
বাংলাদেশে সন্তান দত্তক নেওয়ার বিষয়টি ধর্মভেদে ভিন্ন আইনি কাঠামোর অধীন। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর হিন্দুদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে দত্তক নেওয়ার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অভিভাবকত্ব পাওয়া এবং সন্তান দত্তক নেওয়া এক বিষয় নয়।
সন্তান না হওয়ায় চিকিৎসার পাশাপাশি ভারত ও সিঙ্গাপুরেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছিলেন সিফাত (ছদ্মনাম)। বিয়ের সাত বছর পরও কোনো ফল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শিশু নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব না নিয়ে ছয় বছর আগে স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করে একটি শিশুকে নিজের কাছে নেন।
সিফাত জানান, তখন শিশুটির বয়স ছিল মাত্র ১৮ দিন। শিশুটির জৈবিক বাবা-মায়ের সঙ্গে করা চুক্তিতে বলা হয়, ভবিষ্যতে তারা শিশুটিকে নিজেদের কাছে নিতে পারবেন না। এর বিনিময়ে তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। তবে আইনজীবীরা বলছেন, এভাবে স্ট্যাম্প পেপারে চুক্তি করে শিশু নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়।
মুসলিমদের ক্ষেত্রে দত্তক নয়, অভিভাবকত্ব
আইনজীবীদের মতে, মুসলিম আইনে সন্তান দত্তক নেওয়ার কোনো বিধান নেই। ফলে বাংলাদেশে অনেক সময় যে ‘দত্তক’ নেওয়ার কথা বলা হয়, সেটি মূলত শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া।
‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০’ অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে শিশুকে নিজের জিম্মায় রেখে লালন-পালন করা সম্ভব হলেও সে আইনগতভাবে অভিভাবকের জৈবিক সন্তান হয়ে যায় না।
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন বা শরিয়াহ অনুযায়ী এতিম কিংবা অসহায় শিশুকে লালন-পালন করা যায়। তবে শিশুর বাবা-মায়ের নামের জায়গায় লালন-পালনকারী বাবা-মায়ের নাম ব্যবহার করা ইসলামী আইনে বৈধ নয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বলেন, গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০ অনুযায়ী যে কেউ কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন। তবে মুসলিম আইনে দত্তকের ধারণা নেই। কোনো শিশুকে নিয়ে বিরোধ না থাকলে কয়েকটি শুনানির মাধ্যমেই অভিভাবকত্ব পাওয়া সম্ভব। বিরোধ বা জটিলতা থাকলে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে সময় আরও বেড়ে যায়। এ ধরনের আবেদনে আদালত শিশুর সর্বোচ্চ স্বার্থ ও সর্বোত্তম কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়।
নাজমা (ছদ্মনাম) বিয়ের ১১ বছর পর সন্তান না হওয়ায় শিশু নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় দুই বছর আগে এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে পরিচিতজনদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আদালতের মাধ্যমে কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়া যায়।
পরে তিনি আজিমপুরের সরকারি শিশু সদনে যোগাযোগ করেন। সেখানে দেড় মাস বয়সী একটি মেয়েশিশুকে পছন্দ করেন। শিশুটিকে মাত্র তিন দিন বয়সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে যাওয়া হয়েছিল।
শিশুটির অভিভাবকত্ব পেতে পারিবারিক আদালতে আবেদন করেন নাজমা। কয়েক মাস শুনানির পর কিছু শর্ত সাপেক্ষে আদালত তাকে শিশুটির অভিভাবকত্ব দেন।
নাজমা বলেন, শিশুটির ভবিষ্যৎ কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আদালত তার পড়ালেখার খরচের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা এফডিআর করে রাখতে বলেন। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি সরকারি দপ্তরে রসিদও জমা দেন।
আদালত যখন নিশ্চিত হয় যে তিনি শিশুটির দায়িত্ব নিতে সক্ষম, তখন তাকে শিশুটির আইনগত অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। আদালতসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
হিন্দুদের ক্ষেত্রে দত্তকের সুযোগ
