ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ফিজিওথেরাপি কী, কেন দরকার?

লাইফস্টাইল ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২০, ০৬:০৬ পিএম
ফিজিওথেরাপির চিত্র

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি বা ফিজিক্যাল থেরাপি হলো এমন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা যা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক স্বতন্ত্রভাবে রোগীর রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসাব্যবস্থা প্রদান করতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিক্যাল থেরাপি (ডব্লিউসিপিটি)-এর মতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক প্রফেশনাল ডিগ্রিধারীরাই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্ট এবং স্বাধীনভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারেন।

ফিজিওথেরাপি

ফিজিও (শারীরিক) এবং থেরাপি (চিকিৎসা) শব্দ দুটি মিলে ফিজিওথেরাপি বা শারীরিক চিকিৎসা। ফিজিওথেরাপি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অন্যতম এবং একটি অপরিহার্য শাখা। শুধু ওষুধ সব রোগের পরিপূর্ণ সুস্থতা দিতে পারে না। বিশেষ করে বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা থেকে যে সব রোগের সৃষ্টি হয়, তার পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় ফিজিওথেরাপি।

ফিজিওথেরাপি হলো একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর সব কথা শুনে-বুঝে, রোগীকে ভালোভাবে দেখে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর সঠিক রোগ, আঘাত বা অঙ্গ বিকৃতির ধরন নির্ণয় করে রোগীকে বিভিন্ন ধরনের ফিজিক্যাল মেথড যেমন ম্যানুয়াল টেকনিক, তাপ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে চিকিৎসা করে থাকেন।

সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, বিকলাঙ্গতা, পক্ষাঘাত ও বড় কোনো অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাত, মাথা, ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, কোমর ও হাঁটুর ব্যথায় এবং স্পোর্টস ইনজুরিতে ফিজিওথেরাপি বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত চিকিৎসাব্যবস্থা।

ফিজিওথেরাপি’র সূচনা ও বাংলাদেশে এর ব্যাপ্তি

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সাম্প্রতিক কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়। হিপোক্রেটাস সেই প্রাচীন গ্রিসে ম্যাসেজ ও ম্যানুয়াল থেরাপি দ্বারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার পরিচয় করিয়েছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ সালে হেক্টর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার একটি শাখা ব্যবহার করতেন যাকে বর্তমানে হাইড্রোথেরাপি বলা হয়। যতটুকু জানা যায়, ১৮৯৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বর্তমান ধারা অর্থাৎ ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, এক্সারসাইজ থেরাপি, হাইড্রোথেরাপি, ইলেক্ট্রোথেরাপি ইত্যাদি প্রবর্তন করা হয়। নিউজিল্যান্ডে ১৯১৩ এবং আমেরিকাতে ১৯১৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু হয়।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির যাত্রা অনেকদিন পরে। বিশদভাবে ও একাডেমিকভাবে ১৯৭২ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বিদেশি ফিজিওথেরাপিস্ট দ্বারা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সূচনা হয়। এর পরে ফিজিওথেরাপির ব্যবহার এ দেশে উত্তর উত্তর বাড়তেই থাকে। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা অনুষদের অধীনে স্নাতক ডিগ্রি চালু করা হয়। বর্তমানে নিটোর, সিআরপি, পিপলস্‌ ইউনিভার্সিটি, গণবিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্সসহ বেশ কয়েকটি ইন্সটিটিউটে ফিজিওথেরাপি গ্রাজুয়েশন কোর্স চালু রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা না থাকায় শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পায় না এবং অপচিকিৎসার শিকার হন।

ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা

আমরা যত আধুনিক প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে চলছি তত বেশি পরিমাণ স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছি। দেখা গেছে শরীরের বিভিন্ন রোগ শুধু ওষুধ দিয়ে নিরাময় করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে যে সব রোগের উৎস বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা, সেসব ক্ষেত্রে ওষুধের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম। যেমন- বাত, কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, আঘাতজনিত ব্যথা, হাড় ক্ষয়জনিত রোগ, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, মুখ বেঁকে যাওয়া, সেরিব্রাল পালসি, স্পোর্টস ইনজুরি ইত্যাদি।

তাহলে এসব রোগ থেকে পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় কী? এ ক্ষেত্রেই চলে আসে ফিজিওথেরাপির কথা। ফিজিওথেরাপি এই সব রোগ থেকে মানুষকে পুরোপুরি মুক্তি না দিতে পারলেও উপশম করে ও উন্নতি হয়।

আবু বকর আফরান: (বিএসপিটি চূড়ান্তবর্ষে অধ্যয়নরত)
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)

জিএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
কেমন ছিল নির্বাচনের সময়ে মাশরাফীর দিনগুলো
৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ২০২০, মাঝে কেটে গেছে দুই বছর। এই দুই বছর আগে এই দিনেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাতীয় নির্বাচন। যেখানে অংশ নিয়েছিলেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সফলতম অধিনায়কের জাতীয় নির্বাচনে আসাটা অনেকে মেনে নিতে পারেননি আবার অনেকে বাহবা দিয়েছেন, চেষ্টা করেছেন উৎসাহ দেয়ার। অনেকের চাওয়া ছিল, তার মতো একজন তরুণের রাজনীতিতে আসাটা দরকার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে তৃনমূল, সবখানেই ছিল পক্ষে বিপক্ষে মতামত। সব ছাপিয়ে মাশরাফী অংশ নেন নির্বাচনে এবং সফলতার সঙ্গে বিজয়ী হন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে পৌঁছে যান নড়াইলে। এই সময় থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত ছিলাম মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সঙ্গে। আমার কাছে ক্রিকেটের মাশরাফী নতুন কেউ না হলেও রাজনীতির মাশরাফী ছিল একদমই নতুন। নড়াইল যাবার আগে একদিন বলছিলেন, আমি নড়াইলে আওয়ামীলীগের অফিসেও যাইনি কখনও। কীভাবে পারব সামলে নিতে! রাজনীতির মাঠে একেবারেই নতুন মাশরাফী কী ভাবে সামলেছিলেন সেসব? যতটা দেখেছি সামনে থেকে সেসবই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। অচেনা পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয় সেটার দৃষ্টান্ত উদাহরণ হতে পারেন মাশরাফী বিন মুর্তজা। ক্রিকেটের কল্যাণে বহু দেশ ঘুরেছেন, বহু দেশের ভৌগলিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে খেলতে হয়েছে দেশের জন্য। এবারের পরিবেশটা একেবারেই ভিন্ন! ক্রিকেটের বাইশ গজ এখনও ছাড়েননি তিনি কিন্তু, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডাকে নেমেছেন রাজনীতির মাঠে। এই মাঠের পরিবেশটা তো একেবারেই নতুন তার জন্য। খেলার মাঠ আর রাজনীতির মাঠ, দুটোর সঙ্গেই মাঠ জুড়ে দেয়া হলেও মাশরাফির কাছে রাজনীতির মাঠ তো একদমই অচেনা! এই মাঠের উইকেটে কখন বাউন্স দিতে হবে কিংবা স্লোয়ার বল ছাড়তে হবে এ নিয়ে তো কখনোই অনুশীলন করেননি মাশরাফী। তবুও দিব্যি মানিয়ে নিচ্ছেন নিজেকে প্রতিটা মুহূর্তে। কি আশ্চর্য! এ যেন যুগ যুগ ধরে অনুশীলন করে তবেই নেমেছেন রাজনীতিতে। সকাল ১০ টায় বের হচ্ছেন বাসা থেকে, ফিরছেন রাত ১টায়। এরপর বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে মিটিং তো আছেই। তা শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাতের ঘুম শেষ। নড়াইল-২ আসনের বিভিন্ন ইউনিয়নের পথে পথে করছেন পথ-সভা, তাতে দুপুরের খাবারটাও খেতে পারছেন না ঠিকঠাক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শেষ করে নিজের নির্বাচনী এলাকায় আসতে একটু দেরিই হয়ে গেছে। দেরি হবার কারণটা ইনজুরি। সিরিজ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচেই পড়েছিলেন হ্যামষ্ট্রিং ইনজুরিতে। যার জন্য দৌড়াতে হয়েছে ডাক্তারের কাছে। ২২ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে রওয়ানা করেন নড়াইলের উদ্দেশে। আসার পথে মাওয়া ফেরী ঘাট থেকেই শুরু হয় নির্বাচনী কার্যক্রম। এরপর কালনা ঘাট থেকে শুরু হয় পথ-সভা। কালনা থেকে নড়াইল সদর। রাস্তার দু’পাশে উৎসুক জনতার ভিড়। প্রিয় নেতাকে একবার দেখার অপেক্ষা। মাশরাফীর গাড়ির বহরে সব মিলে গাড়ি ছিল সাতটা। কোন গাড়িতে আছেন মাশরাফী? রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ প্রতিটা গাড়িতেই উঁকি দিয়ে দেখছেন মাশরাফী কোন গাড়িতে আছেন? এদিন পাঁচটা পথ-সভা শেষে জনতার ঢল ঠেলে উঠলেন মামার বাড়িতে। এখানেও নিস্তার মিলল না। এসেই বের হতে হলো পরের দিনের কর্মসূচী ঠিক করার কাজে। চার দিনের কর্মসূচীতে মোট ৯২টি পথ-সভা। গোটা ৬০টি মোটর সাইকেল নিয়ে মাশরাফী বের হলেন অচেনা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে। গত ১৭ বছর ধরে যিনি সামলেছেন বাইশ গজ আর ক্রিকেটের প্রেস-কনফারেন্স, তাকে আজ থেকে কথা বলতে হবে হাজারো জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে! শুরুটা নিজের জন্মস্থান মাইজপাড়া ইউনিয়ন দিয়ে। দুপুরের নিজের চাচার বাসায় খেলেন, খেয়েই মাইজপাড়া স্কুল মাঠে চলে গেলেন জনসভায়। মাঠে অপেক্ষায় থাকা হাজারো জনতার সামনে এদিনও নিজেকে উপস্থাপন করলেন ‘ক্রিকেটার মাশরাফী’ পরিচয়ে। ‘আমি আপনাদেরই সন্তান, আপনাদেরই ভাই। এই মাঠে আমি কত খেলতে এসেছি। জাতীয় দলে খেলার জন্য অনেকদিন এখানে আর আসা হয়নি কিন্তু সেসব স্মৃতি আমি কখনোই ভুলিনি। এবার আমি আপনাদের কাছে এসেছি আপনাদের একজন হয়ে সমৃদ্ধ নড়াইল গড়তে যদি আপনারা চান। প্রধানমন্ত্রী আমাকে আপনাদের সেবা করার জন্য সুযোগ দিয়েছেন, যার জন্য নৌকা প্রতীক দিয়ে পাঠিয়েছেন আপনাদের কাছে। আপনার সবাই আমাকে ভোট দিয়ে সেই সুযোগটা করে দিবেন। জয় বাংলা’ মিষ্টি না খাইয়ে ছাড়ছেন না মাশরাফীর নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিন থেকে শেষ দিন মিলে মোট চারদিন তার মোটর সাইকেলের বহরে থাকার সুযোগ হয়েছে। তাতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, মাশরাফি কাউকে স্বপ্ন দেখাননি। বলেছেন, আমাকে যদি আপনারা সুযোগ করে দেন তাহলে আমি আমার জান দিয়ে হলেও চেষ্টা করবো আপনাদের জন্য কিছু করার। নড়াইলের মানুষ যেন চাঁদ হাতে পেয়েছে। পথ-সভা যেন প্রাণের সভা। রাস্তার দু’পাশে মানুষের অপেক্ষা যেন তারই প্রতিফলন। কেউ ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রিয় মানুষটিকে পরিয়ে দিতে। কেউবা কাগজ-কলম হাতে দাঁড়িয়ে থামিয়ে দিয়েছেন মোটর-সাইকেলের বহর অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য। সে কি উন্মাদনা পথে-পথে। টিভির পর্দায় দেখা মাশরাফীকে একবার দেখার, ছুঁয়ে দেখার প্রত্যাশায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকেও হতাশ করেননি মাশরাফী। এমনও দেখা গেছে, মাশরাফীকে জড়িয়ে ধরে সত্তরোর্ধ বৃদ্ধাও কেঁদে ফেলেছেন। কেউ ছুটে এসেছেন পিঠা নিয়ে। মাশরাফীও সেটি না খেয়ে থাকেননি। জনতার কাছে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ছুটে গেছেন সাধারণ একজন হয়ে। পাঞ্জাবী, ট্রাউজার, স্যান্ডেল আর একটা পাতলা চাদর তার নিত্য পোশাক। জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি নির্ভার। মন খুলে কথা বলছেন মাইক হাতে তবে রাজনীতির কথা নয়। শুনছেন অবহেলিত নড়াইলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথাগুলো। ঘুরে দেখেছেন নদী ভাঙনে খতিগ্রস্ত এলাকা। এতকিছুর ভিড়েও মাশরাফী ভুলে যাননি প্রতিপক্ষের কথা। নিজের সঙ্গে থাকা সবাইকে সাবধান করে দেন, আমার প্রতিপক্ষ দল যেন কোনও কারণে হেয় না হয়। প্রতিটা ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যেও একই কথা, তারাও কারো ভাই-বন্ধু। তাদের দিকে খেয়াল রাখবেন যেন, তাদের কোনও ক্ষতি না হয়। এমআর/
কেমন ছিল নির্বাচনের সময়ে মাশরাফীর দিনগুলো
অলিম্পিকের মঞ্চ ছেড়ে মুক্তির লড়াই
আজ বলছি শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম মিরাজ উদ্দিন আমার শ্রদ্ধেয় কাকার কথা। আদি বড়ি, পুরাতন পাকা মসজিদ পাঞ্জনখাড়া গড়পাড়া মানিকগঞ্জ  হলেও দাদা মরহুম শরিফ উদ্দিন আহমেদ  হরিরামপুরে বসবাস করছেন। পাকিস্তান অলিম্পিকে স্বর্ণজয়ী বাঙালি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বলতম অ্যাথলেট শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মিরাজউদ্দিন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছেন। বিজয়ের ৪৯ তম বর্ষে জাতীয়ভাবে তো নয়ই; তার জন্মভূমি মানিকগঞ্জেও আলাদা করে কেউ তাকে স্মরণ করেনি । মানিকগঞ্জ  স্টেডিয়ামের নামফলকে শহীদ তপনের সঙ্গে যৌথভাবে অঙ্কিত আছে তার নাম ‘শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়াম’ প্রাপ্তি এটুকুই। প্রবীণেরা মোটামুটি চিনলেও এ প্রজন্মের যারা স্টেডিয়ামে আসেন, তারা মিরাজ নামটাই শুধু জানে। এর বেশি কিছু জানে না। তারা জানে না মিরাজের বর্ণাঢ্য খেলোয়াড় জীবন বা যোদ্ধা জীবনের এক বর্ণও। জানাবার কোনও উদ্যোগও নেই। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ভাটিকান্দা গ্রামে জন্মেছিলেন তিন। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ের সেরা ক্রীড়াবিদ এ.কে.এম. মিরাজউদ্দিন (আলোক)। মাত্র ১১ বছর বয়সে হারিয়েছিলেন বাবা শরীফ উদ্দিন আহমেদকে। মা মরহুমা হাজেরা খাতুন তাকে বড় করেছেন মানুষের মতো করে। মিরাজের লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হরিরামপুরের লেছরাগঞ্জ প্রাইমারি স্কুলে। প্রাইমারি পেরিয়ে তিনি ভর্তি হন হরিরামপুরে পাটগ্রাম অনাথবন্ধু হাইস্কুলে। সেখান থেকে অষ্টম শ্রেণী পাশ করে ভর্তি হন ঢাকার নবকুমার ইন্সটিটিউটে। এরপর জগন্নাথ কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অসাধারণ গড়নের সুদর্শন মিরাজের ক্রীড়া খ্যাতি ঝলসে উঠেছিল স্কুল জীবনেই। তার প্রিয় ইভেন্ট ছিল পোলভল্ট, হার্ডলস এবং লং জাম্প। ১৯৬৩ সালে আন্তঃস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে এ তিনটি ইভেন্টে প্রথম হয়ে ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিলেন মিরাজ। ১৯৬৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ঢাকার জগন্নাথ কলেজের হয়ে ১১০মিটার হার্ডলস, পোলভল্ট এবং লং জাম্পে নতুন জাতীয় রেকর্ড স্থাপন করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত দশম পাকিস্তান অলিম্পিকে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিলেন মিরাজ। পোলভল্টে পাকিস্তান অলিম্পিক রেকর্ড করে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের বাঙালি খেলোয়াড়দের মধ্যে মিরাজই একমাত্র স্বর্ণপদক ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিস্ময়ের বিষয় ছিল মিরাজ ১২ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা অতিক্রম করেছিলেন বাঁশের পোল (লম্বা লগা) দিয়ে। সে সময়ের পাকিস্তান দলের অ্যাথলেটিক্স কোচ জার্মানির হফম্যান বলেছিলেন ‘এই ছেলেটি একটি ফাইবার পোল পেলে এশিয়ান গেমসের রেকর্ডও ভাংতে পারবে।’ বাঁশের পোল দিয়ে মিরাজের গড়া সেই রেকর্ড বহুবছর কেউ ভাঙতে পারেনি। ১৯৭০ সালে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এ তিনটি ইভেন্টে প্রথম হয়ে ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিলেন মিরাজউদ্দিন। একই বছর করাচি হকি ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ পাকিস্তান জাতীয় গেমসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ক্রীড়াদলের পতাকা হাতে মার্চপাস্টের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের সেরা অ্যাথলেট হিসেবে মিরাজকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নিজেকে আটকে রাখেননি মিরাজ। অসাধারণ জনপ্রিয়তা আর বন্ধু বাৎসল্য দিয়ে রাজনীতির মাঠও জয় করছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মিরাজউদ্দিন ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মুহসিন হলের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে অংশগ্রহণের জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় মুক্তির লড়াইয়ে । ২৫ মার্চের কালোরাত্রি সব কিছু উল্টে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  হলসহ  শহরে অলিগলির নির্বিচার গণহত্যার শিকার হয়। কালমাত্র বিলম্ব না করে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে আসেন হরিরামপুর গ্রামে মায়ের কাছে। গ্রামে বসে সংগঠিত করতে থাকেন তরুণদের। মুক্তির লড়াই করতে হবে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিক। খবর আসে মানিকগঞ্জ ছেড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হরিরামপুরে ঘাঁটি গেড়েছেন মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল হালিম চৌধুরী। বিধবা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন হালিমের কাছে হাজির হয়ে যান মিরাজ। পোলভল্টের বাঁশের পোল ধরা হাতে আঁকড়ে ধরেন অস্ত্র। একটির পর একটি গেরিলা যুদ্ধ। আসতে থাকে জয়। যুদ্ধকালীন সেক্টর কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার তবারক হোসেন লুডু ভাইয়ের নেতৃত্বে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ঘটে ঐতিহাসিক গোলাইডাঙ্গা যুদ্ধ। ১৯৬৬ সালে লাহোর স্টেডিয়ামে পোলভোল্টরত মিরাজ উদ্দিন টাইগার লোকমান, নবাবগঞ্জের মনসুর আর মিরাজ কাকাদের মরণপণ হামলায় নিহত হয় ৮১ জন খান সেনা। ২ নভেম্বর ১৯৭১। যুদ্ধজয়ের নেশায় উন্মত্ত মিরাজদের উপর দায়িত্ব পড়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বানিয়াজুরি ব্রিজ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার। রাতের আঁধারে শুরু হয় অপারেশন কিন্তু বিধিবাম। ব্রিজে ডিনামাইট বসাতে গিয়ে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান মিরাজ। তাকে চিনতে দেরি হয়নি হানাদারদের, বন্দী মিরাজকে মানিকগঞ্জের ক্যাম্পে না নিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকার আর্মি হেড কোয়ার্টারে। এখানে জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলে নির্মম নির্যাতন। হাজারও নির্যাতনের মুখে মিরাজের কাছ থেকে সহযোদ্ধাদের খবর বের করতে পারেনি তারা। এরই এক পর্যায়ে আহত মিরাজকে দেখানো হয় পাকিস্তান টেলিভিশনে। পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় দুষ্কৃতি হিসেবে। জোর করে বলানো অনেক কথা। তারপর তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৭ ডিসেম্বর স্বাধীনতার আনন্দে উদ্বেল, স্বর্ণরাঙা সকালে মিরাজের ভাইসহ পরিবারের সবাই ছুটে যান কেন্দ্রীয় কারাগারে। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে নির্মম সত্যটি জানিয়ে দেন-মিরাজ তাদের কাছে নেই। ৮ ডিসেম্বর সকালে আলবদর বাহিনীর পরিচালক মেজর মোস্তাক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মিরাজকে মুক্ত করে পাকবাহিনীর জিপে করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আজও তার কোনও খোঁজ মেলেনি। আলবদর বাহিনী ক্রীড়াঙ্গনের এই নক্ষত্রকে চিনতো বলেই তাকে নিভিয়ে দেওয়ার কথা ভুলেনি। পাকিস্তান আমলে মিরাজের মত উজ্জ্বল নক্ষত্র ক্রীড়াঙ্গনে খুব বেশি ছিল না। যাকে নিয়ে আজ ১৭ কোটি বাঙালি গর্ব করতে পারতো। সেই গর্বের মিরাজ আজ তার রক্তে স্বাধীন ভূমিতেই বিস্মৃত এক অতীত। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়াবিদ হিসেবে।  উল্লেখ্য যে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম মিরাজ উদ্দিন এর আপন ছোট ভাই ছিলেন  বীর মুক্তিযোদ্ধা  এ কে এম সিরাজ উদ্দিন মিলন।  এ কে এম সিরাজ উদ্দিন মিলন ২০১৬ সালে ইন্তেকাল করেন। মানিকগঞ্জ টাউনে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স সংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।  সকল শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি । সেই সাথে সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই শ্রদ্ধা, সালাম এবং বিজয়ের শুভেচ্ছা । লেখক শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম মিরাজ উদ্দিনের চাচাতো ভাতিজা ওয়াই
অলিম্পিকের মঞ্চ ছেড়ে মুক্তির লড়াই
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও আমাদের করণীয়
গোপাল অধিকারী গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত। আর বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। করোনা বাংলাদেশে জোরালো প্রভাব না ফেললেও পূর্ব সতর্কতা বর্তমান পরিসংখ্যানও লোপ করে দিতে পারত বলে মনে করেন অনেকে।  শীতকালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের করোনা জনজীবনে একটি অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এই ভাইরাসটি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনীতি ও শিক্ষা সকল কিছুর উপরই প্রভাব বিস্তার করেছে। তাপমাত্রা ওঠানামার সাথে ভাইরাসের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও নানা কারণে বাড়তে পারে সংক্রমণ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাপমাত্রা কমলে বারবার স্নান করা বা ঘন ঘন কাপড় ধোয়ার প্রবণতা কমবে। ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এছাড়া শীতে রোদ কম থাকলে শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-এর জোগান কমে যায়। ফলে কমে যায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। করোনার ভ্যাকসিন এখনও বাজারে আসেনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বিশ্বজুড়ে। ফলে সাবধানতা অবলম্বন করা ছাড়া সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই। এ পরিস্থিতিতে শীতকাল কতটা উদ্বেগের হয়ে উঠতে পারে? সমীকরণে দেখা যায়, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে করোনা সংক্রমণের ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান বাড়ছে। গত ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫১৯৯০ জন, মৃত্যু ৬৪৪৮ জন, মোট সুস্থ ৩৬৬৮৭৭ জন এবং মোট পরীক্ষা হয়েছে ২৬৮০১৪৯ জনের। গত ২৩ নভেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৪১৯ জন আর মৃত্যু হয়েছে ২৮ জন, ২২ নভেম্বর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২০৬০ জন আর মৃত্যু হয়েছে ৩৮ জন, ২১ নভেম্বর মঙ্গলবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৮৪৭ জন আর মৃত্যু হয়েছে ২৮ জন, ২০ নভেম্বর সোমবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২২৭৫ জন আর মৃত্যু হয়েছে ১৮ জন, ১৯ নভেম্বর রবিবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৩৬৪ জন আর মৃত্যু হয়েছে ৩০ জন। তাতে বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি কিন্তু সরকারি তৎপরতা ও শুদ্ধি অভিযান নেই প্রথমকার মতো। এখন জনসাধারণের অবাধ চলাফেরায় মনে হয় করোনা নেই দেশে।  করোনাভাইরাসের আরেকটি ধাক্কা আসছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, প্রথমবারের অভিজ্ঞতা দিয়ে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সবাইকে সতর্ক থাকতেও বলেন তিনি। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে দ্বিতীয় ধাক্কা সামলানো সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেছেন সরকারপ্রধান। গত রোববার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাগুরা, যশোর ও নারায়ণগঞ্জে তিনটি সেতু উদ্বোধনকালে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, মহামারির এই প্রকোপের মধ্যে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।  ইতোমধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। মাস্ক ব্যবহারের পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য সরকার ইতোমধ্যে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশও দিয়েছে। ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’, অর্থাৎ মাস্ক না পরলে সেবা নেই এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সরকার করোনাবিরোধী প্রচারণা চালাতে যাচ্ছে। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের জন্য কোয়ারেন্টিনের আয়োজন করতে সারা দেশের সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচারণা জোরদার করার কাজও শুরু করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কারণ, বিশ্বের বেশ কিছু দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসার পর দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ দেখা দিয়েছে, এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়েছে ইউরোপে। সেখানে কোনো কোনো শহর বা অঞ্চলকে নতুন করে লকডাউন বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে। কথায় বলে, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়। তাই আমার মতে পূর্বের ভুল আবার করলে সঠিক হবে না বরং পূর্বের অভিজ্ঞাকে কাজে লাগাতে হবে। করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলেই সকল ফ্লাইট বন্ধ করে দিতে হবে। পুরো ঢাকাকে আগে নিরাপদ করা প্রয়োজন। সাথে যে সকল জেলাতে সংক্রমণ বাড়বে সেই সকল জেলাকে লকডাউনের আওতায় আনা জরুরি।   যে কোনো বিষয়ে করণীয় কিছু থাকে। করণীয় কাজ বা সতর্কতা কখনও ক্ষতি করে না। সঙ্কটের সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে নিজেকে ও আশেপাশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকতে সাবান ও পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধুতে বলা হয়েছে ডব্লিউএইচওর নির্দেশনায়। এছাড়া মাংস ও ডিম অবশ্যই যথাযথ তাপে ও ভালোমতো রান্না করে খেতে বলা হয়েছে। হাঁচি ও কাশির সময় অবশ্যই হাত বা টিস্যু দিয়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে। এরপর টিস্যু ফেলে দিতে হবে এবং অবশ্যই হাত ধুয়ে নিতে হবে। যে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার পর হাত ধুতে হবে। কোনো প্রাণির যত্ন নিলে বা স্পর্শ করলে ও প্রাণিবর্জ্য ধরার পরও হাত ধুতে হবে। শরীরে যে কোনো সংক্রমণ এড়াতে রান্না ও খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধুয়ে নিতে হবে। নিজের পাশাপাশি অন্যকে সুরক্ষিত রাখতে করণীয় সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। ব্যবহার করা টিস্যু খোলা ঝুড়ি বা ডাস্টবিনে না ফেলে ঢাকনা রয়েছে এমন ঝুড়িতে ফেলতে হবে। হাতে গ্লাভস না পরে বা নিজে সুরক্ষিত না থেকে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির মুখ ও দেহ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে গবাদিপশু ও বন্যপশুকে ধরার আগেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। রান্নাঘরের কাজেও বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলছে। কাঁচা মাংস, সবজি, রান্না করা খাবার কাটার জন্য ভিন্ন চপিং বোর্ড ও ছুরি ব্যবহার করতে হবে। কাঁচা মাংস, সবজি ও রান্না করা খাবার হাতে ধরার আগে অবশ্যই প্রত্যেকবার হাত ধুয়ে নিতে হবে। রোগে ভুগে মারা যাওয়া বা অসুস্থ প্রাণীর মাংস একেবারেই খাওয়া চলবে না। তবে রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন এলাকাতেও উপযুক্ত তাপে ও ভালোভাবে সিদ্ধ করা মাংস খেলে ঝুঁকি নেই। কাঁচা বাজারে গিয়ে কোনো প্রাণী ও প্রাণীর মাংস হাতে ধরলে দ্রুত হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। কাঁচা বাজারে অবস্থানের সময় অযথা মুখে-চোখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কাজের জায়গাটি দিনে অন্তত একবার হলেও পরিষ্কার বা জীবাণুমুক্ত করতে হবে। পরিধেয়টি অবশ্যই প্রতিদিন বদল করতে হবে এবং ধুতে হবে। সংক্রমণ এড়াতে হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা ভালো। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্কের মধ্যে ভ্রমণ বিষয়েও সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যদি জ্বর-সর্দি অনুভূত হয়, তাহলে যে কোনো ভ্রমণ বাতিল করাই ভালো। পাশাপাশি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও ওষুধ খেতে হবে। জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন এমন কারো সঙ্গে ঘনিষ্ট হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি মাস্ক ব্যবহার করা হয়, তবে নাক ও মুখ ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে। একবার মাস্ক পরলে তা বার বার স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। একবার মাস্ক ব্যবহারের পর ফেলে দিতে হবে। মাস্ক ধরার পর হাতে ধুয়ে নিতে হবে। যদি ভ্রমণের সময় অসুস্থ বোধ হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। এর আগে রোগের ইতিহাস থাকলে সেটাও চিকিৎসককে জানাতে হবে। যেখানে সেখানে বা জনসমাগমের স্থানে থুথু ফেলা যাবে না। অসুস্থ প্রাণী ধরা থেকে সতর্ক থাকতে হবে। এই সর্তকতাগুলো মেনে চলতে হবে। এই করণীয় সতর্কগুলো মানতে জনগণকে বাধ্য করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এককথায় অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে কঠোরভাবে। সরকারের একার পক্ষে করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যবিধি ও করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক দূরত্ব বজায়, মাস্ক ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। নিজ নিজ করণীয় কাজগুলো করলে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ জয় করতে পারা অসম্ভব কিছু নয়। আসুন সকলে মিলে করণীয় কাজগুলো নিজেদের প্রয়োজনেই মেনে চলি, করোনামুক্ত জীবন গড়ি। লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও আমাদের করণীয়
তারুণ্যের রক্ত গরম করে দেয়ার মতো বিপ্লবীর নাম ম্যারাডোনা
ম্যারাডোনাকে ভালোবাসার, শ্রদ্ধার প্রধান কারণ তিনি ফুটবলার এজন্য না, তিনি বিশ্বকাপ বিজয়ী কিংবদন্তী এজন্যও না। মূল কারণ ছিলেন তিনি বিপ্লবী, আমাদের তারুণ্যের রক্ত গরম করে দেয়ার মতো বিপ্লবী। তাই তিনি তার ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছিলেন বিপ্লবের কেন্দ্রে, দেশপ্রেমের কেন্দ্রে। বর্তমান তারকাদের মতো তিনি ছিলেন না। স্রোতের বিপরীতে চলা আমাদের বাবাদের নায়ক, আমাদের স্বপ্নের নায়ক ছিলেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার জয় যতটা না আনন্দের সাগরে ভাসিয়েছিল তার চেয়ে বেশি আনন্দের ছিল ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানো। ইতিহাসে যা বিতর্কিত গোল তাই ছিল ম্যারাডোনার ভাষায় ‘হ্যান্ড অব গড’ । কেন আর্জেন্টিনার জয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিজেই বলেছিলেন ম্যারাডোনা ‘আই অ্যাম এল ডিয়েগো’-তে। তিনি বলেছিলেন, ১৯৮৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়টি ছিল মূলত ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারের প্রতিশোধ। আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ড এখনও স্পর্শকাতর বিষয়। আমাদের পাশের দ্বীপ সেন্টমার্টিন যদি ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরের কোনও দেশ জোরপূর্বক দখলে রাখে তখন কেমন লাগবে একবার ভাবুন? আর্জেন্টিনার পাশের দ্বীপ মালভিনাস দখলে নিয়ে ইংল্যান্ড নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলে। রাখে ফকল্যান্ড নামে। সেই ফকল্যান্ড দ্বীপ যা আর্জেন্টাইনরা ডাকে মালভিনাস নামে, দ্বীপটি নিয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ বাঁধে  ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনার মাঝে। সময়টা তখন ১৯৮২ সাল। শীতল যুদ্ধের সময়কার সেই যুদ্ধে লাতিন বিপ্লবের বেলাভূমি লাতিন আমেরিকান দেশ আর্জেন্টিনা হেরে যায় ইংল্যান্ডের, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ শক্তির কাছে। তরুণ বয়সের ম্যারাডোনা যার বুকে খেলা করে বিপ্লবী চে গুয়েভেরা, ফিডেল ক্যাস্ট্রো তিনি মেনে নিতে পারেননি আর্জেন্টিনার পরাজয়। অবশেষে এলো সেই ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। এলো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ যেন সব উগড়ে দিলেন ম্যারাডোনা একাই। ফলে ম্যারাডোনা একাই ইংল্যান্ডের অহংকার দুমড়ে মুচড়ে ছিড়ে ফেলে ফকল্যান্ড যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ  নিতে চাইলেন। তারপর যা হলো তা ছিল ইতিহাস। ইতিহাসের রাজপুত্র হয়ে ফুটবল বিশ্বে নিয়ে নিলেন তিনি তার সোনার চেয়ারখানি। জীবনে ও মরণে। বিদায় হে বিপ্লবী বীর ম্যারাডোনা। নত মস্তকে তোমায় সেলাম। লেখক, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম বিষয়ক শিক্ষা বিভাগ, ইউডা
তারুণ্যের রক্ত গরম করে দেয়ার মতো বিপ্লবীর নাম ম্যারাডোনা
নতুন এক ইস্যুর নাম ‘ধর্মীয় অবমাননা’
চলমান সময়ে কিছু ঘটনা বিস্ময়ের। ঘুরছে মুখে মুখে। চায়ের দোকানে, কফির আড্ডায়, রেস্তোরাঁয়, বাসে-ট্রেনে, বাসা-বাড়িতে, পথে-ঘাটে বেশ সরব। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দোষারোপের বদভ্যাস, বিষোদগারের তীক্ষ্ণ তীর অন্যদিকে সামাজিক অবক্ষয়ের পতন। সিলেটে এমসি কলেজে ভ্রমণরত দম্পতিকে হেনস্তা, স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে নির্যাতন ও ধর্ষণ! বিবস্ত্র করে এক নারীকে বেধরক প্রহার, যৌনাঙ্গে টর্চলাইট ঢুকিয়ে পৈশাচিক উল্লাস ও তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া। পাহাড়ি মেয়েকে ছয়জন মিলে দলগত যৌন অত্যাচার। ডিবি পুলিশের সদস্যের দ্বারা স্কুলছাত্রীকে প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক সহবাস। থানা হেফাজতে রায়হানের করুণ মৃত্যু। নির্বাহী কর্মকর্তাকে রাতের অন্ধকারে ঘরে ঢুকে হাঁতুড়ি দিয়ে থেঁতলে দেওয়া। সরকারী প্রকৌশলীকে দপ্তরে প্রবেশ করে রক্তাক্ত। কক্সবাজারে প্রদীপ কুমার দাশের দানবীয় রূপ, সিনহা হত্যা। ডিআইডি মিজান। এমপি নিক্সনকাণ্ড। রিফাত-মিন্নির নাটকীয় খুন ও কিশোর গ্যাংদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রসর। কলাবাগানে গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর লেফটেন্যান্টকে সাংসদপুত্রের আহত করার দুঃসাহস এবং তার অবৈধ বহু কাহিনির প্রকাশ। টিকটক গ্রুপের যাচ্ছেতাই…। যেন একের পর এক মগেরমুল্লুকের গল্প।  এই লেখা তৈরির মুহূর্ত পর্যন্ত প্রকাশিত ঘটনার মধ্যে লালমনিরহাটে ধর্মীয় অবমাননার নামে জীবন্ত এক মানুষকে শত শত মানুষ মিলে হত্যা ও লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া পিলে চমকে দিয়েছে অসচেতন, আধা সচেতন, সচেতন মহল সকলের। কী হচ্ছে চারদিকে? খুন আর খুন এখন পান্তা ভাতের মতো সহজ। হাতের মোয়ার মতো সস্তা। চাইলেই যে কাউকে পেটানো যায়, চাইলেই যে কাউকে খুন করা যায়। খুন করতে এখন এক মিনিট সময় লাগে না। জোর করা যায়, দখল করা যায়, কেটে টুকরো টুকরো করা যায় নিমিশে। দেখার লোক আছে, বিচার ব্যবস্থা আছে। তবু কী যেন নেই। কোথায় যেন একটা শূন্যতা উঁচু হয়ে হাহাকার করছে। সে শূন্যতা পূরণ না হলে সামনের দিনগুলোর কথা ভাবাই যাচ্ছে না, চিন্তা করা যাচ্ছে না কী হবে সে দিনগুলোর রঙ।  এই যে লোকটিকে ধর্মের নামে, ধর্মের অবমাননার নামে অল্প সময়ের মধ্যে পেটানো হলো, পৌরসভা থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মারা হলো, দায়িত্বরতদের কাছ থেকে লাশ ছিনিয়ে নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো! কেনো হলো? লোকটি কি সত্যি ধর্মের অবমাননা করেছে? কে কে দেখেছে বা শুনেছে? যারা যারা মেরেছে সবাই কি ওই মুহূর্তে উপস্থিত ছিল? নাকি অল্প কয়েকজন প্রত্যক্ষ করেছে? করলেও কি আইন ছিল না? আইনের হাতে কি সোপর্দ করা যেত না? কেনো করা হলো না? কারা করলো এ কাজ? কিসের রাগ এতো তাদের? কাদের উপর রাগ? আর যে লোকগুলো এক ডাকে জড়ো হলো; কিছু না জেনে, না শুনে, না বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়লো, গায়ের শক্তি ও লাঠিসোটা দিয়ে আঘাত করতে থাকলো; এই লোকগুলোর মানসিকতা কোন জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছে বা উপস্থিত করানো হয়েছে তা কি সত্যি ভেবে দেখার নয়? আইন প্রয়োগকারী ও দায়িত্বপালনকারী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অতিসত্ত্বর এ নিয়ে গবেষণায় বসা উচিত। না হলে আশুদিনে এই লোকগুলোকে সামলানো রাষ্ট্রের পক্ষে দুঃসাধ্য হবে। এমনও তো হতে পারে অন্য বিষয়ে তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে হাতে লাঠি আর বাঁশের বদলে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হলো। তবে কি তারা কিছু রাখবে? যা নির্দেশ দেওয়া হবে তাই তারা করে বসবে। তখন সামলানো হবে কী দিয়ে? ঘটনা হবে ভয়াবহ।  ভাইরাল হওয়া আগুনে পুড়িয়ে মারার ভিডিওটি দেখেছি। সহ্য হচ্ছিল না। গা শিরশির করে উঠছিল। হার্টবিট বাড়ছিল। চোখ স্থির রাখলাম। যে কয়েকজন গুতিয়ে গুতিয়ে আগুনে তাও দিচ্ছিল, গোল হয়ে যারা দাঁড়িয়েছিল, আপনি যদি পরখ করেন, দেখবেন প্রত্যেকে কম বয়সী তরুণ। কিশোর। পায়ে রশি বাঁধা লাশটি আগুনের মধ্যে যারা টেনে টেনে মাছের টুকরোর মতো এপিঠ ওপিঠ করছিল তারা তো নিশ্চয় ঘটনার শুরুতে ছিল না। এদেশীয় প্রেক্ষাপটে মসজিদে সাধারণত বয়স্করা বেশি থাকে। গ্রামে তো আরও। তা হলে ওই বয়স্ক মানুষগুলো কই? টিনেজ কিশোররা এখন বেপরোয়া, উগ্র, যা-ইচ্ছা-তা করার শক্তি রাখে বলে কি তাদেরকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে তবে? লালায় লতিয়ে ওঠা কিশোর, তরুণর কি জানে সঠিক ধর্ম কী? তারা কি ধর্মের আদ্যোপান্ত বুঝে এগিয়ে এসেছে? একটি সমাজে, সংসারে, রাষ্টে কিছু অন্যায় হয়; অন্যায় হলেই কি নির্মমভাবে হত্যা করতে হবে? রাষ্ট্র বা ধর্ম তার কোনটিই কি এর পক্ষপাতিত্ব করে? ধর্মের বিজ্ঞজন যারা তারা কি চুপটি করে থাকবেন? এ সমাজ নষ্ট হয়ে গেলে, ভুল তথ্যে, ভুল ধর্মব্যাখ্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ায় অভ্যস্ত হলে কার ক্ষতি? স্বার্থের কারণে, ব্যবহারে কৌশলী হলে সে ব্যবহার তো একদিন নিজের উপরই পরতে পারে! রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ চিন্তকদের এখনই হতে হবে যুথবদ্ধ। গভীর চিন্তা না করলে দুঃশ্চিন্তায় একদিন স্বাস্থ্যহানী নয় গণপ্রাণহানীর সম্ভাবনা সমুজ্জ্বল।  কেউ কেউ ধর্ম আর রাষ্ট্রকে গোপনে দুই পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ আইনকে অপদস্ত করতে করতে আইনের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি হতে সাহায্য করছে। কেউ কেউ বিচার-ব্যবস্থাকে ভঙুর করে তুলছে। কেউ কেউ প্রশাসনের ভিতর-বাহির থেকে প্রশাসনকে পঙ্গুত্বের দিকে নিচ্ছে। কেউ কেউ সমাজকে নিয়ে খেলছে। কেউ কেউ রাষ্ট আর ধর্মকে নিয়ে জুয়ার আসর বসাচ্ছে। এর পরিণতি কোনদিকে যাবে সে মাত্র পালন কর্তাই জানেন। লৌকিক লোক যে জানে না তাও নয়। কিসের ভয়ে যেন লোকের মুখ বন্ধ। কিসের আশায় যেন তারা দ্বিতীয় পথে চলে যাচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ডে। ঘটিয়ে ফেলছে দুর্ঘটনা। সচেতন চোখ না ফেরালে আসবে কালো কাল। তমশা ঘিরে ধরবে সবদিক থেকে। ছুটে পালাবার পথ হবে রুদ্ধ। অনিরুদ্ধ আলো থমকে মরবে। আলো ছড়িয়ে পড়বে না। সে আলোয় আলোকিত হবে না একটি মুখও। গভীর অন্ধকার কেবল জেঁকে ধরবে ভালো-মন্দ সকল পক্ষকে। তাতে শুধু রাষ্ট্রই বিনষ্ট হবে না, অরাজকতার তৈরি হবে ডানে-বামে চতুর্দিকে। ইদানিং ‘ধর্মীয় অবমাননা’ ইস্যুর নামে যে কেউ যে কাউকে নাস্তিক-আস্তিকের দ্বিধান্বিত শিরোনামে জড়িয়ে-পড়ছে তর্কে, অপমান-অপদস্তে। মেজাজ হারিয়ে ঝুঁকছে আক্রমণের দিকে। ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ যেমন ধর্ম নিয়ে বয়ান দিচ্ছেন, অজ্ঞজনও বক্তৃতায় ভারী করছেন আশপাশ। জানা ও অজানা যে কেউ লিপ্ত হচ্ছেন হাতাহাতি ধস্তাধস্তিতে। ধর্মকে এত সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে যে, প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সকল কিছুতে ধর্মযুদ্ধ ভাব যেন। ধর্মী ও বিধর্মীর মধ্যে এ যুদ্ধ নয়। স্বধর্মের মধ্যেই এই যুদ্ধংদেহী অবস্থা। পান থেকে চুন খসলেই ধর্মের দোহাই দিয়ে ভাংচুর, মারামারি। ধর্ম তো একান্ত নিজের বিষয়। সে নয় কি? ধর্ম কি মারামারির কথা বলে! ধর্ম কি তর্কাতর্কি, হাতাহাতির কথা বলে! শান্তির যে ধর্ম সে ধর্মকে আজকাল পাওয়া খুব কষ্ট, কিছু ধর্মলেবাসির কারণে। হাটে-বাজারে ধর্ম নিয়ে যাদেরকে দেখি সরব তাদেরকে খোঁজ করলে তাদের ধর্মশিক্ষা কতটা পাই? ধর্মে শিক্ষিত যারা তারা মায়ায় মমতায় পরিবেশ শান্ত করেন, সত্য বোঝাতে সচেষ্ট হবেন। তাই তো হওয়া উচিত। ধার্মিকগণ সামনে এগিয়ে না এলে সামনে এক অদ্ভুত আঁধার সময় অপেক্ষা করছে। মনে হয় রাষ্ট্রকে ভিন্নভাবে নজরদারী করতে হবে। মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনে সচেতনামূলক কার্যপরিচালনা করতে হবে। মানসিক পরিবর্তনের বাঁকের দিকে করতে হবে দৃষ্টিপাত। রাষ্ট্রের এখন সবচেয়ে বড় খেয়াল করা দরকার ধর্মের নামে যে চিড় ধরছে তা কী করে কমানো যায়। অবিশ্বাস হলেই- যে কাউকে মেরে ফেলার যে চিন্তা তা কী করে দূর করা যায়।  আগে দেখতাম মসজিদ সামাজিক নামাজ আদায়ের ঘর। সমাজের সব মানুষ মসজিদে নামাজ পড়তো। সামাজিক বন্ধনে মসজিদ একটা দৃঢ় বন্ধনের আশ্রয় হতো। এখনও হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মসজিদকে কেন্দ্র করে এক প্রকার রাজনৈতিক অপচেষ্টাও চলে। দুষ্টু লোকেরা তা করছে। যদি ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি, ব্যবসা বা কূটকৌশল হয় তবে তা ধর্মের জন্যই অমঙ্গল। সারা পৃথিবীতে এমনিতেই মুসলিম ধর্ম নিয়ে দ্বেষ-বিদ্বেষ চলছে। ধর্মের প্রতি যেন সাধারণ মানুষের বিশ্বাস হালকা না হয় সে দিকটার দিকে ধার্মিক জ্ঞানীদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সমাজকে সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রকেও তদারকি করতে হবে; তা যেন কারো ব্যবহারে অসৎ দিকে না যায়।   যে কোনো মৃত্যুই ব্যথিত করে। অন্যায় বিচলিত করে। উগ্রতা অশান্তিতে ফেলে। আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা করে শঙ্কিত। প্রতিটি বিষয় যার যার নিয়মে সঠিক পথে চলবে সে প্রত্যাশ সকলের। অযাচিত মৃত্যু যেন না হয়। অন্যায় যেন সীমা না ছাড়ায়। উগ্রতা যেন প্রশ্রয় না পায়। আইন যেন তার নিজস্ব পথে থাকে। রাষ্ট্রকেই তা ঠিক করতে হবে। দুষ্টু লোক সবজায়গায় ছিল, আছে, থাকবে। দুষ্টুকে দমন করার জন্যই তো আইন। আইন দেখার জন্যই তো রাষ্ট্র। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার ভার তো রাষ্ট্রের হাতেই। রাষ্ট যদি পিচ্ছিল পথে হাঁটতে ভয় পায়, নড়বড় করে, তার কর্মদায়িত্ব থেকে অলস হয়ে পড়ে, একরোখা বা একদিকের পথচারী হয় তবে তা রাষ্টের জন্যই বিপজ্জনক। বিশ্বাস করি, লালমনিরহাটের বর্বরোচিত কাজটি কোনো সঠিক ধার্মিক মানুষেদের দ্বারা ঘটেনি। যারা ঘটিয়েছে তারা সঠিক ধর্ম হতে বিচ্যুত অথবা ভুল ব্যাখ্যার দ্বারা ভ্রান্ত। এমন কাণ্ড যেন আর ফিরে না আসে। রাষ্ট্রকে বলি, উদার হোন। সজাগ হোন, আরও আরও।  জোবয়ের মিলন: কবি ও সাংবাদিক  
নতুন এক ইস্যুর নাম ‘ধর্মীয় অবমাননা’
আরও পড়ুন
দাঁতের স্কেলিং কেন দরকার? কতদিন পর করবেন জেনে নিন