
ঢাকার রাস্তায় চলতে গেলে প্রায়ই কানে আসে, ওস্তাদ, বামে প্লাস্টিক, ডাইনে টেসলা, বরাবর, সামনে ক্লিয়ার। প্রথমবার শুনলে এসব কথা শুনে যে কারও মনে হতে পারে, প্লাস্টিক আর টেসলা বুঝি রাস্তার কোনো বস্তু বা গাড়ির নাম। কিন্তু ঢাকার যানজটে নিয়মিত চলাচলকারীরা জানেন, এসব কথার রয়েছে আলাদা অর্থ।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় যানবাহনের ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘ কথা বলার সুযোগ নেই। কোন গাড়ি কোন দিকে, সামনে রাস্তা কতটা ফাঁকা, কোথা দিয়ে এগোতে হবে—এসব দ্রুত বোঝাতেই বাসের হেলপাররা ব্যবহার করেন ছোট ছোট কিছু শব্দ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শব্দগুলোই যেন ঢাকার রাস্তায় এক ধরনের সাংকেতিক ভাষা হয়ে উঠেছে।
‘বামে প্লাস্টিক’ মানে কী
‘ওস্তাদ, বামে প্লাস্টিক’—ঢাকার রাস্তায় বেশ পরিচিত একটি কথা। এখানে ‘প্লাস্টিক’ বলতে পরিবেশের কোনো সমস্যা বোঝানো হয় না। বরং চকচকে, সুন্দর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিগত গাড়িকে বোঝাতে হেলপাররা ‘প্লাস্টিক’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
বিশেষ করে গাড়ির ধরন বা গায়ের উপাদান দেখে দ্রুত আলাদা করে বোঝানোর জন্য এসব নাম ব্যবহার করা হয়। ফলে দীর্ঘ বর্ণনা না দিয়ে একটি শব্দেই আশপাশের গাড়ি সম্পর্কে চালককে ধারণা দেওয়া সম্ভব হয়।
‘বরাবর’ শব্দের বড় অর্থ
‘বরাবর’ শুনতে ছোট একটি শব্দ হলেও ঢাকার যানজটে এর অর্থ বেশ বিস্তৃত। এর মাধ্যমে চালককে মূলত সামনে এগিয়ে যেতে বলা হয়।
প্রয়োজনে ডানে-বামে একটু এঁকেবেঁকে যেতে হতে পারে, রাস্তা সরু হলেও এগিয়ে যেতে হবে কিংবা পরিস্থিতি কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও থামা যাবে না—সব মিলিয়ে এগিয়ে চলার নির্দেশ বোঝাতে ‘বরাবর’ বলা হয়।
‘সামনে ক্লিয়ার’ মানেই রাস্তা ফাঁকা নয়
‘সামনে ক্লিয়ার’ শুনলে মনে হতে পারে সামনের রাস্তা পুরোপুরি ফাঁকা। কিন্তু যানজটে এর অর্থ সবসময় এমন নয়। অনেক সময় গাড়ির চাকা সামান্য নড়তে শুরু করলেও হেলপাররা এই কথা বলেন। কখনো আবার গাড়ি না নড়লেও চালককে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে বলা হয় ‘সামনে ক্লিয়ার’।
অর্থাৎ এটি অনেকটা আশাব্যঞ্জক সংকেত হিসেবেও কাজ করে।
এই ভাষা কোথা থেকে আসে
বাসের হেলপাররা সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকার এই সাংকেতিক ভাষা শেখেন না। বরং দীর্ঘদিন ঢাকার রাস্তায় কাজ করতে করতে নিজেরাই এসব শব্দ ও সংকেত শিখে নেন।
জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন এলাকা, যেমন নোয়াখালী, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ থেকে অনেক মানুষ ঢাকায় এসে হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাদের কথাবার্তায় নিজ নিজ এলাকার আঞ্চলিক ভাষার টান থাকে। এক অঞ্চলের মানুষের কাছে অন্য অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা অনেক সময় সহজে বোঝা যায় না।
কিন্তু ঢাকার ব্যস্ততা তাদের যোগাযোগের ধরন বদলে দেয়। এখানে দীর্ঘ বাক্য বা শুদ্ধ ব্যাকরণের চেয়ে দ্রুত ও স্পষ্টভাবে পরিস্থিতি বোঝানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছোট ও সহজ কিছু শব্দই তাদের যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
যানজটই তৈরি করেছে এই ভাষা
ঢাকার যানজটে সামান্য ফাঁকা জায়গা পেলেই একাধিক গাড়ি সেখানে ঢোকার চেষ্টা করে। কে আগে যাবে, কোন দিক দিয়ে গাড়ি বের হবে—এসব বোঝাতে চালক ও হেলপারদের হাতে থাকে মাত্র কয়েক মুহূর্ত।
এই পরিস্থিতিতে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ নেই। তাই উচ্চস্বরে ছোট ছোট শব্দ ব্যবহার করেই আশপাশের পরিস্থিতি জানিয়ে দেওয়া হয়। যানবাহনের হর্ন ও মানুষের কোলাহলের মধ্যেও যাতে চালকের কানে কথা পৌঁছায়, সেভাবেই তৈরি হয়েছে এসব সংকেত।
শান্ত বা নিয়ম মেনে কথোপকথন না হলেও উদ্দেশ্য পূরণে এসব শব্দ বেশ কার্যকর হয়ে উঠেছে।
রিকশারও আছে নিজস্ব সাংকেতিক ভাষা
এই সাংকেতিক যোগাযোগ শুধু বাসের হেলপারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকার রাস্তায় রিকশাচালকরাও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সংকেত ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো রিকশার ঘণ্টির শব্দ।
একবার ঘণ্টি বাজানোর অর্থ হতে পারে সামনে রিকশার উপস্থিতি জানান দেওয়া। দুইবার ঘণ্টি বাজালে সাধারণত আশপাশের কাউকে সতর্ক করা বোঝায়।
আর পরপর তিনবার ঘণ্টি বাজালে এর অর্থ আরও স্পষ্ট—সামনে থাকা মানুষ বা যানবাহনকে সরে যেতে বলা হচ্ছে। কারণ সামনে জায়গা না ছাড়লে যেকোনো সময় ধাক্কা লাগতে পারে।
ঢাকার যানজট তাই শুধু গাড়ি, হর্ন আর অপেক্ষার গল্প নয়। এই ব্যস্ত শহরের রাস্তায় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এমন কিছু শব্দ, সংকেত ও অভ্যাস, যেগুলো বাইরে থেকে আসা মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও নিয়মিত চালক, হেলপার ও রিকশাচালকদের কাছে হয়ে উঠেছে দ্রুত যোগাযোগের নিজস্ব মাধ্যম।
আরটিভি/জেএমএ

