ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

করোনার জন্য প্রস্তুতি

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২০, ০৯:৪৪ এএম
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল

বেশ কিছুদিন থেকেই আমরা করোনা ভাইরাসের কথা বলে আসছিলাম। আমি বিষয়টাকে কতটুকু গুরুত্ব দেবো বুঝতে পারছিলাম না। সাংবাদিকেরা এক দুইবার আমাকে করোনা ভাইরাস নিয়ে কী করা উচিত সেটা জিজ্ঞেস করেছেন, আমি যথেষ্ট বিনয় সহকারে বলেছি আমি এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই, কিছু একটা বলে ফেলা উচিত হবে না। জনস্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তারা কী বলেন সেটাই আমাদের শোনা উচিত।

এরকম সময়ে আমার কাছে একটা গ্রাফ এসে পৌঁছেছে। এটা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যার একটা প্লট। বিভিন্ন দেশের তথ্য দেওয়া আছে এবং আমি অবাক হয়ে দেখলাম সব দেশের রোগী বেড়ে যাওয়ার হার হুবহু এক। শুধু তাই নয় ইতালির সাথে তুলনা করে দেখানো হয়েছে পৃথিবীর কোন দেশ ইতালি থেকে কত দিন পিছিয়ে আছে এবং সেই দেশগুলোর অবস্থা কত দিনের ভেতর ইতালির মতো ভয়াবহ হয়ে যাবে। আমি একটু বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করেছি সত্যি সত্যি তা-ই ঘটতে শুরু করেছে। একটুখানি চিন্তা করার পর বুঝতে পেরেছি আসলেই তো এটাই ঘটার কথা। করোনা ভাইরাসটি অসম্ভব ছোঁয়াচে এবং তথ্য অনুযায়ী আনুমানিক গড়ে ছয় দিনের ভেতর করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এভাবে বেড়ে যাওয়ার হারটার নাম "এক্সপোনেনশিয়াল" বাংলায় “জ্যামিতিক হার”। বিজ্ঞান করতে যেয়ে এই গাণিতিক প্রক্রিয়াটি আমাকে অসংখ্য বার ব্যবহার করতে হয়েছে, কিন্তু মজার ব্যাপার, সবসময়েই এটা ব্যবহার করা হয়েছে কমে আসার জন্য। যখনই গাণিতিক সমাধানে এভাবে বেড়ে যাওয়ার সমাধান এসেছে আমরা যুক্তি দিয়েছি, এটি বাস্তব সমাধান নয় এবং সেই সমাধানটিকে আক্ষরিক অর্থে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। এই প্রথমবার আমি বাস্তব জীবনে একটা উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি যেটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না এবং আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে।

এক্সপোনেনশিয়াল কিংবা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়া একটি খুবই বিপজ্জনক বিষয়। প্রথমে যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হয় তখন আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে এক দুইটি রোগী পাওয়া যায়। তাদেরকে যদি ঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইন করে সারিয়ে তুলে নেয়া যায় তাহলে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের মাঝে থাকে। একবার যদি কোন ভাবে এটা এক্সপোনেনশিয়াল বা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে তখন সেটাকে থামানোর কোন উপায় নেই। শুধু চীন সেটা করতে পেরেছে, ইউরোপের কোন দেশ পারেনি। সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, হংকং এই দেশ গুলো খুবই বুদ্ধিমানের মতো সময় মত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে করোনা ভাইরাস কে জ্যামিতিক হারে হারে বাড়তে দেয়নি। সারা পৃথিবীতে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেন দায়িত্বহীন দেশ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। আমরা এখন আমাদের চোখের সামনে এই দুটি দেশকে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফল ভোগ করতে দেখবো।

করোনা ভাইরাস এখন আর একটি নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়। এখন এটি সারা পৃথিবীর সমস্যা। সব দেশের করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা প্রতিদিনই তথ্যভাণ্ডারে জমা হচ্ছে এবং সবাই সেটা দেখতে পাচ্ছে। তবে একজন সত্যি সত্যি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কী না সেটা জানতে হলে একটা জটিল এবং খরচ সাপেক্ষ পরীক্ষা করতে হয়। (সত্য মিথ্যা জানি না, খবরের কাগজে দেখেছি আমাদের দেশে এই পরীক্ষা করার উপযোগী কিট নাকী রয়েছে মাত্র হাজার খানেক) কাজেই এই দেশে এখন খুব ব্যাপক ভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব বলে মনে হয় না। তাই এই দেশের জন্য আমরা যে সংখ্যাটি দেখছি তার বাইরেও করোনা ভাইরাস আক্রান্ত কেউ আছে কী না সেটা নিয়েও একটু দুর্ভাবনা থেকে যায়। এই দুর্ভাবনাটা বিশেষ করে শুরু হয়েছে, যখন আমরা দেখতে পাচ্ছি করোনা ভাইরাসের উপসর্গ থাকা রোগী হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে কিংবা বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা বিক্ষোভ করে কোয়ারেন্টটাইন কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। এই অবিবেচক মানুষেরা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনেরা দেশের কোন একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্ফোরকের মত করনা ভাইরাসের রোগী জমা করে যাচ্ছেন কী না সেটি কে বলবে? এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেটে। যখন সবাই ধরে নিয়েছে সেখানে মাত্র অল্প কয়েকজন করোনা আক্রান্ত রোগী তখন আসলে সেখানে কয়েক হাজার মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বসে আছে। হঠাৎ করে অনেক মানুষ মারা যেতে শুরু করেছে।

