
উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি কৃষিকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকরাম। সেই স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ময়মনসিংহের পরানগঞ্জে নিজের বাড়িতে বাবার নামে গড়ে তুলেছেন ‘জিন্নাত এগ্রো’ (Jinnat Agro)। টিউশনের জমানো টাকা দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন তার পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস।
আকরাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী। শৈশব থেকেই কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়াশোনার পর ভর্তি বাতিল করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসায় পরিবার ও বন্ধুদের অনেকেই সে সময় তার সিদ্ধান্তকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তবে সমালোচকদের কথায় কান না দিয়ে কয়েকটি হাঁস পালনের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করেন আকরাম।
২০২৪ সালে টিউশনের জমানো টাকা দিয়ে ৩০টি হাঁস কেনার মাধ্যমে খামারের যাত্রা শুরু করেন তিনি। তবে প্রথম উদ্যোগেই হাঁসগুলো মারা যায়। এতে দমে না গিয়ে একটি এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আবারও খামার গড়ে তোলেন। কিন্তু তিন মাসের মাথায় ভাইরাসের সংক্রমণে আবারও বিপুলসংখ্যক হাঁস মারা যায়। একের পর এক বাধা এলেও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যাননি আকরাম। সংকটের সময়ে তার পাশে দাঁড়ান স্ত্রী। স্ত্রীর নিরলস অনুপ্রেরণাই তাকে কঠিন সময় পেরিয়ে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
বর্তমানে আকরামের খামারে রয়েছে হাঁস ও দেশি মুরগির ইউনিট, দুটি গরু, ছয়টি ছাগল এবং একটি কলার বাগান। পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা উদ্যোগটি ধীরে ধীরে বড় পরিসরে রূপ নিচ্ছে।
চাকরি করবে ছেলে, পরিবারের এমন প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে খামার শুরু করায় শুরুতে কোনো পারিবারিক সমর্থন পাননি আকরাম। তবে বর্তমানে তার বাবা খামারের কাজে সহযোগিতা করছেন। আকরাম ময়মনসিংহ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে নিয়মিত ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন। সকাল থেকে টানা ক্লাস, মিডটার্ম ও প্রেজেন্টেশনের চাপ সামলে বিকেলে বাড়ি ফিরেই তাকে খামারের কাজে ছুটতে হয়। তার অনুপস্থিতিতে খামারের দেখাশোনা করেন তার বাবা।
পড়াশোনার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা এই খামার থেকে বর্তমানে আয়ও হচ্ছে। খামারের হাঁস-মুরগি থেকে আসা প্রতিদিনের আয়েই তার পরিবারের ভরণপোষণ মিটছে। সব মিলিয়ে মাস শেষে তার সার্বিক আয় দাঁড়ায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই এই অবস্থানে পৌঁছেছেন বলে জানান তিনি।
আকরাম বলেন, ব্যবসা মানেই লাভ-ক্ষতির খেলা। লোকসানের ভয়কে পাশ কাটিয়ে আমি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখি। কৃষি নিয়ে আমার অনেক বড় স্বপ্ন। আমি ভবিষ্যতে সব ধরনের কৃষি পণ্য উৎপাদনে যুক্ত হতে চাই। সেই স্বপ্নের শুরু হিসেবে এই শীতে সরিষা চাষের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করছি, যেন শহরবাসীর হাতে একদম খাঁটি ও বিষমুক্ত সরিষার তেল পৌঁছে দিতে পারি।
তিনি আরও বলেন, অনেকে হয়তো এই কাজকে ছোট চোখে দেখে, হাসি-ঠাট্টাও করে। প্রথম প্রথম এসব কথা শুনে খারাপ লাগত, তবে এখন আর গায়ে মাখি না। মানুষের কথায় কান না দিয়ে নিজের স্বপ্নে মনোযোগ দেওয়াটাই আসল। বর্তমানে পড়ালেখা ও ক্লাসের চাপের কারণে ইচ্ছা থাকলেও পুরো সময় দিতে পারছি না। তবে ইনশাআল্লাহ, পড়াশোনা শেষ করে একজন পরিপূর্ণ ও গর্বিত কৃষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলব।
আরটিভি/এমএম




