
ইয়ারবাডে গান শোনা, ফোনে কথা বলা কিংবা নানা কিছু শোনার অভ্যাস এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অনেকেই দিনের বড় একটা সময় কানে ইয়ারবাড লাগিয়ে রাখেন। বাইরে থেকে ক্ষতিকর কিছু মনে না হলেও দীর্ঘ সময় ধরে এবং বেশি শব্দে ইয়ারবাড ব্যবহারে কানের ভেতরে ধীরে ধীরে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শব্দ কতটা জোরে হচ্ছে তা নয়, কতক্ষণ এবং কত ঘন ঘন কানে সেই শব্দ পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কানের ভেতরে কী ক্ষতি হয়?
ইয়ারবাড কানের পর্দার খুব কাছাকাছি থাকে। ফলে বেশি শব্দ সরাসরি কানের ভেতরে পৌঁছায়। দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দ শুনলে অন্তঃকর্ণের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র সংবেদনশীল কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব কোষ শব্দ শনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলো আর আগের মতো ফিরে আসে না।
শুধু বেশি শব্দেই নয়, মাঝারি মাত্রার শব্দেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইয়ারবাড ব্যবহার করলে কান পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। এতে দীর্ঘমেয়াদে শ্রবণশক্তির ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
চারপাশের শব্দ ঢাকতে বাড়ে বিপদ
কোলাহলপূর্ণ জায়গায় ইয়ারবাড ব্যবহার করার সময় অনেকেই বাইরের শব্দ কম শোনার জন্য শব্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেন। এতে কানের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
আবার কানে ঠিকমতো না বসা ইয়ারবাডের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। আশপাশের শব্দ ভালোভাবে শুনতে না পাওয়ায় ব্যবহারকারী অজান্তেই শব্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন।
কানে খৈল জমেও সমস্যা হতে পারে
দীর্ঘদিন ইয়ারবাড ব্যবহারের আরেকটি সমস্যা হলো কানে অতিরিক্ত খৈল জমা। এর ফলে কান বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে এবং সাময়িকভাবে কম শোনার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি সবসময় স্থায়ী শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণ নয়, তবে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
গবেষণায়ও মিলেছে সতর্কবার্তা
২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় বিশ্বের ২৩টি গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে ইয়ারফোন ও হেডফোন ব্যবহারের সঙ্গে শব্দজনিত শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তিগত গান শোনার যন্ত্রের শব্দের মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে, যা দীর্ঘ সময় ব্যবহারে কানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। একটি গবেষণায় প্রতিদিন দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম ব্যবহারকারীদের তুলনায় শ্রবণশক্তি কমে যাওয়ার হার বেশি পাওয়া যায়।
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে হেডফোনে বেশি শব্দ শোনায় অভ্যস্ত কিশোর-কিশোরীদের শ্রবণ সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
দিনে কতক্ষণ ইয়ারবাড ব্যবহার করবেন?
সবার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ শব্দের মাত্রা, ব্যবহারের সময় এবং ব্যবহারের ধরন—সবকিছুর ওপর ঝুঁকি নির্ভর করে।
তবে শ্রবণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণভাবে ৬০-৬০ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ, শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চের প্রায় ৬০ শতাংশের মধ্যে রাখা এবং একটানা প্রায় ৬০ মিনিটের বেশি না শোনা। এরপর কানে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া ভালো।
একটানা সারাদিন ইয়ারবাড পরে থাকার বদলে নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং দৈনিক ব্যবহার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, যারা একটানা এক ঘণ্টার বেশি সময় ইয়ারফোন ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে ইয়ারফোন-সম্পর্কিত কানের সংক্রমণের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
কানের যত্নে যা মনে রাখবেন
ইয়ারবাড ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে দীর্ঘ সময় একটানা ব্যবহার না করে মাঝেমধ্যে কানকে বিশ্রাম দিতে হবে। শব্দের মাত্রা কম রাখতে হবে এবং কোলাহলপূর্ণ জায়গায় শব্দ বাড়িয়ে শোনার অভ্যাস এড়িয়ে চলতে হবে।
কানে ব্যথা, ভোঁ ভোঁ শব্দ, কান বন্ধ লাগা কিংবা আগের তুলনায় কম শোনার মতো সমস্যা দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আরটিভি/জেএমএ

