
দুর্গাপূজার ছুটিতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সাধারণত ঘরমুখী মানুষের ভিড় বাড়ে। টিকিটের জন্য ছোটাছুটি, কুলিদের হাঁকডাক আর যাত্রীদের ব্যস্ততায় মুখর থাকে বুড়িগঙ্গার তীর। তবে এবার ছুটির মধ্যেও সেই চেনা দৃশ্য নেই। লঞ্চ চলছে, কিন্তু অনেক লঞ্চেই যাত্রী তুলনামূলক কম। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় যাতায়াতের ধরন বদলেছে। এর প্রভাব পড়েছে সদরঘাটের লঞ্চ ব্যবসা ও এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকায়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্য মতে, ঢাকার ৪৩টি নৌপথে সক্রিয় লঞ্চের সংখ্যা ২১০টি থেকে কমে ১৭০টিতে দাঁড়িয়েছে। সদরঘাট থেকে দৈনিক লঞ্চ ছাড়ার সংখ্যাও প্রায় ১৪০টি থেকে কমে ৪০ থেকে ৪৫টিতে নেমে এসেছে। বরিশাল রুটে আগে প্রতিদিন আটটি লঞ্চ চললেও এখন চলছে দুটি। যাত্রীসংকটের কারণে কয়েকটি নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও রয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের সময়কাল ও বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
সড়কপথে যাতায়াত সহজ হওয়ায় অনেক যাত্রী এখন বাসকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। গুলিস্তান থেকে বরিশালগামী বাসে ওঠার সময় এক যাত্রী বলেন, আগে বাড়ি যাওয়ার জন্য লঞ্চই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বাসে কম সময়ে বাড়ি পৌঁছানো যায়। ছুটি কম থাকলে তাই বাসে যাতায়াত করেন তিনি। তবে লঞ্চে ভ্রমণের আলাদা আনন্দ রয়েছে, যা বাসে পাওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন এই যাত্রী।
যাত্রী কমলেও লঞ্চ পরিচালনার ব্যয় কমেনি। জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মিত খরচ করতে হচ্ছে মালিকদের। অন্যদিকে, টিকিট ও কেবিন বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় তোলাই কঠিন হয়ে পড়ছে। লোকসান কমাতে কোনো কোনো রুটে ট্রিপের সংখ্যা কমানো হচ্ছে, আবার কিছু লঞ্চ বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে লঞ্চ ব্যবসার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
চাঁদপুরগামী ঈগল-৩ লঞ্চের টিকিট বিক্রেতা মো. আনসারী বলেন, তাদের লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়নি, আগের মতোই রয়েছে। তবে পূজার ছুটিতেও যাত্রী বাড়েনি। স্বাভাবিক সময়ের মতোই যাত্রী হচ্ছে। তার ভাষ্য, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে এবং বেশির ভাগ ট্রিপে লোকসান হচ্ছে।
সদরঘাটের এই মন্দার প্রভাব পড়েছে ঘাটকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র পেশাজীবীদের ওপরও। কুলি, হকার ও ছোট দোকানিরা যাত্রীদের আনাগোনার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন। যাত্রী কমে যাওয়ায় মালামাল বহনের কাজ কমেছে, কমেছে পণ্য বিক্রিও। ফলে লঞ্চের ব্যবসায়িক সংকটের চাপ ছড়িয়ে পড়েছে টার্মিনালের আশপাশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও।
সদরঘাটে প্রায় ১৫ বছর ধরে কুলির কাজ করছেন ৫৫ বছর বয়সী মাজহারুল হক। দীর্ঘ সময়ে টার্মিনালের ব্যস্ততা ও যাত্রীদের ভিড় দেখেছেন তিনি। তবে এখন কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে তার। মাজহারুল হক বলেন, আগে দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হতো। এখন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে যাত্রী কমে যাওয়ার অর্থ নৌপথের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনে নৌপথ এখনো গুরুত্বপূর্ণ। সব রুটে যাত্রী কমার চিত্রও এক নয়; গন্তব্য, যাতায়াতের সময় ও ভ্রমণের সুবিধার ওপর যাত্রীদের পছন্দ নির্ভর করছে। ফলে নৌপরিবহন খাতের সংকট মোকাবিলায় রুটভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নৌপথের নাব্যতা বজায় রাখা, ঘাটে যাতায়াতের সুবিধা বাড়ানো এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। পদ্মা সেতুর কারণে সড়কপথে যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি হলেও নৌপরিবহনকে কার্যকর ও সাশ্রয়ী রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে সদরঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লঞ্চ ব্যবসা ও হাজারো মানুষের জীবিকা আরও সংকটে পড়তে পারে।
আরটিভি/জেএমএ




