স্কুল ছুটির পর ছোট ছোট মেয়েরা বাসায় ফিরে যেতে পারছে না। আমি আর আমার স্ত্রী মিলে আমাদের মাইক্রোবাসে তাদের গাদাগাদি করে তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছি। (নামানোর সময় তাদের বিশাল লেকচার, খবরদার, যত কষ্টই হোক ভুলেও কখনো অপরিচিত মানুষের গাড়িতে উঠবে না!) রাস্তার পাশে ক্ষেতের মাঝে চার চাকা উপরে তুলে পড়ে থাকা বাস কিংবা ট্রাক খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য, তবে বিষয়টা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয় যখন দেখি সদ্য অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার পর রাস্তার পাশে মৃতদেহগুলো সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আন্দোলনের কারণে রাস্তা বন্ধ একসময় প্রায় নিয়মিত ঘটনা ছিল, তখন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে শিখেছি। কখনো কখনো আন্দোলন উত্তপ্ত হয়ে উঠে, গাড়ি ভাংচুর শুরু হয় তখন গাড়ি ঘুরিয়ে পেছন দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যেতে হয়। এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশের সড়ক পথে চলাচল করার সব রকম অভিজ্ঞতা আমার আছে। কাজেই আমি একজন খাঁটি বিশেষজ্ঞ, এ ব্যাপারে আমি দায়িত্ব নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখি। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের সড়ক পথের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? আমি এক কথায় সেটা বলে দিতে পারব সেটা হচ্ছে বেপরোয়া ড্রাইভিং। এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কিংবা বড় বড় কর্মকর্তারা কোনোদিন সেটা সম্পর্কে বলতে পারবেন না। কারণ তাদের কখনো সেটা দেখতে হয় না। বেপরোয়া ড্রাইভিং যে কী পরিমাণ বেপরোয়া সেটি শুধু আমাদের মতো সড়ক পথের সাধারণ যাত্রীরা জানেন। ২. বেশ কিছুদিন আগের কথা, আমি বাসে করে ঢাকা যাচ্ছি। আমার সিট ঠিক ড্রাইভারের পেছনে। ড্রাইভার কিভাবে গাড়ি চালাচ্ছে সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি। বিশাল একটা বাস সরু একটা রাস্তায় গুলির মতো ছুটে যাচ্ছে। অনেক বড় এবং দামি বাস। শুনেছি ড্রাইভারদের এই বাস চালানোর জন্য বিদেশ থেকে ট্রেনিং দিয়ে আনা হয়েছে। আরো শুনেছি এই বাস ড্রাইভারের বেতন আমাদের বেতন থেকেও বেশি। এটা অবশ্য যাচাই করে দেখার কোনও সুযোগ পাইনি! এরকম দামি বাস ঠিকভাবে চালালে বাসটি আসলেই চলছে নাকি দাঁড়িয়ে আছে সেটাও বোঝার কথা নয়- দেশের বাইরে বাসে চড়ায়, অভিজ্ঞতা থেকে আমি সেটা জানি। কিন্তু এই বাসটি এমনভাবে চলছে যে আমরা যাত্রীরা বাসের ভেতর একবার ডানদিকে একবার বামদিকে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছি। আমি বিস্ফোরিত চোখে সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ দেখলাম আমাদের বাসটি অন্য কোনো একটি বাস, ট্রাক কিংবা গাড়িকে ওভারটেক করার জন্য রাস্তার ডান পাশে চলে এসেছে। এটি নূতন কিছু নয়, সবসময় এটি হয়। সব বাস ট্রাক গাড়ি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের লেন থেকে অন্যের লেনে চলে আসে। আমি হঠাৎ দেখলাম সামনে একটি রিকশা। মহাসড়কে সম্ভবত রিকশা থাকার কথা নয় কিন্তু দেশে কে আর এই নিয়ম মানে? একটা রিকশা আর কতটুকু জায়গা নেয়? সহজেই তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আমি হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমাদের বাসের ড্রাইভার অবিশ্বাস্য নৃশংসতায় সোজাসুজি সেই রিকশাটিকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করল! আমি আতঙ্কে চিৎকার করে চোখ বন্ধ করলাম এবং যখন চোখ খুলেছি তখন টের পেয়েছি একেবারে শেষ মুহূর্তে রিকশাটি রাস্তা থেকে নিচে সরে গিয়ে তার প্রাণ রক্ষা করেছে। আমার কিছুক্ষণ লাগল ধাতস্থ হতে, যখন ধাতস্ত হয়েছি তখন ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা আপনি কী করেছেন? রিকশাটিকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন?” ড্রাইভার আমার দিকে তাকালো কোনো কথা বলল না, তারপর তার হেল্পারকে বলল আমার সামনের পর্দাটা টেনে দিতে। আমি যেন তার ড্রাইভিং আর দেখতে না পারি। আমি অসংখ্যবার সড়ক পথে যাতায়াত করার সময় উল্টো দিক দিয়ে দৈত্যের মতো একটি বাসকে একসাথে একাধিক ওভারটেক করার কারণে পুরো রাস্তা দখল করে ছুটে আসতে দেখেছি। আমার নিজের ড্রাইভার কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে অনেক আগেই সেই দৈত্যাকার বাসকে যেতে দেওয়ার জন্য রাস্তার পাশে নেমে গেছে। এই ব্যাপারগুলো আমি জানি, তবে আমার ধারণা ছিল ড্রাইভাররা ভয় দেখিয়ে নিজের জন্য রাস্তা খালি করে নেয়। তবে নিজের চোখে দেখে আমি আবিষ্কার করলাম আসলে বিষয়টা তার থেকে অনেক ভয়ানক। এই দৈত্যাকার বাসের ড্রাইভাররা আক্ষরিকভাবে ছোট গাড়ি, স্কুটার কিংবা রিকশাকে পিষে ফেলার চেষ্টা করে। তাদের প্রাণের জন্য কোনো মায়া নেই, ড্রাইভিং করার পদ্ধতি হিসেবে তারা অন্যদের পিষে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা প্রাণে বাঁচতে চায় সেটা তাদের মাথাব্যথা, বাস ড্রাইভারদের নয়। সারা পৃথিবীর আর কোথাও এরকম ভয়ংকর মনোভাবের ড্রাইভার আছে কি না আমি জানি না। ড্রাইভিং এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে নূতন আইন হয়েছে এবং সেটা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা সম্পর্কে পড়তে এবং জানতে আমি আগ্রহ পাচ্ছি না। যে দেশে ড্রাইভাররা মনে করে যেহেতু আমার গাড়ি সাইজে বড়, দাম বেশি, তাই রাস্তায় আমার অধিকার বেশি, আমি মানুষজনকে পিষে মেরে ফেলার চেষ্টা করব, যার বেঁচে থাকার ইচ্ছা যে যেভাবে পারে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুক। সেই দেশে ড্রাইভিং সংক্রান্ত আইন কানুন নিয়ে আলাপ আলোচনার কোনো অর্থ আছে কিনা, আমি জানি না। প্রথমে সবাইকে বিশ্বাস করতে হবে মানুষের প্রাণ সবচাইতে মূল্যবান, কোনোভাবে কখনো কারো প্রাণের ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সেজন্য আমার যত অসুবিধা হোক সেই অসুবিধা আমাকে মেনে নিতে হবে। যে দেশে প্রাণের মূল্য নেই সেই দেশের আইনের কী মূল্য আছে? ৩. বেশ কয়েক বছর আগে আমি অফিসে বসে আছি হঠাৎ আমার এককালীন ছাত্র এবং বর্তমান সহকর্মীর কাছ থেকে ফোন এসেছে। ফোনটি ধরতেই তার গলায় হাহাকারের মতো আর্তনাদ শুনতে পেলাম। এইমাত্র তার বাস আরেকটা বাসের সাথে মুখোমুখি অ্যাকসিডেন্ট করেছে, তার চারপাশে মৃতদেহ এবং মৃতদেহ (যতদূর মনে আছে সব মিলিয়ে ষোলোজন মারা গিয়েছিল)। নিজের দেশটাকে নিয়ে যতই হা-হুতাশ করি না কেন, আমাদের এই সাদামাটা দেশটার জন্য গভীর একটা ভালোবাসা আছে, কারণ এই দেশে ভয়ংকর বিপদের সময় খুবই সাধারণ মানুষ সাহায্য করার জন্য ছুটে আসে। এবারেও তাই হয়েছে। একজন রিকশাওয়ালা জানালা দিয়ে ঢুকে আমার আহত তরুণ সহকর্মীকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে। ফিরে এসে আরেকজনকে, তারপর আরেকজনকে, এভাবে যতজনকে সম্ভব সে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। আমার তরুণ সহকর্মীকে সেখান থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিল। আমার সহকর্মী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর আমি তাকে বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে রাজি করিয়েছিলাম। এই দুর্ঘটনাগুলো আসলে মোটেও দুর্ঘটনা নয়- এগুলো হচ্ছে বাস কোম্পানির অবহেলা এবং ড্রাইভারদের বেপরোয়া ড্রাইভিং। আমি ভেবেছিলাম যদি কোনো দিন কোনোভাবে একটা বাস কোম্পানিকে অভিযুক্ত করিয়ে তাদের কাছে থেকে অনেক বড় ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়, তাহলে দেশের সব বাস মালিকেরা সাবধান হয়ে যাবে। মানুষের প্রাণরক্ষার জন্য না হলেও শুধু গাঁটের পয়সা থেকে বড় জরিমানা দেওয়ার ভয়ে তারা হয়তো একটু সাবধানে বাস চালাবে। দীর্ঘদিন মামলা চলেছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। একটা দুর্ঘটনার পর পর বিআরটিএ থেকে একটা রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিআরটিএ কখনোই বাস কোম্পানির বিপক্ষে কিছু লিখে না এবং তার কারণটি বুঝতে আমাদের রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হবে না। আমার বিশ্বাস দেশে যদি দুর্ঘটনার পর দোষী ড্রাইভার কিংবা বাস কোম্পানিগুলোকে আহত নিহতদের বড় ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা যায়, শুধু তাহলেই এই অশুভ চক্র একটুখানি সতর্ক হবে। মানুষের প্রাণকে একটুখানি মূল্য দেবে। