
বছরের শেষ রাত বা ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ উদযাপনে পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে এবার কোনো আয়োজন নেই। এরপরও পুরোনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছর বরণে ভিড় বেড়েছে পর্যটকের। গেল বুধবার থেকে বছরের শেষ ৫ দিনে অন্তত চার লাখ পর্যটক সমাগমের আশা করছেন হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকেরা।
কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, গত বছরে থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে বছরের শেষ সাত দিনে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটেছিল। এবার সৈকতসহ হোটেল-মোটেলে নতুন বছরকে বরণের কোনো উৎসবের আয়োজন হয়নি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনেও প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবু গতবারের তুলনায় কিছুটা কম হলেও ব্যাপক পর্যটক সমাগমের আশা করা হচ্ছে। পর্যটকদের মাঝে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই।
সেলিম নেওয়াজ আরও বলেন, পর্যটক টানতে সৈকত ও শহর এলাকার পাঁচ শতাধিক হোটেল-গেস্টহাউস-রিসোর্ট ও কটেজে রুম ভাড়ার বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ছাড় দেয়া হচ্ছে। কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলের প্রায় ৬০ শতাংশ বুকিং হয়েছে।
হোটেল মালিকেরা জানান, গত ২৮ অক্টোবর থেকে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির কারণে টানা ৪৮ দিন সৈকতে তেমন পর্যটক ছিল না। এ কারণে শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলের অধিকাংশ কক্ষ খালি পড়ে ছিল। বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৪ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ দিনের ছুটিতে ব্যবসা কিছুটা চাঙা হলেও পরে আবার পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ে সৈকত পাড়ে। পাঁচ দিনের ছুটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে।
রোববার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে দেখা যায়, সৈকতে পর্যটকের ভিড়। বেশির ভাগ নারী-পুরুষ সমুদ্রের পানিতে নেমে গোসলে ব্যস্ত। কিছু পর্যটক বালুচরে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে ছবি তুলছেন। পর্যটকদের ছবি তুলে দিতে ব্যস্ত তিন শতাধিক পেশাদার আলোকচিত্রী। পর্যটকদের কেউ ঢেউয়ের সঙ্গে আনন্দ উল্লাসে মেতে রয়েছেন। কেউ দ্রুতগতির জলযান জেটি স্কিতে চড়ে ঘোরাঘুরি করছেন। ঘোড়া ও বীচ বাইক নিয়েও ছুটতে দেখা যায় কয়েকজনকে।
বেসরকারি ‘সি সেফ’ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের পাঁচ কিলোমিটারে দুপুরে পর্যটকের ভিড় দেখা গেছে।
স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সৈকতে গোসলে নামেন ঢাকার কলাবাগানের ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম। শনিবার রাতে ট্রেনে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে রবিবার সকালে কক্সবাজারে পৌঁছান। তিনি বলেন, কক্সবাজার পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘুরে সন্ধ্যায় সৈকতে ফিরে ২০২৩ সালের শেষ সূর্যাস্ত দেখবেন। এরপরে তারা ফিরে যাবেন।
তবে কিছু কিছু ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের থার্টিফার্স্ট নাইট পড়ে রোববার। সরকারি ছুটি নেই, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনের কড়াকড়ি, আবার আউডডোর-ইনডোর কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন না থাকায় এবার পর্যটকদের সাড়া নেই এমনটাই বলছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

শহরের পাঁচ তারকা হোটেল কক্সটুডের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার আবু তালেব শাহ বলেন, নানা কারণে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। অন্যান্য বছর রুমের জন্য হাহাকার তৈরি হলেও এবার থার্টিফার্স্ট উপলক্ষে ৪৫ ভাগ বুকিং আছে মাত্র।
নির্বাচনের কারণে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত কোনো বুকিং নেই।
থার্টিফার্স্ট নাইটে কক্সবাজার সৈকতসহ উন্মুক্ত স্থানে কনসার্ট বা অনুষ্ঠানের আয়োজন বন্ধ রাখার কথা জানিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টার আগে উন্মুক্ত স্থানের সব আয়োজন শেষ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে হোটেল-মোটেলের ইনডোর আয়োজনে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে এই সময়ের পর আতশবাজি, পটকা ফাটানো যাবে না। এমনকি হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন স্থানের বারও বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, কক্সবাজারে পর্যটক বাড়তে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঙা ভাব ফিরে এসেছে। বছরের শেষ দিন পর্যন্ত শতকোটি টাকার ব্যবসা হবে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে রুম ভাড়া ও খাবারের দামে বাড়তি টাকা যাতে কেউ নিতে না পারে, তা দেখভাল করতে একাধিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছেন। সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্ট অভিযোগকেন্দ্র খোলা হয়েছে। হয়রানির শিকার পর্যটকেরা সেখানে অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ভ্রমণে এসে কোনো পর্যটক যেনো হয়রানির শিকার না হন, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
প্রসঙ্গত, কক্সবাজারে পর্যটকদের আবাসনের জন্য রয়েছে ৩৮০টি হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউজ ও কটেজ। যেখানে প্রায় দেড় এক লাখ পর্যটকের রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।




