ঢাকাশুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

ইয়াবার গডফাদাররা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে

মো. শাফায়েত হোসেন,বান্দরবান, আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২০ , ০১:২৮ পিএম


loading/img
ছবি সংগৃহীত

বান্দরবান সীমান্তসংলগ্ন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম এলাকা দিয়ে অবাধে আসছে বিপুল পরিমান ইয়াবা, হেরোইন, ড্রাইজিন, হুইসকিসহ হরেক রকম মদকদ্রব্য।মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আসছে এসব  মাদকদ্রব্য।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে নিরাপদ আস্তানা হিসাবে বেছে নিয়েছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এই রোহিঙ্গারা এখন ক্যাম্পের ভেতরে-বাইরে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপকর্মে।মাদকের পাশাপাশি অস্ত্র নিয়েও সীমান্ত এলাকায় ঘুরাফেরা করছে রোহিঙ্গারা।

গত তিন মাসে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু দেশি অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং ইয়াবা উদ্ধার করেন বিজিবি এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। তবে সীমান্তে বেশ কিছু এলাকা এখনও অরক্ষিত থাকায় রোহিঙ্গাদের ইয়াবা বহন করাসহ বিভিন্ন অপকর্ম সহজ হচ্ছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সীমান্ত পার হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এনে মজুদ করা, আবার সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয় এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা ইয়াবাসহ বিভিন্ন চোরাচালানে এবং কাঁচা টাকার লোভে পড়ে এসব মাদক পাচারের কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তবে এসব মাদকদ্রব্য পাচারের ব্যস্ততম রুটে পরিণত হয়েছে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশপারি সীমান্তের ঠান্ডা ঝিরি, ঘুমধুম নয়া পাড়া, রেজু আমতলী পাড়া, বরইতলী,পাত্রাঝিরিসহ বিভিন্ন পয়েন্ট।

ইতোমধ্যে বিজিবি ও পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযানে ইয়াবাসহ পাচারকারী কয়েকজনকে আটক করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি ১১-বিজিবি ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা গেছে, গেলা তিন মাসে সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবি অভিযান চায়িলে ১৪টি অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং ১৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করেন।

বিজ্ঞাপন

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, গলো তিন মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযাযান চালিয়ে প্রায় দুই লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে এবং ইয়াবাসহ কয়েকজনকে আটক করে। আটকৃদের বিরুদ্ধে মাদ্রকদ্রব্য আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয়দের মতে, নাইক্ষ্যংছড়ির কোনা পাড়ায়সহ উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে একটি ইয়াবা চক্রের সঙ্গে ইয়াবা পাচারকারীর একটি সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। তাদের সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন সম্প্রদায় এবং তাদের আত্মীয়দের যোগাযোগ রয়েছে।মিয়ানমার থেকে রাতের আঁধারে ইয়াবা ও মাদকের চালান সীমান্তের কাঁটাতারের পার্শ্বে নিয়ে আসে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। পরে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা সীমান্ত থেকে মাদকের চালান নিয়ে বিভিন্ন স্থানে পাচার করেন। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ইয়াবা ঢুকছে বান্দরবান সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে। তবে রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট দল প্রতিদিন সীমান্তের বিশেষ করে বাইশপারি সীমান্তের ঠান্ডা ঝিরি, ঘুমধুম নয়া পাড়া, রেজু আমতলী পাড়া, বরইতলী, পাত্রাঝিরিসহ বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে চোরাইপথে বিভিন্ন কৌশলে নিয়ে আসছে ইয়াবা। বিভিন্ন কারণে আশ্রিত রোহিঙ্গীরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পয়ন্টে দিয়ে মিয়ানমারে আসা-যাওয়া করেন।তারা রাতের বেলায় বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবা চালান নিয়ে আবার ফিরে আসে এই পারে। রোহিঙ্গাদের বেপরোয়া চলাচল করার কারণে অস্ত্র, ইয়াবা, মাদক ও অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে যারা স্থানীয় বাসিন্দা রয়েছে তাদেরকে বড় ধরনের মাশুল দিতে হবে।