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৯ পাস করার সাথে সাথে আমরা সারা দেশে একটি বিচিত্র নাটক অভিনয় হতে দেখলাম। সারা দেশে ঘোষিত এবং অঘোষিত বাস ট্রাক ধর্মঘট। দেশের সব মানুষ রাতারাতি পরিবহন শ্রমিকদের হাতে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে গেল। সারা পৃথিবীর কোথাও এরকম ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের দেশে এটি ঘটে এবং আমরা আজকাল মোটামুটি এতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি। আমরা মেনে নিয়েছি বাস মালিক এবং পরিবহন শ্রমিকেরা যখন খুশি যেভাবে খুশি আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দেবে, আমাদের সেটা মেনে নিতে হবে। অথচ এরকম হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশ ছোট্ট একটুখানি দেশ, এই দেশটি ট্রেন লাইন দিয়ে আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে ফেলা সম্ভব। আমি সড়ক পথে যাতায়াত সংক্রান্ত একজন ‘বিশেষজ্ঞ’, আমি জোর গলায় ঘোষণা দিতে পারি এই দেশে সড়কপথে যাতায়াত যেরকম একটি বিভীষিকা ট্রেন পথে যাতায়াত ঠিক সেরকম একটি আশীর্বাদ। আমাদের পাশের দেশ ভারতবর্ষেও অসাধারণ ট্রেন যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়েছে কিন্তু আমাদের দেশে সেটি গড়ে উঠেনি। কেন গড়ে উঠেনি কিংবা কেন গড়ে উঠছে না? এমন তো না যে এখন আমাদের দেশের টাকা পয়সার টানাটানি। আমরা তো প্রায় নিয়মিতভাবে নূতন নূতন মেগা, সুপার মেগা প্রকল্পের খবর পড়ছি। তাহলে কেন সারা দেশে নূতন নূতন রেল লাইন বসানো হচ্ছে না? কেন সেই লাইনগুলো দিয়ে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটার পর আরেকটা ট্রেন যাচ্ছে না? কেউ কী কখনো ঢাকা-সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম-সিলেট ট্রেনে গিয়েছে? সেই ট্রেনগুলোর কী ভয়াবহ অবস্থা কেউ কী জানেন? আমরা কী একটুখানি নিরাপদ ট্রেনের আশা করতে পারি না? তাহলে কেন এতো বছর পরেও দেশে আধুনিক একটা ট্রেনের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠল না? আমি এর দুটি ব্যাখ্যা শুনেছি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা তার সত্যতা নিয়ে কথা বলতে পারবেন। প্রথম ব্যাখ্যাটি এরকম: বাংলাদেশে পৃথিবীর যাবতীয় বাস, গাড়ি, ট্রাক যেন বিক্রি করা যায় সেজন্য এখানে রাস্তাঘাট তৈরি করার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টাকা পয়সা ঋণ দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ট্রেন যোগাযোগকে নিরুৎসাহিত করে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি এরকম: এই দেশে বাস মালিকেরা অসম্ভব ক্ষমতাশালী মানুষ, তাদের বাসের ব্যবসা যেন ঠিকভাবে চলে সেজন্য তারা কখনো এই দেশে ট্রেন যোগাযোগ গড়ে তুলতে দেবে না। যদি সত্যি সত্যি আমাদের দেশে ট্রেনের চমৎকার একটা নেটওয়ার্ক থাকতো আমরা সবাই যদি ট্রেনে যখন খুশি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারতাম, তাহলে কী এই দেশের বাস মালিক আর শ্রমিকরা এরকম হুট করে ধর্মঘট ডেকে পুরো দেশ অচল করে দিতে পারতো? সত্যি যদি কথায় কথায় ধর্মঘট ডেকে বসতো, আমরা কী তখন তাদের থোড়াই কেয়ার করতাম! কেন আমাদের নিজের দেশে অন্যদের জিম্মি হয়ে থাকতে হবে?   লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সড়কের আনন্দ, বেদনা ও আতঙ্ক
সড়কের আনন্দ, বেদনা ও আতঙ্ক
আমি নিজেকে যে কয়েকটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করতে পারি তার একটি হচ্ছে- ‘বাংলাদেশের সড়ক পথের নিরলস যাত্রী’। শুধু যে মুখের কথায় দাবি করছি তা নয় আমি তার প্রমাণও দিতে পারব। যে দুমড়ানো-মোচড়ানো মাইক্রোবাসটিতে আমি সারা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছি (এবং আলাদাভাবে ঢাকা-সিলেট কিংবা সিলেট-ঢাকা করেছি)- তার কারণে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়েছে সেটি যদি শুধু একদিকে করা হতো তাহলে এর মাঝে পুরো পৃথিবীটাকে কমপক্ষে ছয়বার পাক খেয়ে আসতাম! কাজেই সড়ক পথে চলাচলের যে সব আনন্দ, বেদনা কিংবা আতঙ্কের অভিজ্ঞতা হওয়া সম্ভব আমার সবগুলো হয়েছে। যখন মেঘনা ব্রিজ তৈরি হয়নি তখন ফেরি পার হওয়ার জন্য অনেক রাত রাস্তায় কাটিয়েছি। জামায়াত-শিবিরের চোখকে ফাঁকি দেয়ার জন্য ঘরের বাতি না জ্বালিয়ে অন্ধকারে প্রস্তুতি নিয়ে গভীর রাতে ঢাকা রওনা দিয়েছি। ছাত্রলীগের ছেলেদের মাস্তানি করার অপরাধে শাস্তি দেয়ার কারণে, তারা আমাদের রাস্তায় খুঁজে বেড়াচ্ছে তার অভিজ্ঞতাও আছে। দিন দুপুরে পেছন থেকে বাস ধাক্কা দিয়েছে, কুয়াশায় সামনে থেকে কিংবা পাশ দিয়ে চলতে থাকা ট্রাকের টায়ার ফেটে তার শক্তিশালী ঝাপটায় পাশ থেকে গাড়ির দরজা-জানালা দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। গণিত অলিম্পিয়াডে যাওয়ার সময় গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে সবাই কমবেশি আহত, একজন সহকর্মী গুরুতর, তাকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে চলন্ত গাড়িগুলো থামানোর চেষ্টা করছি কেউ থামতে রাজি নয়! শেষ পর্যন্ত একটা ট্রাক আমাদের হাসপাতালে নিয়েছে। হঠাৎ করে বাস ধর্মঘট, স্কুল ছুটির পর ছোট ছোট মেয়েরা বাসায় ফিরে যেতে পারছে না। আমি আর আমার স্ত্রী মিলে আমাদের মাইক্রোবাসে তাদের গাদাগাদি করে তুলে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছি। (নামানোর সময় তাদের বিশাল লেকচার, খরবদার, যত কষ্টই হোক ভুলেও কখনো অপরিচিত মানুষের গাড়িতে উঠবে না!) রাস্তার পাশে ক্ষেতের মাঝে চার চাকা উপরে তুলে পড়ে থাকা বাস কিংবা ট্রাক খুবই পরিচিত একটা দৃশ্য, তবে বিষয়টা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয় যখন দেখি সদ্য সদ্য অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার পর রাস্তার পাশে মৃতদেহগুলো সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আন্দোলনের কারণে রাস্তা বন্ধ একসময় প্রায় নিয়মিত ঘটনা ছিল, তখন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে শিখেছি। কখনো কখনো আন্দোলন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, গাড়ি ভাঙচুর শুরু হয় তখন গাড়ি ঘুরিয়ে পেছন দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যেতে হয়। এককথায় বলা যায়, বাংলাদেশের সড়ক পথে চলাচল করার সবরকম অভিজ্ঞতা আমার আছে। কাজেই আমি একজন খাঁটি বিশেষজ্ঞ, এ ব্যাপারে আমি দায়িত্ব নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখি। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের সড়ক পথের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? আমি এককথায় সেটা বলে দিতে পারব সেটা হচ্ছে বেপরোয়া ড্রাইভিং। এই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কিংবা বড় বড় কর্মকর্তারা কোনোদিন সেটা সম্পর্কে বলতে পারবেন না। কারণ তাদের কখনো সেটা দেখতে হয় না। বেপরোয়া ড্রাইভিং যে কী পরিমাণ বেপরোয়া সেটি শুধু আমাদের মতো সড়ক পথের সাধারণ যাত্রীরা জানে। ২. বেশ কিছুদিন আগের কথা, আমি বাসে করে ঢাকায় যাচ্ছি। আমার সিট ঠিক ড্রাইভারের পেছনে। ড্রাইভার কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছে সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি। বিশাল একটা বাস সরু একটা রাস্তায় গুলির মতো ছুটে যাচ্ছে। অনেক বড় এবং দামি বাস। শুনেছি ড্রাইভারদের এই বাস চালানোর জন্য বিদেশ থেকে ট্রেনিং দিয়ে আনা হয়েছে। আরও শুনেছি এই বাস ড্রাইভারের বেতন আমাদের বেতন থেকেও বেশি। এটা অবশ্য যাচাই করে দেখার কোনো সুযোগ পাইনি! এ রকম দামি বাস ঠিকভাবে চালালে বাসটি আসলেই চলছে নাকি দাঁড়িয়ে আছে সেটাও বোঝার কথা নয়- দেশের বাইরে বাস চড়ায়, অভিজ্ঞতা থেকে আমি সেটা জানি। কিন্তু এই বাসটি এমনভাবে চলছে যে আমরা যাত্রীরা বাসের ভেতর একবার ডানদিকে একবার বামদিকে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছি। আমি বিস্ফোরিত চোখে সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ দেখলাম আমাদের বাসটি অন্য কোনো একটি বাস, ট্রাক কিংবা গাড়িকে ওভারটেক করার জন্য রাস্তার ডানপাশে চলে এসেছে। এটি নতুন কিছু নয়, সবসময় এটি হয়। সব বাস-ট্রাক গাড়ি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিজের লেন থেকে অন্যের লেনে চলে আসে। আমি হঠাৎ দেখলাম সামনে একটি রিকশা। মহাসড়কে সম্ভবত রিকশা থাকার কথা নয়, কিন্তু দেশে কে আর এই নিয়ম মানে? একটা রিকশা আর কতটুকু জায়গা