আমি এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নই, তবে গণিত, বিজ্ঞান বা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখানো সংখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারি এবং সেটাই করার চেষ্টা করছি। গত কয়েকদিন এই বিষয়টি নিয়ে লেখাপড়া করে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি যে, "আমাদের কিছুই হবে না, সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মাঝে আছে এবং সবকিছু নিয়ন্ত্রণের মাঝে থাকবে" এটা ধরে নেওয়া মোটেও ঠিক নয়। আমাদের দেশ গরম এবং এখানে জলীয় বাষ্প বেশি তাই এই দেশে করোনা ভাইরাস টিকতে পারে না, সেটা ভেবে নিশ্চিন্তে থাকাও মনে হয় ঠিক হবে না। কারণ মালয়েশিয়ার তাপমাত্রা এবং জলীয় বাস্পের পরিমাণ আমাদের দেশের মতোই কিন্তু সেখানেও করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, সময় মত সাহসী এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ হয়ে বসে নেই তারা সাহায্যের হাত এগিয়ে দিয়েছে, নিজেরা "হ্যান্ড স্যানিটাইজার" তৈরি করছে সেটা চমৎকার একটা ব্যাপার। একজন মানুষ বিদেশ থেকে এসে কোয়ারেন্টাইনে সময় না কাটিয়ে বাড়িতে চলে এসেছে, সেজন্য গ্রামের মানুষ তার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে সেটাও একটা ভালো লক্ষণ, বোঝা যাচ্ছে মানুষ এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি গুলোও সময়মতো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অসংখ্য অনুষ্ঠান কোনরকম ভাবাবেগ ছাড়াই মুহূর্তের মাঝে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেটি অনেক বড় দায়িত্বশীল একটি ঘটনা। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সব রোগীরা বিদেশ থেকে আসছে, তাই সব ফ্লাইটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এই পৃথিবীতেই অনেক দেশ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে তাই চাইলে আমরাও নিশ্চয়ই পারবো। একটা ঘূর্ণিঝড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ তছনছ হয়ে যায় কিন্তু আমরা ঠিকই সেটা সামলে উঠে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাই। তবে, “আমরা কিছুই করব না নিজে নিজেই সব কিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে” সেটা কেউ যেন বিশ্বাস না করে। সামনের কয়েকটি সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়, এই সময়ে জাতি হিসেবে কতটুকু দায়িত্বশীল তার একটা প্রমাণ আমরা পেয়ে যাব।

সারা পৃথিবী যখন একটা বিপদের সম্মুখীন তখন আমরা নিরাপদে থাকব সেটা কেউ আশা করে না। তবে এই ভাইরাসে শতকরা আশি জনের উপসর্গ হয় খুবই সামান্য। বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুদের বিশেষ কোনো সমস্যা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। কাজেই আতঙ্কের কোন বিষয় নেই তবে অবশ্যই সতর্কতার এবং প্রস্তুতির বিষয় আছে। প্রস্তুতটির কথা সবাই জানে সেটি হচ্ছে সামাজিক ভাবে নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলা।

আমরা জানি ইউরোপের দেশগুলোতে করোনা ভাইরাস ভয়াবহ ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানকার একজন গবেষকের লেখার একটি অংশ এরকম: “করোনা ভাইরাস তোমার দিকে এগিয়ে আসছে। এটি ছুটে আসছে এক্সপোনেনশিয়াল গতিতে। প্রথমে ধীরে ধীরে তারপর হঠাৎ করে। এটি আর মাত্র কয়েকদিনের ব্যাপার কিংবা বড়জোর কয়েক সপ্তাহের। যখন এটি আসবে তখন তোমার হাসপাতাল, ক্লিনিক থমকে যাবে। তোমার দেশের মানুষের তখন চিকিৎসা হবে হাসপাতালের মেঝেতে, করিডোরে। অতি পরিশ্রমে ক্লান্ত এবং বিধ্বস্ত হয়ে যাবে ডাক্তার নার্স। অনেকে মারা যাবে। তাদেরকে তখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন দেবে আর কাকে মারা যেতে দেবে। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটি মাত্র উপায়, সেটা হচ্ছে আজকেই নিজেদের সামাজিকভাবে আলাদা করে ফেলা। আগামীকাল থেকে নয়। আজকেই। তার অর্থ হচ্ছে যত বেশি মানুষকে সম্ভব ঘরের ভেতর রাখা। এখন থেকেই!”

আমরা অবশ্যই চাই আমাদের অবস্থা যেন ইউরোপের মত না হয়। আমরা চাই সবাই দায়িত্বশীল হয়ে আমরা যেন এই বিপর্যয় ঠিকভাবে কাটিয়ে উঠতে পারি।

এমকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
পদ্মা সেতু বিজয়ের অহংকার
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ যখন তার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে উপনীত, ঠিক সেই সময়টায় বিজয়ের আরেকটি মাসে আরেকটি বিজয় বাংলাদেশের। পদ্মা সেতু আমাদের বিজয়ের অহংকার। এক থেকে একচল্লিশ নম্বর স্প্যান বিজয়ের ইতিহাস। গর্বের ইতিহাস। স্প্যানগুলো যেন একেকটি প্রতিশোধের স্পৃহার প্রতীক। একেকটি স্প্যান মাথা উঁচু করে গর্বের সহিত দাঁড়িয়েছে আর ষড়যন্ত্রকারীদের চপেটাঘাত করেছে। জবাব দিয়েছে সকল ষড়যন্ত্রের। ষড়যন্ত্রের নানান চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অহংকারের শেষ স্প্যানটি পতপত করে উড়িয়ে জানান দিল আমরা বিজয়ী জাতি। দেশের দৃষ্টিনন্দন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আমাদের পদ্মা সেতু। এই অবকাঠামোটি আর দশটি অবকাঠামো থেকে ভিন্ন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, স্যাটেলাইট, সাবমেরিন কেবল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ফোর লেন হাইওয়ে কোনো কিছু এর কাছে ধোপে টেকে না। কারণ এটি ‘পদ্মা সেতু’। এই সেতু জুড়ে দিয়েছে সেই প্রমত্তা পদ্মাকে, যার একদিন ছিল না কুল, ছিল না কিনারা। পদ্মা আমাদের কাছে অজেয় বিশালত্বের প্রতীক। পদ্মা আমাদের কান্নার আর দুঃখের প্রতীক। পদ্মা বাঙালির আবহমান জনজীবনেরও প্রতীক। পদ্মা জয় করা মানে জয় করা আমাদের সব দুঃখ-কষ্টকে, বশে আনা আমাদের অপ্রাপ্তিগুলোকে আর গৌরবান্নিত করা আমাদের আবহমান বাঙালিত্বকে। পদ্মা জয় তাই নতুন বাংলাদেশের জয়যাত্রার সমার্থক। পদ্মা সেতু তাই নতুন বাংলাদেশের প্রতীক। ২০০১ সালেই পদ্মা সেতুর শুভসূচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। ষড়যন্ত্রের সকল প্রতিকূল, ধ্বংসাত্মক পথ পেরিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণে জোর প্রতিশ্রুতি ছিল। সরকার গঠন করেই ২০১১ সালে ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে। নিজ ইচ্ছায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে। একই বছরের শেষ দিকে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত রাখে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ সরকার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। ২০১২ সালে ঋণচুক্তিটি বাতিল করে দেয় বিশ্বব্যাংক। একই পথ অনুসরণ করেছিল অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও। বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করার পর বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এতে দেশে এক অভূতপূর্ব জনজাগরণের সৃষ্টি হয়। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এক অভিনব দেশাত্মবোধের উন্মেষ ঘটে। সবাই ‘যার হাতে যা আছে’ তাই নিয়ে পদ্মা সেতুর জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। দেশের এই আত্মমর্যাদার সংকটের কঠিন পরিস্থিতিতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিজেই পথ দেখিয়ে ২০১২ সালে জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন কীভাবে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ সম্ভব। বঙ্গবন্ধুকন্যার স্পষ্ঠ ঘোষণা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু হবে। বিশ্বব্যাংকসহ দেশি-বিদেশি চক্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা অসীম সাহসী ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ পারে। প্রমাণ হয়েছে আমরা পারি। পদ্মা সেতু ছিল একটা বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের জন্য। কারণ এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি জড়িত ছিল। এত বড় আর খরস্রোতা একটা নদীর ওপর এত বড় একটা সেতু নির্মাণ করে শেখ হাসিনা বিশ্বের সামনে একটা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা রাজনীতি করেন মানুষের জন্য। দিনরাত কাজ করেন মানুষের জন্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা যে পারেন তা দেখিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা উন্নয়নের সর্বোচ্চ উচ্চতম স্থানে নিয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানুষ এখন আশা দেখে, স্বপ্নে বুকবাঁধে। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ছুটে চলে। কারও রক্তচক্ষুকে শেখ হাসিনা ভয় পান না। পদ্মা সেতু তৈরি করে ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করলেন। করোনা মহামারিতে বিশ্ব এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে। লণ্ডভণ্ড জীবন-জীবিকা। এমন পরিস্থিতিতেও দূরদর্শিতার চমক প্রদর্শনে বিশ্বকে তাগ লাগিয়ে উন্নয়নের চাকা রেখেছেন গতিশীল। করোনার কারণে কোনো প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়নি একটুও। মানুষকে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে রক্ষাকবচের মতো। অসম্ভবকে সম্ভব করা আর স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করা জাদুর নাম শেখ হাসিনা। নিন্দুকের দৃষ্টি কখনই ভালো কিছু দেখে না। বাংলাদেশ এখন অনন্য উচ্চতায়। পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়। বাস্তব। প্রমত্ত পদ্মায় ৬ হাজার ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু গড়েছে বাংলাদেশের নতুন এক দিগন্ত। বিজয়ের কেতন উড়ছে উত্তাল পদ্মার বাতাসে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু ছিল একটি আকাঙ্ক্ষা। এই আকাঙ্ক্ষার বাস্তবে রূপদানে ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সৎ ও মহৎ উদ্দেশ্যই পারে যে কোনো প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সাফল্যের শিখরে আরোহণের, তার প্রমাণ দেখিয়েছে বর্তমান সরকার। বিশ্বের অন্যতম খরস্রোতা পদ্মার সাথে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ এবং নানামুখী সমালোচনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে- বাংলাদেশ উঁচু করে কথা বলতে শিখেছে। এই দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ। এই দেশ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান। এর মধ্যদিয়ে শেষ হলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সেতুর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলো দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯টি জেলা। পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটির উপর বসেছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। এর তিন বছরেরও বেশি সময় পর ১০ ডিসেম্বর ২০২০ সালে মূল সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারে ৪১তম শেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতু। এছাড়াও সেতুর ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্লাবের মধ্যে ১ হাজার ৪১টির বেশি রোড স্ল্যাব বসানো হয়েছে। আর ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে এখন পর্যন্ত বসানো হয়েছে ১ হাজার ৫০০টির বেশি। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বহুমুখী এ সেতু হবে দোতলা। পদ্মাসেতুর মূল কাঠামো স্টিলের, যা স্প্যান নামে পরিচিত। এই স্প্যানের ওপর কংক্রিটের প্রলেপ দিয়ে রাস্তার কাঠামো তৈরি করা হবে, যার ওপর দিয়ে যানবহন চলাচল করবে। দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক বিপুল গতি  তৈরি হবে পদ্মা সেতুর কারণে। এরই মধ্যে সরকারের সম্ভাব্যতা জরিপে বলা হয়েছে, সেতুটি চালু হলে দেশের জিডিপি ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের আয় বাড়বে এক দশমিক চার শতাংশ, ৭ লাখ ৪৩ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু চালু হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ শতাংশ হারে। জাইকার সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ২ শতাংশ। পদ্মা সেতু দিয়ে প্রতিদিন ২১ হাজার ৩০০ যানবাহন চলাচল করবে। ২০২৫ সালের দিকে এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৪১ হাজার ৬০০। এসব হিসাবের বাইরে অনেক অর্থনীতিবিদের ধারণা, পদ্মা সেতুর কারণে দেশের জিডিপি ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর সেটি ঘটলে কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিকে দেখা যাবে সম্পূর্ণ নতুন রূপে। মানুষের জীবনমানে আসবে অভাবনীয় পরিবর্তন। ২০৪১ সালে ১৬ হাজার ডলারের বেশি মাথাপিছু আয় নিয়ে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার যে স্বপ্ন বাংলাদেশের সামনে, সেটা পূরণ সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। টাকার অঙ্কে আকার ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর কারণে প্রথম বছরে জিডিপি যদি দেড় শতাংশও বাড়ে তাহলেও এর সার্বিক অর্থমূল্য হবে ৪১ হাজার ৯৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আর