ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সুইজারল্যান্ডের মতো এমন ঘটনা যদি বাংলাদেশে ঘটতো

বাকি উল্লাহ

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:০৮ পিএম

জেনেভা শহর পার্লামেন্টের এক সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারের হিসাব নিরীক্ষা বিভাগের এক তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি ২০১৭ সালে শুধু টেলিফোন বিল পরিশোধে সরকারি অর্থ ব্যয় করেছেন ১৭ হাজার ফ্রাংক।

অভিযোগের মধ্যে আরও যে বিষয়টি গুরুতর হিসাবে আসছে তাহলো, তিনি একটি রেস্টুরেন্টে দামি শ্যাম্পেইন এবং ককটেলের বিল ব্যক্তিগত কার্ডের পরিবর্তে সরকারি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পরিশোধ করেছেন। আরও যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তাহলো- জেনেভা শহরের পার্লামেন্টের এই সদস্য ব্যক্তিগত ছুটিতে গিয়ে ট্যাক্সি বিল পরিশোধ করেছেন সরকারের দেয়া ক্রেটিড কার্ড থেকে।

এখানে উল্লেখ্য, সুইজের সব সরকারি কর্মকর্তারা বিশেষ করে সব কামরার পার্লামেন্ট সদস্যদের বিপরীতে সরকারি খরচের জন্য সরকারি ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা হয়ে থাকে। এই কার্ড থেকেই সরকারি কর্মকাণ্ডের সব বিল সাথে সাথেই কর্মকর্তারা পরিশোধ করে দেন।

জেনেভার এই কর্মকর্তা নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে উত্তর দিতে গিয়ে জানিয়েছেন, তিনি রেস্টুরেন্টে যে দামি শ্যাম্পেনের বিল পরিশোধ করেছেন তা আসলে ভুলবশত হয়েছে। তিনি কিছুটা ড্রাংক্ট থাকার কারণে ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডের বদলে সরকারি ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিলটি পরিশোধ করেছেন।

টেলিফোন বিলের বিষয়ে তিনি বলছেন, ওটা স্বাভাবিক এবং সরকারি কাজেই তিনি টেলিফোনটা বেশি ব্যবহার করেছেন। সরকারি অডিট বিভাগের তদন্ত অফিসার জেনেভার ওই সংসদ সদস্যের যুক্তি মানতে নারাজ। সরকারি অতিরিক্ত খরচের টাকা রাষ্ট্রীয় তহবিলে ফেরত দেবার আদেশ দিয়েছেন সরকারি অডিট বিভাগ যা রেকনুংহোপ নামে পরিচিত।

বিষয়টি এখন গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত। স্বাভাবিক খরচের চেয়ে এটি বেশি এবং অন্যান্য সদস্যরাও এ পরিমাণ অর্থ খরচ করেননি। সুতরাং বিষয়টি অবশ্যই সমালোচনার।

এর বিপরীতে যদি বাংলাদেশের কথা বলি তাহলে কী বলতে পারি আমরা?

দেশের একজন সংসদ সদস্য বছরে শুধু থোক বরাদ্দ পান পাঁচ কোটি টাকা। কোথায় খরচ করছেন তা জানবার কোনও অডিট আমাদের দেশে বিদ্যমান নেই। এবার সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রস্ত বা ঋণখেলাপিরা আগের দিন ঋণ পরিশোধ করে সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন নিতে পারবেন। আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে না, শুধু টিন থাকলেই হবে। হলফনামায় সম্পদের বিবরণ জনগণ জানতে পারবেন না।

পাঁচ বছরে ২৫ কোটি টাকা কেবল থোক বরাদ্দ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন একজন সংসদ সদস্য। অথচ তার কত ভাগ জনগণের সেবায় খরচ করেন বা করেছেন তা কেবল খোদাতালা ছাড়া আর কারও জানার উপায় নেই। কিন্তু প্রত্যেক সংসদ সদস্যের হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর অডিট থাকা উচিত। যেহেতু তাদের জন্য সরকারি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। পাঁচ কোটি টাকার এক টাকাও যদি কেউ ব্যক্তিগত খরচে ব্যয় করে থাকেন তবে তা অপরাধ। জনগণের এই টাকা জনগণকে ফেরত দেবার নিয়ম থাকতে হবে।

এ তো শুধু থোক আর থোক বরাদ্দের কথা বললাম, একজন সংসদ সদস্য কত টাকা উপর্জন করেছেন আর কত টাকার সম্পদ তার আগে ছিল তা তো হলফ নামাতেই আছে। কোটি কোটি টাকার ব্যবধান রয়েছে এক হলফনামা থেকে অন্য হলফনামায়। বর্তমানে সব দল নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। কোনও ফ্রন্টই বলছেন না যে জনগণকে হলফনামাটা দেখান। সংসদ সদস্যসহ সকল নির্বাচনী সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসেব জনগণের জন্য উম্মুক্ত করে দিন। দেয়ার কথা ছিল দেয়াও হয়েছিল। তারপর একদমই বন্ধ হয়ে গিয়েছে সে ব্যবস্থা। কেন? কার স্বার্থে ?

উন্নত দেশ বানাতে হলে প্রথমত দেশের নির্বাচিত সদস্যদের চরিত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গি উন্নত করতে হবে। তারা সবাই ভালোমানুষ জানি। তবে তারা নিজেরা কেন নিজেদেরকে অডিটের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসছেন না? উন্নত সব দেশে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীদেরকে অডিটেরের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেকে জনগণের কাছে প্রকাশ করে, নিজেকে তুলে ধরে সে কেমন? তার সম্পদের পরিমাণ কত? আমরা কেন তা করছি না?

এ কাজটি করা হলে আর জনগণের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে প্রতিনিধি হলে দেখবেন দেশের অধিকাংশ মানুষই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে আসতেন না বা আসবেন না। তখন কাজটি হবে কঠিন, কেবলই সেবামূলক এবং নিজেকে উৎসর্গ করার। কঠিন এই সেবামূলক কাজটি করতে সংসদ সদস্য হতে তারা আর উৎসাহিত হতেন না, চেলচালাইয়া এমপি হতে আসতেন না। এখানে কেবলই থাকতেন ত্যাগী জনগণের সেবায় ব্রত নেয়া বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর লোকেরা।

আজ জনগণের প্রতিনিধি হওয়াটা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ব্যবসা। বিনিয়োগের জায়গা। কত টাকা বিনিয়োগ করে কত টাকার রাজনীতি উদ্ধার করা যাবে সে ব্যবসা। তাই সব পেশার মানুষ এই বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

মাননীয় রাষ্ট্রপতি সে কথাটিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঠে বলে এসেছিলেন। রাষ্ট্রপতি নিজেও আমাদের মতো কেবল অভিযোগই দিয়ে গেছেন কিন্ত উত্তরণের পথটিতে তিনি নিজেও অন্ধকারেই রয়েছেন। সংসদ সদস্যদের কেবল অডিটের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসুন, দেখবেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় খাত আর ব্যক্তিগত খাতকে আলাদা করে ফেলুন। রাষ্ট্রীয় সকল খরচের হিসাব দেবার জন্য সকলকে বাধ্য করুন।

দেখবেন কেউ আর দেশের এমপি হতে, ব্যবসা করতে আসবেন না। কারণ তখন আর এখানে বিনিয়োগ করে কোনও লাভ হবে না। বিনা পারিশ্রমিকের এ কাজটি করতে তখন আর রাজনীতি ব্যবসায়ীরা আর আগ্রহ দেখাবেন না। রাজনীতির মাঠে তখন থাকবেন কেবল আদর্শের লোকজন।

সুইজের একজন এমপি কত টাকা টেলিফোন করেছেন সেজন্য এ অবস্থা! দেখুন তো আমাদের সাংসদেরা কত শত কোটি সরকারের টাকা ব্যয় করছেন অবলীলায়। একজন সংসদ সদস্যের বিদেশে বাজার করা দেখলে অবাক বনে যেতে হয় আমাদের। একজন আমলার বিদেশে বাজার করা দেখলে আমাদের অবাক বনে যেতে হয় আমাদের। দুদককে একটি কলার মতো ঝুলিয়ে জনগণকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ওই দুদক আসছে, আছে তোমরা সতর্ক হও।

কেন? স্বচ্ছতা আনতে তো এই ডিজিটাল যুগে কোনও কষ্ট হবার কথা নয়।

ডিজিটাল হলফনামাটা জনগণের কাছে প্রকাশ করুন এবং তা সংসদ নির্বাচনের সেই ৯০ দিন আগেই প্রকাশ করবার বাধ্যবাধকতার নিয়ম চালু করুন। জনগণ দেখুক জনগণের টাকাটা সংসদ সদস্য কোথায় খরচ করছেন?

