
সত্যজিৎ রায় একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অনেক সময় তার চারপাশে কাজ, মানুষ, সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে ভীষণ একা মনে করতেন। একই অভিজ্ঞতা ছিল কিশোর কুমারেরও। মৃত্যুর আগে তিনি একাকীত্বে ডুবে গিয়েছিলেন, এমনকি একাকীত্ব কাটাতে গাছের সঙ্গে কথা বলতেন। এ ছাড়া পৃথিবীর বহু মহীরুহের জীবনেই একাকীত্ব জায়গা করে নিয়েছিল। স্পষ্ট যে, একাকীত্ব নামের বিশাল দৈত্যের সঙ্গে লড়াইয়ে কেউই সুবিধা করতে পারেননি। এই অনুভূতি এতটাই ভয়ঙ্কর যে, মানসিক জটিলতা থেকে শুরু করে মৃত্যু ভাবনাতেও মানুষকে ঠেলে দিতে পারে।
একাকীত্ব আসলে কী? মানুষ যখন আশেপাশে মানুষের অভাব অনুভব করে, কিংবা মনে করে তাকে কেউ বুঝতে পারছে না, তখনই জন্ম নেয় একাকিত্ব। যেহেতু মানুষ অনুভূতিসর্বস্ব প্রাণী, তাই সে সবসময় কাউকে চায় যে তার অনুভূতিকে বুঝবে, গ্রহণ করবে, ভ্যালিডিটি দেবে। সে মানুষটি যখন থাকে, তখন সে মরিয়া হয়ে তাকে ধরে রাখতে চায়, আর একদিন যখন সেই মানুষটি হারিয়ে যায়, তখন আবার একাকিত্ব তাকে গ্রাস করে। এখান থেকেই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত অবস্থা, যাকে বলা হয় ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল। এটি হলো মানুষের এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ইমোশনাল এনার্জি ক্রমাগত খরচ হতে থাকে, কিন্তু কখনো ফিরে আসে না। ধীরে ধীরে মানুষ অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ে।
ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের কারণ অনেক, তবে মূলত দুটো বিষয়কে দায়ী করা যায়—বাহ্যিক কারণ এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব। বাহ্যিক কারণগুলোর মধ্যে আছে টক্সিক সম্পর্ক, যেখানে একজন সবকিছু পায় আর অন্যজন অবহেলিত হয়। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অনেকেই শুধু নেয় কিন্তু দেয় না, যার ফলে অপর প্রান্তে থাকা মানুষটির ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। অফিস কালচারে স্বার্থপর সহকর্মী কিংবা কর্তৃত্বপরায়ণ বসও অনেক সময় একইভাবে মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এসব পরিস্থিতির ভুক্তভোগীরা সাধারণত তাদের আবেগ ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারেন না, ফলে ভেতরে জমতে থাকে শূন্যতা, আর সেখান থেকেই আসে একাকিত্ব এবং ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল।
অন্যদিকে অন্তর্দ্বন্দ্বও বড় ভূমিকা রাখে। যেমন, ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স—যারা সবসময় নিজেকে ছোট মনে করেন, সেলফ ডাউটে ভোগেন, তারা অন্যের কাছ থেকে ক্রমাগত ভ্যালিডেশন খোঁজেন। কিন্তু যতই ভালোবাসা বা মনোযোগ তারা পান না কেন, তাদের ভেতরের শূন্যতা কখনোই পূরণ হয় না। এরপর আছে ইমোশনাল ট্রমা—যে মানুষ প্রিয়জন হারিয়েছে, শৈশবে বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, অথবা বারবার অবহেলা ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে, তার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের স্থায়ী শূন্যতা তৈরি হয়। আরেকটি কারণ হলো নেতিবাচক চিন্তাভাবনা। যারা সবসময় ভয় ও সন্দেহে ভোগেন, তারা এক ধরনের মানসিক লুপে আটকে পড়েন, যেখান থেকে বের হওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
তবে সুখবর হলো, ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল থেকে বের হওয়া সম্ভব। প্রথম শর্ত হলো স্বীকার করা যে আপনি এই অবস্থার মধ্যে আছেন এবং এখান থেকে বের হতে চান। তারপর সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আশেপাশে থাকা সম্পর্ক, কাজ বা মানুষের প্রভাব কতটা ইতিবাচক আর কতটা নেতিবাচক—তা খুঁজে বের করতে হবে। নিজেকে প্রাধান্য দিতে হবে, কারণ দায়িত্ব, প্রত্যাশা বা টক্সিক মানুষ থাকবে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় কিছু নয়। এজন্য প্রয়োজন সবার সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সীমারেখা তৈরি করা।
নিজেকে সময় দেওয়াও জরুরি। এর মানে এই নয় যে সবকিছু ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে হবে। বরং মানুষের মাঝেই থেকে ছোট ছোট কাজ করা যায়—মেডিটেশন, প্রিয়জনের সঙ্গে কথা, কিংবা রুটিন থেকে সামান্য বিরতি। প্রতিদিনের জীবনে এমন কিছু কাজ যোগ করতে হবে যা মনকে শান্ত রাখে। একইসঙ্গে নেতিবাচক চিন্তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কোনো নেগেটিভ থট আসলে সেটিকে পজিটিভ থট দিয়ে প্রতিস্থাপন করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। শুরুতে কঠিন হলেও সময়ের সঙ্গে এটি সহজ হয়ে যায়। অনেকেই কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, মাইন্ডফুলনেস বা কৃতজ্ঞতার চর্চার মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তার প্রভাব কমিয়ে আনতে পারেন।
সবশেষে আসলে এটি এক ধরনের ঝড়ের মতো। হারুকি মুরাকামি তার Kafka on the Shore উপন্যাসে লিখেছিলেন—ঝড় একসময় থেমে যায়, কিন্তু তখন আর আপনি আগের মানুষটি থাকেন না। আপনি পাল্টে যান। ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল থেকে বের হওয়াটাও তেমনি। এটা বেঁচে থাকার লড়াই—মেলানকোলির সাগরে ডুবে না গিয়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার লড়াই। যারা এই লড়াই জিততে পারেন, তারাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হন।
আরটিভি/এফএ




