
ভালোবাসা হচ্ছে মানুষের সবচাইতে ক্ষমতাধর আবেগের অভিজ্ঞতা। সেই আবেগের উৎস কোথায় আমরা জানি না। হাসন রাজা বলেন, আখি মুঞ্জিয়া দেখো রুপ। ভালোবাসার গভীরতর উপলব্দিও কেউ দেখতে পায় না। কাজেই প্রেমিককে পাগল বলে সম্বোধন শুনতে হয়। সেই রকম এক পাগলের নাম ইসহাক আলি শরীফ। বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন হওয়া ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটা যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ভূ-রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রকে তখন বিনির্মাণ করছেন বঙ্গবন্ধু।
ইসহাক আলি শরীফের বয়স তখন ৪৭ বছর। শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন চট্রগ্রামের এক ডক ইয়ার্ডে। সেখানেই তিনি খবর পান বঙ্গবন্ধু নেই। তিনি কাজ ছেড়ে নিজের গ্রামে রওনা দেন। নিজেকে নিঃস্ব মনে হয় তার। পায়রা নদীতে যখন জোয়ারের পানি আসে। সেই নদীর ধারে বসে তিনি হাউমাউ করে কাঁদেন। পায়ের মলিন জুতো জোড়া ফেলে তিনি খালি পায়ে হাঁটতে থাকেন। যে মাটিতে বঙ্গবন্ধু শুয়ে আছে সে মাটিতে তিনি জুতো পায়ে হাঁটতে পারবেন না।
শরীফের তখন তিন ছেলে-মেয়ে। বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বড় ছেলেটাকে কাজে দিয়েছেন এক গৃহস্ত বাড়িতে। মেয়েটা অন্যের বাড়ি থেকে ভাতের মার নিয়ে এসে খায়। স্ত্রী প্রতিবেশির বাড়ির ধান বেনে দেয়।
শরীফের বড় মেয়ে জাহানারা দেখতে বেশ ভালো। পাশের গ্রামের নুরুদ্দিন নানা অযুহাতে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। নুরুদ্দিনের মা এতো গরীবের মেয়ের সঙ্গে ছেলের মেলামেশা পছন্দ করেন না। কিন্তু নুরুদ্দিন জাহানারার জন্যে অস্থির। জাহানারা বলে পেটে ক্ষুধা থাকলে ভাব ভালোবাসা আসে না। তবু একসময় নুরুদ্দিনের জন্যে মায়া অনুভব করে সে। বিয়ের কথা হয়।
সকালে পান্তা খেয়ে শরীফ বাশ বেতের চালুনি বুনে। সেই চালুন নিয়ে বাজারে যায়। বাজারে কেউ একজন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটু কথা বললে, তার রাগ উঠে যায়। লোকটাকে মেরে বসে। পরদিন গ্রামে শালিস বসে। শালিসে তার বিচার হয়। কিন্তু পরদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায় শরীফ।
_8.jpg)
পকেটে টাকা ছিলো না। তিনি বরগুনা থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন টুঙ্গিপাড়া। মানুষের থেকে চেয়ে খেয়েছেন। এদিকে স্ত্রী ছেলেমেয়েরা ধরে নিয়েছেন তিনি আর ফিরবেন না। তিনি ফিরে আসেন মাস খানেক পর। ফিরে এসে স্ত্রী ছেলে-মেয়েদের বলেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তার কাছে নালিস করতে গিয়েছিলেন কিন্তু গার্ডরা তাকে কবরের কাছে যেতে দেয়নি।
গল্প করতে গিয়ে প্রতিবেশী কাসেমকেও তিনি তার এই কষ্টের কথা বলেন। গ্রামে তার নাম হয়ে যায় মুজিব পাগলা। এ নিয়ে নানা রকম টিটকারী শুনতে হয় তাকে। তিনি প্রতিবাদ করতে গিয়ে মার খান। মার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। শরীফ কখনো রঙিন জামা পড়েন না। তিনি পড়েন শোকের কালো পোশাক। গ্রামের সবাই তাকে নানাভাবে টিপ্পনি কাটলেও স্ত্রী রমিজা তাকে বুঝতে পারেন।
বিয়ের আগে শরীফের মেয়ে জাহানারার সঙ্গে দেখা করতে আসে নুরু। কথায় কথায় তার হবু শ্বশুরের পাগলামী নিয়ে কথা বললে, জাহানারা রেগে যায়। রেগে গিয়ে বলে, আমার বাপেরে যে পাগল বলে তারে আমি বিবাহ করবো না। এরপর থেকে নুরু দেখা করতে আসলে জাহানারা কথা না বলে চলে যায়। নূরু মাফ চায়। কিন্তু বিয়ের পরদিনই মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তার বাবার পাগলামী নিয়ে হাসাহাসি করে। জাহানারা তার স্বামীর সঙ্গে রাগারাগি করে। মেয়ে এসে বাপকে বোঝায়, কেনো তুমি এইসব পাগলামী করো আব্বা। শরীফ বলে, তুই এইসব গায়ে মাখিস না মা।
নুরু আসে জাহানারাকে নিতে। শরীফ তখন নুরুর কাছে জানতে চায়, বঙ্গবন্ধুরে ভালোবাসা কি দোষের? আমি কি কোন দোষ করছি? নূরু বলে, আপনে তো পাগলামী করেন আব্বা। পাগলামীটা বন্ধ করেন। বেশ অনেকটা সময় চুপ করে থেকে শরীফ মৃদু হাসে, কিন্তু তার চোখের ভেতর চিক চিক করে অশ্রুকণা। সেই অশ্রুকণায় একই সঙ্গে মিশে থাকে ভালোবাসা আর অভিমান।
_8.jpg)
তারপর অভাবে অনটনে কেটে গেছে বহু বছর। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। মিছিলে মিটিংয়ে অংশ নিয়েছে শরীফ। তার অভাব আজও দূর হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ভালোবাসা এখনো আগের মতোই। এখনও গ্রামের লোকেরা তাকে মুজিব পাগলা বলেই ডাকে। তাকে দেখলে বলে, ওই যে যায় মুজিব পাগলা।
দীর্ঘ ৯২ বছর বয়সে আর কখনোই তিনি পায়ে জুতো পড়েন নাই। জীর্ণ বাড়ির উঠানে বসে তিনি এখন বেতের চালুন বোনেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসার গভীরতর অনুভূতি বুকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন এদেশের সব দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে আজ রাত ৮টায় আরটিভিতে প্রচার হবে বিশেষ নাটক 'পরম প্রেমের গল্প'। সত্য ঘটনার অনুপ্রেরণায় মাসুম শাহরিয়ারের রচনা ও পরিচালনায় এতে অভিনয় করেছেন- ফজলুর রহমান বাবু, আনিসুর রহমান মিলন, নাবিলা ইসলাম প্রমুখ।
এনএস