নেয়? সহজেই তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আমি হঠাৎ লক্ষ করলাম আমাদের বাসের ড্রাইভার অবিশ্বাস্য নৃশংসতায় সোজাসুজি সেই রিকশাটিকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করল! আমি আতঙ্কে চিৎকার করে চোখ বন্ধ করলাম এবং যখন চোখ খুলেছি তখন টের পেয়েছি একেবারে শেষ মুহূর্তে রিকশাটি রাস্তা থেকে নিচে সরে গিয়ে তার প্রাণরক্ষা করেছে। আমার কিছুক্ষণ লাগল ধাতস্থ হতে, যখন ধাতস্থ হয়েছি তখন ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, “এটা আপনি কী করেছেন? রিকশাটিকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন?” ড্রাইভার আমার দিকে তাকাল কোনো কথা বলল না, তারপর তার হেল্পারকে বলল আমার সামনের পর্দাটা টেনে দিতে। আমি যেন তার ড্রাইভিং আর দেখতে না পারি। আমি অসংখ্যবার সড়ক পথে যাতায়াত করার সময় উল্টোদিক দিয়ে দৈত্যের মতো একটি বাসকে একসাথে একাধিক ওভারটেক করার কারণে পুরো রাস্তা দখল করে ছুটে আসতে দেখেছি। আমার নিজের ড্রাইভার কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে অনেক আগেই সেই দৈত্যাকার বাসকে যেতে দেয়ার জন্য রাস্তার পাশে নেমে গেছে। এই ব্যাপারগুলো আমি জানি, তবে আমার ধারণা ছিল ড্রাইভাররা ভয় দেখিয়ে নিজের জন্য রাস্তা খালি করে নেয়। তবে নিজের চোখে দেখে আমি আবিষ্কার করলাম আসলে বিষয়টা তার থেকে অনেক ভয়ানক। এই দৈত্যাকার বাসের ড্রাইভাররা আক্ষরিকভাবে ছোট গাড়ি, স্কুটার কিংবা রিকশাকে পিষে ফেলার চেষ্টা করে। তাদের প্রাণের জন্য কোনো মায়া নেই, ড্রাইভিং করার পদ্ধতি হিসেবে তারা অন্যদের পিষে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা প্রাণে বাঁচতে চায় সেটা তাদের মাথাব্যথা, বাস ড্রাইভারদের নয়। সারা পৃথিবীর আর কোথাও এ রকম ভয়ংকর মনোভাবের ড্রাইভার আছে কিনা আমি জানি না। ড্রাইভিং এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে নতুন আইন হয়েছে এবং সেটা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা সম্পর্কে পড়তে এবং জানতে আমি আগ্রহ পাচ্ছি না। যে দেশে ড্রাইভাররা মনে করে যেহেতু আমার গাড়ি সাইজে বড়, দাম বেশি, তাই রাস্তায় আমার অধিকার বেশি, আমি মানুষজনকে পিষে মেরে ফেলার চেষ্টা করব, যার বেঁচে থাকার ইচ্ছা যে যেভাবে পারে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুক। সেই দেশে ড্রাইভিং সংক্রান্ত আইন-কানুন নিয়ে আলাপ-আলোচনার কোনো অর্থ আছে কিনা, আমি জানি না। প্রথমে সবাইকে বিশ্বাস করতে হবে মানুষের প্রাণ সবচাইতে মূল্যবান, কোনোভাবে কখনো কারও প্রাণের ঝুঁকি নেয়া যাবে না। সে জন্য আমার যত অসুবিধা হোক সেই অসুবিধা আমাকে মেনে নিতে হবে। যে দেশে প্রাণের মূল্য নেই সেই দেশের আইনের কী মূল্য আছে? ৩. বেশ কয়েক বছর আগে আমি অফিসে বসে আছি হঠাৎ আমার এককালীন ছাত্র এবং বর্তমান সহকর্মীর কাছ থেকে ফোন এসেছে। ফোনটি ধরতেই তার গলায় হাহাকারের মতো আর্তনাদ শুনতে পেলাম। এইমাত্র তার বাস আরেকটা বাসের সঙ্গে মুখোমুখি অ্যাকসিডেন্ট করেছে, তার চারপাশে মৃতদেহ এবং মৃতদেহ (যতদূর মনে আছে সব মিলিয়ে ১৬ জন মারা গিয়েছিল)। নিজের দেশটাকে নিয়ে যতই হা-হুতাশ করি না কেন, আমাদের এই সাদামাটা দেশটার জন্য গভীর একটা ভালোবাসা আছে, কারণ এই দেশে ভয়ংকর বিপদের সময় খুবই সাধারণ মানুষ সাহায্য করার জন্য ছুটে আসে। এবারও তাই হয়েছে। একজন রিকশাওয়ালা জানালা দিয়ে ঢুকে আমার আহত তরুণ সহকর্মীকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ফিরে এসে আরেকজনকে, তারপর আরেকজনকে, এভাবে যতজনকে সম্ভব সে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। আমার তরুণ সহকর্মীকে সেখান থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং সে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিল। আমার সহকর্মী সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর আমি তাকে বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করতে রাজি করিয়েছিলাম। এই দুর্ঘটনাগুলো আসলে মোটেও দুর্ঘটনা নয়- এগুলো হচ্ছে বাস কোম্পানির অবহেলা এবং ড্রাইভারদের বেপরোয়া ড্রাইভিং। আমি ভেবেছিলাম যদি কোনোদিন কোনোভাবে একটা বাস কোম্পানিকে অভিযুক্ত করিয়ে তাদের কাছে থেকে অনেক বড় ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়, তাহলে দেশের সব বাস মালিক সাবধান হয়ে যাবে। মানুষের প্রাণরক্ষার জন্য না হলেও শুধুমাত্র গাঁটের পয়সা থেকে বড় জরিমানা দেয়ার ভয়ে তারা হয়তো একটু সাবধানে বাস চালাবে। দীর্ঘদিন মামলা চলেছে কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। একটা দুর্ঘটনার পরপর বিআরটিএ থেকে একটা রিপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়। এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিআরটিএ কখনোই বাস কোম্পানির বিপক্ষে কিছু লেখে না এবং তার কারণটি বুঝতে আমাদের রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হবে না। আমার বিশ্বাস দেশে যদি দুর্ঘটনার পর দোষী ড্রাইভার কিংবা বাস কোম্পানিগুলোকে আহত-নিহতদের বড় ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা যায়, শুধুমাত্র তাহলেই এই অশুভচক্র একটুখানি সতর্ক হবে। মানুষের প্রাণকে একটুখানি মূল্য দেবে। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৯, পাস করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সারাদেশে একটি বিচিত্র নাটক অভিনয় হতে দেখলাম। সারাদেশে ঘোষিত এবং অঘোষিত বাস-ট্রাক ধর্মঘট। দেশের সব মানুষ রাতারাতি পরিবহন শ্রমিকদের হাতে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে গেল। সারা পৃথিবীর কোথাও এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে বলে আমার মনে হয় না। আমাদের দেশে এটি ঘটে এবং আমরা আজকাল মোটামুটি এতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি। আমরা মেনে নিয়েছি বাস মালিক এবং পরিবহন শ্রমিকরা যখন খুশি যেভাবে খুশি আমাদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দেবে, আমাদের সেটা মেনে নিতে হবে। অথচ এ রকম হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশ ছোট্ট একটুখানি দেশ, এই দেশটি ট্রেনলাইন দিয়ে আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে ফেলা সম্ভব। আমি সড়ক পথে যাতায়াত সংক্রান্ত একজন ‘বিশেষজ্ঞ’, আমি জোরগলায় ঘোষণা দিতে পারি এই দেশে সড়কপথে যাতায়াত যে রকম একটি বিভীষিকা ট্রেনপথে যাতায়াত ঠিক সে রকম একটি আশীর্বাদ। আমাদের পাশের দেশ ভারতবর্ষেও অসাধারণ ট্রেন যোগাযোগ গড়ে তোলা হয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে সেটি গড়ে ওঠেনি। কেন গড়ে ওঠেনি কিংবা কেন গড়ে উঠছে না? এমন তো না যে এখন আমাদের দেশের টাকা-পয়সার টানাটানি। আমরা তো প্রায় নিয়মিতভাবে নতুন নতুন মেগা, সুপার মেগা প্রকল্পের খবর পড়ছি। তাহলে কেন সারাদেশে নতুন নতুন রেললাইন বসানো হচ্ছে না? কেন সেই লাইনগুলো দিয়ে প্রতি পাঁচ মিনিটে একটার পর আরেকটা ট্রেন যাচ্ছে না? কেউ কি কখনো ঢাকা-সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম-সিলেট ট্রেনে গেছে? সেই ট্রেনগুলোর কী ভয়াবহ অবস্থা কেউ কি জানে? আমরা কি একটুখানি নিরাপদ ট্রেনের আশা করতে পারি না? তাহলে কেন এত বছর পরও দেশে আধুনিক একটা ট্রেনের নেটওয়ার্ক গড়ে উঠল না? আমি এর দুটি ব্যাখ্যা শুনেছি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানুষরা তার সত্যতা নিয়ে কথা বলতে পারবেন। প্রথম ব্যাখ্যাটি এ রকম: বাংলাদেশে পৃথিবীর যাবতীয় বাস, গাড়ি, ট্রাক যেন বিক্রি করা যায় সে জন্য এখানে রাস্তাঘাট তৈরি করার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টাকা-পয়সা ঋণ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ট্রেন যোগাযোগকে নিরুৎসাহিত করে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি এ রকম: এই দেশে বাস মালিকরা অসম্ভব ক্ষমতাশালী মানুষ, তাদের বাসের ব্যবসা যেন ঠিকভাবে চলে সে জন্য তারা কখনো এই দেশে ট্রেন যোগাযোগ গড়ে তুলতে দেবে না। যদি সত্যি সত্যি আমাদের দেশে ট্রেনের চমৎকার একটা নেটওয়ার্ক থাকত আমরা সবাই যদি ট্রেনে যখন খুশি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারতাম, তাহলে কি এই দেশের বাস মালিক আর শ্রমিকরা এ রকম হুট করে ধর্মঘট ডেকে পুরো দেশ অচল করে দিতে পারত? সত্যি যদি কথায় কথায় ধর্মঘট ডেকে বসত, আমরা কি তখন তাদের থোড়াই কেয়ার করতাম! কেন আমাদের নিজের দেশে অন্যদের জিম্মি হয়ে থাকতে হবে? লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সড়কের আনন্দ, বেদনা ও আতঙ্ক
ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস
কিছুদিন আগে আমাদের ক্রিকেট টিম যখন দিল্লিতে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল তখন হঠাৎ করে দিল্লির ভয়ংকর বায়ু দূষণের খবর আসতে শুরু করল। ছবিতে দেখতে শুরু করলাম দিল্লির ঝাপসা ছবি। দূষণের মাত্রা এতোই ভয়ঙ্কর যে এর ভেতর দিয়ে সামনে দেখা যায় না। ৩০টির মতো বিমানের ফ্লাইট রানওয়ে স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে অন্য এয়ারপোর্টে গিয়ে অবতরণ করতে বাধ্য হলো। বায়ু দূষণ সংক্রান্ত রোগ বালাই এতোই বেড়ে গেল যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলতে শুরু করলেন, দিল্লি এখন একটা গ্যাস চেম্বার। (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানি ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে হত্যা করা হতো।) দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বললেন যে শহরটিতে বায়ু দূষণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে, শহরে লক্ষ লক্ষ মাস্ক বিতরণ করা হলো, স্কুলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলো। হাইকোর্ট জানতে চাইল কেমন করে শহরটিতে এরকম বায়ু দূষণ হতে পারে? নিজের দেশে বসে তখন আমাদের ক্রিকেট টিমের জন্য মায়া হতে শুরু করল। ভাবতে লাগলাম আমাদের এই ক্রিকেট টিম খেলতে গিয়ে কী রকম বিপদের মাঝে পড়ল, এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে থেকে তাদের কী না কী হয়ে যায়! কখন তারা এই অভিশপ্ত শহর থেকে মুক্তি পাবে, নিঃশ্বাস নেবার যোগ্য একটি শহরের খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে? ঠিক তখন হঠাৎ করে খবরের কাগজে পৃথিবীর রাজধানী শহরগুলোর বায়ু দূষণের মাত্রা নিয়ে একটা প্রতিবেদন আমার চোখে পড়ল। পিএম ২.৫ নামে বাতাসের দূষিত ভাসমান কণার পরিমাণ দিয়ে বায়ু দূষণের পরিমাণ বের করা হয়। সেই মাত্রার পরিমাণে প্রথম স্থান দখল করেছে দিল্লি (প্রতি কিউবিক মিটারে ১১৪ মাইক্রোগ্রাম) এবং তার খুবই কাছাকাছি হচ্ছে আমাদের ঢাকা (৯৭ মাইক্রোগ্রাম)। এর পরের শহরটি (কাবুল) ঢাকা থেকে দূষণের মাত্রায় ৩০ মাইক্রোগ্রাম কম এবং অন্যান্য দূষিত রাজধানী শহর সবই এর কাছাকাছি। Dhaka is the second most air polluted city in the world নামে গ্রিনপিস এবং এয়ার ভিজুয়ালের এই প্রতিবেদনটি এখনো ডেইলি স্টারের অনলাইন সংস্করণে খুঁজে পাওয়া যাবে। দিল্লি ও ঢাকার দূষণের মাত্রা গ্রাফে যখন দেখানো হয়েছে, তখন বুকের মাঝে ধক করে একটা ধাক্কা লাগে কারণ পৃথিবীর দূষিত রাজধানী শহরগুলোর বায়ু দূষণের মাত্রা খুবই কাছাকাছি। শুধু দুটি দেশ একেবারে আলাদা, বায়ু দূষণের তালিকায় অন্য দেশগুলোর প্রায় দ্বিগুণ, সেই ভয়ঙ্কর বায়ু দূষণের শহর দুটি হচ্ছে দিল্লি ও ঢাকা। আমি হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম, আমি আমাদের ক্রিকেট টিমের জন্য যে আশঙ্কা অনুভব করছিলাম, আমার নিজের জন্যও সেই আশঙ্কা অনুভব করার কথা। শুধু আমার নিজের জন্য নয় ঢাকা শহরের প্রায় দেড় কোটি (মতান্তরে দুই কোটি) মানুষও আসলে এক অবিশ্বাস্য বিষাক্ত গ্যাসের মাঝে বসবাস করছে। প্রতিবেদনটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লে হঠাৎ করে হতাশা অনুভব করতে হয়, কারণ জনসংখ্যা দিয়ে এই বায়ু দূষণ বিবেচনা করলে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত গ্যাসের দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের দেশ সম্পর্কে যেকোনো নেতিবাচক তথ্য বের হলেই সাথে সাথে আমাদের দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা সেই তথ্যের ফাঁক-ফোকর খুঁজে বের করে ফেলতে শুরু করেন। সেই হিসেবে আমি প্রায় নিশ্চিতভাবে বলতে পারি বায়ু দূষণের এই মন খারাপ করা তথ্যটিকেও নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে বলা হবে এটি অপপ্রচার, অবৈজ্ঞানিক এবং অবশ্যই অতিরঞ্জিত। শুধু তাই নয়, নেটে ঘাঁটাঘাঁটি করলে অনেক রকম তথ্য পাওয়া যায়, সব যে একরকম তাও নয়। তবে ভালো তথ্য কোথাও নেই। কাজেই আমি কারো সাথেই এই ব্যাপার নিয়ে তর্ক করতে যাব না কিন্তু আমি নিজের চোখে কী দেখছি সেটা তো বলতে পারি। সামনে ডিসেম্বর মাস আসছে, আমাদের দেশের সেমিনার কনফারেন্সের মাস। তখন বিদেশ থেকে অনেকেই দেশে আসেন। অনেকের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হয় পরিচয় হয়। তারা দামি হোটেলের নিরাপদ বাতাসে দিন কাটান তারপরও যদি খোলামেলাভাবে কথা বলতে দেয়া হয়, তারা অবধারিতভাবে মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন, এই দেশে এলে তাদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়! আমরা এই বিষাক্ত বাতাসে অভ্যস্ত হয়ে গেছি টের পাই না। যারা বাইরে থেকে আসেন তারা টের পান। আমরা যে একেবারে টের পাই না সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়, আমাদের পরিচিত অনেক শিশুর আজকাল নানা ধরনের এলার্জি, শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুখ, হাঁপানি যেগুলো নিশ্চিতভাবে বায়ু দূষণের কারণে হচ্ছে। আমরা সহজ করে বলি বায়ু দূষণের কারণে গড় আয়ু কমে যাচ্ছে। সত্যি কথাটি হচ্ছে অনেকেই ভয়ংকর রোগে ভুগে সময়ের আগে মারা যাচ্ছেন। ভয়ংকর রোগ মানেই ভয়ংকর চিকিৎসা খরচ। চোখের সামনে মধ্যবিত্ত পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। যারা অর্থনীতি জানেন তারা বিষয়টা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারবেন, এই বায়ু দূষণের কারণে কতভাবে আমাদের অর্থনীতির উপর চাপ পড়ছে। একসময় আমাদের আকাশের রঙ ছিল নীল। মাঝে মাঝে যখন বিদেশ যাই- যে দেশে বায়ু দূষণ নেই তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই, তাদের আকাশটা এখনো আশ্চর্য নীল। কিন্তু আমাদের আকাশ আর নীল নেই, এটি ধূসর! যদিও বা কখনো নীল আকাশ চোখে পড়ে সেই নীল বিবর্ণ। বাতাসের দূষিত কণা আমাদেরকে আর নীল আকাশ দেখতে দেয় না। শৈশবে যখন অমাবস্যার রাতে আকাশের দিকে তাকিয়েছি, সেখানে দেখেছি লক্ষ লক্ষ নক্ষত্র, আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছায়াপথ, আমাদের গ্যালাক্সি। তখনও সুযোগ পেলেই আমি আকাশের দিকে তাকাই সেখানে এক দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ছাড়া আর কিছু নেই। ছায়াপথকে খুঁজে পাই না, শেষবার কখন ছায়াপথকে দেখেছি মনে করতে পারি না। বাতাসের ভাসমান দূষিত কণা আমাদের প্রকৃতির আসল রূপটিকে ঢেকে ফেলেছে, দেখতে চাইলেও সেই প্রকৃতিকে খুঁজে পাওয়া যায় না।   ২. আমি বায়ু দূষণের বিশেষজ্ঞ নই। পত্র-পত্রিকার খবরাখবর পড়ে কিংবা ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে যেটুকু জেনেছি সেটুকুই আমার জ্ঞান। এর মাঝে কতটুকু খাঁটি এবং কতটুকু ভেজাল ঠিক করে পার্থক্য করতে পারি না। পত্রপত্রিকা পড়ে জেনেছি আমাদের দেশের, বিশেষ করে ঢাকা শহরের বায়ু দূষণের কারণগুলো হচ্ছে ইটের ভাটা, কল-কারখানা, নির্মাণ কাজ এবং যানবাহনের ধোঁয়া। আমরা যারাই ঢাকা থেকে বাইরে যাই কিংবা বাইরের শহর থেকে ঢাকায় আসি, তারাই এই আতঙ্ক জাগানিয়া ইটের ভাটাগুলো দেখেছি। একটি দুটি নয়, শত শত ইটের ভাটা। কোনো একটা ফসলের জমি দখল করে ইটের ভাটা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে শ্রমিকেরা কাচা ইট তৈরি করছে। অন্য পাশে ইট পোড়ানো হচ্ছে, বিশাল কুৎসিত চিমনি। সেই চিমনি দিয়ে কুচকুচে কালো ধোঁয়া গলগল করে বের হচ্ছে। এর কোনো বিরাম নেই। বাতাস সেই ধোঁয়াকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আমি নিশ্চিত আশেপাশে যে গ্রাম আছে সেখানকার মানুষের উপর আকাশ থেকে প্রতি মুহূর্তে কালো ধোঁয়ার কণার বৃষ্টি হচ্ছে। আমি হাইওয়ে ধরে যাই এবং বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলি। মনে মনে অপেক্ষা করি কখন বর্ষাকাল আসবে, কখন ঝমঝম বৃষ্টি হবে আর এই ভয়ংকর ইটের ভাটা তাদের কাজ বন্ধ রাখবে। মাঝে মাঝে খবরের কাগজে দেখি যে পরিবেশবান্ধব ইটের ভাটা তৈরি করার উপায় আছে। কখনো কখনো দেখি ইটের বদলে কিভাবে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহার করা যায়। পত্রপত্রিকায় আমাদের কাঁদুনি শুনে ইটের ভাটা রাতারাতি পরিবেশবান্ধব হয়ে যাবে না কিন্তু সরকার চাইলে সেটা হতে পারে। যে দেশে সারা পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণ হয় সেই দেশ কী তার আত্মমর্যাদার