জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতিতে বিশেষ কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হলেও ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪২ জন শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন।
তারা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে নির্ধারিত কর্মসূচি পালনের পরিবর্তে কক্সবাজারে আনন্দ ভ্রমণে গেছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিও)। সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে শিক্ষকদের এমন ভ্রমণে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে বিশেষ কর্মসূচি পালনের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন না করে আনন্দ ভ্রমণে গেছেন। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শিক্ষকরা নিজেরাই অনুপস্থিত। এতে তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এক অভিভাবক বলেন, আমাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে আসতে বলা হয়েছে, অথচ শিক্ষকরা নিজেরাই বিদ্যালয়ে না এসে আনন্দ ভ্রমণে গেছেন। এটা কেমন কথা? শিক্ষকদের এমন দায়িত্বহীনতা মেনে নেওয়া যায় না।
জানা গেছে, গত ৫ নভেম্বর বিকেলে সদরপুর থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা। তাদের এ ভ্রমণ শেষ হবে ৯ নভেম্বর সকালে।
ভ্রমণে অংশ নেওয়া বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা হলেন— চর বিষ্ণুপুর কলাডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লুৎফুন্নেছা, জরিপের ডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নওরোজ আল ফারুকী, ৩২ নম্বর ডিক্রীর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম বাবুল, আমিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান, নলেটেক-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কবির উদ্দিন মোল্লা, চর বলাসিয়া মোল্লা গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মশিউর রহমান, রাজারচর ওযাবউল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জিন্নাত আলী এবং হাকিমনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এটিএম আইয়ুব আলী।
ভ্রমণে অংশ নেওয়া সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন— মধ্য চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আমিনুল, মুন্সি চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মশিউর রহমান, নতুন সাহেবের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আজাহার, পশ্চিম রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাহবুব হাসান, বালিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সজিব, চর গজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জাকির হোসেন, সতের রশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আনোয়ার হোসেন ও সাইফুজ্জামান, চর বিষ্ণুপুর চৈতের কোলপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সালাম, সুকদেব নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মনির হোসেন, হকিয়তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জালাল, ৩২ নম্বর ডিক্রীর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আব্দুল কুদ্দুস, দক্ষিণ চর ডুবাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আবু সাইদ এবং বৈদ্য ডাংগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাহমুদুল হাসানসহ আরও ২০ জন।
এ ছাড়া ভ্রমণে রয়েছেন— সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান। তিনি আকোটেরচর ও সদরপুর ক্লাস্টারের দায়িত্বে আছেন। অন্য কর্মকর্তা ঝিল্লুর রহমান চর নাসিরপুর ক্লাস্টারের দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৭ নভেম্বর দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিশেষ কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, সকালে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা এবং রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের কথা রয়েছে। নিয়মিত পাঠদান বন্ধ থাকলেও এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে বিদ্যালয়গুলোতে নির্ধারিত কর্মসূচি কীভাবে পালিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, তারা গাড়িতে ‘শিক্ষা সফর’ লেখা ব্যানার লাগিয়েছেন। কিন্তু তারা তো পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ ভ্রমণে গেছেন। শিক্ষা সফরে সাধারণত শিক্ষার্থীরা যায়। শিক্ষকরা পরিবার নিয়ে ভ্রমণে গেলে সেটিকে শিক্ষা সফর বলা কতটা যৌক্তিক? আমরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকে সরকারি কর্মসূচি পালন করছি, আর তাঁরা আনন্দ ভ্রমণে ব্যস্ত। বিষয়টি সত্যিই দুঃখজনক।
এ বিষয়ে সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান ও ঝিল্লুর রহমানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, তারা প্রতিবছরই ভ্রমণে যান। অনেক আগেই তাঁরা ভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আমি প্রজ্ঞাপনটি পেয়েছি ৫ তারিখ বিকেল ৩টার দিকে। ওই দিন জেলায় আমার একটি সভা ছিল। এরপরও বিষয়টি তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানিয়ে দিয়েছি। কিন্তু অবহিত করার পরও তাঁরা ভ্রমণে গেছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শরীফ শাওন বলেন, এটি তাদের নিজস্ব দায়িত্বের বিষয়। তাদের ভ্রমণের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই। এ জন্য আমার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। তবে ভ্রমণের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা গত ৪ নভেম্বর একটি আবেদন নিয়ে এসেছিলেন। আমি ওই আবেদনে স্বাক্ষর করে দিয়েছি।
আরটিভি/এসআর