ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

গুম বন্ধ হলেও চলছে গণগ্রেপ্তার ও জামিন না দেওয়ার চর্চা: এইচআরডব্লিউ

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:১৭ এএম
ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গুমসহ ভয়ভীতি ও দমন–পীড়নের যে পরিবেশ বাংলাদেশে বিরাজমান ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের এই আমলে তার কিছুটা অবসান ঘটলেও মব, গণগ্রেপ্তার ও জামিন না দেওয়ার চর্চা চলছে বলে উল্লেখ করেছে নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সংস্থাটির ভাষ্য, ২০২৪ সালে ক্ষমতা নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যাপক হিমশিম খাচ্ছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হাজারো মানুষকে নির্বিচার আটকের অভিযোগও তুলেছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশ সম্পর্কিত সবশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এমনই তথ্য তুলে ধরেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঘোষিত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরে ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সহিংস কর্মকাণ্ড অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী অধিকার ও এলজিবিটিবিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর উপস্থিতিও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন।

গণগ্রেপ্তার ও হেফাজতে মৃত্যু

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার আটকের যে চর্চা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছিল, তা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও অব্যাহত রয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা হিসেবে কয়েক শ ব্যক্তিকে আসামি করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থক হত্যা মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে কারাবন্দী রয়েছেন। বিচার ছাড়াই আটকে থাকা এসব ব্যক্তির জামিন নিয়মিতভাবে নাকচ করা হচ্ছে। এই তালিকায় অভিনেতা, আইনজীবী, গায়ক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছর শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আরও অনেককে আটক করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির সমাবেশের পর নিরাপত্তা বাহিনী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। ঘটনার পর পুলিশ কয়েক শ আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করে এবং ৮ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ১০টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যাঁদের অধিকাংশই অজ্ঞাতনামা। যদিও সরকার গণগ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর অক্টোবর মাসের এক প্রতিবেদনের বরাতে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন নির্যাতনে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত এবং ৮১ জন নিহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা

প্রতিবেনে এইচআরডব্লিউ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনীর ক্ষমতা ব্যবহার করে গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে সরকার। এর ফলে দলটির সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা এবং অনলাইনে সমর্থনমূলক বক্তব্য প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার অধিকাংশই রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সহিংস জনতার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় লেখক ও সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আদালত ফৌজদারি কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

এইচআরডব্লিউ’র মতে, সাইবার নিরাপত্তা আইন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অন্যায্য বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ সৃষ্টি করছে। গত বছরের মার্চে আইনের ৯টি ধারা বাতিল করা হলেও এখনও এমন কিছু বিধান রয়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আরও পড়ুন

অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের আন্দোলনের সময় পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল বলে ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।

তবে, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি সীমিত বলে মন্তব্য করেছে এইচআরডব্লিউ। জুলাই মাসে পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, আন্দোলন দমনে ভূমিকার জন্য মাত্র ৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে, এই ট্রাইব্যুনালের বিচারিক মান ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে কিছু উন্নতি হলেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা এবং রাজনৈতিক সংগঠন বিলুপ্ত করার ক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সংস্কার কার্যক্রমে স্থবিরতা

এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, শ্রম ও নারী অধিকারসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য একাধিক কমিশন গঠন করে। তবে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে খুব কম সংস্কারই বাস্তবায়িত হয়েছে।

গত আগস্টে ‘জুলাই ঘোষণা’ এবং অক্টোবরে ‘জুলাই সনদ’ প্রকাশ করা হলেও সংস্কার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি সীমিত বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এ ছাড়া নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রবেশ এবং বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে মানবিক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
পাটওয়ারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে দেশে ছাগল ও ল্যাপটপ চুরি বেড়ে যাবে
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে দেশে ছাগল ও ল্যাপটপ চুরির ঘটনা আরও বেড়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন।
পাটওয়ারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলে দেশে ছাগল ও ল্যাপটপ চুরি বেড়ে যাবে
আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলন এখন চলছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। 
আন্দোলনের নামে যারা সহিংসতা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালিকপক্ষের বক্তব্য ও শিল্পের স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে, যেন উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত না হয়। তবে শ্রমিকদের স্বার্থ যেন বেশি সংরক্ষিত হয়, সে চেষ্টা সরকার করবে।
পোশাক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
পোশাক শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ছাড়াও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ গার্মেন্টস শিল্পের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত রয়েছেন।
পোশাক শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম, প্রজ্ঞাপন জারি
সোমবার (২ নভেম্বর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
রাজশাহীর নতুন বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম, প্রজ্ঞাপন জারি
আরও পড়ুন
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমকে সমর্থন করে না সরকার: তথ্য উপদেষ্টা
ইলিয়াস আলীকে গুমের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ২৫ জানুয়ারি
জামিনে বেরিয়ে খুন হলেন ‘পিচ্চি জাহেদ’
গুমের শিকার গণঅধিকার পরিষদ নেতা দিলেন নির্যাতনের ভয়ংকর বর্ণনা