আরও পড়ুন :

সি/

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
নির্বাচনি ইশতেহারে কী চাই?
নির্বাচন আসছে, তাই রাজনৈতিক দলগুলো এখন অনেক খাটাখাটুনি করে তাদের দলের নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করবে। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই নির্বাচনি ইশতেহারে আমি দেখতে চাই এরকম দশটি বিষয়ের কথা বলতে, তাহলে আমার তালিকাটি হবে এরকম: ১। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ: সবার আগে আমি চাইবো, সব রাজনৈতিক দল যেন তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে খুবই স্পষ্টভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কথা বলে। এই দেশে রাজনীতি ও গণতন্ত্রের কথা বলে রাজাকার কমান্ডারদের একবার ক্ষমতায় আসতে দেখে আমি ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ’ কথাটির ব্যাপারে অনেক স্পর্শকাতর হয়ে গেছি। রাজনৈতিক দলগুলোর মুখ থেকে এই কথাটি খুব স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হতে না শুনলে আমি স্বস্তি অনুভব করি না। একাত্তর সালে আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি যারা রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার, তারাই একদিন এই দেশের মন্ত্রী হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে আর কখনও যেন এরকম কিছু ঘটতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গড়ে তোলা হবে বলা হলে আসলে অনেক কিছু বলা হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝে যাই, আমরা সব ধর্ম, সব বর্ণ, সমাজের সব স্তরের মানুষকে নিয়ে একটা আধুনিক দেশ গড়ে তোলার কথা বলছি। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যাই, আমরা একটা অসাম্প্রদায়িক দেশের কথা বলছি, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলছি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি। সেজন্য এই তালিকার প্রথম বিষয়টি সবসময়েই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। ২। বঙ্গবন্ধু: বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায় কোনটি জিজ্ঞেস করা হলে অনেক ঘটনার কথা উঠে আসবে, যার একটি হচ্ছে ১৯৭৫ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নির্বাসন দেওয়া। ১৯৭৫ সালে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়ে গেছে কিন্তু তার স্মৃতিটুকুও যেন এই দেশে না থাকে, তার জন্যে সবরকম চেষ্টা করা হয়েছে। রেডিও টেলিভিশনে তার নাম পর্যন্ত উচ্চারিত হয়নি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কথা না জেনেই। অথচ এই মানুষটি ও বাংলাদেশ আসলে সমার্থক। আমাদের অনেক বড় সৌভাগ্য যে, বঙ্গবন্ধু এই দেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যদি তার জন্ম না হতো, আমরা সম্ভবত বাংলাদেশটিকে পেতাম না। বেঁচে থাকতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন কিন্তু এখন তিনি আর কোনও একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন। তিনি বাংলাদেশের স্থপতি, সারা বাংলাদেশের সব মানুষের নেতা। কাজেই আমি চাই, এই দেশের সব রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করবে। অকৃতজ্ঞ মানুষকে আমরা ঘেন্না করি, তার থেকে শত হাত দূরে থাকি। ঠিক একই কারণে অকৃতজ্ঞ রাজনৈতিক দলের জন্যে সেটা অন্যরকম হবে কেন? তাদের কাছে অন্যেরা কে কী আশা করে আমি জানি না, ব্যক্তিগতভাবে আমি অকৃতজ্ঞ রাজনৈতিক দলের কাছে কিছুই আশা করতে পারি না। ৩। অসাম্প্রদায়িক: বাংলাদেশ গত দশ বছরে অনেক অগ্রসর হয়েছে। সংখ্যা দিয়ে বিচার করতে চাইলে বলা যায় জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১৭৫২ ডলার, দারিদ্র্যের হার কমে হয়েছে ২২ শতাংশ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি করা পদ্মা ব্রিজের কাজ শেষ হয়ে গেছে ৬০ শতাংশ। বিদেশি পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা দেখানোর জন্য খুবই ব্যস্ত, তারা প্রায় সময়েই সোশ্যাল নেটওয়ার্কের রগরগে চটুল তথ্য দিয়ে হেডলাইন করে থাকে। সে রকম একটি সাপ্তাহিকী দ্য ইকনোমিস্ট পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে অবশ্যই দেশের উন্নয়ন দেখে সবাই খুশি। আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে, চাইলেই অনেক দ্রুত দেশকে উন্নত করে ফেলতে পারবো। কিন্তু আমাদের সমস্ত আনন্দ ও উৎসাহ মাঝে মাঝেই ছোট একটা সাম্প্রদায়িক ঘটনা দেখে পুরোপুরি ম্লান হয়ে যায়। যত সময় যাবে, আমাদের হৃদয়ের প্রসারতা তত বাড়ার কথা, আমাদের তত উদার হওয়ার কথা। কিন্তু যখন দেখি, সাম্প্রদায়িক মানসিকতা কমেনি বরং বেড়েছে, তখন আমরা খুবই অসহায় বোধ করি।  আমি সবসময়েই বলে এসেছি, একটা দেশ ভালো চলছে না খারাপ চলছে, সেটি জানার জন্য বড় বড় গবেষণা করতে হয় না। সেমিনার কিংবা গোলটেবিল বৈঠক করতে হয় না। দেশের একজন সংখ্যা লঘু কিংবা  ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কাউকে জিজ্ঞেস করতে হয়। তারা যদি বলে, দেশটি ভালো চলছে, তাহলে বুঝতে হবে দেশটি আসলেই ভালো চলছে। যদি তারা প্রশ্নের উত্তর ‘না’ দিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তাহলে বুঝতে হবে দেশটি ভালো চলছে না। এই দেশে এখনও মানুষে মানুষে বিভাজন রয়ে গেছে। বেশ কয়েক বছর আগে আমি দলিত শিশুদের একটি সমাবেশে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি ফুটফুটে শিশুদের কাছে শুনেছিলাম, তারা সেই এলাকায় অস্পৃশ্য। পানি খাওয়ার জন্য একটা গ্লাসকে পর্যন্ত তারা স্পর্শ করতে পারে না। কাজেই আমি চাইবো, নির্বাচনি ইশতেহারে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে যে, দেশের সব মানুষের ভেতর থেকে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার মানসিকতা দূর করে সবাইকে নিয়ে আধুনিক একটা বাংলাদেশ তৈরি করা হবে। ৪। নারী-পুরুষ সমতা: আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কী, আমি সব সময়েই তার উত্তরে বলে থাকি যে, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে, এখানে সব ক্ষেত্রে ছেলেরা এবং মেয়েরা সমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলগুলোয় বরং মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের লেখাপড়ার মান ভালো। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যখন বইপড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, সেখানে মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। আন্তর্জাতিক মেয়েদের খেলাতেও মেয়েরা অনেক ভালো করছে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে দেখা যায়, ছেলেদের সংখ্যা থেকে মেয়েদের সংখ্যা কম। কারণ তখন বাবা-মায়েদের ধারণা হয় ভালো একটা পাত্র দেখে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে ফেলা দরকার। মেয়েরা যে শুধু লেখাপড়ার সব জায়গায় আছে তা নয়, গার্মেন্টস শ্রমিক প্রায় সবাই মেয়ে এবং তারা আমাদের অর্থনীতিটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে ক্যারিয়ার বলে একটা নিষ্ঠুর শব্দ আছে। যেকোনও পর্যায়েই এই ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতায় পুরুষের কাছে মেয়েরা হেরে যায়। কারণ, যখন ক্যারিয়ার গড়ার সময়, সেটি সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়, সন্তানকে বড় করার সময়। পুরুষ মানুষ অনেক কিছু করতে পারলেও সন্তান জন্ম দিতে পারে না। সন্তানের মা হতে পারে না। কাজেই রাষ্ট্র ইচ্ছে করলে নারীদের এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। যেখানে মেয়েরা কাজ করে, সেখানে চমৎকার ডে কেয়ার গড়ে তুলতে পারে। সেটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিই হোক আর বিশ্ববিদ্যালয়ই হোক। যদি মায়েরা জানে তার শিশু সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার একটা জায়গা আছে, তাহলে তাদের জীবনটাই অন্যরকম হয়ে যেতে পারে। নির্বাচনকালীন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে একটা শব্দ খুবই জনপ্রিয় হয়েছে, তাহলে পুরুষ ও নারীর ক্যারিয়ার গড়ে তোলার ব্যাপারে কেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না? মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার বেলায় বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে এগিয়ে আছে। তাহলে মায়েদের কাজ করার সুযোগ করে দেওয়ার বেলায় আমাদের দেশ কেন এগিয়ে থাকবে না? কাজেই নির্বাচনি ইশতেহারে আমি নারী পুরুষের মাঝে সমতা আনার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝ থেকে এরকম একটি অঙ্গীকার দেখতে চাই। ৫। জ্ঞানভিত্তিক দেশ:  প্রথম যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছিল, তখন অনেকেই ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়েছিল