
বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। যতদূর চোখ যায়, ততদূরই আমন ধানের কচি চারা বাতাসে দুলছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে জমিগুলোতে কৃষকরা ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত ছিলেন, সেসব জমি এখন সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে। মাঠের এই সবুজ দৃশ্যের সঙ্গে কৃষকের চোখেমুখেও ফুটে উঠেছে ভালো ফলনের প্রত্যাশা।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমনখেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। কেউ জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় সার। আবার কেউ ধানের গাছের বৃদ্ধি ও পাতার রং দেখে রোগবালাই কিংবা পোকার আক্রমণের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করছেন। কৃষকদের কর্মব্যস্ততায় মাঠজুড়ে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
কৃষকরা জানান, আমন চাষে সময়মতো বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূলে থাকায় অনেক জমিতে ধানের চারা ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও সেচের প্রয়োজনও তুলনামূলক কম হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা কমার আশা করছেন তারা।
তবে স্বস্তির পাশাপাশি রয়েছে দুশ্চিন্তাও। অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় নিচু এলাকার আমনখেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। টানা বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে থাকলে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ দেখা দিলে বাড়তে পারে উৎপাদন ব্যয়। তাই নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করছেন তারা।
কৃষক জয়নাল বেপারী বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ধানে রোগবালাই কম হলে এবার ভালো ফলনের আশা করছেন। তবে শুধু ফলন ভালো হলেই হবে না, উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়াও জরুরি। কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া গেলে কৃষকের পরিশ্রম সার্থক হবে।
চলতি আমন মৌসুমে কৃষকদের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সদরপুরের ১ হাজার ৫০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে আমন ধানের বীজ ও ডিএপি সার বিতরণ করা হয়েছে। এতে প্রান্তিক কৃষকেরা আমন চাষে সহায়তা পেয়েছেন।
কৃষকদের মতে, ভালো ফলন হলেই কৃষকের লাভ নিশ্চিত হয় না। ধান ঘরে তোলার পর বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও জমি প্রস্তুতসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে ভালো ফলন করেও কৃষকের লাভ কমে যেতে পারে।
তারা উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আমন চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে। এর পাশাপাশি কৃষকের পরিবারে স্বস্তি ফিরবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন আমনখেতে রোগবালাই বা পোকার আক্রমণ দেখা দিলে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অনুমাননির্ভরভাবে কীটনাশক ব্যবহার না করে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকেও নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বর্তমানে সদরপুরের মাঠজুড়ে যে সবুজের সমারোহ, তা কৃষকের পরিশ্রম, প্রত্যাশা ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি কচি ধানের চারার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের পরিবারের ভবিষ্যতের আশা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে কয়েক মাস পর এই সবুজ মাঠই সোনালি ধানে ভরে উঠবে—এমন প্রত্যাশা সদরপুরের আমনচাষিদের।
আরটিভি/এমএইচজে




