
দীর্ঘ ৩৫ বছরের অচলায়তন ভেঙে গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীরা পায় তাদের প্রতিনিধিত্বশীল ছাত্র সংসদ। তবে এক বছর না পেরোতেই সেই রাকসুর মেয়াদ এখন শেষের পথে। আগামী ২৬ অক্টোবর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচন আয়োজন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি নেই। ফলে পরবর্তী রাকসু নির্বাচন নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জুলাইয়ে রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে ২৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ২৬ অক্টোবর শপথ নেন। রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর দায়িত্ব পালন করবেন।
গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রাকসুর ২৩টি পদের মধ্যে ২০টিতে জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। নির্বাচনের আগে জোটটি রাকসু নির্বাচনকে নিয়মিত ও ক্যালেন্ডারভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
নিয়মিত রাকসু চান শিক্ষার্থীরা
দীর্ঘদিন পর সচল হওয়া ছাত্র সংসদকে আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে না ফেলে নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ আলবী আরটিভিকে বলেন, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা ও ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য রাকসু নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আমরা চাই সঠিক সময়ে নিয়মিত রাকসু নির্বাচন দিয়ে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের পথ সুগম করা হোক।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন আরটিভিকে বলেন, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি থেকে মুক্তি পেতে আমরা অবশ্যই রাকসু নির্বাচন চাই। যদিও বর্তমান রাকসু শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ চাওয়া পূরণ করতে পারেনি। তবুও আমরা চাই ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রতিবছর জারি থাকুক।
দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি ছাত্রনেতাদের
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারাও দ্রুত পরবর্তী রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবির সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী রাকসু নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠনও দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান করছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
বাম সংগঠনগুলোর জোট গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল আরটিভিকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে অবশ্যই রাকসু বা ছাত্র প্রতিনিধি থাকতে হবে। আমরা সবসময় রাকসুর পক্ষে। প্রশাসন যদি কোনো টালবাহানা করে, তাহলে আমরা রাকসুর পক্ষে আন্দোলন গড়ে তুলব।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও গত বছর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে এজিএস পদপ্রার্থী জাহিন বিশ্বাস এশা আরটিভিকে বলেন, রাকসু আমাদের সকলেরই একটি প্রাণের দাবি ছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন হয়েছে। আমাদের ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্মের প্যানেল’-এর ইশতেহারে পরবর্তী রাকসু নির্বাচন আয়োজন এবং নিয়মিত তা আয়োজনের জন্য কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু এই রাকসু আমাদের সকল শিক্ষার্থীকেই হতাশ করেছে। প্রতিনিধিদের প্রতি যে আস্থা ছিল, সেটাও একপ্রকার হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমরা রাকসুর প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চাই এবং রাকসু যে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, সেটা করে দেখাতে চাই। আমরা আশাবাদী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অল্প সময়ের মধ্যেই রাকসুর তফসিল ঘোষণা করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল আরটিভিকে বলেন, ‘রাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। তাই পরবর্তী রাকসু নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তফসিল দ্রুত ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
নির্বাচন আয়োজন নিয়ে যা ভাবছে প্রশাসন
পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সেতাউর রহমান আরটিভিকে বলেন, রাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপাচার্য তথা রাকসু সভাপতির এখতিয়ারাধীন। উপাচার্য স্যার যেদিন রাকসু নির্বাচনের বিষয়ে অনুমতি দেবেন, সেদিনই আমরা কাজ শুরু করব। তবে এখনো কোনো নির্দেশনা আমি পাইনি।
নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন না হলে বর্তমান কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ বলেন, রাকসু সভাপতি যদি চান যে মেয়াদ বাড়াবেন, তাহলে বাড়াতে পারবেন। আর যদি না চান, তাহলে সম্ভব নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাকসুর সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম আরটিভিকে বলেন, আমরা চাই শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকুক; পুরো বাংলাদেশেই থাকুক, থাকাটা স্বাভাবিক। এর মাধ্যমে সুবিধা হয়। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি থাকলে তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির ওপর। শুধু সময় হলেই হবে না, পরিবেশও অনুকূলে থাকতে হবে।
আরটিভি/টিআর


