
চোখে দেখা যায় না, অথচ জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে—অণুজীবের সেই অদৃশ্য জগত এবার পেট্রি ডিশে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কখনো গোলাপ, কখনো গাছের মতো শাখা-প্রশাখা, কখনো কোষ কিংবা বিভিন্ন প্রতীকী অবয়ব। রং-তুলির আঁচড় নয়, এসব নকশা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার কালচার ও স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে। আর এই ব্যতিক্রমী বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনার পেছনে রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের হাত।
আন্তর্জাতিক অণুজীব দিবস উপলক্ষে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত নানা কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয় এসব ব্যাকটেরিয়াল কালচার। র্যালি, সমাবেশ, অণুজীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের গ্র্যান্ড ফাইনাল, ইনোভেশন শোকেস, ‘মাইক্রোবস ডিসকভারি কর্নার’ ও বায়োফার্টিলাইজার প্রদর্শনীর পাশাপাশি পেট্রি ডিশে তৈরি এসব ফর্মেশন বিশেষভাবে নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের।
শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কালচার মিডিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটিয়ে তৈরি করেছেন নান্দনিক এসব ফর্মেশন। কোথাও ব্যাকটেরিয়ার কলোনি ছড়িয়ে পড়েছে গাছের ডালপালার মতো, কোথাও ফুটে উঠেছে ফুলের অবয়ব। আবার কোনো পেট্রি ডিশে দেখা গেছে কোষের প্রতিকৃতি, কোনোটি যেন প্রকৃতির কোনো দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে এগুলোকে সাধারণ শিল্পকর্ম মনে হলেও কাছে গেলেই বোঝা যায়, এসবের প্রতিটি রেখা ও নকশার পেছনে রয়েছে অণুজীবের বৃদ্ধি।
প্রদর্শনীতে থাকা পেট্রি ডিশগুলোর একটিতে দেখা যায় ‘The Eternal Tree’—ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে ব্যবহার করে গাছের মতো একটি বিস্তৃত ফর্মেশন। অন্যটিতে ‘The Prokaryotic Cell’, যেখানে অণুজীববিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণাকে শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে ‘Roses’, ‘The Phoenix’, ‘The Pursuit of Knowledge’, ‘Swimming’ ও অন্যান্য সৃজনশীল ফর্মেশনও। প্রতিটি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কালচার মিডিয়া ও অণুজীবের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।
শুধু নান্দনিকতা নয়, এসব প্রদর্শনীতে অণুজীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক শিক্ষাটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। Escherichia coli, Staphylococcus aureus, Staphylococcus epidermidis, Klebsiella pneumoniae এবং বিভিন্ন Vibrio প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার কালচার প্রদর্শনের পাশাপাশি E. coli-এর জন্য MacConkey ও EMB এবং Vibrio প্রজাতির জন্য TCBS-এর মতো কালচার মিডিয়ায় অণুজীবের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বৃদ্ধিও দেখানো হয়েছে।
বিভিন্ন পেট্রি ডিশে ব্যাকটেরিয়ার কলোনির রং, আকার, বিস্তার ও বৃদ্ধির ধরনও আলাদা। ফলে একই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা যেমন অণুজীবের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন, তেমনি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কালচার, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার অভিজ্ঞতারও একটি বাস্তব চিত্র দেখতে পেয়েছেন।
অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের আয়োজিত এই প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ ছিল অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করে তোলা। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া বলতে চোখের সামনে কোনো দৃশ্যমান অবয়ব কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু উপযুক্ত কালচার মিডিয়া ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে তাদের বৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা সেই অদৃশ্য জগতকেই পেট্রি ডিশে নান্দনিক রূপ দিয়েছেন।
এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় তাই বিজ্ঞান ও শিল্পের এক ভিন্ন ধরনের মেলবন্ধন দেখা গেছে। একদিকে তারা শিখেছেন কীভাবে নির্দিষ্ট কালচার মিডিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করতে হয়, অন্যদিকে সেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকেই ব্যবহার করেছেন দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো সৃজনশীল উপস্থাপনায়।
আন্তর্জাতিক অণুজীব দিবসের মূল আয়োজনেও অণুজীবের গুরুত্ব, গবেষণা ও জনসচেতনতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান র্যালিতে শিক্ষার্থীদের প্রদর্শিত ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে বিশেষ করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-সংক্রান্ত সচেতনতামূলক বার্তার প্রশংসা করেন। বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. সেলিনা আক্তারও মানবদেহ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অণুজীবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।
সেই বড় আয়োজনের ভেতরে পেট্রি ডিশে তৈরি এসব ব্যাকটেরিয়াল ফর্মেশন যেন অণুজীববিজ্ঞানের আরেকটি গল্প বলেছে—যে জীবকে খালি চোখে দেখা যায় না, তাকেও বিজ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে মানুষের সামনে দৃশ্যমান করে তোলা সম্ভব। যবিপ্রবির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই আয়োজন তাই কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; এটি তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান, গবেষণামুখী চিন্তা ও সৃজনশীলতারও এক অভিনব প্রকাশ।
আরটিভি/টিআর