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। হিন্দু উত্তরাধিকার আইন (সংশোধিত) অনুযায়ী সন্তান দত্তক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ আইনে দত্তক সন্তান ও জৈবিক সন্তানের মধ্যে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা হয় না।
তবে উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশের পর বর্তমানে শুধু ছেলে শিশুকে দত্তক নেওয়ার বিষয়টি আইনসিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন আইনজীবীরা। অর্থাৎ এ আইনের আওতায় শুধু ছেলে শিশুকেই দত্তক নেওয়া যায়।
হিন্দু পুরুষ বিবাহিত, অবিবাহিত কিংবা বিপত্নীক যেকোনো অবস্থায় সন্তান দত্তক নিতে পারেন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একজন অবিবাহিত হিন্দু নারী সন্তান দত্তক নিতে পারেন না। বিবাহিত নারীকে সন্তান দত্তক নিতে হলে স্বামীর অনুমতি প্রয়োজন। হিন্দু বিধবা নারীও সন্তান দত্তক নিতে চাইলে স্বামীর মৃত্যুর আগে দেওয়া অনুমতিপত্র দেখাতে হবে।
খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও অভিভাবকত্ব
মুসলিম আইনের মতো খ্রিস্ট ধর্মেও সন্তান দত্তক নেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। এ ধর্মের অনুসারীরা ‘গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০’ অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব পেতে পারেন।
বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি
১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের শিশু অধিকার কনভেনশন গৃহীত হলেও বাংলাদেশ দত্তক গ্রহণ-সংক্রান্ত ২১ নম্বর ধারায় অনুস্বাক্ষর করেনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে মুসলিম ধর্মীয় বিধানে দত্তক গ্রহণের স্বীকৃতি না থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
তবে যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে একটি বিশেষ আইন করা হয়েছিল। ওই আইনে এতিম ও পরিত্যক্ত শিশুদের দত্তক নেওয়ার সুযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে শিশু পাচার ও ধর্মান্তরের অভিযোগ সামনে আসার পর ১৯৮২ সালে আইনে সংশোধন আনা হয়। এরপর বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশি শিশু দত্তক দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
তবে বিদেশে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হলে তিনি অভিভাবকত্বের মাধ্যমে কোনো শিশুকে নিজের জিম্মায় নিতে পারেন। শিশুকে দেশের বাইরে নিতে হলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে। আদালতের অনুমতি পাওয়ার পরই শিশুকে দেশের বাইরে নেওয়া যাবে বলে জানান আইনজীবীরা।
পালক সন্তানের সম্পত্তির অধিকার
আইন অনুযায়ী, জৈবিক সন্তান ছাড়া পালক সন্তান স্বাভাবিকভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। মুসলিম ও খ্রিস্টান আইনে কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পেলেও সে পালক বাবা-মায়ের সম্পত্তির আইনগত উত্তরাধিকারী হয় না।
মুসলিমদের মধ্যে পালক সন্তানকে হেবা বা উপহার হিসেবে সম্পত্তি দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। তবে এভাবে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা রয়েছে। তার মতে, হেবা করতে হলেও সেটি নিকট রক্তসম্পর্কের মধ্যে হতে হবে। তবে মুসলিমরা ওসিয়তের মাধ্যমে পালক সন্তানকে সম্পত্তি দিতে পারেন। আইন অনুযায়ী মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ওসিয়ত করা যায়।
ওসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। পুরো সম্পত্তি ওসিয়ত করার সুযোগ নেই। পালক বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর পালক সন্তানকে ওই সম্পত্তি ভোগ করতে হলে অন্য ওয়ারিশদের অনাপত্তি প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ‘সন্তান দত্তক নেওয়া’ কথাটি প্রচলিত হলেও এর আইনি কাঠামো ধর্মভেদে ভিন্ন। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে মূলত আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর হিন্দুদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে দত্তক নেওয়ার আইনি ব্যবস্থা রয়েছে।
আরটিভি/এসকে


