
বিজয় দিবস কিংবা স্বাধীনতা দিবস; শত সহস্র জনতা ছুটে যায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে, জানায় ফুলেল শ্রদ্ধা। সাতটি স্তম্ভে গড়া এই সৌধ শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় বলে যায় স্বাধীনতার গল্প। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে দেশে যে ভাস্কর্যগুলো স্থাপিত হয়েছে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতম জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এই অনন্য স্থাপনাটি যে মানুষটির মেধা ও শ্রমে প্রতিষ্ঠিত তার নাম সৈয়দ মাইনুল হোসেন। জাতীয় স্মৃতিসৌধের এই স্থপতির নাম কালের ধূলোয় এখন অনেকটাই বিস্মৃত।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের মতো মহান স্থাপত্য কর্মের জনক হওয়ার পরও সৈয়দ মাইনুল হোসেন অজানা কারণে জীবদ্দশায় ছিলেন অবহেলিত। জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় এই মানুষটিকে কাটাতে হয়েছিল নিরবে নিভৃতে। মৃত্যুর পরও বিস্মৃতির ছায়ায় ঢেকে আছেন তিনি।
সৈয়দ মাইনুল হোসেনের জন্ম ঢাকাতেই। তার দাদা সৈয়দ এমদাদ আলী ছিলেন একজন নামকরা সাহিত্যিক। মোসলেম ভারত, সওগাত ইত্যাদি পত্রিকায় নিয়মিতই লিখতেন কবিতা ও প্রবন্ধ। মাইনুল হোসেনের নানা খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফা। আজকের প্রথিতযশা শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের ভাগ্নে তিনি।
শিক্ষানুরাগী সম্ভ্রান্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন সৈয়দ মাইনুল হোসেন। তার বাবা সৈয়দ মজিবুল হক ছিলেন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক। শৈশব থেকেই ছেলের ছিল ছবি আঁকার ঝোঁক, বিশেষ করে ঘরবাড়ি দালানকোঠা আকঁতে সে পছন্দ করতো। ছেলের এই ঝোঁক দেখে বাবা চেয়েছিলেন, বড় হয়ে ছেলে স্থাপত্য নিয়ে পড়ুক। বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন মাইনুল হোসেন। স্কুল কলেজের গণ্ডি ডিঙিয়ে ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য (নকশা) বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাস করেন।
সৈয়দ মাইনুল হোসেন কর্মজীবন শুরু করেন ইএএইচ কনসালট্যান্ট লিমিটেডে জুনিয়র স্থপতি হিসেবে। এরপর একে একে তিনি কাজ করেন বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড, স্থপতি সংসদ লিমিটেড, শহিদুল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডসহ আরো কিছু নামকরা প্রতিষ্ঠানে। কর্মজীবনে তিনি প্রায় চল্লিশটি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- জাতীয় স্মৃতিসৌধ (১৯৭৮), ঢাকা যাদুঘর (১৯৮২), ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং ইস্টিটিউট (১৯৭৭), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন (১৯৭৮), চট্রগ্রাম ইপিজেড-এর অফিস ভবন (১৯৮০), শিল্পকলা একাডেমীর বারোশো আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম, উত্তরা মডেল টাউন (আবাসিক প্রকল্প) (১৯৮৫) ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে দেশ ও জাতির প্রতি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা করা।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি ধরে রাখতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে ৮৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ১৯৭৬ সালে প্রকল্পের জন্য নকশা প্রতিযোগিতার আহবান করা হয়। প্রতিযোগিতার বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। প্রথম দফায় ২০টির মতো নকশা জমা পড়েছিল; কিন্তু কোনোটিই নির্বাচিত হয়নি। দ্বিতীয় দফায় যতগুলো জমা পড়েছিল মাইনুল হোসেনের নকশাও ছিল তার মধ্যে। মোট ৫৭টি নকশার মধ্যে থেকে ওই সময়ের তরুণ স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নকশাটি গৃহীত হয়। তার করা নকশা অনুসারে নির্মিত হয় অমর স্থাপনা জাতীয় স্মৃতিসৌধ। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল কনকর্ড লিমিটেড। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৮৮ সালে।
সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নকশা অনুযায়ী স্মৃতিসৌধের বেদিমূল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে সাতটি ত্রিকোণ কলাম, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ১৫০ ফুট উঁচু। এই সাতটি কলামে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সাতটি পর্যায় সূচিত হয়েছে। আকার-আকৃতিতে ভিন্নতা থাকায় একেক দিক থেকে স্মৃতিসৌধকে দেখায় একেক রকম।এছাড়াও সাত সংখ্যাটির একটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল নকশাটিতে। সৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে ক্রমশঃ বড়র করে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ধারাবাহিক পর্যায়কে নির্দেশ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রকল্পের কাজ ১৯৮৮ সালে শেষ হলেও প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সেটি উদ্বোধন করা হয়। ১৯৮২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ জাতীয় স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো, উদ্বোধনী সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনকে। রাষ্ট্রীয় ভিআইপিরা চলে যাওয়ার পর সেখানে গিয়ে জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে হয়েছিল নিজের স্থাপত্যকর্মকে। শুধু তাই নয়, স্মৃতিসৌধের ডিজাইন করার সম্মানী পাবার কথা ছিল ২ লাখ টাকা আর আয়কর চাওয়া হয়েছিল এর ৫০ শতাংশ, অর্থাৎ এক লাখ টাকা। এমনকি, স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর বড় একটি সময় পর্যন্ত স্মৃতিসৌধের নামফলকে স্থপতি হিসেবে ছিল না সৈয়দ মাইনুল হোসেনের নাম।একজন স্রষ্টার কাছে এর চেয়ে বড় দুঃখের আর কী-ই বা হতে পারে?
জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি মাইনুল হোসেন ১৯৮২ সালে বিয়ে করেছিলেন। দুই কন্যা সন্তানের জনক তিনি।তাদের সঙ্গ পেতে খু্ব ভালোবাসতেন। কিন্তু একসময় তার দাম্পত্যজীবনে দেখা দেয় ভাঙণ। তিনিও ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একজন মানুষ হিসেবে জীবনের বড় একটা অংশ তাকে অতিবাহিত করতে হয়েছিল। ঢাকা মহানগরীর শান্তিনগরের এক গলিতে চারপাশে বহুতল আবাসিক ভবনের ভিড়ে, নানা গোলাম মোস্তফার একতলা বাড়িটিতে বিষণ্ণ আর একাকি জীবন যাপন করতেন তিনি। কোনো অজানা আতঙ্কে অস্থির হয়ে থাকতেন সবসময়।
মাইনুল ইসলাম শেষ জীবনে এতটাই নিভৃতচারী হয়ে যান যে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অনেকদিন মানুষ তার খবরই জানতো না। অনাদরে অবহেলায় নিভে যায় তার জীবনের দীপ। ২০১৪ সালের ১০ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও মাত্রাতিরিক্ত নিম্ন রক্তচাপকেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়ি করেছিলেন চিকিৎসকরা।
সৈয়দ মাইনুল হোসেনকে তার জীবদ্দশায় ১৯৮৮ সালে প্রদান করা হয়েছিল একুশে পদক। চলতি বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে এই মহান স্থপতিকে প্রদান করা হয় মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক।
শিল্পী ও স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন মাত্র ২৬ বছর বয়সে জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশা তৈরি করে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। জীবিত অবস্থায় তাকে মূল্যায়ন করা হয়নি। মৃত্যুর পরও সেইভাবে তাকে স্মরণ করা হয় না। তবে আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক স্মৃতিসৌধের মাঝেই তিনি আমৃত্যু বেঁচে থাকবেন।




