
গাজীপুর সাফারি পার্কে জলহস্তী পরিবারে সম্প্রতি নতুন শাবকের জন্ম হয়েছে। নতুন শাবককে নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে মা জলহস্তী। কেউ খাবার দিতে গেলে পানিতে ডুব দিয়ে হারিয়ে যাওয়া, আবার হঠাৎ ভেসে দেখা দেওয়া, আবার কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে থাকাসহ খুনসুটিতে আনন্দের বন্যা বইছে জলহস্তী পরিবারে। নতুন শাবককে নিয়ে মাতিয়ে রেখেছে জলহস্তী বেষ্টনী।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক তারেক রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমানে পার্কে নতুন শাবকসহ জলহস্তীর সংখ্যা ৫টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে কত তারিখে জলহস্তীর জন্ম হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ।
সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী পরিদর্শক রাজু আহমেদ বলেন, জন্মের পর এখন পর্যন্ত শাবকটি সুস্থ রয়েছে। শাবকটিকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছে তার মা। পুষ্টিমানের কথা বিবেচনা করে তাদের খাবারের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময়ই মায়ের সঙ্গে শাবকটি পানিতেই থাকছে। সারা শরীর ডুবিয়ে চোখ বের করে কচুরিপানার ভেতরে লোক চক্ষুর আড়াল হয়ে থাকছে। তবে মাঝেমধ্যে শাবকটি ডাঙায়ও উঠে আসে।
তিনি জানান, জলহস্তীর প্রজনন প্রক্রিয়া পানির ভেতরেই সম্পন্ন হয়। স্ত্রী জলহস্তী সাধারণত ৫ থেকে ৬ বছর বয়সে এবং পুরুষ জলহস্তী ৭ থেকে ৮ বছর বয়সে প্রজননের জন্য পরিপক্কতা লাভ করে। স্ত্রী জলহস্তীর গর্ভধারণকাল বা জেস্টেশন পিরিয়ড প্রায় ২৪০ দিন (৮ মাস)। পানির নিচেই এরা সাধারণত একটি মাত্র বাচ্চার জন্ম দেয়। জন্মের পরপরই বাচ্চাকে সাঁতার কেটে পানির ওপরে এসে প্রথম শ্বাস নিতে হয়। বাচ্চারা পানির নিচে এবং ডাঙায় উভয় স্থানেই মায়ের দুধ পান করতে পারে। মা জলহস্তী তার বাচ্চার প্রতি অত্যন্ত রক্ষণশীল হয় এবং কুমির বা অন্যান্য শিকারী প্রাণীর হাত থেকে বাচ্চাকে রক্ষা করতে যেকোনো স্তরের আক্রমণাত্মক রূপ নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জলহস্তীর আচরণ জল এবং ডাঙায় দুই জায়গায় দুই রকমের হয়ে থাকে। পানিতে নিজের এলাকা রক্ষায় পুরুষ জলহস্তীগুলো খুব উগ্র হয়ে ওঠে। তবে ডাঙায় থাকার সময় এরা সাধারণত একে অপরের এলাকা নিয়ে মাথা ঘামায় না। দিনের বেলা প্রচণ্ড সূর্যরশ্মি এবং তাপ থেকে বাঁচতে কাদার মধ্যে গা ডুবিয়ে অলস সময় পার করে। এদের ত্বক খুব সংবেদনশীল হওয়ায় পানি বা কাদা এদের শরীরকে ঠান্ডা ও ভেজা রাখতে সাহায্য করে। এরা পানির নিচে এবং ওপরে বিভিন্ন রকমের আওয়াজ (গর্জন বা ফুঁসানি) শব্দ করে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে।
শ্রীপুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক নূরুল ইসলাম বলেন, জলহস্তী একটি আধা-জলচর স্তন্যপায়ী প্রাণী। জলহস্তী মূলত জলজ এবং স্থলজ উভয় পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে হাতির পর জলহস্তী অন্যতম বৃহৎ প্রাণী। এদের চামড়া অত্যন্ত পুরু এবং শরীরে কোনো লোম থাকে না বললেই চলে। জলহস্তীর মুখ প্রায় ১৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত বড় করে খোলা যায়। এদের নিচের চোয়ালের দাঁতগুলো প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ওই দাঁতগুলো দিয়ে তারা নিজেদের রক্ষা করতে বা লড়াইয়ের সময় ব্যবহার করে। চোখ, কান এবং নাসারন্ধ্র মাথার একেবারে উপরের অংশে অবস্থিত হওয়ায় তারা শরীরের বাকি অংশ পানির নিচে ডুবিয়ে রেখেও অনায়াসে দেখতে, শুনতে এবং শ্বাস নিতে পারে। পানির নিচে যাওয়ার সময় এরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাক ও কান বন্ধ করে নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জলহস্তী মূলত তৃণভোজী প্রাণী। এদের প্রধান খাবার হলো ঘাস। ডাঙার নরম ও ছোট ঘাস খেতে এরা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। দিনের বেলা পানিতে কাটানোর পর, সূর্যাস্তের সময় এরা পানি থেকে ডাঙায় উঠে আসে। পানিতে অলস বসে থাকায় এদের শক্তি খুব কম খরচ হয়। ঘাস ছাড়া এরা মাঝে মাঝে বুনো ফলমূল বা জলজ উদ্ভিদও খেয়ে থাকে। তবে এরা পানির ভেতরের জলজ উদ্ভিদ খুব একটা পছন্দ করে না। জলহস্তী দেখতে শান্ত স্বভাবের মনে হলেও এরা আক্রমণাত্মক প্রাণী হিসেবে পরিচিত।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, দেড় সপ্তাহ আগে পার্কের জলহস্তী বেষ্টনীতে শাবকসহ মা জলহস্তী বেষ্টনীর ভেতরে ডাঙায় উঠে আসে। পার্কের কর্মীরা তাদের দেখতে বেষ্টনীতে গেলে গভীর পানিতে ডুবে লুকিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে জলাধারের কোথাও সামান্য ভেসে উঠেই আবার হারিয়ে যাচ্ছে। এ যেন এক প্রকার লুকোচুরি খেলা। এখনো শাবকটির লিঙ্গ শনাক্ত করা যায়নি। তবে লিঙ্গ শনাক্ত করতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। শাবকটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। মা জলহস্তীর সাথে কচুরিপানার ভেতরে দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। মা জলহস্তীকে বাড়তি খাবারও দেওয়া হচ্ছে। মায়ের পেছন পেছন বেষ্টনীর পুকুরের পানি থেকে পাড়ে উঠে আসছে, বেশ কিছু সময় অবস্থানের পর আবার মায়ের সঙ্গে পুকুরের গভীর পানিতে মিশে যাচ্ছে। আবার গভীর পানিতে মাঝে মাঝে গা ভাসিয়ে পার্কের দর্শনার্থীদের বিনোদন দিচ্ছে সদ্য জন্ম নেওয়া শাবকসহ পার্কের বেষ্টনীতে থাকা জলহস্তীগুলো।
আরটিভি/এমএইচজে


