
রাজশাহীর পবা উপজেলার বিন্দারামপুর গ্রামের যে বাড়ির উঠানে একসময় খেলাধুলা করে বেড়িয়েছেন রিফাত, সেই উঠানেই এবার ফিরছেন তিনি। তবে জীবিত নয়, নিথর দেহ হয়ে। দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্য রিফাত।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণকে কেন্দ্র করে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে দুই সেনাসদস্য নিহত এবং এক সেনা কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন।
নিহত রিফাত পবা উপজেলার দামকুড়া ইউনিয়নের বিন্দারামপুর গ্রামের আসাদুল ইসলামের ছেলে।
তার মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজন-প্রতিবেশীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে রিফাতের বাড়ির পরিবেশ।
সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে তার নিজের সংসারে। স্ত্রী ও মাত্র দুই বছরের একমাত্র মেয়েকে রেখে না ফেরার দেশে চলে গেলেন রিফাত।
দায়িত্বের কারণে পরিবার নিয়ে সেনাবাহিনীর কোয়ার্টারে থাকলেও ছুটি পেলেই স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফিরতেন তিনি।
রিফাতের মৃত্যুর খবর হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি তার ছোট্ট মেয়েটি। যে বাবা তাকে কোলে নিতেন, আদর করতেন, হাত ধরে হাঁটতেন—সেই বাবা আর কখনো দরজা দিয়ে ঘরে ফিরবেন না। বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে বড় হবে শিশুটি।
তিন ভাইয়ের মধ্যে রিফাত ছিলেন মেজ। প্রায় এক বছর আগে তার মা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই সন্তান হারানোর বেদনা নিয়ে শোকে কাতর বাবা আসাদুল ইসলাম। তিনি দেশবাসীর কাছে তার ছেলের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
স্বজনেরা জানান, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন রিফাত। পরিবারের কাছ থেকে দূরে থেকেও দায়িত্ব পালনে ছিলেন আন্তরিক ও নিবেদিত। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই আকস্মিক দুর্ঘটনায় থেমে গেল তার জীবন।
রিফাতের শৈশবের স্মৃতি আজও ছড়িয়ে আছে বিন্দারামপুরের বাড়ি ও আশপাশের এলাকায়। যে উঠানে তাঁর হাসি-আনন্দে মুখর থাকত পরিবার, সেই উঠানেই এখন অপেক্ষা তার মরদেহের।
এদিকে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সেনা কর্মকর্তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
তদন্তে হয়তো জানা যাবে দুর্ঘটনার কারণ। কিন্তু কোনো তদন্তই ফিরিয়ে দিতে পারবে না রিফাতকে। ফিরবে না দুই বছরের মেয়েটির বাবা, বাবার কাছে ফিরবে না সন্তান।
বিন্দারামপুরের বাড়িতে তাই এবার রিফাতের শেষ ফেরার অপেক্ষা। একসময় যে উঠানে তার শৈশবের পদচারণায় প্রাণ ফিরত, সেই উঠানেই এবার শেষ বিদায়ের কান্নায় ভারী হবে চারপাশ। দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রিফাতের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—বাবার ছায়া হারানো এক ছোট্ট শিশুর সারাজীবনের বেদনার শুরু।
আরটিভি/এসএস