জিডিপি ৩ শতাংশ বাড়লে সার্বিক অর্থনীতিতে ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি স্ফীতি ঘটবে প্রথম বছরেই। এই সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভারী শিল্পের পাশাপাশি এসএমই খাতে বিপ্লব ঘটবে। বিকশিত হবে পর্যটন খাত। পায়রা সমুদ্রবন্দর দিয়ে বাড়বে পণ্য আমদানি-রফতানি। পায়রা ও মোংলা বন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে আমূল বদলে যাবে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতি। পদ্মার দুই পারে আধুনিক স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা চলছে। এরই মধ্যে বদলে গেছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। সেতু চালু হলে ট্রেন পৌঁছাবে দক্ষিণের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। বিজয়ের মাসে বাংলাদেশের জন্য সক্ষমতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে পদ্মা সেতু। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যে প্রয়াস তাতে আরেকটি অর্জন এই সেতু। বিজয়ের মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আরেকটি বিজয়ের ইতিহাস রচিত হলো বাংলাদেশে। তারুণ্যের কবি সুকান্তের ভাষায়- হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে, সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে। …. সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়ঃ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। লেখক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজ, কালীগঞ্জ, লালমনিরহাট।   এফএ
পদ্মা সেতু বিজয়ের অহংকার
তথ্য এবং তথ্য চাই
আমার ধারণা চাপে পরে আমরা আজকাল অনেক বেশি আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছি। আগে কাউকে কোনো সেমিনার, কনফারেন্স বা ওয়ার্কশপে বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ জানাতে হলে আয়োজকরা দশবার চিন্তা করতেন। আজকাল চোখ বন্ধ করে ই-মেইল পাঠিয়ে দেন! আমাদের আমন্ত্রণ জানালেও আগে নানাভাবে ছুতো খুঁজে বের করতাম যেন যেতে না হয়—আজকাল সেটাও করা যায় না। যারা আয়োজক তাদেরও অনেক সুবিধা, হলঘর ভাড়া করতে হয় না, হোটেল খুঁজতে হয় না, লাঞ্চের ব্যবস্থা করতে হয় না, প্রধান অতিথির পিছন পিছন ঘুরতে হয় না। কয়দিন আগে সেরকম একটি অনুষ্ঠানে আমার থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। আয়োজকদের প্রধানকে যখন শুভেচ্ছা বক্তব্য দেওয়ার কথা বলা হলো আমি স্পষ্ট দেখলাম তিনি বিছানায় এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছেন। একটা বালিশকে বুকে চেপে ধরে উঠে বসলেন,  ল্যাপটপের ক্যামেরার সামনে মুখটা এনে কিছুক্ষণ ভালোভাবে কথা বলে হাই তুলে আবার শুয়ে পড়লেন! আমি যখন বক্তব্য দিচ্ছি তখন আমি খুব দুশ্চিন্তার মাঝে ছিলাম, আমার কথা কী আদৌ কেউ শুনছে না কী আমি একা একা নিজের মনে কথা বলে যাচ্ছি? (ভাগ্যিস বক্তব্যের শেষে প্রশ্নোত্তরের ব্যবস্থা ছিল, অনেক প্রশ্ন দেখে বুঝতে পেরেছিলাম কেউ কেউ নিশ্চয়ই কথা শুনছে!)।  আজকাল শুধু যে দেশ বিদেশে “শর্টকাট” সেমিনার, কনফারেন্স হচ্ছে তা নয়, আমরাও দেশ বিদেশের খবর অনেক বেশি রাখছি। করোনার খবরই বেশি, এমনকি যখন রাজনীতির খবর নিই সেটাও ঘুরেফিরে হয়ে যায় করোনা নিয়ে রাজনীতি! অনেক দেশে মাস্ক পরা এবং না পরা এখন হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়। বিষয়টা যেহেতু প্যানডেমিক তাই শুধু একটা দেশ ভাইরাস মুক্ত হয়ে গেলে হবে না, পুরো পৃথিবীর সবাই মিলে একসাথে সবাই মিলে ভাইরাস মুক্ত হতে হবে। এতদিন শুধু নিজের দেশ নিয়ে দেশের মানুষের সমালোচনা শুনে এসেছি, এই দেশের মানুষজন স্বাস্থ্যবিধি মানেনা, মাস্ক পরে না, অকারণে এখানে সেখানে ভিড় জমায়, ইত্যাদি ইত্যাদি!  এখন দেখছি এটা শুধু আমাদের দেশের নয়, অন্য দেশেরও সমস্যা। জার্মানির বার্লিন শহরে হাজার হাজার মানুষ আমাদের দেশের বৈশাখী মিছিলের মতো রাস্তায় বের হয়ে চিৎকার করছে, তারা মাস্ক পরবে না, নিয়ম নীতি মানবে না! আমেরিকা রীতিমত বিপদজনক, এই দেশে সবার কাছে অস্ত্র, যারা মাস্ক পরে নেই তাদেরকে মাস্ক পরার কথা বললে রেগেমেগে গুলি করে দেয়। করোনার সংক্রমণ এবং মৃত্যুর দিকে তারা পৃথিবীর এক নম্বর। সুইডেনের বুড়ো মানুষদের বাঁচিয়ে রাখতে নিশ্চয়ই সেই দেশের অর্থনীতির উপর খুব চাপ পড়ছিল তাই এই ধাক্কায় তারা তাদের দেশের সব বয়স্ক মানুষকে মেরে ফেলে ঝাড়া হাত পা হয়ে গেছে। ভিয়েতনামকে দেখে আমরা সবসময়ই মুগ্ধ হই, এবারেও তারা যেভাবে দেশকে ভাইরাস মুক্ত  রেখেছিল সেটা দেখে  মুগ্ধ হয়েছিলাম কিন্তু মনে হচ্ছে শেষ রক্ষা হলো না, এখন তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেদিন দেখলাম তারা আস্ত একটা শহরের সব মানুষকে করোনার জন্য টেস্ট করবে। রাশিয়া অক্টোবর মাস থেকে তাদের দেশের মানুষকে করোনার জন্য টিকা দিতে শুরু করবে, মনে হচ্ছে সবার আগে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের নাক সিটকানো এবং সমালোচনা শুরু হয়েছে, তারা বলছে তাদের থেকে আগে কেউ নেই, তাদের থেকে ভালো টিকা কারো নেই! (রাশিয়া বলছে তারা সবার আগে টিকা দেবে ডাক্তার এবং শিক্ষকদের। ডাক্তারদের ব্যাপারটা আমরা বুঝি কিন্তু শিক্ষকদের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টা আমাকে খুব আনন্দ দিয়েছে! সত্যিই তো, একটা সমাজে শিক্ষক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আর কে আছে?) পৃথিবীর অন্যান্যদের মাঝে যারা টিকা বানাচ্ছে তাদের মাঝে একটা কোম্পানি খোলাখুলি ঘোষণা দিয়েছে টিকা বিক্রি করে তাদের টাকা বানানোর মতলব আছে! পোলিও রোগের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন জোনাস সাল্ক, তাঁকে তাঁর আবিষ্কারটি পেটেন্ট করার জন্য সবাই পীড়াপীড়ি করেছিল, তিনি রাজি হননি, বলেছিলেন, সবকিছু পেটেন্ট করা যায় না। সূর্যকে কেউ পেটেন্ট করতে পারবে? অস্ট্রেলিয়া এতদিন ভালোই ছিল এখন ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের জন্য ভিক্টোরিয়া রাজ্যে তারা মিলিটারি নামাচ্ছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক মনে হয় ব্রাজিলের অবস্থা, সেখানকার প্রেসিডেন্টের একগুয়েমির কারণে কোনো স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেখানে টিকতে পারে না, শেষবার যখন খোঁজ নিয়েছি  তখন কোনো স্বাস্থ্যমন্ত্রীই ছিল না। সেখানে দিনে প্রায় একহাজার মানুষ করোনায়  মারা যাচ্ছে। যাই হোক, সারা পৃথিবী এখন একটা বিচিত্র সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। শত বছরেও পৃথিবীর এরকম অভিজ্ঞতা হয়নি। অভিজ্ঞতা বিষয়টি খারাপ নয়, কিন্তু এই অভিজ্ঞতাটি না হলেও মনে হয় চলতো! কয়দিন আগে আমাদের বাংলাদেশ নিয়ে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখতে পেয়েছি।  বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির কাছে নয়শত এন্টিবডি কিট পাঠানো হয়েছে,  এটা দিয়ে একজনের শরীরে করোনার এন্টিবডি আছে কী নেই বের করা যাবে। যদি এন্টিবডি থাকে তাহলে ধরে নেওয়া যায় তার এর মাঝে করোনার সংক্রমণ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তাদের এই কিটগুলো দিয়ে তাদের পরিচালিত হাসপাতালে স্বাস্থ্য কর্মী এবং সাধারণ কর্মীদের পরীক্ষা করেছে। ফলাফলটি আমার জানামতে বাংলাদেশের প্রথম বার প্রকাশিত এরকম একটি তথ্য। যারা স্বাস্থ্যকর্মী তাদের ভেতর শতকরা ২৫ জনের এর মাঝে করোনার সংক্রমণ হয়ে গেছে, যারা সাধারণ কর্মী তাদের মাঝে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ।  যার অর্থ গড়ে এখানে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষের এর মাঝে করোনা হয়ে গেছে। (কলকাতা শহরে এর সংখ্যা হচ্ছে ১৭ শতাংশ। মুম্বাইয়ের বস্তিতে প্রায় ৬০ শতাংশ!) যদি আরো বেশি করে আরো বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক মানুষকে এভাবে পরীক্ষা করা যেত তাহলে সংখ্যাটি আরো নিশ্চিত ভাবে বলা যেত। কিন্তু আমরা মোটামুটি অনুমান করতে পারি এই এলাকায় প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষের নিশ্চয়ই করোনা হয়ে গেছে। যার অর্থ বাইরে আমরা যাদেরকে ঘোরাঘুরি করতে দেখি নিশ্চয়ই তাদের ভেতরে একটা অংশ আসলে করোনায় সংক্রমিত, তাদের দর্শনীয় কোন উপসর্গ নেই তাই আমরা তাদের আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারি না, তারা নিজেরাও হয়তো জানে না। কিন্তু হয়তো সবার অগোচরে তারা অন্যদের কম বেশি সংক্রমিত করে যাচ্ছে! আমি অন্তত দুই জনের কথা জানি যারা পুরোপুরি সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেও করোনায় সংক্রমিত হয়েছে এবং যথেষ্ট ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কলকাতায় শুধু যে এন্টিবডি টেস্ট হচ্ছে তা নয়, সেখানে এন্টিজেন টেস্টও শুরু করা হচ্ছে, যেটা করে দ্রুত কোভিড সংক্রমণ বের করা যায়, যদিও এই পদ্ধতিটা অনেক কম নির্ভরযোগ্য। কিন্তু অনেক দ্রুত, অনেক কম খরচে, অনেক বেশি টেস্ট করা যায় বলে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এটা খুবই কার্যকরী। বিশেষজ্ঞরা বলে যাচ্ছেন এন্টিজেন টেস্ট করে যাদের করোনা আক্রান্ত পাওয়া যাবে তাদের যদি কিছুদিন ঘরে থাকতে বলা হয় তাহলেই রোগটা অনেক নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে।   আমি আমাদের কমনসেন্স দিয়ে বুঝতে পারি একটা সমস্যা সম্পর্কে যত বেশি খুঁটিনাটি জানা যায় সমস্যাটা ততো ভালোভাবে সমাধান করা যায়। তাহলে কেন আমরা আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শুনি না? কেন আমরা ব্যাপকভাবে এন্টিবডি টেস্ট শুরু করি না? কেন আমরা এন্টিজেন টেস্টও শুরু করি না? সবচেয়ে বড় কথা আমাদের দেশের গণস্বাস্থ্য থেকে এই দুটি টেস্টেরই কিট  তৈরি করা হয়েছে। এই সুযোগটি কেন আমরা গ্রহণ করছি না? যদি সত্যিই কর্মকর্তাদের দেশের প্রযুক্তির উপর বিশ্বাস না থাকে তাহলে কিটগুলো বাইরে থেকে আমদানি করলে কী হয়? সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যাটাকে বোঝা!  সমস্যা বোঝার জন্য প্রয়োজন হল তথ্য এবং তথ্য। কেন সেই তথ্য আমরা সংরহ করি না? আমরা সমস্যাটা বুঝতে চাই না? সবকিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে চাই? খবরে দেখেছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ সস্ত্রীক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। একসময় পরিচিত কাউকে কারোনায় আক্রান্ত হতে দেখতাম না। এখন প্রায়ই দেখছি। আশা করছি অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ তার স্ত্রীকে নিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন, তাদের জন্য রইলো অনেক শুভকামনা।
তথ্য এবং তথ্য চাই
কোরবানির পশুর হাট : সব কূল রক্ষাই মূল চ্যালেঞ্জ
জীবন আগে নাকি জীবিকা, এই তর্কের মীমাংসা অনেক আগেই হয়ে গেছে। মোটামুটি সবাই একমত যে, দুটির যেকোনো একটিকে বেছে নেবার সুযোগ নেই, বরং দুটোকেই এগিয়ে নিতে হবে সমান্তরালে। তবে, করোনার মতো অতিমারি দুর্যোগে “জীবন এবং জীবিকাকে” একসূতায় গাঁথতে হলে অনেক কৌশলী হতে হয়, চলতে হয় সুপরিকল্পিত পথে। আর পরিকল্পনা দুর্বল হলে জীবন-জীবিকা দুটোই হারানোর শঙ্কা থাকে। পুরনো এই কথা আবারো সামনে আনার পেছনে বড় কারণ হলো, আসন্ন কোরবানির ঈদ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে গত বছর দেশে কোরবানি হয় ১ কোটি ১০ লাখের কিছু বেশি। ধারণা করা হচেছ, করোনার দুর্যোগ না থাকলে, এবারও প্রায় সমপরিমাণ অথবা তারচেয়েও বেশি পশু কোরবানি হতো। প্রায় অর্ধ লক্ষ কোটি টাকার পশু কেনা-বেচা হয় এই ঈদে। কাপড়-চোপড়, পরিবহন, মসলাপাতি সবকিছু মিলে অন্তত ৭০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে ঈদুল আজহাকে ঘিরে। দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত চামড়া শিল্পের জন্য সারা বছর যে পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয়, তার অর্ধেকেরও বেশি সংগ্রহ হয় এই ঈদে। বর্তমানে শিক্ষিত তরুণরা সারাদেশে ছোট-বড় প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি খামার গড়ে তুলেছে। এই খামারগুলোর টার্গেট থাকে কোরবানির ঈদ। বিপুল সংখ্যক গৃহস্থের স্বপ্নের ডাল-পালা বিস্তৃত হতে থাকে বাড়িতে পালা গবাদিপশুর তিলে তিলে বেড়ে ওঠার সঙ্গে। পোষা গরু, ছাগল কিংবা মহিষটি বিক্রি করে প্রিয় সন্তানের আবদারটি পূর্ণ করার স্বপ্ন দেখেন অনেকে। কিংবা পশুবিক্রির টাকা দিয়ে এবার বড় মেয়েটির বিয়ে দেবে, অথবা, ধানমাড়াইয়ের একটি যন্ত্র কিনবে। কোরবানি দিতে না পারলে সামর্থ থাকা মুসলমান ভাইটির মনে কতটা রক্তক্ষরণ হবে, তাও তো এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই। সারা বছর গরু কিংবা ছাগলের মাংস খেতে না পারা দরিদ্র মানুষগুলো চেয়ে থাকে কোরবানির ঈদের দিকে।  কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির টাকার পুরোটাই গরীব-দুস্থদের হক। মফস্বলে তো বটেই, শহরেও অনেক এতিমখানা চলে সাধারণ মানুষের দেয়া চামড়া কিংবা চামড়া বিক্রির টাকা দিয়ে।  এখন প্রশ্ন হলো, করোনার কারণে এবার কি সব খারিজ করে দেবো? গৃহস্থ কিংবা খামারির স্বপ্নগুলো কি সব চুরমার হয়ে যাবে? নাকি জীবন বাঁচিয়ে জীবিকা এগিয়ে নেবার পথ তৈরির চেষ্টা করবো আমরা? কোভিড-১৯ বাস্তবতায় সব কূল কিভাবে রক্ষা করা যায়, তার কিছু আইডিয়া তুলে ধরার জন্যই এই প্রয়াস। প্রথমত কোরবানির বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। প্রদর্শনের চিন্তা থেকে বেরিয়ে কোরবানির মূল দর্শনে ফিরে যেতে হবে, পরিবর্তন আনতে হবে মাইন্ডসেটে। ঈদের আগের দিন দুপুরের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো বড় শহরগুলোতে কসাইয়ের কাজ করতে আসে। ট্রেনের ভেতরে এবং ছাদে এসব শ্রমিকের ভিড় দেখলেই বোঝা যায় কি পরিমাণ মৌসুমী কসাই ঈদে শহরগুলোতে আসে। সাধারণ সময়ে এটা ইতিবাচক হলেও করোনার এই দুর্যোগে এটা ডেকে আনতে পারে ভয়ঙ্কর পরিণতি। বিপুলসংখ্যক এই মৌসুমী কসাইরা যেমন শহরে এসে নিজেরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রান্তিক অঞ্চলে কোভিডের জীবাণু বহন করে নিয়ে যেতে পারে, তেমনি নিজেরাই বাহক হিসেবে শহরে এসে করোনার দ্রুত বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।  অথচ, শহরের বাসিন্দারা যদি গ্রামে কোরবানি দেয় তাহলে এই মৌসুমী কসাইরা গ্রামেই কাজের সুযোগ পেয়ে যাবে, শহরে আসতে হবে না। গ্রামের অতি দরিদ্র মানুষরা কিছু মাংস খাওয়ার সুযোগও পাবে, কোরবানির উদ্দেশ্যও সফল হবে। দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পশুর হাট কমিয়ে ফেলায় কম হাটে বেশি মানুষের ভিড় হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হবে না, ফলে কোরবানির জন্য পশু কিনতে যারা হাটে যাবেন, তাদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে কোভিড-১৯ জীবাণু পৌঁছে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এর বদলে গ্রাম এবং মফস্বল এলকাগুলোতে পশুর হাটের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে প্রতিটি হাটে ভিড় কম হবে, সঙ্গে করোনার ঝুঁকিও কমে যাবে। আর রাজধানী ঢাকার মতো অতি ঘনবসতিপূর্ণ নগরের ভেতরে পশুর হাট না বসিয়ে নগরের বাইরে প্রয়োজনে চক্রাকারে পশুর হাট বসানো যেতে পারে। এবারের ঈদুল ফিতর করোনার কারণে ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেই পালিত হয়েছিলো। সেসময় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ও আবাসস্থল বা কর্মস্থল ত্যাগের ব্যাপারে একধরনের নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়। কিন্তু, ঈদের দুদিন আগে নগরীর বহির্মুখগুলোতে এবং ফেরিঘাটে গ্রামমূখী মানুষের ঢল ঠেকানো যায়নি। সাধারণ পরিবহন না পেয়ে অনেকে মোটরবাইক, মাইক্রোবাস, ছোট পিকাপ ভাড়া করে ঠাসাঠাসি করে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছেন। যার ফলে, শুধু জুন মাসেই প্রায় ১ লাখ মানুষ নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এবারের ঈদেও যদি পরিকল্পনায় দুর্বলতা থাকে, তবে আবারো করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে বেড়ে যাবার শঙ্কা রয়েছে। ঈদুল ফিতরের মতো এবারের ঈদেও যদি মানুষের ব্যাপক মুভমেন্ট না ঘটে, কঠোরভাবে সবাই যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। “সেভ ইয়োর টি” অর্থাৎ দুই চোখ, নাক এবং মুখ সুরক্ষিত রাখতে হবে। নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রায় সব গবেষণারই ফাইন্ডিংস হচ্ছে এই ভাইরাসটি চোখ, নাক ও মুখ দিয়ে মানব দেহে প্রবেশ করে। সুতরাং, এই অঙ্গগুলো ঢেকে রাখতে হবে। পশুর হাটে, গণপরিবহন কিংবা যেকোনো ধরনের মার্কেটে মাস্কবিহীন ব্যক্তির প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।    দেশে ১৬ কোটি ১৫ লাখের বেশি মোবাইল সিম ব্যবহার হচ্ছে, ইন্টারনেট সংযোগ আছে ১০ কোটির বেশি।  দেশজুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে সরকার ভার্চুয়াল পশুর হাটের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে, এর সুবিধা পেতে হলে ব্যাপক ভিত্তিক প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে ক্রেতা এবং বিক্রেতা, উভয়ের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়ার কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিতে হবে। কেননা অনলাইনে পশু বিক্রির প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ খামারি ও কৃষক কিছুই জানেন না। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনলাইন বাজার পরিচালনা সম্ভব হলে খামারিরা যেমন লাভবান হবেন, বেঁচে যাবে বহু গৃহস্থের স্বপ্ন, তেমনি করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখাও সম্ভব হবে। ভার্চুয়াল পশুর হাটের সুবিধা পেতে হলে ইন্টারনেটের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি দামও কমাতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, অনলাইন ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা এখনো শহরেই সীমাবদ্ধ, এই অল্প সময়ে সারা দেশের মানুষকে এর আওতায় আনা কখনোই সম্ভব হবে না। ফলে, মফস্বল শহরে এবং গ্রামে সরাসরি পশুর হাট বসানোর বিকল্প নেই। এতে কোনো সমস্যাও হবে না, যদি কিছু ব্যবস্থা নেয়া যায়। প্রতিটি হাটেই মাস্ক, সাবান, তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র, স্যানিটাইজারের মতো সুরক্ষা সামগ্রীর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিটি হাটের জন্য ভলান্টিয়ার তৈরি করা যেতে পারে। হাট কমিটিগুলোর সঙ্গে প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পশুর দরদামে ব্যস্ত থেকে ক্রেতাকে যেনো হাটে বেশি সময় থাকতে বাধ্য হতে না হয় সেজন্য হাট কমিটি পশুর একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারেন, যেনো ক্রেতার পশু পছন্দ হওয়ার পর তা দামের জন্য সময়ক্ষেপণ করতে না হয়। এছাড়া কেউ হাটে অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।  