
প্রেমের সম্পর্ক শেষ। একসময় যে মানুষটির সঙ্গে প্রতিদিনের কথা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আর গভীর আবেগ জড়িয়ে ছিল, বিচ্ছেদের পর তিনিই হয়ে যান প্রাক্তন। কিন্তু সম্পর্কের ইতি টানার পরও অনেকের যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয় না। কখনো খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো কিংবা সুযোগ পেলেই কথা বলা—এভাবেই থেকে যায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
প্রেম না থাকলেও বন্ধুত্বটা কেন থেকে যায়? মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে এর একক কোনো কারণ নেই। পরিচিতির স্বস্তি, মানসিক নির্ভরতা, বাস্তব প্রয়োজন কিংবা অপূর্ণ আবেগ—বিভিন্ন কারণ মিলেই তৈরি হতে পারে প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসহ কয়েকটি গবেষণার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, কেউ মানসিক স্বস্তির জন্য, কেউ প্রয়োজনের কারণে, আবার কেউ পুরোনো ভালোবাসার টানেই সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
পরিচিত মানুষটির কাছেই স্বস্তি
দীর্ঘদিনের সম্পর্কে দুজনের মধ্যে এক ধরনের মানসিক স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হয়। কে কখন মন খারাপ করেন, কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন কিংবা কখন কথা বললে ভালো লাগে—এসব সাবেক সঙ্গী অনেকটাই জানেন।
তাই বিচ্ছেদের পরও তার সঙ্গে কথা বললে অনেকের কাছে অচেনা কারও তুলনায় বেশি স্বস্তি লাগে। প্রেমের সম্পর্ক শেষ হলেও পুরোনো অভ্যাস ও মানসিক নিরাপত্তার অনুভূতি একদিনে মুছে যায় না। দুজন নতুন সীমারেখা মেনে চলতে পারলে এমন বন্ধুত্ব টিকে থাকাও স্বাভাবিক।
যোগাযোগের পেছনে থাকতে পারে প্রয়োজন
প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পেছনে সবসময় পুরোনো আবেগ কাজ করে না। অনেক সময় কারণটা একেবারেই বাস্তব। একই বন্ধু মহল, একই কর্মক্ষেত্র কিংবা যৌথ কোনো দায়িত্ব থাকলে পুরোপুরি দূরে সরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সন্তানের দেখভাল, পোষা প্রাণীর দায়িত্ব, যৌথ আর্থিক বিষয় বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দুজনকে যোগাযোগে রাখতে পারে। তাই এমন সম্পর্ককে সবসময় পুরোনো ভালোবাসার রেশ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। পরিস্থিতির প্রয়োজনেও যোগাযোগ বজায় থাকতে পারে।
ঝামেলা এড়াতেও যোগাযোগ রাখেন অনেকে
বিচ্ছেদ মানেই সবসময় ঝগড়া, রাগ বা শত্রুতা নয়। অনেকেই সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর নতুন কোনো বিরোধে জড়াতে চান না। বিশেষ করে দুজনের বন্ধু, পরিচিতি বা সামাজিক পরিমণ্ডল একই হলে সৌজন্য বজায় রাখাই সহজ মনে হতে পারে।
কেউ কেউ মনে করেন, হঠাৎ পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে অন্যজন আরও বেশি কষ্ট পেতে পারেন। তাই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ বজায় রাখেন। তবে এই যোগাযোগ সবসময় গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয় না। কখনো এটি শুধু স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি উপায়।
মনের কোথাও কি রয়ে গেছে পুরোনো প্রেম?
কখনো বন্ধুত্বের আড়ালে থেকে যেতে পারে অপূর্ণ আবেগ। একজন হয়তো সম্পর্কটিকে সত্যিই শেষ করে নতুনভাবে এগিয়ে যেতে চাইছেন, কিন্তু অন্যজন তখনও ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখছেন। তাই বন্ধুত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে যোগাযোগের দরজাটি পুরোপুরি বন্ধ করতে চান না।
আবার কেউ কেউ সাবেক সঙ্গীর জীবনে নতুন মানুষ আসাও সহজে মেনে নিতে পারেন না। তখন ‘বন্ধুত্ব’ পুরোনো সম্পর্কের সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত থাকার একটি উপায় হয়ে উঠতে পারে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন দুজনের প্রত্যাশা এক থাকে না। একজন যদি শুধু বন্ধুত্ব চান আর অন্যজন যদি পুরোনো প্রেম ফিরে পাওয়ার আশা করেন, তাহলে বন্ধুত্বের আড়ালেও নতুন করে কষ্ট তৈরি হতে পারে।
প্রাক্তনের সঙ্গে বন্ধুত্ব কি খারাপ?
সবসময় নয়। কোনো কোনো বিচ্ছেদ তিক্ততা ছাড়াই হয়। সময়ের সঙ্গে অনেক সম্পর্কেই প্রেমের জায়গা বদলে গিয়ে পারস্পরিক সম্মান ও বন্ধুত্ব তৈরি হতে পারে। তাই সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেই যে কেউ পুরোনো সম্পর্কে আটকে আছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
সাইকোলজি টুডের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের অন্তত একজন সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব রয়েছে। প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের একাধিক সাবেক সঙ্গীর সঙ্গেও বন্ধুত্ব আছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমারেখা ও প্রত্যাশার মিল। প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে কি না, তার চেয়েও জরুরি হলো—এই যোগাযোগ দুজনের জন্যই স্বস্তির, সম্মানজনক ও স্পষ্ট কি না।
আরটিভি/জেএমএ

