
বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের অনুরোধে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট ল (আইসিএনএল) ঢাকায় “নাগরিক পরিসরের সুরক্ষা: বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন নিয়ে নাগরিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি” শীর্ষক একটি গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) গোলটেবিল আলোচনায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী, ডিজিটাল অধিকার বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজন অংশ নেন। আলোচনায় প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ও নাগরিক পরিসরের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের ডিজিটাল আইনকাঠামো সংস্কারের চলমান উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে সরকার গণমাধ্যমের প্রতিনিধি, সাংবাদিক এবং সম্পাদকদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে একাধিক আলোচনা করেছে বলে জানা গেলেও নাগরিক সমাজের সংগঠন ও ডিজিটাল আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট পরামর্শের সুযোগ এখনো সীমিত রয়েছে।
এই ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে আইসিএনএল আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনাটি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা, উদ্বেগের বিষয়গুলো চিহ্নিত করা এবং প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করে।
আলোচনায় আইসিএনএলের জ্যেষ্ঠ আইন উপদেষ্টা ও ডিজিটাল অধিকার কর্মসূচির সমন্বয়ক জ্যাকারি ল্যাম্পেল প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর ওপর আইসিএনএলের আইনি বিশ্লেষণের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো উপস্থাপন করেন।
বিশ্লেষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীন বিচারিক তদারকি ছাড়াই অনলাইন কনটেন্ট বন্ধ বা অপসারণের ব্যাপক ক্ষমতা, নির্দিষ্ট ধরনের বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার অস্পষ্ট বিধান, অপরাধের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি এবং নাগরিক সমাজের সংগঠন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি।
আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অর্থবহ জনঅংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকার বিষয়টিও বিশ্লেষণে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
আইসিএনএলের বিশ্লেষণে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ নীতিগত লক্ষ্য হলেও অনলাইন হুমকি মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে অবশ্যই মৌলিক অধিকারসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
সুইডিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার (সিডা) সহায়তায় আইসিএনএল এই গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।
গোলটেবিল আলোচনা থেকে উঠে আসা প্রধান পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ
অংশগ্রহণকারীরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং সংশ্লিষ্ট সুপারিশ প্রদান করেন:
− সাইবার সুরক্ষা আইন (সিপিএ) সংশোধনীর ২৫ ও ২৬এ ধারা বৈধ বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ঝুঁকি তৈরি করে। “মানহানি”-র বিস্তৃত সংজ্ঞা এবং যথাক্রমে ২৫ ও ২৬এ ধারায় “অপমান”, “হয়রানি”, “গুজব” ও “ভুল তথ্য” প্রচারের মতো নতুন অপরাধের বিধান অস্পষ্ট ও বিষয়নির্ভর। এসব বিধানের ফলে আইনের স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা বৈধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা ২৫ ও ২৬এ ধারা বাতিলের আহ্বান জানান।
− অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তির কারণে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে (২৯(৩) ধারা)। কোনো সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ কেবল সর্বশেষ অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
− খসড়া আইনটিতে বিচারিক তদারকি ছাড়াই অনলাইনে তথ্য অবরুদ্ধ করার নতুন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যথাযথ মাত্রার বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে এবং আপিলের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা পুনর্বহাল করতে আইনটির সংশোধন প্রয়োজন।
− খসড়া আইনটিতে সাংবাদিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতা এবং অনিয়মের তথ্য প্রকাশকারীদের সুরক্ষায় আরও শক্তিশালী বিধান অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
− ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ হিসেবে সরকারকে নাগরিক সমাজ, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শের প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এর আওতায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীসহ প্রভাবিত সব সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রত্যেকে অর্থবহভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
− সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ইতিবাচক ও সহায়ক পরিবর্তন আনার পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সংশোধনী প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানানো হয়।
আইসিএনএল সম্পর্কে
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট ল (আইসিএনএল) বিশ্বজুড়ে নাগরিক সমাজ, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং জনঅংশগ্রহণের জন্য অনুকূল আইনি পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করে। সংস্থাটি মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর বিকাশ ও কার্যক্রমের জন্য সহায়ক আইনকাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সহায়তা করে।
আরটিভি/ এসকেডি