তবে মুখে মাস্ক ছাড়া কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা হাটে যেনো প্রবেশ করতে না পারে এবং একটি পশু থেকে আরেকটা পশুর কমপক্ষে ৫ ফুট দূরত্ব অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।  মহামারির এই দুর্যোগে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই অর্থনীতি সচল রাখার পাশাপাশি ধর্মীয় রীতি এবং উৎসব পালনের সুযোগ অবারিত রাখা যেতে পারে। আর যদি বাজার অনিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পনাহীন হয়ে পড়ে তাহলে শেষ পর্যন্ত জীবিকাও টিকবে না, মানুষও বাঁচবে না। লেখক: সৈয়দ আশিক রহমান প্রধান সম্পাদক আরটিভি অনলাইন ও সিইও আরটিভি
কোরবানির পশুর হাট : সব কূল রক্ষাই মূল চ্যালেঞ্জ
‘ভাইরাল বোমা’ এমন অপবাদের বোঝা কেন বইবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশিরা ফিরতে শুরু করেছেন ইউরোপের কর্মস্থলে। এমন খবর গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর অনেকের মাঝেই নিশ্চয়ই স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু এতো অল্প সময়ের মাঝেই যে তা অস্বস্তিতে পরিণত হবে তা হয়তো কারও ধারণার মধ্যেই ছিল না।গত সোমবার সব রকমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও করোনাভাইরাস নেগেটিভ রিপোর্ট হাতে নিয়েই ২২৫ জন বাংলাদেশি ইটালিতে পৌঁছে।কিন্তু তার মাঝে ২১ জন যাত্রী করোনা পজেটিভ হওয়া এবং এর আগে আরও কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইটে ইটালি যাওয়া বেশ কয়েকজন পজেটিভ হওয়ায় এখন বাংলাদেশের ভুয়া করোনা সনদের খবরটি ঘুরছে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে।  এতোদিন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও তা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক রিপোর্ট বিশ্বগণমাধ্যমে প্রচার হয়নি। বরং দুর্যোগকালে সরকারের নেয়া বেশ কিছু উদ্যোগের  প্রশংসা করে রিপোর্ট হয়েছে।কিন্তু যখন ইউরোপের বাজার খুলতে শুরু করেছে, বিশ্ব অর্থনীতির চাকা আবারও সচল হচ্ছে তখন এই ধরনের রিপোর্ট শুধু বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নই করেনি, বরং এখন বিশ্ব বাজারে যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে তা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে দেবে।  ইটালি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। অথচ ইউরোপের মাঝে ইটালিতেই সবচেয়ে বেশি বৈধ প্রবাসী বাংলাদেশি থাকেন।এছাড়া তৈরি পোশাক রপ্তানিসহ মেশিনারিজ, কৃষি ও অন্যান্য বিষয়ে ইটালির সাথে বড় অংকের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে।  শুধু ইটালি নয় ভুয়া করোনাভাইরাস সনদের কারণে ফ্লাইট স্থগিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও। গত এপ্রিলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাপান ফেরাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাড়া করা তিন-চারটি চার্টার্ড ফ্লাইটে যেসব যাত্রী জাপান পৌঁছে তাদের হাতে করোনা নেগেটিভ সনদ থাকলেও সেখানে ৪ জনের পজেটিভ আসে। এর পরই বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে মে মাসের প্রথমদিকে শর্ত আরোপ করে দেশটি।একই রকম ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়াগামী চার্টার্ড ফ্লাইটের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও।করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে গেলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছার পর পজেটিভ হয় ৬ বাংলাদেশি।  বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করেছে তুরস্ক। গত ৩ জুলাই থেকে ইস্তাম্বুল-ঢাকা রুটে ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সউদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের সঙ্গে। আর এসব দেশেই রয়েছে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার।আমিরাতের সাথে বিমানের ফ্লাইট ৬ জুলাই থেকে শুরুর ঘোষণা দিয়েও পরে তা ৩০ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। শুধু তাই নয়, করোনার কারণে যখন সব দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করা হয় তখনও চীনের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু গত ১১ জুন ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংঝুতে চায়না সাউদার্নের ফ্লাইটে যাওয়া ১৭ জন যাত্রীকে পজিটিভ শনাক্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে চায়না সাউদার্নের ঢাকার ফ্লাইট চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।  এসব ভুয়া করোনাভাইরাসের সনদের ফলে দেশের কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সক্ষমতাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধিই করেনি, দেশের ভাবমূর্তিকেও ভিষণভাবে ক্ষুন্ন করেছে।  এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই লকডাউন তুলে নিচ্ছে, স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জীবনযাত্রা। সে সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন নেতিবাচাক খবর শ্রমবাজারে বড় প্রভাব পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ২২৫ যাত্রীর মাঝে ২১ জন পজেটিভ হওয়ার পর ইটালির লাৎজিও অঞ্চলের একজন ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন আমরা একটি ‘ভাইরাল বোমা’ নিষ্ক্রিয় করেছি।তার এই বক্তব্য বিশ্বগণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।  অথচ এসব ঘটনার পেছনে জড়িত রিজেন্ট গ্রুপের মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের মতো কিছু সুবিধাবাদী ও উচ্চাভিলাষী। যাদের কাছে মানবতা, দেশ ও রাষ্ট্রের চেয়ে বড় বিষয় ক্ষমতা ও বিত্ত বৈভব। সাহেদ করিমরা কখনো কর্নেল, কখনো মেজর বা কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এপিএস নামে, বেনামে এসব অপকর্ম করে যান। তাদের অপকর্মের জন্য ভিন দেশের লোকেরা আজকে বাংলাদেশিদের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারে ‘ভাইরাল বোম’। কেন এমন অপবাদের বোঝা বইবে বাংলাদেশ।  লেখক: সৈয়দ আশিক রহমান প্রধান সম্পাদক আরটিভি অনলাইন ও সিইও আরটিভি 