এবং বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে নেয়নি। কিন্তু এখন মোটামুটি সবাই বিষয়টা গ্রহণ করেছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে উদ্যোগ নেওয়ার কারণে অনেক কিছু ঘটেছে, যেটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঘটা সম্ভব ছিল না। যখন ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হয়, তখন দেশের মানুষের কথা আলাদাভাবে বলা হয় না,কিন্তু যদি এর পরের ধাপ হিসেবে আমরা জ্ঞানভিত্তিক দেশের কথা বলি, তখন কিন্তু আমরা দেশের মানুষের কথা বলি। আমাদের দেশে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ কোটি। যদি তাদের সবাইকে ঠিকভাবে লেখাপড়া করানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে, সে রকম দেশ আর কয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে? আমরা সবাই দেখেছি, এই দেশের একেবারে সাধারণ মানুষটিও কিন্তু লেখাপড়ার গুরুত্বটি ধরতে পেরেছে। লেখাপড়ার মান নিয়ে আমরা এখনও সন্তুষ্ট নই কিন্তু যদি লেখাপড়ার মানটুকু বাড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে জোর দিয়ে বলা যাবে, আমাদের দেশটিকে জ্ঞানভিত্তিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যে সব উপাদান আছে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এখনও এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের শরীরের ঘাম। তাদের পাশে যদি মেধা নিয়ে নতুন প্রজন্ম দাঁড়াতে শুরু করে, তাহলেই আমরা জ্ঞানভিত্তিক দেশের স্বপ্নে পা দিতে শুরু করবো। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশা করতেই পারি, তারা আমাদের দেশকে জ্ঞানভিত্তিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখাবে। ৬। শিক্ষায় জিডিপির চার শতাংশ: বাংলাদেশ ডাকার সম্মেলনে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা দেশের জিডিপির  ৬ শতাংশ খরচ করবে শিক্ষায়। এখন বাংলাদেশ খরচ করছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকেও কম। আমি সব সময়েই বলে থাকি, লেখাপড়ার পেছনে এত কম টাকা খরচ করে পৃথিবীর আর কোনও দেশ এত ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করানোর কথা চিন্তাও করতে পারবে না! আমরা ইচ্ছা করলে তো দাবি করতেই পারি যে, যতটুকু অঙ্গীকার করা হয়েছিল, ততটুকু খরচ করতে হবে কিন্তু তাহলে হয়তো আমাদের দাবিটা কেউ বিশ্বাস করবে না। এই মুহূর্তেও যেটুকু খরচ করা হচ্ছে, তার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি কেমন করে চাই? তাই আমার মনে হয়, আমরা আপাতত নির্বাচনি ইশতেহারের জন্য জিডিপির চার শতাংশ চাইতে পারি! যারা বাজেট করেন, তাদের বিশ্বাস করতে হবে লেখাপড়ার পেছনে যদি একটাকাও বাড়তি খরচ করা হয়, তাহলে সেটারও একটা ফল পাওয়া যায়। তার কারণ লেখাপড়ার পেছনে যে টাকা খরচ করা সেটি মোটেও খরচ নয়, সেটি হচ্ছে বিনিয়োগ। ৭। সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা: কেন সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত, সেটি নিশ্চয়ই নতুন করে কাউকে বোঝাতে হবে না। ভর্তি পরীক্ষার নামে ছেলে মেয়েদের এমন একটি নিষ্ঠুরতার ভেতর দিয়ে নেওয়া হয়, যেটি রীতিমতো অবিশ্বাস্য। রাষ্ট্রপতি সেটি লক্ষ্য করেছেন এবং একাধিকবার সব ভাইস চ্যান্সেলরকে ডেকে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলেছেন। গত বছর সেটি নেওয়া সম্ভব হয়নি, আমি ভেবেছিলাম এই বছর নিশ্চয়ই সেটি হবে। কিন্তু আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছি যে, এই বছরেও কেউ এটি নিয়ে কথা বলছে না! সত্যি কথা বলতে কী, এই বছর অবস্থা আগের থেকে খারাপ। আগে যে পরীক্ষাটি একবার নেওয়া হয়েছে, প্রশ্নফাঁস হওয়ার কারণে এবার সেই পরীক্ষা দুই বার নিতে হয়েছে। কেমন করে আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের রক্ষা করবো, জানি না। কিন্তু আমি নিশ্চিত সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অঙ্গীকার এই দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং তাদের বাব-মা একবাক্যে লুফে নেবে। কাজেই নির্বাচনি ইশতেহারে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার অঙ্গীকার করে তরুণ প্রজন্মকে খুব সহজে উৎসাহী করা সম্ভব বলে আমি মনে করি! ৮। সাইকেল লেন:  বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম। বিশেষ করে যারা ঢাকা শহরের বাইরে থাকে, তারা যদি ঢাকায় একে একবার ট্রাফিক জ্যামের যন্ত্রণাটা অনুভব করে তাহলে সাধারণত তার ঢাকা আসার সাধ জন্মের মতো মিটে যায়। ঢাকা শহরে নানা মিটিংয়ের জন্যে আমাকে প্রায়ই আসতে হয়, আমি একটা বিচিত্র বিষয় আবিষ্কার করেছি। ঢাকা শহরে কোথাও আমি সময়মতো যেতে পারি না। বেশি সময় হাতে নিয়ে রওনা দেওয়ার পরও ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারি না কিংবা বেশি সময় হাতে নিয়ে রওনা দেওয়ার কারণে অনেক আগে পৌঁছে গিয়ে সময় কাটানোর জন্যে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটাই। সোজা কথায় বলা যায়, কতটুকু দূরত্ব কত সময়ে পৌঁছানো যাবে, সে দুটির মাঝে কোনও সম্পর্ক নেই। এ কারণে ঢাকার মানুষজনের যে কী পরিমাণ সময় নষ্ট হয়, তার কোনও হিসাব নেই। সেই সময়টাকে যদি টাকা দিয়ে বিবেচনা করা যায়, আমার ধারণা তাহলে আমরা প্রতি মাসে একটা করে পদ্মা ব্রিজ তৈরি করে ফেলতে পারবো। আমার ধারণা, এর একতা খুব সহজ সমাধান আছে, সেটা হচ্ছে সাইকেলে যাতায়াত করা। আমাদের নতুন একটা আধুনিক প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সাইকেলে যেতে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। শুধু তাই না, স্কুলের অনেক ছেলে-মেয়েও সাইকেলে করে স্কুলে যাবে। এখন যেতে পারে না শুধু একটি কারণে, সেটা হচ্ছে ব্যাপারটা মোটেও নিরাপদ নয়। যে রাস্তায় দৈত্যের মতো  বড় বড়  বাস-ট্রাক একজনের সঙ্গে আরেকজন প্রতিযোগিতা করে ছুটে যাচ্ছে, সেই রাস্তায় কে সাইকেলে যেতে সাহস পাবে? কিন্তু যদি রাস্তার এক পাশে ছোট একটি লেন তৈরি করে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হয়, তাহলে সবাই সেই পথে যেতে পারবে। আমার এই কথাগুলো মোটেও আজগুবি কথাবার্তা নয়। পৃথিবীর অনেক বড় শহরে সাইকেল যাত্রীদের জন্যে আলাদা পথের ব্যবস্থা করে রাখা আছে। আজকাল শুধু যে সাইকেলের পথ তৈরি হয়েছে তা নয়, সাইকেল ভাড়া করার জন্যে একটু পরে পরে সারি সারি সাইকেল রাখা আছে, কাউকে আর সাইকেল কিনতেও হয় না। তাই আমি মনে করি নির্বাচনি ইশতেহারে যদি সব বড় বড় শহরে সাইকেলের আলাদা লেন তৈরি করে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়, নতুন প্রজন্ম অনেক আগ্রহ নিয়ে সেটি গ্রহণ করবে। ৯। সোশাল নেটওয়ার্কের অভিশাপ থেকে মুক্তি: আমি এখন যেটা বলতে চাইছি, সেটি সবাই মানতে রাজি হবেন কিনা আমি জানি না, কিন্তু আমি যেহেতু আমার নিজের পছন্দের কথা বলছি অন্যেরা রাজি না হলেও খুব ক্ষতি নেই। আমি জানি না, সবাই এটি লক্ষ করেছে কিনা, ছাত্রছাত্রীদের মাঝে একটা মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, যে পরিবর্তনটি ভালো নয়। ছাত্র-ছাত্রীদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা সাংঘাতিকভাবে কমে এসেছে। এটি শুধু যে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ঘটেছে তা নয়, সারা পৃথিবীর সব দেশের ছাত্রছাত্রীদের বেলায়ও ঘটেছে। এর কারণটিও এখন আর কারও অজানা নয়, সেটা হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক নামক বিষয়টির প্রতি আসক্তি। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, সারা পৃথিবীটি এখন দুটি জগতে ভাগ হয়ে গেছে, একটি হচ্ছে রক্তমাংসের বাস্তব জগৎ, আরেকটি ইন্টারনেটের পরাবাস্তব জগৎ। ইন্টারনেটের জগতে একেবারে তুলকালাম ঘটে যাচ্ছে কিন্তু বাস্তব জগতের কেউ সেটি সম্পর্কে কিছু জানে না, সেটি এখন এমন কিছু বিচিত্র ব্যাপার নয়। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত না থেকে আক্ষরিক অর্থে এক মুহূর্ত থাকতে পারে না, সেরকম মানুষের সংখ্যা খুব কম নয়। সাধারণ মানুষজন হয়তো খুব বেশি জানে না কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি জগতের বাঘা বাঘা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানে, যেগুলো হয়তো আমরা নিজেরাই জানি না। তথ্য এখন সোনার চেয়েও দামি এবং আমরা না জেনে আমাদের সমস্ত তথ্যভাণ্ডার বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছি। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে যেটি ফ্যি সার্ভিস মনে হচ্ছে, সেটি যে ফ্রি নয় এবং একবার আমাদের ভালো করে হাতে পেয়ে নিলে হঠাৎ করে গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট, আমাজন বা আপেলের মতো বাঘা বাঘা প্রতিষ্ঠানগুলো যে আমাদের সর্বস্ব সুদে-আসলে তুলে নেবে না, আমরা সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারি না। সারা পৃথিবীতে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা কোথায় আছি এবং কোথায় যাবো, সেটি কেউ ভালো করে জানে না। কিন্তু বোঝার আগে আমরা হয়তো আবিষ্কার করবো, আমরা অন্যের হাতের পুতুল হয়ে বসে আছি। তাই আমি চাই নির্বাচনি ইশতেহারে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকুক। পরিবর্তনশীল এই নাজুক পৃথিবীতে পৃথিবীর বড় বড় তথ্য প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের পুরোপুরি কব্জা করে ফেলার আগে আমাদের যেন নিজেদের রক্ষা করার একটা পথ খোলা থাকে। সেই সঙ্গে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে আসক্ত ছেলে-মেয়েদের রক্তমাংসের জগতে ফিরিয়ে আনার একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে।        ১০। বাক-স্বাধীনতা: আমি জানি বাক-স্বাধীনতা কথাটি খুব বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ অনেকবার দেখেছি ঠিক কোথায় বাকস্বাধীনতা খিস্তি খেউড় গালাগাল হয়ে যাচ্ছে, সেটা অনেকেই জানে না। সামনা-সামনি অনেকেই একে অন্যকে গালমন্দ করে না কিন্তু ইন্টারনেটের পরাবাস্তব জগতে খুব সহজেই একজন অন্যজনকে তুলোধূনা করে ফেলে। এই সবের পরেও আমি মনে করি, একজনের বাক-স্বাধীনতা থাকুক, বাড়াবাড়ি করে ফেললে সেটাকে প্রতিবাদ করার ব্যবস্থা থাকুক কিন্তু মন খুলে কথা বলা নিয়ে সবার ভেতরে যতি একটা আতঙ্ক কাজ করে তাহলে সেটি ভালো কথা নয়। আমার মনে হয় আমাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ৫৭ ধারাটি সবার মাঝে এক ধরনের ভীতি ঢুকিয়ে দিয়েছে। ইন্টারনেটে খিস্তি খেউড় হয়তো কমেছে কিন্তু অনেক জায়গায়ই মানুষ  তাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভয় পেতে শুরু করেছে। এটি আমরা কখনো চাই না। ৫৭ ধারার বাক্যগুলো খুবই ঢিলেঢালা ইচ্ছে করলেই যেকোনও মানুষের যেকোনও কথাকে ব্যবসার করে তাকে বিপদে ফেলে দেওয়া যাবে। তাই আমি মনে করি নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা বাক-স্বাধীনতা নিয়ে আরেকটু গুছিয়ে তৈরি করা একটি প্রস্তাব আশা করতে পারি। এই হচ্ছে নির্বাচনি ইশতেহারে আমি কী দেখতে চাই, সেরকম দশটি বিষয়ের তালিকা। দেখাই যাচ্ছে এটি কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ নয় এবং আমি যে বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাই ঘুরেফিরে সেগুলোই এসেছে। কিন্তু ক্ষতি কী? এটাই তো বাক-স্বাধীনতা আমার যেটা বলতে ইচ্ছে করছে সেটা বলছি! সবাইকে সেটা শুনতে হবে কিংবা বিশ্বাস করতে হবে কে বলেছে?   লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নির্বাচনি ইশতেহারে কী চাই?
নিউ ইয়র্কে নির্বাচন
আমার ধারণা, এখন পৃথিবীর সবচেয়ে অমানবিক জায়গা হচ্ছে এয়ারপোর্ট। যারা এয়ারপোর্টে কাজ করেন, নিশ্চয়ই তাদের কানের কাছে চব্বিশ ঘণ্টা বলা হয়, ‘পৃথিবীতে কোনও ভালো মানুষ নেই। সবাই হচ্ছে খুনি ডাকাত বদমাইশ সন্ত্রাসী। তাদের কোনও কিছুতেই বিশ্বাস করবে না।’ তাই যখন সিকিউরিটির জন্য দাঁড়ানো হয়, তখন শরীরে যা কিছু আছে, সবকিছু খুলে আলাদা করে ফেলতে হয়। বেল্ট, ঘড়ি, জুতো, জ্যাকেট, মোবাইল ফোন, টেলিফোন, চাবির রিং, খুচরো পয়সা, ল্যাপটপ, মানিব্যাগ কিছুই সঙ্গে রাখা যাবে না। সেগুলো বাস্কেটে করে এক্স-রে করতে পাঠানো হয়। কিছু কিছু ভয়ঙ্কর জিনিস আছে, যেগুলো দেখলে সিকিউরিটির মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে যায়, তার একটা হচ্ছে পানি! সিকিউরিটিতে কাজ করতে করতে মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিশ্চয়ই অমানুষ হয়ে যায়। এবার আমি সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েছি, কারণ এবার আমি যখন এয়ারপোর্টের সিকিউরিটির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, তখন আমাদের সঙ্গে এক ছয় মাসের শিশু ছিল। তাকে আলাদা করে রাখতে হলো এবং ডাকাতের মতো একজন মানুষ তাকে টিপেটুপে দেখলো, সে গোপনে কোনও অস্ত্র নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে কিনা। শুধু তাই না, টিপেটুপেই তারা নিঃসন্দেহ হলো না, মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তাকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করে দেখলো, আসলে শিশুটি বড় কোনও সন্ত্রাসী কিনা! যে চাকরিতে ছয় মাসের অবোধ শিশুকে সন্দেহ করতে হয়, সে চাকরি না করলে কী হয়? তবে পৃথিবীর দুটি এয়ারপোর্টে আমি এখনও যথেষ্ট স্বস্তি অনুভব করি, তার একটি হচ্ছে ঢাকা এয়ারপোর্ট। এখানেই সবাই আমাকে চেনেন এবং, ‘স্যার এইখানে চলে আসেন’ বলে ডেকে নিজ থেকে সবকিছু করে দেন। শুধু তাই না, পাসপোর্টে সিল দেওয়ার সময় অনেকেই তাদের ছেলে-মেয়ের গল্প করেন, আমার লেখালেখি পড়তে তারা ভালোবাসেন,  সেই কথাটিও জানিয়ে দেন। দ্বিতীয় যে এয়ারপোর্টে আমি যথেষ্ট স্বস্তি অনুভব করি, সেটি হচ্ছে নিউ ইয়র্কের এয়ারপোর্ট। এখানেও বাঙালি পুলিশ অফিসার ইমিগ্রেশানের লাইনে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তারাও আমাকে চিনে ফেলেন এবং আলাদাভাবে সাহায্য করেন। কাজ শেষ হওয়ার পর তারা আমার সঙ্গে একটা সেলফিও তুলে ফেলেন। আমাদের সঙ্গে যেহেতু একটা ছোট শিশু ছিল তাই এয়ারপোর্টের অপরিচিত মানুষেরাও নিজ থেকে এগিয়ে এসে আমাদের সাহায্য করেন। যেখানে মানুষজন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আমাদের কখনোই লাইনে দাঁড়াতে হয় না, ছোট শিশুকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হিসেবে না দেখে ছোট শিশু হিসেবে দেখার মাঝে নিশ্চয়ই এক ধরনের আনন্দ আছে। অন্য এয়ারপোর্টের সিকিউরিটির মানুষেরা কখনোই সেই আনন্দটি উপভোগ করতে পারে না। নিউ ইয়র্ক শহরটি নিঃসন্দেহে একটি চমকপ্রদ শহর। যারা এই শহরটিতে থেকেছেন কিংবা ঘুরতে এসেছেন, সবাই এটি স্বীকার করবেন। একেকজন মানুষের কাছে শহরটিকে একেকটি কারণে চমকপ্রদ মনে হতে পারে। যেমন, আমার কাছে এই শহরটিকে চমকপ্রদ মনে হওয়ার অনেক কারণের একটি হচ্ছে, এখানকার মানুষের শরীরের উল্কি (Tattoo)! শীতকালে জাব্বা জোব্বা পরে শরীর ঢেকে রাখতে হয় বলে বেশিরভাগ সময় উল্কি দেখা যায় না। গ্রীষ্মে বা গরমের সময় এখানকার মানুষের উল্কি উপভোগ করা যায়। শৈশবে শুধু এক রঙের উল্কি দেখেছি কিন্তু উল্কি যে কত বিচিত্র রঙের হতে পারে এবং কত নান্দনিক হতে পারে সেটি এখানে না এলে কেউ অনুমান করতে পারবে না। তবে যে কারণে নিউ ইয়র্ক শহর সম্ভবত সারা পৃথিবীর সব শহর থেকে আলাদা করা যায়, সেটি হচ্ছে এখানকার মানুষের বৈচিত্র্য (Diversity)। শহরটি দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যদি শুধু তাদের মুখের কথা শোনার চেষ্টা করা হয়, তাহলে অবাক হয়ে আবিষ্কার করা যায়, কত বিচিত্র তাদের মুখের ভাষা! আমি মিনিট দশেক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষজনকে যেতে দেখেছি, এর মাঝে দুই জন বাঙালি মহিলাকে খাঁটি সিলেটি ভাষায় কথা বলতে বলতে হেঁটে যেতে দেখলাম! আমার ধারণা, যেকোনও জায়গায় যেকোনও সময় যদি মানুষদের লক্ষ্য করা যায়, বেশিরভাগ সময় দেখা যাবে- তারা ইংরেজি নয়, পৃথিবীর অন্য কোনও ভাষায় কথা বলছে! আজকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইলেকশান হচ্ছে। আমাদের দেশে ইলেকশান বিশাল একটি ঘটনা! দেশে এখনও প্রার্থীদের নমিনেশান দেওয়া হয়নি কিন্তু মনে হয় পুরো দেশ মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের পোস্টারে ঢেকে গেছে। ইলেকশানের দিন দেশের মানুষ সেজেগুজে ভোট দিতে আসে। কত মানুষ ভোট দিয়েছে জানার জন্যে ইন্টারনেটে খোঁজ করেছিলাম, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় আশি শতাংশ ভোটার ভোট দেন। আমেরিকায় সেই সংখ্যাটি মাত্র পঞ্চান্ন শতাংশ। কাজেই এই দেশের মানুষকে ভোট দেওয়ানোর জন্য অনেক চেষ্টা-চরিত্র করা হয়। খুব যে লাভ হয়, তা মনে হয় না। আজ সকালে আমি একজন ভোটারের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলাম। মানুষজনকে ভোট দিতে উৎসাহী করার জন্যে পুরো ব্যাপারটি খুবই সহজ করে রাখা হয়েছে। গিয়ে নিজের নাম বললেই তাকে একটা ব্যালট পেপার দেওয়া হচ্ছে। ভোট দেওয়ার নিয়মকানুন কমপক্ষে দশটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লেখা আছে, তার মাঝে বাংলাও আছে! পাশাপাশি অনেক ডেস্ক, মানুষজন আলাপ আলোচনা করে ব্যালটে টিক চিহ্ন দিচ্ছে! টিক চিহ্ন দেওয়ার পর স্ক্যানারে স্ক্যান করে ভোটার ভোটকেন্দ্র থেকে বের হয়ে আসছে। মানুষজন যেহেতু ভোট দেয় না, তাই যারা কষ্ট করে ভোট দিতে আসে, তাদের একটা স্টিকার দেওয়া হয়। সেখানে লেখা ‘আমি ভোট দিয়েছি’ সেটা বুকে লাগিয়ে গর্বিত ভোটার ঘুরে বেড়ান। তবে, এই দেশে যারা স্থায়ীভাবে থাকেন, তারা আমাকে বার বার সতর্ক করে বলেছেন, আমি যেন নিউ ইয়র্ককে দেখে সারা আমেরিকা