তাদের মতে, সীমান্ত এলাকায়  যারা মাটির কলসি বিক্রি করতো তারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক এবং ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছে। এতে নতুন প্রজন্মদের ভবিষৎ অন্ধকার।

নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি তসলিম ইকবাল চৌধুরী বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি মাদকের বেচাকেনা ও অবাধে মাদক পাচার হচ্ছে সেটা হলো সীমান্তের ঘুমধুম ইউনিয়নের বিশেষ করে নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশপারি সীমান্তের ঠান্ডা ঝিরি, ঘুমধুম নয়া পাড়া, রেজু আমতলী পাড়া, বরইতলী,পাত্রাঝিরিসহ বিভিন্ন পয়েন্ট মাদক পাচারকারীরা সক্রিয় রয়েছে।তবে নিমিয়ত আইশৃঙ্খলা বাহিনী সীমান্ত থেকে ইয়াবা মাদকদ্রব্য উদ্ধার করলেও সিন্ডিকেটের গডফাদাররা এখনও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তার মতে, মিয়ানমান সীমান্তের কিছু কিছু এলাকা এখন  রয়েছে অরক্ষিত। যেখানে আইশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও যেতে পারছেন না, সেইখানে নিরাপদ সড়ক হিসেবে মাদক মাদক পাচারকাবীরা কাজ করছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তবর্তী ঘুমধুম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান একে এম জাহাঙ্গীর আজিজ আরটিভি নিউজকে বলেন, ঘুমধুম এলাকাকে ইয়াবামুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না একমাত্র রোহিঙ্গার কারণে। রোহিঙ্গাদের আনাগোনা বন্ধ করা যায় একমাত্র সেনাবাহিনী দিয়ে ক্যাম্প থেকে তাদেরকে বের হতে না দেওয়া গেলে।

এই জনপ্রতিনিধির মতে, এখনও কোনাপাড়া জিরু পয়ন্টে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে।এই রোহিঙ্গাগুলো সিমান্তের পাহাড়ে বিভিন্ন স্থানে অবাধে অস্ত্র নিয়ে চলফেরা করছে।এরা সবাই মাদকের সঙ্গে জড়িত। কারণ এই ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা হিসেবে কোন একসময় সুনাম ছিল।কিন্ত এই রোহিঙ্গাদের কারণে আজ ঘুমধুম ইউনিয়নের সুনাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং মাদকের কারণে এখানকার যুব সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।তার মতে, স্থানীয় একটি মহল হঠাৎ করে কোটিপতি বনে গেছেন এবং তারা ইয়াবার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। তাদের যদি একটি তালিকা করা হয়, দেখা যাবে কারা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন আরটিভি নিউজকে বলেন, মাদককে আমরা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসছি।তবে পাহাড়ি এলাকা যোগাযোগের জন্য অনেক দুর্গম।যার কারণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সহজে যেতে পারে না।তবে এখানে মাদক বিস্তারে অনেকটা ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার জেরিন আখতার আরটিভি নিউজকে বলেন, আমরা চাই মাদকমুক্ত রাষ্ট্রগঠন। মাদকের সঙ্গে যাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে সেই বিষয়টাকে মোটেই ছাড় দেওয়া হবে না। সেই ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ী হোক অথবা আমাদের নিজেদের সদস্যদেরও সংশ্লিষ্টতা থাকলেও। তবে বান্দরবানেও আমরা অনেক অভিযান চালিয়েছি এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। তবে মাদকের সঙ্গে আপস করা হবে না।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দাউদুল ইসলাম আরটিভি নিউজকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জীরো টলারেন্স প্রশাসনও খুব সর্তক রয়েছে এবং সীমান্তে বিজিবি সার্বক্ষণিক প্রহরায় রয়েছে।আইশৃঙ্খলাবাহিনী সবসময় তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম এলাকায় মাদকের চোরাচালান ধরা পড়েছে এবং আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়েও মাদক বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালা করে থাকি। বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য বিভাগসহ সবাই সর্তক অবস্থায় আছি। মাদক নির্মূলে সকল ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

জেবি

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিজ্ঞাপন


© স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৬-২০২৫ | RTV Online |