‘ভাইরাল বোমা’ এমন অপবাদের বোঝা কেন বইবে বাংলাদেশ
‘ভাইরাল বোমা’ এমন অপবাদের বোঝা কেন বইবে বাংলাদেশ 
বাংলাদেশিরা ফিরতে শুরু করেছেন ইউরোপের কর্মস্থলে। এমন খবর গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর অনেকের মাঝেই নিশ্চয়ই স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু এতো অল্প সময়ের মাঝেই যে তা অস্বস্তিতে পরিণত হবে তা হয়তো কারও ধারণার মধ্যেই ছিল না।গত সোমবার সব রকমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও করোনাভাইরাস নেগেটিভ রিপোর্ট হাতে নিয়েই ২২৫ জন বাংলাদেশি ইটালিতে পৌঁছে।কিন্তু তার মাঝে ২১ জন যাত্রী করোনা পজেটিভ হওয়া এবং এর আগে আরও কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইটে ইটালি যাওয়া বেশ কয়েকজন পজেটিভ হওয়ায় এখন বাংলাদেশের ভুয়া করোনা সনদের খবরটি ঘুরছে আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে। এতোদিন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও তা প্রতিরোধে বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক রিপোর্ট বিশ্বগণমাধ্যমে প্রচার হয়নি। বরং দুর্যোগকালে সরকারের নেয়া বেশ কিছু উদ্যোগের  প্রশংসা করে রিপোর্ট হয়েছে।কিন্তু যখন ইউরোপের বাজার খুলতে শুরু করেছে, বিশ্ব অর্থনীতির চাকা আবারও সচল হচ্ছে তখন এই ধরনের রিপোর্ট শুধু বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নই করেনি, বরং এখন বিশ্ব বাজারে যে প্রতিযোগিতা শুরু হবে তা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে দেবে।  ইটালি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। অথচ ইউরোপের মাঝে ইটালিতেই সবচেয়ে বেশি বৈধ প্রবাসী বাংলাদেশি থাকেন।এছাড়া তৈরি পোশাক রপ্তানিসহ মেশিনারিজ, কৃষি ও অন্যান্য বিষয়ে ইটালির সাথে বড় অংকের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে।  শুধু ইটালি নয় ভুয়া করোনাভাইরাস সনদের কারণে ফ্লাইট স্থগিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানও। গত এপ্রিলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাপান ফেরাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাড়া করা তিন-চারটি চার্টার্ড ফ্লাইটে যেসব যাত্রী জাপান পৌঁছে তাদের হাতে করোনা নেগেটিভ সনদ থাকলেও সেখানে ৪ জনের পজেটিভ আসে। এর পরই বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে মে মাসের প্রথমদিকে শর্ত আরোপ করে দেশটি।একই রকম ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়াগামী চার্টার্ড ফ্লাইটের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও।করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে গেলেও দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছার পর পজেটিভ হয় ৬ বাংলাদেশি।  বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ করেছে তুরস্ক। গত ৩ জুলাই থেকে ইস্তাম্বুল-ঢাকা রুটে ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে সউদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের সঙ্গে। আর এসব দেশেই রয়েছে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার।আমিরাতের সাথে বিমানের ফ্লাইট ৬ জুলাই থেকে শুরুর ঘোষণা দিয়েও পরে তা ৩০ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। শুধু তাই নয়, করোনার কারণে যখন সব দেশের সঙ্গে ফ্লাইট বন্ধ করা হয় তখনও চীনের সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু গত ১১ জুন ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংঝুতে চায়না সাউদার্নের ফ্লাইটে যাওয়া ১৭ জন যাত্রীকে পজিটিভ শনাক্ত হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে চায়না সাউদার্নের ঢাকার ফ্লাইট চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।  এসব ভুয়া করোনাভাইরাসের সনদের ফলে দেশের কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সক্ষমতাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধিই করেনি, দেশের ভাবমূর্তিকেও ভিষণভাবে ক্ষুন্ন করেছে।  এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই লকডাউন তুলে নিচ্ছে, স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জীবনযাত্রা। সে সময় বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন নেতিবাচাক খবর শ্রমবাজারে বড় প্রভাব পড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ২২৫ যাত্রীর মাঝে ২১ জন পজেটিভ হওয়ার পর ইটালির লাৎজিও অঞ্চলের একজন ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন আমরা একটি ‘ভাইরাল বোমা’ নিষ্ক্রিয় করেছি।তার এই বক্তব্য বিশ্বগণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।  অথচ এসব ঘটনার পেছনে জড়িত রিজেন্ট গ্রুপের মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের মতো কিছু সুবিধাবাদী ও উচ্চাভিলাষী। যাদের কাছে মানবতা, দেশ ও রাষ্ট্রের চেয়ে বড় বিষয় ক্ষমতা ও বিত্ত বৈভব। সাহেদ করিমরা কখনো কর্নেল, কখনো মেজর বা কখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এপিএস নামে, বেনামে এসব অপকর্ম করে যান। তাদের অপকর্মের জন্য ভিন দেশের লোকেরা আজকে বাংলাদেশিদের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারে ‘ভাইরাল বোম’। কেন এমন অপবাদের বোঝা বইবে বাংলাদেশ।  লেখক: সৈয়দ আশিক রহমান প্রধান সম্পাদক আরটিভি অনলাইন ও সিইও আরটিভি 
‘ভাইরাল বোমা’ এমন অপবাদের বোঝা কেন বইবে বাংলাদেশ 
আরও পড়ুন
মানিকগঞ্জে পথচারীদের ২০ হাজার মাস্ক বিতরণ
সিনোফার্মের করোনা টিকা অনুমোদন দিলো চীন
জেনারেল সোলাইমানি হত্যায় ব্রিটিশ নিরাপত্তা কোম্পানি জড়িত: ইরান
উপসাগরীয় অঞ্চলে ফের মার্কিন বোমারু বিমান