
জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে শতভাগ রপ্তানিমুখী পরচুলা তৈরির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারখানা। প্রায় অর্ধশত কুটির, শিল্পকারখানায় হাতের বুননে পরচুলা তৈরি করছেন প্রায় সহস্রাধিক নারী। বাড়িতে অলসভাবে বসে না থেকে বাড়তি রোজগারের আশায় অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন এখানকার নারীরা। তবে কুটির শিল্পগুলোর শতভাগ ট্রেড লাইসেন্স না হওয়ায় স্থানীয় সরকারের কোষাগারে এখনও কোনো রাজস্ব জমা হয়নি।
প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠা শতভাগ রপ্তানিমুখী পরচুলা তৈরির প্রায় অর্ধশত কুটির শিল্পকারখানাগুলোতে কাজ ও বাড়তি রোজগারের সন্ধান পেয়েছেন গৃহবধূ ও তরুণীরা। শুধু তাই নয়, অবসরে এখানে কাজ করে রোজগার করছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরাও। হাতের বুননের কারুকাজ দিয়ে পরচুলা তৈরি করা এসব শিল্পীরা আছেন, বেশ খোশ মেজাজে।
জয়পুরহাট সদরের কাশিয়াবাড়ির কবিরাজপাড়া, পাঁচবিবি পৌর এলাকার মাতাশমঞ্জিল ও পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই, বেলখুর, শালাইপুর, সরাইল, শুকুরমনি, জয়হার, সালাখুর, শালাইপুর, কুয়াতপুর, মোহাম্মদপুর, বড়পুকুরিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীরা বিভিন্ন জেলার উদ্যোক্তাদের নির্ধারিত ব্যক্তির মাধ্যমে অর্ডারের কাজ সম্পন্ন করে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলার পাঁচবিবি উপজেলার উঁচাই গ্রামে প্রতিষ্ঠিত একটি পরচুলা তৈরির কারখানায় ৩০ জন বিভিন্ন বয়সের নারী পরচুলা তৈরির কাজ করছেন। আবার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বেলখুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত একটি পরচুলা তৈরির কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ২০ জন বিভিন্ন বয়সের নারী। এদের মধ্যে গৃহবধূ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন আকারের মাথার অবয়বে তৈরি এসব পরচুলার মূল উপাদান প্রসেসিং করা চুল উদ্যোক্তাগণ ঢাকা থেকে সংগ্রহ করে কারখানাতে পাঠিয়ে দেন। কারখানায় বসে বিভিন্ন আকারের প্লাস্টিকের মাথার খুলির উপর বিশেষ ধরনের সুতার তৈরি নেট বসিয়ে ফারর্নিং ও নিডলের সাহায্য চুলগুলো স্থাপন করে তৈরি করা হয় পূর্ণাঙ্গ পরচুলা বা হেয়ার ক্যাপ।
চুয়াডাঙ্গার ফারুক হোসেন তার শ্বশুর বাড়ি বেলখুর গ্রামের ওই এলাকার নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে এই ক্ষুদ্র শিল্পের কাজ শুরু করেন প্রায় এক বছর আগে।
ফারুক হোসেন বলেন, এই কারখানাতে ৪৮ জন নারীর কাজ করার মতো সুবিধাদি থাকলেও বর্তমানে ২০ জন নারী কাজ করছেন। এখানকার তৈরি পরচুলাগুলো ঢাকায় চিনা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। যা পরবর্তীতে চিনে রপ্তানি করা হয়।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার কাশিয়াবাড়ি কবিরাজ পাড়ায় ৩ মাস আগে একই ধরনের কারখানা স্থাপন করেছেন চুয়াডাঙ্গা জেলার আব্দুস সালাম। এই কারখানায় কাজ করছেন ৩০ জন বিভিন্ন বয়সের নারী।
এই পরচুলা তৈরি কারখানায় জয়পুরহাট সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী হাসি আক্তার কিছুদিন আগে পরচুলার তৈরির কাজে নিয়োজিত হয়েছেন।
হাসি বলেন, বড়দের অনুপ্রেরণায় এই কাজে এসেছি, ভালো লাগছে।
কাশিয়াবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছুম্মা আক্তার বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে পরচুলা তৈরির কাজ করে প্রতিমাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করি। এই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ ছাড়াও পরিবারে সহযোগিতা করেছি।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার কবিরাজ পাড়ার মেরিনা আক্তার বলেন, পরিবারের চার জন সদস্য। স্বামী অসুস্থ। এখন পরচুলা তৈরির কাজ করে পুরো সংসার চালাচ্ছি। এই পরচুলা তৈরির কাজ করে প্রতিমাসে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় করছি।
কাশিয়াবাড়ি কবিরাজপাড়ার কারখানার সুপারভাইজার কলেমা বেগম বলেন, বিভিন্ন আকারের পরচুলা তৈরি করে সর্বনিম্ন ৩৫০ থেকে ১২০০ টাকা মজুরি পেয়ে থাকেন নারীরা। দক্ষ নারী শ্রমিকরা দৈনিক ৬ ঘণ্টা কাজ করে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ দিনে একটি বড় আকারের পরচুলা তৈরি করতে পারেন। সেই হিসেবে কেউ যদি এটাকে মূল পেশা হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে এ ধরনের কাজ থেকে প্রাপ্ত আয়ে ৪ বা ৫ সদস্যের একটি পরিবার সচ্ছলভাবে চলতে পারবে।
পরচুলা তৈরির উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষক সজীব বাবু জানান, চীন দেশের কারিগরি নির্দেশনায় দেশটির ক্রেতারাই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন এখানে উৎপাদিত নানা ডিজাইনের সব পরচুলা। নারী শিল্পীদের হাতে তৈরি করা পরচুলা কারখানাগুলোর উদ্যোক্তারাও সফল।
সরাইল এলাকার বাসিন্দা প্রভাষক নুরুজ্জামান পবন বলেন, পরচুলা তৈরির শিল্পী ও উদ্যোক্তারা মোটামুটি একটা ভালো অবস্থান করে নিলেও এখনও শতভাগ নিবন্ধন বা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের আওতাভুক্ত না হওয়ায় কয়েকটি কারখানা বন্ধ হলে বিপাকে পড়ে কারখানায় কর্মজীবীরা। এজন্য সরকারের নজরদারিও প্রয়োজন।
পাঁচবিবি উপজেলার কুশুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জিহাদ মণ্ডল জানান, সমস্যা থাকা সত্ত্বেও নারীদের কর্মসংস্থান ও এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে দেশি-বিদেশিদের বেশি করে সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জয়পুরহাট জেলার উপ-ব্যবস্থাপক লিটন চন্দ্র ঘোষ বলেন, বেকার ও কর্মহীন আছেন এমন নারীরা ইচ্ছে করলে এ রকম কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেন। জয়পুরহাটে নারীদের পরচুলা তৈরির কাজ অন্যদের অনুপ্রেরণা যোগাবে। এ ছাড়া এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরচুলা শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তাদের সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।