জন্য একটু চেষ্টা করবে না? কল কারখানা নিয়েও একই ব্যাপার। এক সময় দেশ রীতিমতো দরিদ্র ছিল, অর্থনীতি একটুখানি সচল করার জন্য যে যেখানে যেভাবে পেরেছে কল কারখানা বসিয়েছে সেই কলকারখানার কারণে পরিবেশের কী ক্ষতি হয়েছে সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামানোর চেষ্টা করেনি। কিন্তু এখন তো অন্য ব্যাপার, পরিবেশ রক্ষা করা বাধ্যতামূলক হতে হবে। কলকারখানার মাঝে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। আমাদের বায়ু দূষণের আরেকটা বড় কারণ হচ্ছে নির্মাণ কাজ। উন্নয়নের একটা পর্যায়ে মনে হয় পৃথিবীর সব দেশকেই এই যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। শুধু ঢাকা শহরেই যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি কিছু একটা তৈরি হচ্ছে। মেট্রোরেল একটা বিশাল কাজ রাস্তা ঘাট, বড় বড় বিল্ডিং সবকিছু মিলিয়ে পুরো ঢাকা শহরে এখন এক সুবিশাল দক্ষযজ্ঞ। মাটি কাটা হচ্ছে, কংক্রিট ঢাকাই হচ্ছে বড় বড় যন্ত্রপাতি নড়ছে, ঘট ঘট শব্দ করছে, ধুলা উড়ছে এবং আমরা সবাই ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছি। আশা করছি এক সময় এই নির্মাণ কাজ শেষ হবে, ঢাকা শহর তার আগের সৌন্দর্য ফিরে পাবে। বাতাস একটুখানি হলেও পরিষ্কার হবে। বায়ু দূষণের আরেকটা বড় কারণ হচ্ছে যানবাহন। গাড়ি টেম্পো বাস ট্রাক কিংবা মোটরবাইক। এটি শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়, এটি সারা পৃথিবীর সমস্যা। আমাদের আলাদা করে সমাধান করতে হবে না, পৃথিবীর অনেক দেশ সেই সমস্যার সমাধান করে রেখেছে আমাদের শুধু সেই সমাধানটি বেছে নিতে হবে। বড় শহরের যানবাহন সমস্যার সবচেয়ে সুন্দর সমাধান আমি দেখেছি ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এবং নেদারল্যান্ডস এর অ্যামস্টারডাম শহরে। এই দুটি শহরের যানবাহনের সমস্যার সমাধান একই রকম। সেটি হচ্ছে সাইকেল! এই শহরগুলোতে সবাই সাইকেলে যাওয়া আসা করে। শিশুটির জন্ম হওয়ার পর সে হাসপাতাল থেকে বাসায় আসে সাইকেলে, যখন বড় হতে থাকে তখন সাইকেলে যাতায়াত করে, বয়স নব্বই হোক, আর একশ হোক সে সাইকেল ছাড়া আর কিছুতে উঠে না। শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে মৃত্যুর পর তার মৃতদেহটি পর্যন্ত করবস্থানে নেয়া হয় সাইকেলে। যার দশটি গাড়ি কেনার ক্ষমতা আছে সেও সারা জীবনে গাড়ি কিনে না, সাইকেলে ঘুরে বেড়ায়! আমার ধারণা এটি এখন শুধু এই দুটি শহরের জন্য সত্যি নয়। সারা পৃথিবীতেই এই সাইকেল কালচার শুরু হয়ে যাচ্ছে, তাহলে আমাদের দেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? --------------------------------------------------------------- আরো পড়ুন: দূষণে দিল্লিকে টপকে গেলো কলকাতা --------------------------------------------------------------- ৩. যে সকল শহরে সাইকেল খুব চমৎকার সমাধান হতে পারে ঢাকা শহর হচ্ছে ঠিক সেরকম একটি শহর। তার একটা কারণ হচ্ছে শহরটি আসলে খুবই ছোট। দিনের বেলা গাড়ি নিয়ে বের হলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যায়। কিন্তু কেউ যদি একটু গভীর রাতে যখন গাড়ির ভিড় কমে যায় তখন বের হয় তাহলে দশ মিনিটের মাঝে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যেতে পারে। ঢাকা শহর সাইকেলের জন্য খুবই উপযোগী একটা শহর তার আরেকটা বড় কারণ হচ্ছে পুরো শহরটা সমতল, পৃথিবীর অনেক দেশের মতো উঁচুনিচু নয়। যেকোনো মানুষ একেবারে সাধারণ একটা সাইকেলে করে এই শহরে চক্কর দিতে পারবে। তিন নম্বর কারণ হচ্ছে ঢাকা শহরের জনবসতির বয়স, অনেক বড় একটা অংশ হচ্ছে কম বয়সী তরুণ ও তরুণী। তাদেরকে যদি সাইকেলে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়া হয়, তারা সাগ্রহে এবং সানন্দে সেই সুযোগটা লুফে নেবে। চার নম্বর কারণ হচ্ছে সাইকেলে যাতায়াত করলে শুধু যে বায়ু দূষণ কমবে তা নয়, ট্রাফিক জ্যামও কমবে। আমরা যখন গাড়িতে যাতায়াত করার সময় আশেপাশে তাকাই তখন দেখতে পাই একটা বিশাল গাড়িতে একজন মানুষ যাচ্ছে। মাত্র একজন মানুষ যদি তার গাড়িতে করে এতখানি দখল করে রাখে তাহলে ট্রাফিক জ্যাম না হয়ে উপায় কী? কিন্তু সেই মানুষটি যদি সাইকেলে যেতো তাহলে কত স্বল্প জায়গা নিয়ে চলাচল করতো কেউ চিন্তা করে দেখেছে কী? শুধু তাই নয় কমবয়সী ছেলে ও মেয়েরা, তরুণ ও তরুণীরা সাইকেলে করে স্কুলে যাচ্ছে, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে কিংবা কাজে যাচ্ছে এর থেকে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে? ঢাকা শহরের বিশাল এই সমস্যার খুব সহজ এই সমাধানটি আসলে একটি জায়গায় আটকে আছে। সেটি হচ্ছে ঢাকা শহরের মানুষ সাইকেল চালাবে কোথায়? কোপেনহেগেন এবং আমস্টারডামে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করে দেওয়া আছে, সবাই সেই লাইনে নিরাপদে সাইকেল চালায়। পিছন থেকে বিশাল একটা ট্রাক তার ঘাড়ের উপর চেপে বসবে সেটা নিয়ে কাউকে দুর্ভাবনা করতে হয় না। ঢাকা শহরেও যদি আমরা সাইকেল দিয়ে যানবাহনের একটা বড় সমাধান করে ফেলতে চাই তাহলে সাইকেলের জন্য আলাদা একটা লেন করে দিতে হবে। বড় বড় রাস্তার পাশে ছোট একটুখানি জায়গা আলাদা করে দেওয়া যেখানে সবাই নিরাপদে সাইকেল চালাতে পারবে। অন্যদের কথা জানি না, যদি আমাদের দেশে সত্যিই কখনো সাইকেলের লেন করে দেওয়া হয় তাহলে আমি সবার আগে সেখানে সাইকেলে করে নেমে যাব। আমি এই ধূসর আকাশ আর বিষাক্ত বাতাস থেকে মুক্তি চাই!   লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস
জান্নাতীর মুখের হাসি
বেশ কিছু দিন আগের কথা। একটি প্রতিষ্ঠান শিশুদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। আমি নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করি। কারণ, শিশুদের অনেক অনুষ্ঠানে এবং মাঝে মাঝে বাচ্চাদের স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাই। তবে এবার যে অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেটি অন্য যেকোনও অনুষ্ঠান থেকে ভিন্ন। কারণ, এই অনুষ্ঠানে এসেছে ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাসার ছোট ছোট গৃহকর্মীরা। ঠিক সময়ে উপস্থিত হয়ে দেখি হল বোঝাই ছোট ছোট শিশু। গৃহকর্মীদের যে এক ধরনের মলিন চেহারা বা পোশাক থাকে আজকে সেটি নেই, সবাই সেজেগুজে এসেছে। বিশেষ করে যারা স্টেজে গান গাইবে বা নাচবে তারা আলাদাভাবে সেজে এসেছে। আয়োজকরা গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর অনুমতি নিয়ে তাদের পুরো দিনের জন্য নিয়ে এসেছিল, সারা দিন নানাভাবে কাটিয়ে বিকেলে এখানে এসেছে। বাচ্চাগুলো প্রথমে নাচ-গান এ রকম নানা ধরনের অনুষ্ঠান করলো, তারপর একসময় আমাকে স্টেজে তুলে দেওয়া হলো তাদের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য। বড় মানুষদের অনুষ্ঠানে যখন আমাকে বক্তব্য রাখতে হয় তখন সবসময়ই কী বলবো কিংবা কিভাবে বলবো সেটা নিয়ে এক ধরনের সমস্যায় পড়ে যাই। ছোট বাচ্চাদের অনুষ্ঠানে আমার কখনোই সেই সমস্যা হয় না। আমি যেকোনও সময় তাদের সঙ্গে যেকোনও বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি। কিন্তু এই প্রথম আমি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে এই বাচ্চাগুলোকে কী বলবো ভেবে পেলাম না। স্কুলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমি লেখাপড়ার কথা বলতে পারি, এই বাচ্চাদের আমি সেটা বলতে পারবো না। তাদের কেউই স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পায়নি। ছোট ছেলেমেয়েদের আমি মাঠে-ঘাটে দৌড়াদৌড়ি করে খেলাধুলা করার কথা বলতে পারি, এই বাচ্চাদের আমি সেটা বলতে পারবো না। কারণ তারা বাসার কাজ করে, বাসন ধোয়, ঘর ঝাট দেয়, কখন তারা খেলাধুলা করবে? আমি সুযোগ পেলেই বাচ্চাদেরকে দেশের কথা বলি, তাদের মনে করিয়ে দিই আমাদের দেশটিতে তাদের জন্য কত সুযোগ অপেক্ষা করছে। এই বাচ্চাদের আমি কেমন করে দেশের কথা বলবো? দেশ কী সত্যিই তাদের কিছু দিয়েছে? সত্যিই কি কিছু দেবে? ছোট ছেলেমেয়েদের আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা করি। এই ছেলেমেয়েদের আমি কোন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাবো? আমি মাইক্রোফোন হাতে কিছুক্ষণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারা কী চমৎকার একটি অনুষ্ঠান করেছে এবং দেখে আমি কত মুগ্ধ হয়েছি এরকম অবান্তর কিছু বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করে দিয়ে বললাম, আমি তাদের জন্য একটা করে বই উপহার