
কুমিল্লায় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পেয়েই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রোশন আলী মাস্টার। বিতর্কিত ফেনালাপ ফাঁস হওয়ার পরই একে একে বের হয়ে আসছে তার নেতিবাচক চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। এই আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে রয়েছে মনোনয়ন বাণিজ্য, অবৈধ প্রভাব বিস্তার।
হঠাৎ পদ পেয়ে দলে গ্রুপিং দ্বন্দ্ব সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদেরকে নিয়ে দল ভারী করার অভিযোগ। সম্প্রতি তিনি নৌকার সব কর্মীকে রাজাকারের বাচ্চা আখ্যা দিয়ে দলের বিরুদ্ধে নানা অশালীন মন্তব্য করে বিএনপিকে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামার ইন্দন দেন। অশালীন মন্তব্যের পর তাকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে ফুঁসছে গোটা উত্তর জেলার নেতাকর্মীরা। তাকে খুনি মোশতাকের লোক বলে মনে করছে জেলার সিনিয়র নেতারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদ্য বিতর্কিত রোশন আলী মাস্টার রাজনীতির মাঠে তেমন কোন আলোচনাতেই ছিলেন না। ঢাকায় থেকে রডের ব্যবসা করতেন। ২০১৯ সালের পর তিনি হঠাৎ দেবিদ্বার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য লবিং শুরু করেন। কিন্তু কর্মী শূন্য হওয়ায় মাঠে এসে সুবিধা করতে পারেনি।
এরই মাঝে রাজনৈতিক গ্রুপিং দ্বন্দ্বের মাঝে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্টিত হয়। ওই সম্মেলনে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদ লাভ করেন। আচমকা আওয়ামী লীগের মতো এত বড় দলের হঠাৎ কুমিল্লা উত্তর জেলার মত এত বড় সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়ায় অধিকাংশ নেতাকর্মীরা তখন হতবাক হন।
ওই পদ পাওয়ার পর থেকে কোনোভাবেই তিনি নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। পদ পাওয়ার পর পরই যাকে তাকে নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য, অশালীন বাক্য ব্যবহার, নিজ দলের নেতাকর্মীদেরকে হুমকি ধমকি গালাগালি, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন উপজেলার দায়িত্বে থাকা নেতাদেরকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন। এসব কারণে এলাকায় রীতিমতো সর্বত্রই সমালোচনার মুখে ছিলেন তিনি।
শুধু নিজ উপজেলা দেবিদ্বারে নয় আশপাশের দাউদকান্দি, তিতাস, হোমনা, চান্দিনাসহ গোটা উত্তর জেলায় তার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে নেতাকর্মীরা। তিনি বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা করে দলের ভিতরে বিভেদ সৃষ্টি করে আসছিলেন বলে অভিযোগ নেতাকর্মীদের।
তাকে নিয়ে কুমিল্লা উত্তর জেলায় নানা অস্থিরতার মধ্যেই সম্প্রতি দল এবং সরকারবিরোধী একটি নেতিবাচক অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অডিওতে তিনি বলেন, যারা নৌকা করে তারা সব রাজাকারের বাচ্চা, এ দেশে টাকা দিলে মনোনয়ন এবং মন্ত্রিত্ব পাওয়া যায়। অডিওতে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপিকে মাঠে নেমে আন্দোলন করার জন্য ইন্ধন জোগান এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশ খারাপ অবস্থায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এসব নেতিবাচক মন্তব্য বিভিন্ন মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার বিচার ও বহিষ্কার দাবিতে ফুঁসে ওঠে দলের নেতাকর্মীরা।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক আবুল কাশেম ওমানী আরটিভি নিউজকে বলেন, রোশন আলী মাষ্টারের অতীত কর্মকাণ্ড শুনলে দলের ইজ্জত থাকবে না। তিনি রাজনীতির মাঠে ছিলেন একেবারেই নিষ্ক্রিয়। ঢাকায় থেকে ব্যবসা করতেন। দলের আন্দোলন-সংগ্রামসহ কোনো কাজেই আমরা তাকে পাশে পাইনি। ২০১৯ সালে এসে উপজেলা আওয়ামী লীগের যেকোনো একটা পদ পেতে লবিং শুরু করেন। কিন্তু হঠাৎ তিনি জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে গেলেন।
হোমনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, রোশন আলী হোমনায় মনোনয়ন বাণিজ্য করে দলের অনেক ক্ষতি করেছে। আমরা উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে দলের হাইকমান্ডে অভিযোগ করেছি। সে দলের জন্য একটা ক্ষতিকারক তাকে অবিলম্বে বহিষ্কার করা দরকার।
কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তিতাস উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ হোসেন সরকার আরটিভি নিউজকে বলেন, রোশন আলী মাস্টার যে মন্তব্য করেছেন তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, আমরা অবিলম্বে তাকে বহিস্কার করে তার বিচার দাবি করছি, তিনি বলেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর রোশন আলী মাস্টার কুমিল্লা উত্তর জেলার প্রতিটি উপজেলায় দলের মধ্যে গ্রুপিং দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দলের অনেক ক্ষতি করেছে, আমরা তার মতো বিতর্কিত একজন নেতাকে আর এ পদে দেখতে চাই না তৃণমূল।
এ বিষয়ে রোশন আলী মাস্টার বলেন আমি আওয়ামী লীগকে বুকে ধারন করি, দলের জন্য অনেক জেল জুলুম এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সঠিক নয়। আমি কোনো মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নই। আমার একটি খন্ডিত অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করা হয়েছে। এ নিয়ে একটি চক্র আমাকে বিতর্কিত করার পাঁয়তারা করছে, আমি এসবের প্রতিবাদ জানাই।
এমআই/টিআই