সম্পর্কে একটা ধারণা করার চেষ্টা না করি। নিউইয়র্ক শহরটি পুরোপুরি অন্যরকম। এখানে পুলিশ কোনও মানুষকে ধরে কখনোই জানতে চাইতে পারবে না, তার কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা! এই দেশের অনেক জায়গা আছে, যেখানে কালো বা দরিদ্র মানুষেরা যেন ভোট দেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, সেজন্যে পুরো প্রক্রিয়াটাকে কঠিন করে রাখা আছে। ভোটার তালিকায় নাম খুঁজে পাওয়া যায় না, প্রতি বছর ভোটকেন্দ্র পাল্টানো হয়, নানারকম আইডি দেখিয়ে ব্যালট নিতে হয়, লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এবং কিছুদিনের ভেতরেই দরিদ্র মানুষগুলো ভোট দেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত গণতন্ত্রের কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। এই দেশে এক ধরনের গণতন্ত্র নিশ্চয়ই আছে, তা না হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একটা উৎকট রসিকতা কেমন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারে? আমার ধারণা ছিল, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলটিকে এই দেশের মানুষ বিদায় করে দেবে। সেটি হয়নি, কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ এখনও ডোনাল্ড ট্রাম্পের দখলে। নিচের কক্ষটি তার হাতছাড়া হয়েছে। এবারে আমি আগ্রহ নিয়ে দেখার চেষ্টা করবো, একজন প্রবলভাবে মিথ্যাচারী, হিংসুটে, প্রতিহিংসাপরায়ণ, পৃথিবীর সব মানুষের প্রতি বিতৃষ্ণাপরায়ণ প্রেসিডেন্টকে একটুখানি হলেও আটকে রাখা যায় কিনা। যদি সে রকম কিছু ঘটে, তাহলে এই দেশের গণতন্ত্রের জন্যে একটুখানি হলেও বিশ্বাস ফিরে আসবে। আমাদের দেশেও নির্বাচন আসছে। দেশের বাইরে থেকে ইন্টারনেটে দেশের সব খবর পেয়ে গেলেও দেশটিকে অনুভব করা যায় না। নির্বাচন নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো না। ঠিক কী কারণ, জানা নেই, শুধু মনে হয় নির্বাচন ঠেকানোর জন্য পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কীভাবে একটা লাশ ফেলে দেওয়া যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে! তবে আমি একচক্ষু হরিণের মতো জটিল রাজনীতিকে খুব সহজ করে বুঝতে চাই। যেহেতু এই দেশটি মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে, তাই এই দেশের সব রাজনীতি হতে হবে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো সেটি মুখে স্পষ্ট করে উচ্চারণ না করবে, আমি সেই রাজনৈতিক দলটিকে বিশ্বাস করতে পারি না। বিএনপি এখনও মুখে স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেনি তারা নির্বাচন করবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়া। যে কারণে বিকল্পধারা তাদের সঙ্গে ফ্রন্ট করেনি। বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন বর্ষীয়ান নেতা ড. কামাল হোসেনের কাছে বিষয়টি সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ নয়, তিনি সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে আগ্রহী নন। সম্ভবত এটাকেই রাজনীতি বলে। আমি সেই রাজনীতি চোখ দিয়ে দেখবো কিন্তু মন থেকে বিশ্বাস করতে হবে কে বলেছে? লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নিউ ইয়র্কে নির্বাচন
নির্বাচনের আগে-পরে
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ—যারা এই কথাটা বিশ্বাস করেন না কিংবা কথাটাকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, তাদের এই লেখাটার বাকি অংশ পড়ার কোনও প্রয়োজন নেই। যারা এখনও পড়ছেন, তারাও নিশ্চয়ই একটু অবাক হচ্ছেন। শুধু মার্চ মাসে না হয়ে ডিসেম্বর মাসে গলা কাঁপিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলার কথা। আমি এই অবেলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে আনছি কেন? বলা যেতে পারে, এটা আমার একটা দুর্বলতা (কিংবা কে জানে, হয়তো এটা আমার একটা শক্তি!) আমি কখনোই মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টা আমার মাথা থেকে সরাতে পারি না। মুক্তিযুদ্ধের সময়টুকু একেবারে নিজের চোখে দেখেছি বলে আমার ভেতরে (এবং আমার মতো অন্যদের ভেতরে) এমন একটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, যেখান থেকে আমরা কখনোই আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবো না। সেই সময়টুকু ছিল একটা বিস্ময়কর সময়। মানুষ যে কত ভালো হতে পারে, কত নিঃস্বার্থ-আত্মত্যাগী হতে পারে, সেটা আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময়। আবার ঠিক একইভাবে মানুষ যে কত খারাপ হতে পারে, কত নৃশংস ও অমানুষ হতে পারে, সেটাও দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের সময়। তাই আমি জেনে হোক, না জেনে হোক, সবসময় সবকিছু বিচার করি আমার মুক্তিযুদ্ধের ফিল্টার দিয়ে। এদেশে যখন কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আমার কাছে তখন সেটা একটা যৌক্তিক আন্দোলন মনে হয়েছিল। আমি তাদের পক্ষে লিখেছি এবং কথা বলেছি। হঠাৎ করে একদিন দেখি, এই আন্দোলনকারী একজন নিজের বুকে ‘আমি রাজাকার’ লিখে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে—মুহূর্তে আমার মন বিষিয়ে গেল। আমি শুধু যে এই আন্দোলন নিয়ে সমস্ত উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম, তা নয় আমার মনে হতে থাকল নিশ্চয়ই আমরা কোথাও বড় কোনও ভুল করেছি। তা না হলে কেমন করে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম নিজেকে রাজাকার হিসেবে ঘোষণা দিতে পারে? কমবয়সী ছেলেমেয়ে আমার কিছু পাঠক আছে, তাদের জন্যে প্রতিবছর বইমেলার আগে আমার কয়েকটা বই লিখতে হয়। এই বছর সবকিছু ফেলে বই মেলার আগেই আমি রাজাকার নিয়ে একটি বই লিখেছি। আমার মনে হয়েছে, রাজাকার কী চিজ, সেটা আমার সবাইকে জানানো উচিত, যেন ভবিষ্যতে কেউ এই দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজেকে রাজাকার পরিচয় দেওয়ার নির্বোধ দুঃসাহস দেখাতে আগ্রহী না হয়। কাজেই এই বছর যখন নির্বাচন এগিয়ে আসছে, আমি আবার আমার চোখে মুক্তিযুদ্ধের ফিল্টার লাগানো চশমাটি পরে ডানে বাঁয়ে তাকাতে শুরু করেছি। কী দেখছি, সেটি আলোচনা করার জন্য আমার এই লেখা। নির্বাচনের তিনটা পর্যায়, নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের সময় এবং নির্বাচনের পরে। এখন পত্রপত্রিকা, সংবাদ মিডিয়া, টক শো আলোচনা—সবকিছুই হচ্ছে নির্বাচনের সময় পর্যায়টি নিয়ে। জোট তৈরি হচ্ছে, ফ্রন্ট তৈরি হচ্ছে, জোট থেকে কেউ বের হয়ে যাচ্ছে, কেউ ঢুকে যাচ্ছে, নতুন নতুন দফা তৈরি হচ্ছে, দাবি তৈরি হচ্ছে—ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার কেন জানি মনে হয়, নির্বাচনের সময় কী দাবি-দাওয়া করা হচ্ছে তার বিশ্লেষণের অংশটি সবচেয়ে সহজ। একেবারে এক কথায় বলে দেওয়া সম্ভব—পারলে আদায় করে নাও! শুধু যে বাংলাদেশের জন্যে সেটা সত্যি তা নয়, সারা পৃথিবীর জন্যও এটা সত্যি। পৃথিবীতে কেউ যুক্তিতর্ক শোনে ভালোমানুষের মতো কিছু ছেড়ে দেয় না, তার কাছ থেকে আদায় করে নিতে হয়। ছোট বাচ্চা গলা ফাটিয়ে না চেঁচানো পর্যন্ত মাও তার বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায় না! কাজেই নির্বাচনের সময় কে কী চায়, না চায়, তার দাবি নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি, সেই দাবি-দাওয়া আদায় করা সম্ভব হয় কিনা সেটা দেখার জন্য। তবে নির্বাচনের আগের সময় এবং নির্বাচনের পরের  সময়টুকু নিয়ে আমার আগ্রহ আছে, কিছু বলারও আছে। নির্বাচনের আগের সময় নিয়ে আমার খুবই মৌলিক একটা প্রশ্ন—যারা বাংলাদেশ চায়নি, তাদের কি বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে? উদাহরণ জামায়াতে ইসলামী। একাত্তরে তারা পত্রপত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেনি, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদলেহী হয়ে হাতে অস্ত্র নিয়ে রাজাকার বাহিনী আর বদর বাহিনী তৈরি করে মানুষ মেরে গ্রাম জ্বালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর এই দেশে তাদের রাজনীতি করার অধিকার ছিল না, প্রাণ বাঁচানোর জন্য গর্তে লুকিয়েছিল। তখন এলো পনেরোই আগস্ট ঊনিশ শ পঁচাত্তর। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেই শেষ হয়ে গেলো না, জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নেতৃত্বহীন করে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। তখন এই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটলো। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ অ্যাবাউট টার্ন করে পুরোপুরি উল্টোদিকে পাকিস্তানের পথে যাত্রা শুরু করলো। নেতৃত্ব দিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। জেলখানা থেকে যুদ্ধাপরাধীরা ছাড়া পেয়ে গেলো, তারা রাজনীতি করা শুরু করলো। আমাদের এতো স্বপ্নের বাংলাদেশটি জানি কেমন হয়ে গেল। মিলিটারি জেনারেল হয়ে দেশ শাসন করলে ভালো দেখায় না, গণতন্ত্রের ভাণ করতে হয়, তাই জন্ম নিলো বিএনপি। বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থক—তারা কী এই রাজনৈতিক দলটির এই জন্ম ইতিহাসের গ্লানি অস্বীকার করতে পারবে? এখানেই কি শেষ? বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা শুরু হলো, টেলিভিশনে রাজাকার বলা যাবে না, পাকিস্তান সেনাবাহিনী বলা যাবে না, হানাদার বাহিনী বলতে হবে, দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে শুধু টেলিভিশন নয়, পুরো দেশ থেকে নির্বাসন দেওয়া হলো। এখানেই শেষ নয়, আমরা দেখলাম একদিন জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির জোট হয়ে গেলো। সিন্দবাদের সেই বুড়োর মতোন জামায়াতে ইসলামী সেই যে বিএনপির ঘাড়ে চেপে বসে তার গলা চিপে ধরেছে, সেখান থেকে আর তাদের মুক্তি নেই। নির্বাচনের আগে এখন নানা রকম জোট হচ্ছে, নানা রকম ফ্রন্ট হচ্ছে, এই সময় আমি যদি একেবারে পরিষ্কার বাংলায় শুনতে চাই- মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ নিয়ে তাদের বক্তব্য কী, কেউ কি আমার মুখ বন্ধ করতে পারবে? আমি কী বলি, তাতে কিছু আসে যায় না কিন্তু কেউ আমার বিশ্বাস থেকে এক বিন্দু সরাতে পারবে না। যত বড় জোট কিংবা যত বড় ফ্রন্টই হোক না কেন, তাদের পরিষ্কার করে সোজা বাংলায় বলতে হবে- এই নির্বাচনে তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামী আছে কি নেই। যতক্ষণ সেটি না হচ্ছে কারও জন্যে আমার ভেতরে কোনও সম্মানবোধ নেই, কোনও বিশ্বাস নেই। এবারে আসি নির্বাচনের পরের পর্যায়টি নিয়ে। সবাই কি জানে যতই নির্বাচন এগিয়ে আসছে এই দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজনের বুকের ভেতর এক ধরনের অশান্তি, এক ধরনের দুর্ভাবনা দানা বাঁধতে শুরু করেছে? সবার কি মনে আছে শেষবার যখন জামায়াত-বিএনপি নির্বাচনে জয় লাভ করেছিল, তখন এই দেশের মাটিতে কী ঘটেছিল? মানুষের ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক রূপটি আমি প্রথম দেখেছিলাম ঊনিশ শ একাত্তর সালে। জুন জুলাই মাসে নানা জায়গায় তাড়া খেয়ে আমরা গহীন একটা গ্রামে একজন ধর্মভীরু মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। সেই গহীন গ্রামেও একদিন পাকিস্তান মিলিটারি হানা দিয়েছে, মানুষকে গুলি করে মারছে, বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। ঠিক তখন দেখলাম একজন হিন্দু যুবক, তার স্ত্রীর কোলে একটি ছোট শিশুকে নিয়ে ভয়ঙ্কর আতঙ্কে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে যাচ্ছে। আমার মা তাদের থামালেন, অভয় দিলেন তারপর তাদের একটু টাকা পয়সা দিলেন। পাশেই একজন দাঁড়িয়ে ছিল, সে অবাক হয়ে আমার মা’কে বললো, ‘এরা হিন্দু, এদের সাহায্য করলে কোনও সওয়াব হবে না! কেন এদের টাকা-পয়সা দিচ্ছেন?’ আমার মা কী উত্তর দেবেন জানেন না, অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। বলা যেতে পারে, সেই প্রথমবার আমি টের পেলাম মানুষকে ধর্ম দিয়ে ভাগ করে ফেলা যায়। নিজ ধর্মের মানুষের জন্যে গভীর মমতা এবং ভালোবাসা থাকা সম্ভব, আবার অন্য ধর্মের মানুষকে একেবারে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা না করা সম্ভব। যখন অন্য ধর্মের মানুষকে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয় না, তখন তাদের প্রতি কী পরিমাণ নৃশংসতা করা সম্ভব, সেটা আমরা দেখেছি। নির্বাচনের পর ঠিক সেই ব্যাপারটা ঘটেছিল, ভবিষ্যতে আবার ঘটবে না, সেটা কে গ্যারান্টি দিতে পারবে? আমি সব সময়েই স্বপ্ন দেখি, আমাদের দেশের সবাই রাজনীতি করবে মুক্তিযুদ্ধকে বুকে ধারণ করে। সেটি তো আর অযৌক্তিক কোনও কথা নয়। বাংলাদেশটার জন্মই হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে। তাই সেই আদর্শটা নিয়েই যদি রাজনীতি করা হয়, তাহলে নির্বাচন নিয়ে আমাদের ভেতর কোনও দুর্ভাবনা থাকবে না, কোনও দুশ্চিন্তা থাকবে না। কেন জানি মনে হয় ব্যাপারটা হয়তো খুব কঠিন নয়!   লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়     
নির্বাচনের আগে-পরে
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন
শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকতা জীবন শেষ হতে শুরু করেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি চব্বিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছি। চব্বিশ বছর হচ্ছে দুই যুগ—অনেক বড় একটি সময়। এত দীর্ঘ একটা সময় এক জায়গায় থাকলে সেখানে শেকড় গজিয়ে যায়, সেই শেকড় টেনে উপড়াতে কষ্ট হয়, সময় নেয়! আমি সেই সময় সাপেক্ষে কষ্টের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। চিন্তা করলে মনে হয়, এই তো মাত্র সেদিনের ঘটনা। প্রথম যখন এসেছি যোগাযোগ করার জন্য টেলিফোন পর্যন্ত নেই, ঢাকায় মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য কার্ড ফোন ব্যবহার করার চেষ্টা করি, টেলিফোন কার্ডের টাকা খেয়ে হজম করে ফেলে কিন্তু কথা শুনতে পারি না। বাচ্চাদের স্কুল নেই, যেটা আছে সেখানে নেওয়ার যানবাহন নেই। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন যৎসামান্য ভাগ্যিস কয়েকটা বই লিখেছিলাম রয়েলটির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চলে যায়। এরকম ছোটখাটো যন্ত্রণার কোনও শেষ ছিল না কিন্তু যখন পেছনে ফিরে তাকাই তখন পুরো স্মৃতিটি মনে হয় একটা মধুর স্মৃতি। মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার কিছুদিন পর হঠাৎ একদল ছাত্র এসে হাজির, তারা হাসি হাসি মুখে বললো, ‘স্যার টিলার ওপর পিকনিক হচ্ছে। সবাই মিলে মাছ রান্না করেছি, চলুন স্যার, আমাদের সঙ্গে খাবেন।’ আমি সরল বিশ্বাসে আরেকজন শিক্ষক নিয়ে সেই মাছ খেতে গিয়েছি। পরদিন সকালে শুনি ছাত্রদের বিরুদ্ধে বিশাল অভিযোগ, তারা নাকি আগের দিন কোথা থেকে মাছ চুরি করে এনেছে! ভাইস চ্যান্সেলর রেগে আগুন কিন্তু ছাত্রদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটিও বসাতে পারছেন না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন (আমি) এবং প্রক্টর (আমার শিক্ষক বন্ধু) আগের রাতে ছাত্রদের সঙ্গে সেই চুরি করা মাছ খেয়ে এসেছি। যে অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও প্রক্টর অপরাধী, সেই অপরাধের তদন্ত হয় কেমন করে? আমি আমার ছাত্রদের বুদ্ধি দেখে চমৎকৃত হলাম! তবে কিছুদিনের ভেতরেই অবশ্য আমি নিজেই একটা তদন্ত করার দায়িত্ব পেলাম। তখন ছাত্র সংসদটি ছিল ছাত্রদলের হাতে, তারা সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন করেছে, সেখানে উপস্থিত বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল রাজাকারদের অপকর্ম নিয়ে। ছাত্রশিবিরের সেটা পছন্দ হয়নি। তাই তারা ছাত্রদলের একজন নেতাকে ছুরি মেরে দিয়েছে। তদন্ত করে আমরা দোষী ছেলেটাকে বের করেছি কিন্তু শাস্তি দেয়ার আগেই সে আলীগড়ে চলে গেলো। ছাত্রদলের ছেলেদের তখন মুক্তিযুদ্ধের জন্যে এক ধরনের ভালোবাসা ছিল। তবে কিছুদিনের ভেতরেই জামায়াত ও বিএনপি জোট করার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও ভালোবাসা উবে যেতে থাকে। আমার মনে আছে, শিবির ছাত্রদের হাতে ছুরি খাওয়া ছাত্রদলের সেই নেতাটিকে একদিন ক্যাম্পাসে দেখলাম। সে শিবিরের ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে গলা ফাটিয়ে আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে! ভাষা অত্যন্ত অশালীন, লজ্জায় কান লাল হয়ে যাওয়ার অবস্থা। আমি নিশ্চয়ই তদন্তে এক্সপার্ট হয়ে উঠেছিলাম, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্পর্শকাতর তদন্ত আমাকে দেয়া হতে থাকলো। আমি হাবাগোবা মানুষ, তখনও জানি না যে, কোন কোন তদন্ত করতে হয় এবং কোন কোন তদন্ত করতে গিয়ে কালক্ষেপণ করে একসময়ে হিমাগারে পাঠিয়ে দিতে হয়। তাই আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগের কিছু মাস্তানের তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়ে সবাইকে বিপদে ফেলে দিয়েছি। একদিন আবিষ্কার করলাম, ছাত্রলীগ আমাকে ও আমাদের ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। ক্যাম্পাসে আসতে পারি না, খবর পেয়েছি তদন্তের আসামিরা গোলচত্বরে সোফা পেতে বন্দুক কোলে নিয়ে বসে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার এরকম ঘটনার কোনও শেষ নেই। একবার বাসায় বোমা পড়েছে, সেটা নিয়ে খুব হইচই। সেই হইচই দেশ ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কীভাবে কীভাবে আমেরিকায় বেল কমিউনিকেশন্স রিসার্চে আমার সাবেক বস সেই খবর পেয়েছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ইমেইল পাঠিয়েছেন, ‘আপনি এই ই-মেইল পাওয়া মাত্র পরিবারের সবাইকে নিয়ে প্লেনে চেপে এখানে চলে আসুন। এখানে পৌঁছানোর পর আমার বেতন ঠিক করবো।’ আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারি না। তাকে অভয় দিয়ে ই-মেইলে পাঠালাম, বললাম, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এখানে এটা আমার জন্যে এমন কোনও ব্যাপার নয়, এটি আমার দৈনন্দিন জীবনের খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। কেউ যেন মনে না করে, আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন বুঝি কেটেছে এরকম ঝক্কি ঝামেলার ভেতর দিয়ে, মোটেও সেরকম কিছু নয়। বেশিরভাগ সময় কেটেছে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে, সেই সময়টি হচ্ছে জীবনের পরম পাওয়া। তাদের সঙ্গে গেলেই মনে হতো আমি বুঝি আবার নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে গেছি, কোনও দায়দায়িত্ব নেই সময়টি রঙিন চশমা চোখে পৃথিবীটাকে দেখার, নিরবচ্ছিন্নভাবে আনন্দ করার। তাই যেদিন সিলেটের ঝুম বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এসে পৃথিবীটাকে ভাসিয়ে নেয় আর ছাত্রছাত্রীরা বলে, ‘স্যার চলুন বৃষ্টিতে ভিজি’—আমি সঙ্গে সঙ্গে তাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি। আমি নিশ্চিত, আমার এই ছেলেমানুষি কাজকর্ম দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গুরুগম্ভীর শিক্ষক কৌতুক অনুভব করেছেন, অনেকে হয়তো বিরক্তও হয়েছেন কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেননি। কেমন করে বলবেন, আমার ছাত্রছাত্রীরা তো লেখাপড়াও করেছে। বাংলাদেশের এক কোণায় পড়ে থাকা ছোট ও অখ্যাত একটি ইউনিভার্সিটি হয়েও তারা দেশের বড় বড় ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়েছে। তাদের অনেকেই আমার কথা বিশ্বাস করে নিজেদের গড়ে তুলেছে, আমি সারাক্ষণ তাদের কানের কাছে বলে গিয়েছি, ক্লাসরুমে আমরা তোমাদের যেটা শেখাই, সেটা হচ্ছে তোমার শিক্ষার পাঁচ পার্সেন্ট। বাকি পঁচানব্বই পার্সেন্ট শিখতে হবে নিজে নিজে, ক্লাসরুমের বাইরে থেকে। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাটানো সময়টুকু আমার জীবনের একটি অমূল্য সম্পদ। কিছুদিন আগে ছুরিকাহত হয়ে হাসপাতালে ছিলাম, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে আমি বাসাতেও ফিরে যাইনি, সোজা এয়ারপোর্টে গিয়ে সিলেটে আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে চলে এসেছিলাম। আমি যখন ক্যাম্পাসে মাথা ঘুরিয়ে দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক তাদের বেশিরভাগই একসময়ে আমার ছাত্র ছিল আমার এক ধরনের আনন্দ হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় তারা ভীরু পদক্ষেপে সসংকোচে এসেছে এখন তারাই বড় বড় প্রফেসর, বিভাগীয় প্রধান, ডিন। কত বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। একজন শিক্ষক তার জীবনে এর চাইতে বেশি আর কী চাইতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই যুগ কাটিয়ে দিতে গিয়ে অনেক কিছু খুব কাছে থেকে দেখতে পেয়েছি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট বল্টু নিজ হাতে লাগিয়েছি, খুলেছি তার এর সমস্যাটা কোথায় আমি ভালো করে জানি, আবার কেমন করে এর সমস্যাটা মেটানো হয় সেটাও আমি খুব ভালো করে জানি। কিছুদিন আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাংবাদিকেরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সম্মেলন করেছে, তারা আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপচারিতা করার জন্যে। আমাকে জিজ্ঞেস করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা কী, আমি খোলাখুলি বলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সমস্যা হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর। আমি নিজের কানে শুনেছি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে বলেছেন, কোনও ভাইস চ্যান্সেলর যদি দাবি করে তিনি কোনও রকম লবি না করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন, তাহলে তিনি হচ্ছেন ডাহা মিথ্যাবাদী (তার ব্যবহৃত শব্দটি ছিল ড্যাম লায়ার)। আমি হা করে তাকিয়েছিলাম এবং কল্পনা করছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার জন্য নানা ধরনের লবি করে বেড়াচ্ছেন, লবি করা সংক্রান্ত যেসব গল্প আমরা শুনে থাকি সেগুলো মোটেও সম্মানজনক নয়। আমার বক্তব্যটি সংবাদ মাধ্যমে চলে এসেছিল এবং ভাইস চ্যান্সেলররা আমার ওপরে রাগ হয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন, যদিও বক্তব্যটি আমার নিজের নয়- আরেকজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের, তারপরও আমি তাদের বিবৃতি নিয়ে বাদ প্রতিবাদ করিনি। কারণ এই দেশে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো ভাইস চ্যান্সেলর আছেন যারা খাঁটি শিক্ষাবিদ, যাদের স্বপ্ন আছে এবং যারা দেশকে যেমন ভালোবাসেন বিশ্ববিদ্যালয়টিকেও সেরকম ভালোবাসেন। আবার সবাইকে মেনে নিতে হবে এই দেশে অনেক ভাইস চ্যান্সেলর আছেন, যাদের এত বড় দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা নেই, শুধু ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা ধরনের বাণিজ্য করার জন্যে ধরাধরি করে ভাইস চ্যান্সেলর হয়েছেন। আমার দুঃখটা এখানে, এই দেশে এখনও ধরাধরি করে ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া যায়! আমরা কি দেখিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর চলে যাবার আগে শেষ দিনেও পঞ্চাশ ষাটজনকে একসঙ্গে মাস্টার রোলে নিয়োগ দিয়ে গিয়েছেন? সেই নিয়োগের সঙ্গে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ যদি সত্যি হয় তাহলে শুধু একটা স্বাক্ষর দিয়ে তারা কত টাকা কামাই করেছেন, সেটা কেউ হিসাব করে দেখেছে? আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে আমি নতুন একধরনের জীবনে ফিরে যাবো। বহুদিন থেকে আমি আমার নতুন জীবনের জন্যে অপেক্ষা করছি। যাওয়ার আগে অনেক জোর দিয়ে একটি কথা বলে যেতে পারি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিক করার জন্যে সেখানে সত্যিকারের শিক্ষাবিদ স্বাপ্নিক ভাইস চ্যান্সেলরের নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশে এখন অর্থের অভাব নেই, অর্থের অভাবে আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাঁড়াতে পারছিল না। এখন তারা খুব সহজেই দাঁড়াতে পারবে। শুধু দরকার একজন খাঁটি ভাইস চ্যান্সেলর। বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতির বাইরে থেকে স্বচ্ছল বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সত্যিকার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়টি দেখার জন্যে আমি সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকবো।    লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়   
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন
কাছের দেশ
দেশে থেকে থেকে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, এখন দেশের বাইরে গেলে কেমন যেন অস্থির লাগে, মনে হয় কখন আবার দেশে ফিরে যাব! বাংলাদেশের একটা টিমের সঙ্গে একেবারে সবচেয়ে কাছের দেশ ভারতবর্ষে এসেছি, শহরটির নাম পুনে। ঝকঝকে তকতকে একটা শহর। থাকা খাওয়া এবং কাজকর্মের আয়োজন চমৎকার। যারা সাথে আছে তারা সবাই আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাই চমৎকার সময় কাটছে। তারপরও মনে হচ্ছে কখন দেশে ফিরে যাব। আজকে একটু বেশি ব্যস্ততা ছিল তাই দুপুরে ফাস্ট ফুডের দোকানে ঢুকেছি। অন্য খাবারের সঙ্গে সফট ড্রিংক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। গ্লাসে করে সফট ড্রিংক আনা হয়েছে এবং তখন লক্ষ্য করলাম ড্রিংক খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের স্ট্র নেই, এরকমটি আগে দেখিনি। প্রথমে ভেবেছি বুঝি ভুল করে দেওয়া হয়নি কিন্তু একটু পরেই জানতে পারলাম, আসলেই সফট ড্রিংক খাওয়ার জন্য এখানে কোনও স্ট্র দেওয়া হয় না। কারণটা খুবই চমৎকার। এই রাজ্যটি বুঝতে পেরেছে প্লাস্টিক পলিথিন এই বিষয়গুলো পরিবেশের জন্য একটা বিপজ্জনক বিষয়। পরিবেশ রক্ষা করতে হলে এগুলোর ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। কাজেই তারা আইন করে বন্ধ করে দিয়েছে, কেউ আর পলিথিন কিংবা প্লাস্টিক ব্যবহার করতে পারে না। সফট ড্রিংক খাওয়ার জন্য প্লাস্টিকের স্ট্র পর্যন্ত পাওয়া যায় না। স্থানীয় মানুষদের কাছে শুনেছি, কেউ যদি পলিথিনের ব্যাগে কিছু ভরে রাস্তা ঘাটে চলাফেরা করে তাদের নাকি পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। দেশ থেকে আসার সময় ভুল করে কোনও পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে এসেছি কিনা সেটা নিয়ে এখন খুব দুশ্চিন্তায় আছি! অথচ এই বিষয়টা করার কথা ছিল আমাদের দেশে, বিশেষ করে ঢাকা শহরে। শুনেছি বুড়িগঙ্গার