
মৃত্যু এমন এক সত্য, যা থেকে কারও মুক্তি নেই। দুনিয়ার জীবন শেষ হলে মানুষের সামনে শুরু হয় পরকালের যাত্রা। জীবদ্দশায় করা ভালো ও মন্দ কাজের পরিণতি নিয়ে ইসলামে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। কোরআন ও হাদিসে মৃত্যুর সময় মানুষের অনুশোচনা, কবরের জীবন এবং পুনরুত্থানের দিনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘বরযখ’। এই জীবন সম্পর্কে কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা এসেছে।
মৃত্যুর সময় কেন ফিরে আসতে চাইবে মানুষ?
মৃত্যুর মুখোমুখি হলে অনেক মানুষ দুনিয়ায় ফিরে এসে ভালো কাজ করার আকাঙ্ক্ষা করবে। কিন্তু তখন আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ ٩٩ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ١٠٠
অর্থ: অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি যা ছেড়ে এসেছি, সেখানে সৎকাজ করতে পারি। কখনোই নয়! এটি তো কেবল তার মুখের কথা। আর তাদের সামনে রয়েছে বরযখ, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত। (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত ৯৯-১০০)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মৃত্যুর পর দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে সৎকাজ করার সুযোগ পাওয়া যাবে না। তাই জীবিত থাকতেই নামাজ, ইবাদত, মানুষের হক আদায় এবং ভালো কাজের প্রতি যত্নবান হওয়া জরুরি।
মৃত্যুর পরও কি শাস্তি হতে পারে?
কোরআনে ফেরাউনের অনুসারীদের শাস্তির কথা উল্লেখ করে বরযখের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا ۖ وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ ٤٥ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا ۖ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ٤٦
অর্থ: অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউনের অনুসারীদের ঘিরে ধরল কঠিন শাস্তি। আগুন, তাদের সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়। আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন বলা হবে, ফেরাউনের অনুসারীদের কঠিনতম শাস্তিতে প্রবেশ করাও। (সুরা গাফির, আয়াত ৪৫-৪৬)
আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, ফেরাউনের অনুসারীদের কিয়ামতের আগেই সকাল-সন্ধ্যায় আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। এরপর কিয়ামতের দিন তাদের আরও কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। ইসলামি ব্যাখ্যায় এ আয়াতকে কবরের শাস্তি ও বরযখের জীবনের অন্যতম প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মুমিনের মৃত্যুর সময় কী ঘটে?
সাহাবি বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিন ও অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময়ের অবস্থা এবং কবরের জীবনের বিভিন্ন বিষয় বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি সুনানে আবু দাউদসহ হাদিসের গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মুমিনের মৃত্যুর সময় রহমত ও সুসংবাদের সঙ্গে ফেরেশতারা আসেন। তার আত্মা গ্রহণের পর তাকে সম্মানজনকভাবে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কবরের জীবনে তাকে প্রশ্ন করা হয়—তার রব কে, তার ধর্ম কী এবং তার কাছে প্রেরিত রাসুল কে?
মুমিন আল্লাহকে রব, ইসলামকে ধর্ম এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসুল হিসেবে স্বীকার করবে। তখন তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ, কবরের প্রশস্ততা এবং জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়ার কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসে আরও এসেছে, তার কাছে সুন্দর চেহারা ও সুগন্ধিযুক্ত একজন ব্যক্তি আসবেন। মুমিন জানতে চাইবে, তিনি কে? উত্তরে বলা হবে, তিনি তার সৎকর্মের প্রতিরূপ।
অবিশ্বাসীর মৃত্যুর অবস্থা কেমন?
একই হাদিসে অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময়ের বিপরীত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, তার আত্মা গ্রহণের সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এরপর কবরের প্রশ্নের জবাব দিতে সে ব্যর্থ হবে।
তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা এবং জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়ার কথা হাদিসে এসেছে। তার কাছে কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত একজন ব্যক্তি আসবেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলবেন, তিনি ওই ব্যক্তির অসৎকর্মের প্রতিরূপ।
এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামি বিশ্বাসে মানুষের কাজের সঙ্গে পরকালের পরিণতির সম্পর্ক রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত রায় দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই; চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে।
কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাইতে বলেছেন নবীজি
বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে এসেছে, এক আনসারি সাহাবির দাফনের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলেন। তিনি তাঁদের এ বিষয়ে সতর্ক করেন এবং মৃত্যুর পরের জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তাই কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং সৎকাজে মনোযোগী হওয়া মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মুখে বিশ্বাসের কথা বলাই যথেষ্ট নয়; জীবনে সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটানোও জরুরি।
কিয়ামতের আগে বরযখ, এরপর পুনরুত্থান
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মাঝের জীবনই বরযখ। এ সময়ে মানুষ দুনিয়ায় ফিরে এসে আমল করার সুযোগ পায় না। কিয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং আল্লাহর সামনে নিজেদের কাজের হিসাব দিতে হবে।
সৎকর্মশীল মুমিনদের সঙ্গে তাদের ঈমানদার সন্তানদের মিলনের সুসংবাদও কোরআনে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ ۚ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ ٢١
অর্থ: আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমরা তাদের সঙ্গে তাদের সন্তান-সন্ততিকে মিলিত করব। আর তাদের কর্মের কোনো অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপার্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ। (সুরা আত-তুর, আয়াত ২১)
মৃত্যুর আগেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি
কোরআন ও হাদিসের এসব বর্ণনা মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে শিক্ষা দেয়। জীবনের কোনো সময়ই সৎকাজের সুযোগকে অবহেলা করা উচিত নয়। নামাজ আদায়, অন্যের অধিকার রক্ষা, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া—এসব কাজের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের জীবনকে সুন্দর করতে পারেন।
মৃত্যুর পর ফিরে এসে ভালো কাজ করার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং জীবিত থাকতেই সৎকাজে মনোযোগী হওয়াই কোরআন-হাদিসের অন্যতম শিক্ষা।
সূত্র: হাদীস বিডি
আরটিভি/জেএমএ


