
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল ২৪টি ট্রমা সেন্টার। এসব কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে দুই দফায় ব্যয় হয়েছে অন্তত ১৪০ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ কেন্দ্রে চালু হয়নি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা। কোথাও সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের সেবা চলছে, কোথাও ভবন ব্যবহৃত হচ্ছে অন্য কাজে। জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে অধিকাংশ কেন্দ্রই কার্যত অকার্যকর।
আজ ১৭ অক্টোবর বিশ্ব ট্রমা দিবস। জরুরি পরিস্থিতিতে আহত ব্যক্তিদের জীবন রক্ষা, দ্রুত চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং দুর্ঘটনাজনিত আঘাত ও মৃত্যু কমাতে সচেতনতা বাড়ানোই দিবসটির মূল লক্ষ্য। এমন দিনে দেশের মহাসড়ককেন্দ্রিক জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা ও ট্রমা সেন্টারগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দিতে দেরি হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মাথা ও বুকে আঘাত কিংবা হাড় ভাঙার মতো ঘটনায় দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার সচল থাকলে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং প্রয়োজন হলে উন্নত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব।
২০০৪-০৫ অর্থবছরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে প্রথম পর্যায়ে ১০টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১০ সালে আরও ১৪টি কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দুই দফায় মোট ২৪টি কেন্দ্র নির্মিত হলেও অধিকাংশেই নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। মাত্র দুটি কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের সেবা চালু রয়েছে। আরেকটি কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন পরামর্শক চিকিৎসক, তিনজন হাড় ও অস্থিসংক্রান্ত অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞ, দুজন অবেদনবিদ এবং দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি ১০ জন নার্স এবং ওষুধবিদ, এক্স-রে পরীক্ষকসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় অধিকাংশ কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও নেই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, বড় বড় সড়ক ও মহাসড়ক নির্মিত হলেও সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে প্রতিবছর সড়কে প্রাণহানি বাড়ছে। যাত্রীদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়নি। এখন সরকার এগুলো চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, যা ইতিবাচক। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব ট্রমা সেন্টারেও জনবলসংকটের কারণে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম এখনো শুরু করা যায়নি।
একই পরিস্থিতি সুনামগঞ্জের ছাতক ট্রমা সেন্টারেও। জেলার সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ গণমাধ্যমকে জানান, স্থায়ী জনবল না থাকায় কেন্দ্রটির সেবাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা সেখানে কিছু সেবা দিয়ে থাকেন।
মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার পরিস্থিতি থেকে। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ।
ভাঙ্গা উপজেলার সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের নাদিম গণমাধ্যমকে বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ট্রমা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সচল থাকলে আহত ব্যক্তিরা দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা পেতেন। ভাঙ্গা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও বেশি ঘটে। এ এলাকায় একটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হলে আহত ব্যক্তিরা দ্রুত সেবা পেতেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, ট্রমা সেন্টারকে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না; জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুতর রোগীকে উন্নত হাসপাতালে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। পাশাপাশি নিকটবর্তী জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো আধুনিকায়ন করে ‘দুর্ঘটনা ও জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র’ নামে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে এসব কেন্দ্রের সেবা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম গণমাধ্যমকে বলেন, ট্রমা সেন্টারগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই এগুলোর কার্যক্রম শুরু করা হবে। পাশাপাশি মহাসড়কে প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর অ্যাম্বুলেন্স রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত আহত ব্যক্তিদের সেবা দেওয়া যায়। নতুন আরও কয়েকটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ট্রমা বলতে দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো ঘটনার কারণে শরীরে সৃষ্ট গুরুতর আঘাতকে বোঝায়। সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সহিংসতার মতো ঘটনায় এমন আঘাত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হতে পারে, এমনকি মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতাও দেখা দিতে পারে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় বিভিন্ন ধরনের আঘাতের কারণে। মোট মৃত্যুর প্রায় ১০ শতাংশ এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। আঘাতজনিত মৃত্যুর পাশাপাশি মস্তিষ্কে আঘাতসহ বিভিন্ন কারণে বহু মানুষ দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার শিকার হন।
জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা, রক্তক্ষরণ বন্ধ করা, হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে পুনরুজ্জীবন পদ্ধতি প্রয়োগ এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অনেক দেশে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল ও দ্রুত রোগী পরিবহনের অভাব রয়েছে।
বিশ্ব ট্রমা দিবসের উদ্দেশ্যও এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো। দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। বাংলাদেশের ২৪টি ট্রমা সেন্টার দ্রুত সচল করা গেলে মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
আরটিভি/জেএমএ