তলাটি নাকি পলিথিনের ব্যাগে বোঝাই। নালা নর্দমা পলিথিন দিয়ে বুজে গেছে। এই পলিথিন যে আস্তে আস্তে ক্ষয়ে গিয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে তাও নয়, যুগ যুগ ধরে এগুলো পরিবেশের ওপর বিষ ফোঁড়া হয়ে বেঁচে থাকবে। আমাদের এত কাছের একটি দেশ যারা কথাবার্তা চালচলন শিক্ষাদীক্ষায় হুবহু আমাদের মতো, তারা যদি পরিবেশকে বাঁচানোর জন্যে এতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে আমরা কেন পারি না, সেই প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজে পাই না! আমরা এখানে এসেছি মেধাস্বত্ব (বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি সংক্ষেপে আইপি) সম্পর্কে জানতে। সারা পৃথিবীই মেনে নিয়েছে নূতন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জ্ঞান। যারা মনে করে এটা একটা রূপক বা বিমূর্ত কথা তারা যদি একটু খুটিয়ে দেখে তাহলেই বুঝতে পারবে যে এটি আসলে একেবারে টাকাপয়সা বা ডলারের হিসাব হতে পারে। গবেষণা করে যখন কিছু আবিষ্কার করা হয় সেটা যদি পৃথিবীতে ব্যবহার করার উপযোগী কিছু হয় এবং যদি পেটেন্ট করে তার মেধাস্বত্ব রক্ষা করা হয় তাহলে এটা দেশের আয়ের উৎস হয়ে যেতে পারে। ভারতবর্ষে এই মেধাস্বত্ব রক্ষা করার ব্যাপারটি খুব গুরুত্ব নিয়ে শুরু হয়েছে এবং যে মানুষটি প্রথম এই বিষয়টা শুরু করেছেন তার নাম আর.এ.মাশেলকার। বিজ্ঞানের জগতে সুপারস্টার বলে যদি কিছু থাকে তাহলে মাশেলকার হচ্ছেন সেরকম একজন মানুষ। অল্প বয়সে যখন তার বাবা মারা যান তখন তার অশিক্ষিত মা অনেক কষ্ট করে তাকে মানুষ করেছেন। মাশেলকার তার পিএইচডি শেষ করার পরও তার মা নিশ্চিত ছিলেন না তিনি তার সন্তানকে ঠিক করে মানুষ করতে পেরেছেন কিনা। দেখতে দেখতে মাশেলকার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠলেন, পৃথিবীর সেরা সেরা ইউনিভার্সিটি তাকে ডেকে ডেকে নিয়ে সম্মান সূচক পিএইচডি দিতে শুরু করলো। যখন তার সম্মান সূচক পিএইচডি এর সংখ্যা পঁচিশে দাঁড়ালো তখন তার মা শেষপর্যন্ত নিশ্চিত হলেন যে তিনি তার ছেলেকে মানুষ করতে পেরেছেন! তার বর্তমান পিএইচডি’র সংখ্যা কত জানার জন্য তার একজন সহযোগীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভদ্রলোক মাথা চুলকে বললেন, ‘শেষবার যখন এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে তখন তার সংখ্যা ছিল উনচল্লিশ, আমি যতদূর খবর পেয়েছি তিনি এর মাঝে আরও একটি পেয়ে গেছেন!’ এই হচ্ছেন মাশেলকার। বলাই বাহুল্য আর.এ.মাশেলকার খুব ব্যস্ত থাকেন, দেশে বিদেশে ঘুরতে হয়। তারপরেও আমাদের টিমের জন্য সময় বের করে এনেছেন। আমি আগেও লক্ষ্য করেছি আমাদের দেশের জন্যে এক ধরনের মায়া আছে। সেদিন বিকেলেই তার প্যারিস যাবার কথা কিন্তু তার মাঝেই তিনি আমাদের তিন ঘণ্টা সময় দিলেন, একসাথে দুপুরের খাবার খেলেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গী খুব সুন্দর। খুব চমৎকারভাবে মানুষদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন। পশ্চিমা দেশের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ করে নিজেদের উপস্থাপন করতে হয় সেটা কখনও ভুলেন না। পশ্চিমা দেশ বহুদিন থেকে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে আছে কাজেই বড় বড় ব্যাঙের লাফ (Frog Leap) দিয়ে তাদের ধরতে হবে এরকম একটা আলোচনা হয়।  আরএ মাশেলকার সেটা শুনে মাথা নেড়ে বলেছেন- ‘উঁহু, ব্যাঙের লাফ দিয়ে হবে না, আমাদের পোল ভল্ট করে তাদের ধরে ফেলতে হবে।’ শুধু যে মুখে একথা বলেন তা নয়, আসলেই দেশটি যেন পোল ভল্টের লাফ দিয়ে পশ্চিমা জগতকে ধরে ফেলতে পারেন সে জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যাইহোক, খুব বড় বড় জ্ঞানীগুণী মানুষের সাথে আসলে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না, যদি পেয়ে যাই তাহলে তাদের চিন্তার জগতটা পরীক্ষা করে দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। মনে আছে প্রায় তিরিশ বৎসর আগে একবার কার্নেগি মিলান ইউনিভার্সিটিতে হার্বাট সাইমনের সাথে কথা বলেছিলাম। আমরা সবাই এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কথাটার সাথে পরিচিত, এই কথাটা প্রথম হার্বাট সাইমন ব্যবহার করেছিলেন। তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, কথা বললেই বোঝা যায় মানুষটা কত অসাধারণ বুদ্ধিমান। তখন মাত্র ইন্টারনেট, ই-মেইল আসতে শুরু করেছে, আমার মনে আছে হার্বাট সাইমন তখনই সেটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার মাঝে ছিলেন। একেবারে ঘোষণা দিয়ে তিনি নিজেকে এসব থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। তার ভাষায়, যখন আমার প্রয়োজন হয় তখন আমি কারো সাথে যোগাযোগ করবো, সবাই ঢালাওভাবে না চাইতেই আমাকে দুনিয়ার খবর দিয়ে ভারাক্রান্ত করে ফেলবে আমি তাতে রাজী নই। আমার তখন বয়স কম ছিল, আমি গলার রগ ফুলিয়ে তার সঙ্গে তর্ক করেছিলাম, সময়মতো খবর পাওয়া যে কত জরুরি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, তিনি আমার কথাকে কোনও গুরুত্ব দেননি! এতদিন পর আমি আবিষ্কার করেছি যে, আসলে যে বিষয়টা বুঝতে আমার তিরিশ বছর লেগেছে তিনি সেটা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলেন। এখানেও এভাবে মাশেলকারের মতো মানুষকে পেয়ে গিয়ে আমার প্রশ্নের শেষ ছিল না, তিনি ধৈর্য্য ধরে উত্তর দিয়েছেন।  আমি প্রথমেই জানতে চাইলাম, জীবনে ব্যর্থতা সম্পর্কে তার কী ধারণা। আমরা যখনই পেছনে ফিরে তাকাই, সবসময়েই দেখি জীবনে যতটুকু সাফল্য, ব্যর্থতা তার থেকে অনেক বেশি। মাশেলকার ব্যর্থতাকে ব্যর্থতা বলতেই রাজী নন, তার মতে এটা হচ্ছে কোনও কিছু জানার প্রক্রিয়া, (FAIL হচ্ছে First Attempt In Learning বাক্যটার শব্দগুলোর প্রথম অক্ষর!) আমি তারপর জানতে চাইলাম তাকে কখনো অসৎ বা দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের পাল্লায় পড়তে হয়েছে কিনা, তিনি বললেন যে, হ্যাঁ। মানুষজন তার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। আগে ঢালাওভাবে সবাইকে বিশ্বাস করতেন এখন খোঁজখবর নিয়ে তারপর বিশ্বাস করেন। আমি জানতে চাইলাম তাকে কেউ হিংসা করে কিনা, তার পেছনে কেউ লেগেছে কিনা। মাশেলকার বললেন, যে হ্যাঁ, তার বিরুদ্ধে মানুষজন অনেকবার লেগেছে, বড় বড় খবরের কাগজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দিনের পর দিন প্রচারণা চালিয়ে গেছে। তারপর যেটা বলেছেন সেটা লেখার জন্যেই আমি এত কিছু লিখেছি।  আর এ মাশেলকার বললেন, আমার ভেতরে আসলে একটা ডিলিট (Delete) বাটন আছে, দিনের শেষে ঘুমানোর আগে আমি সেই ডিলিট বাটন চাপ দিয়ে সবকিছু মুছে ফেলে শান্তিতে ঘুমাই। কথাটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে,আমাদের মতো মানুষদের যাদের ক্রমাগত চারপাশের মানুষের নেতিবাচক কথা শুনতে হয় তাদের সবার ভেতরে এই ডিলিট বাটন থাকতে হবে যেন আমরা দিনের শেষে চারপাশের সবকিছু অসুন্দর এবং কুৎসিত বিষয় মুছে দিয়ে মহানন্দে শান্তিতে ঘুমাতে পারি! পুনে শহরের ছোট আরেকটা বিষয়ের কথা বলে শেষ করে দিই। একজন খুব উচ্চবিত্ত মানুষের বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। সন্ধ্যেবেলা বাইরে তার সঙ্গে হাঁটছি তিনি আশেপাশে সবকিছু দেখাতে দেখাতে তার বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পাশে আরেকটি উঁচু দালান দেখালেন। বললেন, ‘যারা আমাদের কমপ্লেক্সটি তৈরি করেছে তাদেরকে এই দালানটাও তৈরি করতে হয়েছে, এটি স্বল্প মূল্যের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষেরা এখানে থাকবে। শুধু তাই না এর অর্ধেক অ্যাপার্টমেন্ট করপোরেশন নিয়ে নিয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের মাঝে বিতরণ করার জন্য।’ এর পেছনের কারণটি শুনে আমি চমৎকৃত হলাম। শহর কর্তৃপক্ষ কখনোই চায় না যে শহরটি বড়লোকের এলাকা এবং গরিবের এলাকা হিসেবে ভাগ হয়ে যাক। সব মানুষ সমান এবং সবাই মিলে মিশে থাকবে সেটাই হচ্ছে লক্ষ্য! সেজন্য বড় লোকের অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পাশে গরিবের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং তৈরি করতে হয়। আমার তখন হঠাৎ করে মহাখালী ডিওএইচএস এর কথা মনে পড়লো, এর ঢোকার পথে বড় বড় করে লেখা, ‘টোকাই প্রবেশ নিষেধ’। একটা স্বাধীন দেশে সত্যিই কি আমি দরিদ্র শিশুদের একটা এলাকায় ঢোকা নিষিদ্ধ করে দিতে পারি? একেবারে ঘোষণা দিয়ে?    লেখক: অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
কাছের দেশ
আরও পড়ুন
বাংলাদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের সতর্ক করলো যুক্তরাজ্য
প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মমতা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগের মহাবিজয়ের খবর
ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট