জিডিপিতে এসএমইর অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য সরকারের

বাসস

বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬ , ১১:১৯ পিএম


জিডিপিতে এসএমইর অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য সরকারের
প্রতীকী ছবি

আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের অবদান ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে কাজ করছে সরকার। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবে এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশে এসএমই খাত ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাতীয় অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান আরও শক্তিশালী করাই নতুন এই লক্ষ্যমাত্রার মূল লক্ষ্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বর্তমানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন, অর্থায়নের সহজ প্রবেশাধিকার এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে আগামী বছরগুলোতে এই খাত জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রাখতে পারবে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার জাতীয় এসএমই নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায় ঋণের প্রবাহ বাড়ানো এবং এসএমই ক্লাস্টারগুলোতে ডিজিটাল রূপান্তরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নারী উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের সহায়তা করতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সংযোগ সহজতর করতে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসএমই ফাউন্ডেশনের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে তা কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিই বাড়াবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও শক্তিশালী করবে।

তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তির ঘাটতি এবং বাজারে প্রবেশের বাধার মতো বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। 

তিনি জানান, এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, স্বল্প সুদে ঋণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ এসএমই খাতের চিত্র বদলে দিচ্ছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের বাজারের পরিধি ও পরিচালনা দক্ষতা বাড়াতে পারছেন। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাজার সংযোগ সৃষ্টির বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এসএমই ফাউন্ডেশন।

ফারজানা খান বলেন, নীতি সহায়তা, সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আর্থিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে ফাউন্ডেশনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ফারজানা খান আরও বলেন, একটি জাতীয় ফোকাল সংস্থা হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন ক্ষুদ্র ব্যবসার টেকসই উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতে অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, বছরের পর বছর ধরে ফাউন্ডেশনটি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ,  বৈচিত্র্যময় পণ্য কর্মসূচি, ক্লাস্টার-ভিত্তিক শিল্প উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়াতে বাজার সংযোগের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করে আসছে।

তিনি জানান, বিশেষ করে উৎপাদন, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রক্রিয়া সহজ করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে ফাউন্ডেশনটি অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করছে।

আরও পড়ুন

এছাড়া, ব্যবসায়িক কর্মকা-ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং সহায়তা সেবার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্লাস্টার উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), হস্তশিল্প, পাটজাত পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক পণ্যের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে শক্তিশালী করেছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখছে।

উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও এসএমই মালিকরা দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, সুদের উচ্চ হার, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে চলেছেন।

দেশি ও আন্তর্জাতিক উভয় বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোক্তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ এবং উন্নত লজিস্টিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।

রংপুরে সামান্য পুঁজিতে শুরু হওয়া একটি ক্ষুদ্র কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান এখন একটি লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে ২০ জনেরও বেশি স্থানীয় কর্মী কাজ করছেন।।

এসএমই অর্থায়ন প্রকল্পের সহায়তায় এই ব্যবসাটি এখন একাধিক জেলায় প্যাকেটজাত কৃষি পণ্য সরবরাহ করছে, যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে এই খাতের সম্ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্গানাইজেশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড লিডারশিপ বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রাশেদুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এসএমই ক্লাস্টারগুলোকে শক্তিশালী করা, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারি ও বেসরকারি অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টার গুরুত্বের ওপরও জোর দেন তিনি।

রাশেদুর রহমান ঢাবির ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ সেন্টারেরও নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন নীতি সহায়তা এবং ও উদ্ভাবন অব্যাহত থাকলে উন্নত অর্থনীতি হওয়ার পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি হয়ে থাকবে এসএমই খাত।

এদিকে, ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এসএমই খাতকে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। সেইসঙ্গে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তৃণমূল পর্যায়ের শিল্পায়নে এই খাতের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আরও পড়ুন

তিনি জানান, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের নিয়ে এসএমই একটি বৈচিত্র্যময় গ্রাহক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ব্যাংকটি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চলতি মুলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল), মেয়াদী ঋণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নসহ বিভিন্ন ঋণ সুবিধার মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে সেবা প্রদান করে আসছে।

তার মতে, এসএমই অর্থায়ন কেবল একটি ব্যবসায়িক খাতই নয়, বরং এটি জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার; বিশেষ করে প্রধান শহরগুলোর বাইরে উদ্যোক্তা তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং স্বল্প সুদের কর্মসূচিতে ব্যাংকের অংশগ্রহণ এই অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।

তবে এসএমই অর্থায়নে দীর্ঘস্থায়ী কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তিনি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঠিক আর্থিক দলিলপত্রের অভাব, জামানতনির্ভর ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা এবং ছোট অংকের ঋণে বেশি পরিচালন ও তদারকি ব্যয় এ খাতের প্রধান সমস্যা।

তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সঠিক সহযোগিতা পেলে এসএমই খাত ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের আচরণও সন্তোষজনক।

কৌশলগত অবস্থান থেকে তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছাতে প্রযুক্তি-নির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, বিশেষায়িত পণ্যের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং তাদের মধ্যে আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ শৃঙ্খলা জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আশা করেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তা এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের ফলে এসএমই খাত ব্যাংক ও জাতীয় অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রেই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে টিকে থাকবে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission