
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় মজুরি বাড়ানোর দাবি যৌক্তিক হলেও, একবারে বর্তমান মজুরি দ্বিগুণ বা তার বেশি বাড়ানো হলে কারখানার উৎপাদন ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যেতে পারে, যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু শ্রমিক ও মালিকের মধ্যকার সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতাও জড়িত। বিদেশি ক্রেতারা যদি পোশাকের ক্রয়মূল্য না বাড়িয়ে আগের দামেই পণ্য নিতে চান, আর বাড়তি মজুরির পুরো ব্যয় মালিকদের বহন করতে হয়, তাহলে উৎপাদন খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এতে কারখানাগুলোর মুনাফা কমার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ জরুরি।
হঠাৎ সংকট
করোনাভাইরাস মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক ঋণ সংকটের বিশ্বের উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো আগে থেকেই চাপে রয়েছে। এরমধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে এটি আগের সব খারাপ পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উৎপাদনের প্রাণ জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হয়। এতে এসব দেশের সরকার বাধ্য হয়ে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়। এটি দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশের মানুষ চাপে পড়ে, যার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।
এরইমধ্যে চলতি বছরের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিকরা। কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভে কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও যানবাহনে হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েনের পাশাপাশি অনেক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
তবে শ্রমিকদের দাবি দ্রুত বিবেচনায় নিয়ে সরকার গত ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, পাঁচ সদস্যের এই বোর্ড দ্রুত সভা করে নতুন মজুরির বিষয়ে সুপারিশ দেবে।
পরবর্তীতে গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম সভায় মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন যে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে এবং জানুয়ারি ২০২৭ থেকে নতুন স্কেলে বেতন পাওয়া শুরু করবেন পোশাক শ্রমিকরা।
সরকারের এই ঘোষণার পর শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। শ্রমিকরা কারখানায় ফিরছেন এবং উৎপাদন কার্যক্রম চালু হচ্ছে।
এতটা মজুরি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারের কী হবে?
একটি তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা বা প্রায় ১০১ মার্কিন ডলার। প্রস্তাবিত ৩০ হাজার টাকা মজুরি দাঁড়ায় প্রায় ২৪২ ডলারে। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় বাড়বে প্রায় ১৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে ভারতে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২৪ ডলার, পাকিস্তানে ১৩৫ ডলার এবং কম্বোডিয়ায় ২০৮ ডলার। অর্থাৎ প্রস্তাবিত ৩০ হাজার টাকা কার্যকর হলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ভারত ও পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ এবং কম্বোডিয়ার চেয়েও বেশি হবে।
এতে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদনশীলতা না বাড়িয়ে একবারে এত বেশি মজুরি বাড়ানো হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বেশি চাপে পড়তে পারে। পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পোশাকের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে কম খরচে পোশাক উৎপাদনকারী ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে ক্রয়াদেশ চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে শুধু শ্রমিকের মজুরি নয়, পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহের সময় ও কারখানার কমপ্লায়েন্সও বিদেশি ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আছে আরও সংকট
দেশের পোশাক কারখানাগুলো আগে থেকেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ব্যাংকঋণের চাপে রয়েছে। বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে মজুরি একবারে বাড়ানো হলে কারখানার পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে। এতে মুনাফা কমে যাওয়া, উৎপাদন সীমিত করা কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে। এ খাতে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই নারী। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাও জরুরি। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে অর্থায়ন, শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তাই ৩০ হাজার টাকা মজুরি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একবারে এতটা মজুরি বৃদ্ধি কারখানার ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা ও কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোই এখন পোশাকশিল্পের বড় চ্যালেঞ্জ।
আরটিভি/এমএ