এনেছি, আমি বক্তৃতা না দিয়ে বরং তাদের সেই বইগুলো দিই। আয়োজকরা আপত্তি করলেন না এবং আমি তখন স্টেজে পা ঝুলিয়ে বসে গেলাম। আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রামের বারোটা বেজে গেলো এবং বাচ্চাগুলো আমাকে ভিড় করে ঘিরে দাঁড়ালো। কতজন বাচ্চা আসবে আমি জেনে নিয়েছিলাম এবং সবাইকে যেন একটা করে দেয়া যায় সেই সংখ্যক বই নিয়ে এসেছিলাম। বাচ্চাদের অনেকেই লেখাপড়া জানে না কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। তারা খুবই আগ্রহ নিয়ে নিজের উপহারটি নিলো। এর মাঝে হঠাৎ একটি শিশু বইটিতে আমার অটোগ্রাফ নিতে চাইলো। তখন তার দেখাদেখি সবাই তাদের বই নিয়ে এলো অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য। আমি বসে বসে অটোগ্রাফ দিতে দিতে তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। বেশ অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, এক-দুইজন বাসায় কাজ করার পাশাপাশি কাছাকাছি কোনও একটা স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। যার অর্থ বাসায় গৃহকর্মী হলেই তাকে সারা জীবন নির্যাতন সহ্য করে একটি অসহনীয় জীবন কাটাতে হবে সেটি সত্যি নয়, গৃহকর্তা কিংবা গৃহকর্ত্রী যদি স্নেহপ্রবণ হন তাহলে এই শিশুদের একটা সুন্দর জীবন উপহার দেওয়া যায়। আমার মাঝে মাঝেই এই ফুটফুটে শিশুদের কথা মনে পড়ে। এই আয়োজকদের আগ্রহে তারা তাদের দৈনন্দিন একঘেয়ে আনন্দহীন জীবনের মাঝখানে একটি দিনকে আলাদাভাবে উপভোগ করেছিল। তারা ছিল খুবই সৌভাগ্যবান গৃহকর্মী, গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রী তাদেরকে তাদের মতো করে একটি দিন কাটাতে দিয়েছিল, অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য নাচ-গানের রিহার্সাল করতে দিয়েছিল কিন্তু অন্য গৃহকর্মীরা কেমন থাকে? আমরা সাধারণত তাদের খোঁজ পাই না। জান্নাতীর মতো একজন শিশু যখন খবরের কাগজের সংবাদ হয়ে যায় তখন হঠাৎ করে কয়েক দিনের জন্য আমরা সচকিত হই। তারপর আবার ভুলে যাই। দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে পৃথিবী নিয়ে কত কী গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, এই বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় কোথায়? ২. সংবাদপত্রের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে শিশু গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এই দেশে জেএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রায় ২০ লাখ। অর্থাৎ এই দেশে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে, লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছে এবং  জেএসসি পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছে এরকম প্রতিটি শিশুর জন্য একজন করে শিশু আছে, যারা স্কুলে যাওয়ার বা লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি। জেএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর সাংবাদিকেরা যখন দেশের ভালো ভালো স্কুলে গিয়ে হাত উঁচু করে ভি-সাইন দেখানো আনন্দমুখর হাস্যোজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের ছবি দেখাবে, তখন আমাদের কল্পনা করে নিতে হবে প্রত্যেকটা হাসিমুখের পেছনে একটি করে মলিন মুখের শিশু আছে, যাকে আমরা কিছু দিতে পারিনি। তাদের অভাবী বাবা-মায়েরা এই শিশুকে পেটেভাতে কিংবা অতি সামান্য বেতনে অপরিচিত নির্বান্ধব আনন্দহীন পরিবেশে সপ্তাহে সাতদিন এবং প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে দিয়ে এসেছে। এক বা দুটি পরিবারের সজ্জন মানুষেরা হয়তো এই শিশুগুলোকে আদর করে নিজের সন্তানের মতো দেখেশুনে রাখেন কিন্তু বেশির ভাগ শিশুর জীবন দুর্বিষহ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য হচ্ছে, প্রতিবছর গড়ে ৫০ শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনে মারা যায়। মৃত্যু হচ্ছে নির্যাতনের একেবারে চরম রূপ, একেবারে শেষ পর্যায়, নৃশংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ ছবি। কিন্তু সেই শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে আরও অনেক ধাপ আছে। যদি ৫০ জন শিশুকে নির্যাতন করে হত্যাই করে ফেলা হয় তাহলে কত গৃহকর্মীকে না জানি কতভাবে নির্যাতন করা হয়, যার খবর আমরা কোনও দিন জানতে পারি না। খবরটি শেষ পর্যন্ত যখন খবরের কাগজ পর্যন্ত পৌঁছায় তখন চক্ষু লজ্জার খাতিরে কিছু একটা করতে হয় কিন্তু যদি খবরের কাগজ পর্যন্ত না পৌঁছায় তখন কী হয়? আমার মনে অনেক দিন থেকে খুব সহজ একটা প্রশ্ন। যদি প্রতিবছর ৫০ জন শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে ফেলা হয় তাহলে গড়ে প্রতিবছর ৫০ জন হত্যাকারীর বিচার করে ফাঁসি দিতে দেখি না কেন? ফাঁসি যদি নাও হয় অন্তত বিচার করার এবং ঠিক ঠিক শাস্তি দেওয়ার খবরটি আমরা শুনতে পাই না কেন? আমরা শুধু নির্যাতনের খবরটি পাই কিন্তু নির্যাতনের বিচার করে শাস্তি দেওয়ার খবরটি কেন পাই না? যদি বছরে ৫০ জনের বিচার করা হয় তাহলে প্রতি মাসে চারটি বিচারের খবর থাকার কথা। প্রতি সপ্তাহে একটি। তাহলে সেই খবরগুলো কোথায়? হত্যা মামলার বিচার কী অনেক গুরুত্ব দিয়ে গণমাধ্যমে আসার কথা নয়? প্রকৃত কারণটি আমি জানি না। অনুমান করতে পারি, যারা এই অসহায় অবোধ শিশুদের নির্যাতন করে মেরে ফেলেন তারা সমাজের ওপরতলার মানুষ, তারা ছলেবলে কৌশলে মামলার সেই বেড়াজাল থেকে বের হয়ে আসেন। সম্ভবত শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। যেহেতু খবর দেওয়ার মতো কিছুই নেই, তাই আমরা কোনও খবরই পাই না। সাংবাদিকরা একটা একটা করে সবকটি হত্যাকাণ্ডের তালিকা করে কোনটি বিচারের কোন পর্যায়ে আছে, কারা পুরোপুরি ছাড়া পেয়ে বহাল তবিয়তে নিজের সন্তান এবং পরিবার নিয়ে সুখে দিনকাল-পাত করছেন, সেগুলো আমাদের জানাতে পারেন না? আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে। ৩. শিশু জান্নাতীর হত্যাকাণ্ডটি আমাদের সবাইকে খুব কষ্ট দিয়েছে। যে মহিলার নির্যাতনে এই শিশুটি মারা গেছে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্ত্রীকে ফেলে রেখে স্বামী ভদ্রলোক পলাতক। হয়তো ধরা পড়বেন। হয়তো গ্রেফতার হবেন, হয়তো কখনও বিচার হবে। হয়তো আইনের নানা ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যাবেন। কারোরই বিচার হবে না। আমরা কদিন পরে সবকিছু ভুলে যাবো। যখন নতুন আরেকজন জান্নাতী এরকম নৃশংস অত্যাচারে মারা যাবে, তখন কয়েক দিনের জন্য আমরা সচকিত হবো, আবার খবরের কাগজে লেখালেখি হবে। আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, এই দেশে তার চাইতে বেশি কিছু কি করা যায় না? মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান কিংবা গৃহকর্মীদের সুরক্ষার সংগঠনগুলো নিশ্চয়ই ভেবে ভেবে বের করেছে ঠিক কীভাবে এই গৃহকর্মীদের রক্ষা করা যায়। কীভাবে তাদের আনন্দময় জীবন উপহার দেওয়া যায়। সেটা সত্যি সত্যি বাস্তবে রূপ দেওয়া কতটুকু কঠিন? আমি ইদানীং অনেক কিছু নিয়ে খুব আশাবাদী। এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা প্রায় হাল ছেড়ে দিই, হঠাৎ করে দেখি সেটা হয়ে গেছে। আমি বিশেষ করে আমাদের হাইকোর্টের ভূমিকা দেখে খুবই মুগ্ধ। এই দেশের রুগ্ন নদীগুলো যেন আমাদের মতো জীবন্ত মানুষ, তাই তাদের প্রায় মানুষের মর্যাদা দিয়ে দেওয়া আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে। আমি বিশেষ করে মুগ্ধ হয়েছি মেয়েদের জন্য আলাদাভাবে কিছু নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়গুলোতে। যেমন, বিয়ের সময় শুধু মেয়েদের তাদের কৌমার্য্য বিষয়ে তথ্য দেওয়ার বিধান ছিল! এখন সেই বৈষম্যটি দূর করা হয়েছে। শ্রমজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্য তাদের কাজের জায়গায় ডে-কেয়ার তৈরি করার অসাধারণ একটি মানবিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, কর্মক্ষেত্রে মায়েরা যেন তাদের সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন তার আলাদা জায়গা করে দেওয়ার একটি চমৎকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের গৃহকর্মীদের প্রায় সবাই মেয়ে। আমি স্বপ্ন দেখি তাদের আলাদাভাবে সুরক্ষা করার জন্য হঠাৎ করে হাইকোর্ট থেকে একটা নির্দেশনা চলে আসবে। একটি শিশুকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে না পারলে তাকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়া যাবে না, এটি কি খুব বেশি চাওয়া? জান্নাতীর মুখের মিষ্টি হাসিটির কথা ভোলা কঠিন। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে? কেন আমরা হাসিটি রক্ষা করতে পারলাম না?   লেখক: কথা সাহিত্যিক ও শিক্ষক
