আজ উচ্ছেদ অভিযান, কালই কেন দখল হচ্ছে রাজধানীর ফুটপাত?

ইউএনবি

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬ , ০৭:২৬ পিএম


আজ উচ্ছেদ অভিযান, কালই কেন দখল হচ্ছে রাজধানীর ফুটপাত?
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার ফুটপাতগুলো হকারদের কবল থেকে মুক্ত করতে মাঝেমধ্যেই অভিযান চালাতে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানের দিন কয়েকের মধ্যেই ফুটপাতগুলোতে ফিরে আসে পুরোনো সেই চিত্র— পণ্যের ডালি সাজিয়ে হকারদের হাঁকডাক, ফুটপাতের অর্ধেকের বেশি অংশ দখলে নেওয়ায় অতি সংকীর্ণ পথ ধরে গাদাগাদি করে পথচারীদের চলাচল এবং চলতি পথে নানাজনের প্রশাসনকে গালাগাল।

রাজধানীর নিউ মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি জায়গার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো এক সপ্তাহও হয়নি, এরই মধ্যে নিউ মার্কেটে ফিরে এসেছে পুরোনো জীর্ণ চেহারা। ডিএমপির অভিযানের পর এক সপ্তাহ তো দূর, ওই দিনই ফুটপাতে ফিরে আসতে শুরু করেন হকাররা; দিন দুয়েকের মধ্যে ফের দেখা যায় দোকানের সারি।

বারংবার অভিযানের পরও হকারদের কেন দমন করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

চলতি মাসের ১ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত ডিএমপির আটটি ট্রাফিক বিভাগের নেতৃত্বে এ সমন্বিত অভিযানে সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দোকান, ভ্রাম্যমাণ হকার এবং অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা এবং বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানে মোট ৪০৫টি মামলা করা হয়েছে, জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এছাড়া ৫৭ জনকে সতর্ক করা হয়েছে এবং ৯৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এত কিছুর পরও দমানো যায়নি হকারদের।

গুলিস্তান, ধোলাইখাল, উত্তরা, শনির আখড়া ও ধানমণ্ডির কলাবাগানসহ বেশকিছু এলাকায় অল্প সময়ের জন্য নাগরিকরা স্বস্তি পেলেও অভিযান শেষ হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই অধিকাংশ জায়গায় আবার ফুটপাত দখল হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, গুলিস্তানে হকাররা আগের মতোই ফুটপাত দখল করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ এখন কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে ব্যবসা করছেন। গোলাপ শাহ মাজারের সামনে আগে স্থায়ী দোকান বসানো অনেকেই এখন চট বিছিয়ে পণ্য বিক্রি করছেন, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত সরে যেতে পারেন। পল্টন, মতিঝিল ও নিউমার্কেট এলাকাতেও দেখা গেছে একই দৃশ্য।

সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে শত শত হকার বসে আছেন। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। এতে যেমন ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি যানজটও তীব্র হচ্ছে।

উচ্ছেদ আর ফেরার চক্রে আটকে রাজধানী

উচ্ছেদ অভিযানের পর অল্প সময়ের জন্য ফুটপাত খালি থাকলেও দ্রুতই আবার হকারদের দখলে চলে যাচ্ছে। এই চক্র এখন নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিউমার্কেট ছাড়াও মোহাম্মদপুর, শ্যামলী রিং রোড, মগবাজার, বাংলামোটর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও গুলিস্তানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আবারও হকারদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ঘোষিত উচ্ছেদ অভিযান শেষ হয়েছে, তবে যেসব জায়গায় উচ্ছেদের পর পুনরায় ফুটপাতে হকাররা বসেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ফলোআপ অভিযান চলমান রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ৬ এপ্রিলই ডিএমপি সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকায় আবার অভিযান চালিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

যেসব জায়গায় ১ থেকে ৫ এপ্রিল অভিযান চালিয়েছে, সেসব জায়গায় আবারও ফুটপাত দখল হয়ে গেলে সেগুলোতে আবারও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা।

ফুটপাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন, দাবি হকারদের

বারবার ফুটপাত থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও কেন তারা আবারও সেখানে এসে বসছেন, এ বিষয়ে কথা হয় নিউ মার্কেট-নীলক্ষেত এলাকার কয়েকজন হকারের সঙ্গে। উত্তরে তারা যে কারণ ব্যাখ্যা করলেন, তাতে তাদের কর্মকাণ্ড আইনত বেঠিক হলেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

হকারদের দাবি, ফুটপাতের ওই দোকানটি তার ও তার পরিবারের জীবিকার একমাত্র উৎস। অনেকের আবার শহরে এবং গ্রামে একাধিক পরিবারের খরচ বহন করতে হয়। ফলে হঠাৎ করে তাদের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে একটি বড় জনগোষ্ঠীর ওপর।

আবার ফুটপাত থেকে তাদের সরিয়ে দিলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নতুন কোনো জায়গায় ব্যবসা করার ব্যবস্থা তাদের করে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন তাদের কেউ কেউ। ফলে বাধ্য হয়ে আবার ফুটপাতেই ফিরতে হয় বলে জানান তারা।

নিউমার্কেট এলাকার হকার সবুজ আলী বলেন, আমাদের সরিয়ে দিলে আমরা কোথায় যাব? আমরা কারও ক্ষতি করছি না। যদি উচ্ছেদ করতেই হয়, তাহলে আমাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।

পথচারীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন

মৌচাক এলাকায় ফুটপাত ছেড়ে রাস্তার ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন শহীদ আলী নামের এক পথচারী। তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ফুটপাতে হাঁটার জায়গা আছে? পুরোটাই তো দখল হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে। পুলিশ বলেছে ফুটপাত পরিষ্কার করেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন তো চোখে পড়ছে না!

সমাধান কীসে

এর আগে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ফুটপাতে আর হকার বসতে দেওয়া হবে না এবং তাদের ‘হলিডে’ ও ‘নাইট’ মার্কেটের মাধ্যমে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবায়নের অভাবে এসব উদ্যোগের প্রভাব খুবই সীমিত পড়েছে।

নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া হকার বা অটোরিকশা হঠাৎ উচ্ছেদ করা সমর্থনযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘হকারদের হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়, তাদের জন্য টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরও জানান, শহরে আটটি নাইট মার্কেট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চালু থাকবে, যাতে দিনের বেলা ফুটপাত দখল না হয়।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইশরাত ইসলাম বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শহরে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ফুটপাত দখল হয়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই বারবার উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই অধ্যাপকের ভাষ্যে, উচ্ছেদের আগে যাদের সরানো হবে, তাদের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে, না হলে এটি টেকসই হবে না।

আরও পড়ুন

তিনি আরও বলেন, সমস্যাটির মূল কারণ বোঝার জন্য গভীর গবেষণা প্রয়োজন। শুধু হকার সরিয়ে দিলে হবে না, এর পেছনের বাস্তবতা না বুঝলে স্থায়ী সমাধান আসবে না।

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পৃথিবীর বহু দেশেই হকাররা বৈধভাবে ব্যবসা করে থাকেন। সেজন্য ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই সরকারের আলাদা পলিসি থাকলেও আমাদের দেশে তা নেই। বাংলাদেশে এখনো এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য অবশ্যই ফুটপাত দখলমুক্ত করা উচিত। কিন্তু তার আগেই বর্তমান হকাররা কীভাবে কাজ করছেন, সেগুলো বোঝা উচিত। পাশাপাশি তার পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নীতিমালা প্রস্তুত করে তার মাধ্যমে আমাদের কাজ করা উচিত। বিষয়টাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন এ পরিকল্পনাবিদ।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission