
প্রকৃতি যেন তার অদ্ভুত খেয়ালে এই পৃথিবীতে কতশত বিচিত্র প্রাণী সৃষ্টি করেছে, যার শেষ নেই। সমুদ্রের তলদেশ এমনিতেই এক রহস্যময় জগত, আর সেই গভীর নীল জলের নিচে বাস করে এমন এক জীব যাকে দেখলে মনে হবে সে যেন কোনো কসমেটিকস শপ থেকে লিপস্টিক পরে সমুদ্রের রানওয়েতে হাঁটতে বের হয়েছে! বলছি রেড-লিপড ব্যাটফিশ এর কথা।
গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের তলদেশে এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর জলে বসবাসকারী এই অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় মাছটি নিয়ে আজকের এই ফিচার।

কেন এই নাম এবং এর বাহ্যিক রূপ?
রেড-লিপড ব্যাটফিশের নামটির সঙ্গেই এর চেহারার আসল রহস্য লুকিয়ে আছে।
উজ্জ্বল লাল ঠোঁট: এদের মুখের চারপাশটা টকটকে লালে মোড়ানো, ঠিক যেন গাঢ় লিপস্টিক দেওয়া কোনো মানুষের ঠোঁট। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন কেন এদের ঠোঁট এত লাল হয়, তবে ধারণা করা হয় প্রজননের সময় বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করতে অথবা নিজের প্রজাতিকে চেনার জন্য এই লাল রং বিশেষভাবে কাজ করে।

ব্যাটফিশ নাম কেন?
এদের শরীরের গঠন চামড়ার মতো ছড়ানো এবং পাখনাগুলো ডানা বা চামড়ার ছাতার মতো দেখায়, যা দেখতে অনেকটাই বাদুড় বা ব্যাটের মতো। সাঁতার কাটার চেয়ে হাঁটতেই বেশি পছন্দ করে!
অন্যান্য মাছের মতো অবাধে জল কেটে সাঁতার কাটতে এরা খুব একটা পছন্দ করে না। বরং সমুদ্রের তলদেশে হেঁটে বেড়াতেই এরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
এদের শরীরের নিচের জোড়া পাখনাগুলো মানুষের পায়ের মতো রূপান্তরিত হয়েছে। এই 'পা' বা রূপান্তরিত পেক্টোরাল ও পেলভিক পিন্ডগুলোর ওপর ভর দিয়ে এরা সমুদ্রের বালুকাময় তলদেশে হেটে হেটে ঘুরে বেড়ায়। দৃশ্যটা দেখলে মনে হবে যেন কোনো ছোট প্রাণী সাগরের নিচে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে!

শিকার ধরার অদ্ভুত কৌশল: 'ফিশিং রড'
রেড-লিপড ব্যাটফিশ শিকার ধরার জন্য এক দারুণ প্রাকৃতিক কৌশল ব্যবহার করে। এদের মাথার ঠিক ওপরের অংশে 'অ্যাসিচিয়াম' নামের একটি মাংসপিণ্ড বা লতাঝুলের মতো অঙ্গ থাকে।
এটি দেখতে ঠিক ফিশিং রড বা ছিপের মতো কাজ করে।
ছোট ছোট মাছ, চিংড়ি বা ক্রাস্টেশিয়ানরা যখন এই উজ্জ্বল অঙ্গটির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কাছে আসে, তখন অতর্কিত আক্রমণ করে তাদের গিলে খায় এই ব্যাটফিশ।

শারীরিক বৈশিষ্ট্য এক নজরে
আবাসস্থলগ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ ও পেরুর উপকূলবর্তী গভীর সমুদ্রের তলদেশ (সাধারণত ৩০ থেকে ১২০ মিটার গভীরতা)। আকারলম্বায় সাধারণত ২০ সেন্টিমিটার (৮ ইঞ্চি) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
খাদ্যাভ্যাসছোট মাছ, চিংড়ি, ক্রাস্টেশিয়ান এবং সামুদ্রিক কীট। সাঁতার দক্ষতাখুবই দুর্বল সাঁতারু; সমুদ্রের তলদেশে হেঁটে চলাটাই এর মূল চলাচলের মাধ্যম।

প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু
সমুদ্রের তলদেশের এই অদ্ভুত ও নিরীহ প্রাণীটি দেখতে যতটা মজার, এর স্বভাবও ততটাই শান্ত। মানুষের কোনো ক্ষতি এরা করে না। তবে সমুদ্রের তলদেশের তাপমাত্রা পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল আজ হুমকির মুখে পড়ছে।
সাগরের নিচের বিচিত্র দুনিয়ায় রেড-লিপড ব্যাটফিশ যেন এক জীবন্ত বিস্ময় প্রকৃতির ফুসফুসে জমে থাকা অপার সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন!
আরটিভি/এসকে