জান্নাতীর মুখের হাসি
ছাত্র রাজনীতি
১ আবরারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি আমাদের সবাইকে একটা বিশাল ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে। প্রাথমিক রাগ-দুঃখ-হতাশা এবং ক্ষোভের পর্যায়টুকু শেষ হয়ে যাবার পর আমরা এখন তার পরের পর্যায়টুকু দেখতে পাচ্ছি যেখানে এই অত্যন্ত হৃদয় বিদারক ঘটনাটি নিয়ে দেশে-বিদেশে অল্প বিস্তর রাজনীতি করা শুরু হয়েছে। সরকারও তাদের মুখ রক্ষায় কাজ শুরু করেছে, যদিও তাদের জন্য কাজটি খুব সহজ নয়। আমরা সবাই জানি আবরারকে নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্য খবর পেয়ে পুলিশ এসেছিল। যেহেতু তাকে নির্যাতন করছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মী তাই তারা দরকার হলে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও তাকে উদ্ধার করার সাহস পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কমবয়সী কয়েকজন তরুণ ছাত্রের সামনে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন অসহায় দুর্বল কিছু মানুষ, তাদের চোখের সামনে অচিন্তনীয় নৃশংসতায় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে যেতে পারে কিন্তু তারা কিছু করতে পারে না, এটি মেনে নেওয়া খুব কঠিন। বলা যেতে পারে ছাত্র রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপটি এবারে আমরা দেখতে পেয়েছি। খুব স্বাভাবিক কারণে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সারা দেশে আলাপ আলোচনা হচ্ছে। আমাদের দেশে এখন আসলেই ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা আছে কি-না সেটা নিয়ে সবাই কথা বলছেন। ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র রাজনীতি তুলে দেয়া হয়েছে’এই ঘোষণা দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে কি-না সেটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। তবে আমি একটুখানি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি- ছাত্র রাজনীতি নিয়ে আলাপ আলোচনা হলেও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে সেরকম আলোচনা হয়নি, যদিও সেটাও কম জরুরি একটা বিষয় নয়। অনেক দিন পর আমি নিজেও আবার ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ভাবছি। নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করছি সত্যি কী ব্যাপারটা এতো সহজ? শুধু একটা ঘোষণা দিলেই রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? যখন বয়স কম ছিল তখন সব প্রশ্নের উত্তর জানতাম কিন্তু আজকাল যে কোনো বিষয় নিয়ে মুখ খুলতে দ্বিধা হয়। তবে দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্রিয়ার মাঝে থাকার কারণে ছাত্র রাজনীতির নানা ধরনের ঘটনা দেখেছি। সেরকম কয়েকটি ঘটনার কথা বলি তাহলে ছাত্র রাজনীতি কীভাবে কাজ করে হয়তো তার ধারণা পাওয়া যাবে! ঘটনা: তখন বিএনপি জামায়াত আমল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে। আমি ভর্তি কমিটির সভাপতি, সব ছাত্রছাত্রী পরীক্ষার হলে ঢুকেছে, বাইরের সব মানুষকে বের করে বিল্ডিংগুলোর মূল গেইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হলের বাইরে জন-মানুষ নেই, ভেতরে মাত্র পরীক্ষার প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে। হঠাৎ করে আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম একটি ছাত্র তার পিঠে একটা ব্যাগ নিয়ে গদাইলস্করী চালে হলরুমের বারান্দা দিয়ে হাঁটছে। আমি ছাত্রটিকে চিনতে পারলাম সে ছাত্র শিবিরের একজন নেতা, তার হাঁটার ভঙ্গিতে সবার জন্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট একটা মেসেজ। সেটি হচ্ছে- “এই দেখ, পরীক্ষার হলে কারো ঢোকার কথা না কিন্তু আমি শিবিরের নেতা, আমি ঢুকেছি এবং বুক ফুলিয়ে হাঁটছি। কারো সাধ্যি নাই আমাকে কিছু বলে!” আমি তার মেসেজকে থোড়াই পরোয়া করে হুঙ্কার দিয়ে বললাম, “এই ছেলে! তুমি এখানে কীভাবে ঢুকেছ? বের হও! এক্ষুণি বের হও!” আমি দারোয়ানকে ডেকে তাকে বের করে দেওয়ার সাথে সাথে মুহূর্তের মাঝে অসংখ্য ছাত্র শিবিরের কর্মী এসে আমাকে ঘিরে ফেলল, চিৎকার করতে লাগল, আমি নাকি তাদের সভাপতিকে অপমান করেছি! হই চই শুরু তখন অন্য অনেকে ছুটে এসে কোনোভাবে অবস্থাটা সামলে নিলেন। ঘটনার বিশ্লেষণ: এটি হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি করার একটা অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন। শুধু অন্য শিক্ষার্থীদের সামনে নয়, শিক্ষক কিংবা প্রশাসনের সামনেও! সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যে কাজটি করার কথা কল্পনাও করতে পারবে না, ছাত্র রাজনীতি করা নেতা হলে তারা অবলীলায় সেটা করতে পারে সবার মাঝে এরকম বিশ্বাস তৈরি করতে হয়। ঘটনা: এটি কিছুদিন আগের একটি ঘটনা। ডিপার্টমেন্টের কোনো একটি উৎসবে সারা দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসেছে। তাদের নিয়ে একটি সমাপনী অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেই অনুষ্ঠানে একজন প্রতিমন্ত্রীও আমার সাথে মঞ্চে বসে আছেন। অনুষ্ঠান চলছে তখন হঠাৎ করে শ্লোগান শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি অডিটরিয়ামের পেছন থেকে সারি বেঁধে দশ বারোজন ছাত্র আসছে। সবার সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি। তার পোশাক যথেষ্ট রাজকীয় এবং মুখে নেতাসুলভ গাম্ভীর্য। এই সভাপতিকেই অভিনন্দন জানিয়ে শ্লোগান দেওয়া হচ্ছে। দৃশ্যটি যথেষ্ট হাস্যকর। কিন্তু শ্লোগানের কারণে যিনি বক্তব্য দিচ্ছিলেন তাকে থেমে যেতে হলো এবং দলটি এসে শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোতে গ্যাঁট হয়ে বসে গেল। তখন আবার অনুষ্ঠান শুরু হলো। বলাই বাহুল্য ঘটনাটি যথেষ্ট দৃষ্টিকটূ এবং আমি খুবই বিরক্ত হলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের ছাত্রনেতা থাকে সাধারণত আমি তাদের চিনি না। কিন্তু ঘটনাক্রমে এই সভাপতি আমার পরিচিত। কাজেই বক্তব্য দেওয়ার সময় আমি তার নাম ধরে তাকে সবার সামনে তার এই ঔদ্ধত্যের জন্য বিতৃষ্ণাটুকু প্রকাশ করে তাকে সেটা জানিয়ে দিলাম। অনুষ্ঠান শেষে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় আমার থেকেও আরো অনেক কঠিন ভাষায় এই ছাত্রনেতাকে সতর্ক করে দিলেন। ঘটনার বিশ্লেষণ: এটি ঠিক আগের ঘটনার মতোই, ছাত্রনেতারা বিশ্বাস করে যে কোনো অনুষ্ঠানের মাঝখানে শ্লোগান দিতে দিতে ঢুকে যাওয়া তাদের অধিকার আছে। শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বসে যাওয়া তাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তারা কত গুরুত্বপূর্ণ এবং কত ক্ষমতাবান সেটা সবাইকে জানানোর জন্য তারা খুবই ব্যস্ত থাকে। ঘটনা: তখন জামায়াত-বিএনপি আমল। পয়লা বৈশাখের দিন ছাত্র-শিক্ষক মিলে একটা আনন্দ র্যা লি করবে। তখন কয়েকজন ছাত্র আমাদের জানিয়ে দিল ছাত্রদলের একজন নেতার হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী ধর্ষিতা হয়েছে। এই র্যা লিটির মাধ্যমে তারা বিষয়টি প্রকাশ্যে এনে বিচার দাবি করার কাজটি শুরু করতে চায়। ছাত্রদলের নেতারা আশেপাশেই আছে, কাজেই আমরাও যদি থাকি তারা হয়তো একটু নিরাপদ থাকবে। কাজেই আমরা র্যা লিতে থাকলাম এবং একটি আনন্দ র্যা লি দেখতে দেখতে একটি বিক্ষোভ র্যা লিতে পাল্টে গেল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রী বিশাল একটি প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলল। ভাইস চ্যান্সেলরের অফিস ঘেরাও করে ধর্ষকদের বিচার করার দাবি করল। বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমুল উত্তেজনা, অসংখ্য ছেলেমেয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের অফিস ঘেরাও করে বিচার দাবি করছে, দূরে ছাত্রদল ও শিবিরের ছাত্ররা, কাছাকাছি একটা পুলিশের গাড়ি। হঠাৎ করে পুলিশের গাড়িটি ধীরে ধীরে সরে গেল এবং কিছুক্ষণের মাঝে ছাত্রদল ও শিবিরের দলটি সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আক্রমণ করল। যারা এই ধরনের আক্রমণ নিজের চোখে দেখেনি তাদেরকে বিষয়টি বোঝানো খুব মুশকিল। ঘণ্টা দুয়েকের একটা ভয়ংকর তাণ্ডবের পর শেষপর্যন্ত আবার পুলিশ ফিরে এলো এবং তখন ভাংচুর এবং তাণ্ডব থিতিয়ে এলো। ভেতরে আটকে থাকা ছাত্রীরা বের হতে পারল। ঘটনার বিশ্লেষণ: আমার বিবেচনায় এই ঘটনাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন ছাত্রনেতার হাতে ধর্ষিত হওয়ার পর সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা খুব দক্ষতার সাথে একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। কাজেই যারা দাবি করে নেতা গড়ে তোলার জন্য ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন, তাদেরকে আমি জোর দিয়ে বলতে পারি- রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটা ব্যবহার করার জন্য রাজনৈতিক দলের সদস্য হতেই হবে সেটি সত্যি নয়। ছাত্র রাজনীতি না করেই একজন ছাত্র বা ছাত্রী কীভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন করতে হয় সেটা শিখতে পারে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা শুধু যে খুবই দক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করেছে তা নয়, তারা খুব সতর্ক থেকেছে যেন যারা নেতৃত্ব দিয়েছে তাদেরকে বিপদে পড়তে না হয় কিংবা আন্দোলনটা অন্যদিকে দিক হারিয়ে না ফেলে। শুধু তাই নয় কেউ যেন ধর্ষিতা মেয়েটির পরিচয় জানতে না পারে তারা সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করেছিল। এই ঘটনার সময় আরো কয়েকটি বিষয় ঘটেছিল। ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীরা যেন সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নেতাকর্মীদের আক্রমণ করতে পারে সেজন্য পুলিশ বাহিনী তাদেরকে সাহায্য করেছিল। এটি আমাদের দেশের খুবই বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। এই দেশের পুলিশ নয়, সরকারি দলের আজ্ঞাবহ অনুচর! স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না! তারা শুধু সরকারের আন্দোলনটি গড়ে তোলার সময় কোনো একটি সভায় আমিও বক্তব্য দিয়েছিলাম। তার একটি ছবি দেখিয়ে একজন ছাত্র আমাকে বলেছিল, “স্যার, আপনার ঠিক পেছনে যে ছাত্রটি দাঁড়িয়ে আছে সে হচ্ছে ধর্ষকদের একজন সহযোগী!” দুঃখের কথা হচ্ছে ধর্ষককে শেষ পর্যন্ত কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি। তবে যে বিষয়টি আমি কখনোই বুঝতে পারিনি সেটা হচ্ছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন রাষ্ট্রের আইন কাজ করবে না? একটি ছাত্র পরীক্ষায় নকল করলে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শাস্তি দিতে পারে কিন্তু সে ধর্ষণ করলে কেন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে না? বিচার করে আজীবন জেলে আটকে রাখবে না? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা কেমন করে দেশের আইনের ঊর্ধ্বে থাকে? এই পুরো দুঃখজনক ঘটনার মাঝে একমাত্র স্বস্তির বিষয় হচ্ছে ধর্ষিতা ছাত্রীটির পরিচয় কেউ জানতে পারেনি। সে তার লেখাপড়া শেষ করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পেরেছে। ঘটনা: অনেক আগের ঘটনা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ফাইনাল পরীক্ষার একটা তারিখ ছিল। যদি কোনো কারণে একটি বিভাগও সেই তারিখে পরীক্ষা শুরু করতে না পারতো তাহলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পিছিয়ে যেত। ছাত্রনেতাদের লেখাপড়া নিয়ে বিশেষ আগ্রহ নেই, যত দীর্ঘ সময় তারা ছাত্র হিসেবে থাকতে পারবে ততই লাভ। তাই পরীক্ষা পেছানোর ব্যাপারে তারা খুবই আগ্রহী। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এই নিয়ে খুবই ত্যক্ত-বিরক্ত। একবার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা পেছানোর পাঁয়তারা চলছে তখন হঠাৎ করে হলের মেয়েরা সিদ্ধান্ত নিল যেভাবে হোক তারা পরীক্ষা দেবে! স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল উত্তেজনা, ভোরবেলা ছাত্রীরা দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে দল বেঁধে পরীক্ষা দিতে বের হয়ে এসেছে এবং ছাত্রনেতারা তাদের রাস্তা আটকে রেখে শ্লোগান দিচ্ছে, ককটেল ফাটাচ্ছে! আমরা কয়েকজন শিক্ষক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি বাড়াবাড়ি কিছু না ঘটে যায় সেটি দেখার জন্য। চার চারটি ঘণ্টা এভাবে কেটে গেল তখন ভাইস চ্যান্সেলর ছাত্রীদের অনুরোধ করলেন তাদের হলে ফিরে যাওয়ার জন্য, কথা দিলেন তিনি ব্যাপারটি দেখবেন। তখনই একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগ এখন থেকে আলাদা আলাদাভাবে নিজের পরীক্ষা নিতে, পারবে। এখন যেহেতু পরীক্ষা শুরুর নির্দিষ্ট একটি তারিখ নেই ছাত্রনেতারা আর পরীক্ষা আটকাতে পারে না, সত্যি সত্যি সমস্যার সমাধান হয়ে গেল! ঘটনার বিশ্লেষণ: ছাত্র রাজনীতি বিভিন্ন দলের মাঝে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। এক দল পারলে আরেক দলকে খুন করে ফেলে কিন্তু লেখাপড়া না করার মাঝে কিংবা পরীক্ষা পেছানোর মাঝে তাদের ভেতরে কোনো বিরোধ নেই, তখন সবাই একসাথে। ঘটনা: তখন জামায়াত-বিএনপি আমল, বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরনের শ্বাসবন্ধ করা অবস্থা। তখন হঠাৎ মোটামুটি এক ধরনের ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রক্টর ঘোষণা দিলেন- তারা কেউ তাদের পদ ছাড়ছেন না কিন্তু কাজ করা বন্ধ রাখবেন। প্রক্টরহীন বিশ্ববিদ্যালয় খুবই বিপজ্জনক জায়গা। ঠিক তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে পাশের ‘রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ’ এর ছাত্রদের কোনো একটা বিষয় নিয়ে গোলমাল লেগে গেল। দুই দলের ভেতর মারামারি ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি হচ্ছে। যেহেতু কোনো প্রক্টর নেই তাদের থামানোর কেউ নেই। তখন পুলিশ এসে গুলি করল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র গুরুত্বর আহত হলো। সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ গুরুতর আহত ছাত্রদের ঢাকা পাঠিয়ে দিল এবং ভোর রাতে খবর এলো আমাদের একজন ছাত্র মারা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাদের একজন সহপাঠীর গুলি খেয়ে মারা যাওয়ার মতো একটি খবর সহ্য করার মতো নয়। মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্ববিদ্যালয় বিক্ষোভে ফেটে পড়ল এবং ছাত্রছাত্রীরা ভাইস চ্যান্সেলরের ভবন আক্রমণ করল। তাদের সমস্ত ক্ষোভ তার উপর এবং কয়েক ঘণ্টা জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের পর ভাইস চ্যান্সেলর তার পদত্যাগ পত্র লিখে দিলেন। দুটি ট্রাক এনে ঠাণ্ডা মাথায় তার জিনিসপত্র তুলে বিদায় নিলেন। একজন ভাইস চ্যান্সেলরের জন্য সেটি যথেষ্ট অসম্মানজনক বিদায়। ঘটনার বিশ্লেষণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাদের সহপাঠীর মৃত্যু খুব হৃদয়বিদারক ঘটনা। এরকম একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে যদি বিশাল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী হঠাৎ করে সংগঠিত হয়ে যায় তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। ছাত্র রাজনীতির দলগুলো সংগঠিত হলেও বিশাল সংখ্যক সাধারণ ছাত্রছাত্রীর সামনে তখন তারা অসহায়। তবে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাদের অর্জনটুকু ধরে রাখা কঠিন। সবাই অপেক্ষা করে তাদের উত্তেজনা কমে আসার জন্য এবং উত্তেজনা কমে আসার পর আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার কয়েক মাস পর তিনি শিবির এবং ছাত্রদলের পাহারায় আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছিলেন।   ২. আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন আমার ঘনিষ্ঠ একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার পঁচিশ বৎসরের শিক্ষকতা জীবনে ছাত্র রাজনীতির কারণে ভালো কিছু হয়েছে সেরকম কিছু কী দেখেছ? আমার তখন গণজাগরণ মঞ্চের কথা মনে পড়ল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা তরুণদের সেই অবিশ্বাস্য আন্দোলনের সময় কিন্তু ছাত্রদের প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী সবকয়টি রাজনৈতিক দল সাহায্য করেছিল। শুধু তাই না, মে মাসের ২৯ তারিখ সন্ধ্যেবেলা আমি শাহবাগে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে আক্রমণ করেছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের প্রতিহত করেছিল। কাজেই আমরা কী জোর দিয়ে বলতে পারি এই দেশে ছাত্র রাজনীতির আর কোনো দরকার নেই? ভবিষ্যতেও কখনো দরকার হবে না?   মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্র রাজনীতি
আরও পড়ুন
টেলিভিশন কন্টেন্ট গবেষণা প্রয়োজন: তথ্যমন্ত্রী
আজ বিশ্ব টেলিভিশন দিবস (ভিডিও)