
রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনাটি সুপরিকল্পিত হতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। গ্রেপ্তার দুই আসামির কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে তাদের মধ্যে ৮০ বার ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টাতেই ৩০ বার ফোনে কথা হয়েছে তাদের।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী।
ডিবি কর্মকর্তা জানান, গত ২২ আগস্ট রাত ৮টা থেকে পূর্ববর্তী ৮০ ঘণ্টার সিডিআর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের মধ্যে মোট ৮০ বার ফোনালাপ হয়েছে। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের আগের ১২ ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ তার দুটি নম্বর থেকে মুগ্ধর একটি নম্বরে ৩০ বার কল করেন।
পুলিশের তথ্যমতে, এসব কলের সবগুলোই সিদ্ধার্থের দিক থেকে করা হয়েছিল এবং অধিকাংশই ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কোনো কোনো কলের স্থায়িত্ব ছিল ১৩, ১৫ ও ১৭ সেকেন্ড। সর্বোচ্চ একটি কলের স্থায়িত্ব ছিল ৯৬ সেকেন্ড।
কলের ধরন, সময় ও পুনরাবৃত্তি বিশ্লেষণ করে পুলিশ মনে করছে, ঘটনাটি আকস্মিক নয় এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে তদন্তের স্বার্থে আসামিদের সঙ্গে বাইরের অন্য কোনো ব্যক্তির ফোনালাপের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি পুলিশ। এখন পর্যন্ত ঘটনায় কেবল সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
চার খুনের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানিয়েছিল, ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠেছিলেন আসামিরা। সেখানে গৃহকর্তা তাদের দেখে বাধা দিলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুলিশ আরও জানিয়েছিল, ঘটনার আগে ও পরে আসামিরা মোট নয়টি ইয়াবা সেবন করেছিলেন।
তবে আদালতের নির্দেশে রোববার (৩০ আগস্ট) রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করা পরীক্ষায় তাদের শরীরে কোনো মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে জানান ডিবি কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্রাব পরীক্ষায় সাধারণত ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব। আসামিদের গ্রেপ্তারের নয় দিন পর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করায় মাদকের উপস্থিতি ধরা না পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।
এদিকে, চার খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল পুলিশ। তবে আসামিরা ইতোমধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় এবং নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করে আদালত তিন দিনের পরিবর্তে দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে। রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলাম এ আদেশ দেন।
গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার পর নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে নগরীর কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। পরে মামলাটি কোতোয়ালি থানা থেকে মহানগর ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছেন ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী।
সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তারের পর তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে কল রেকর্ড ও মাদক পরীক্ষার নতুন তথ্য সামনে আসায় চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনে আরও কোনো পরিকল্পনা বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ।
আরটিভি/এসকে




